kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

গ ল্প

রূপকথার ছায়াতলে

নাসরীন জাহান

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রূপকথার ছায়াতলে

অঙ্কন: ফারজানা জাহান

রূপকথা নাম ওর। আশৈশব ঠাকুর মার ঝুলি আক্রান্ত মেয়েটিকে দেখে তার অবয়বে আচ্ছন্ন হওয়ার আগেই ওর নামে তোলপাড় হয়।

ফর্সা মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট সে চিরকাল। কিন্তু রূপকথা শ্যামলা।

আত্মার মাঝে লাল মখমলে মুড়িয়ে নিজের মতো একটা রূপ তৈরি করে, যাতে রূপকথা সেতুর নিজস্ব নির্মাণেই মূর্ত হয়, বিশেষত সেতু যখন কল্পনা করে তাকে, ভাবনার অনেক কথা বলে।

এমনকি রূপকথাকে আমূল জড়িয়ে ধরলেও সে তার কল্পনার নারীটিকে ধরে উন্মত্ত ঘোরের মধ্যে প্যাঁচাতে থাকে। কিন্তু আশ্চর্য, এই শ্যামলা রূপকথাকেও যে ভালোবাসে। তারা সামনাসামনি কথা বলে বিমূঢ় হয়ে। ও সামনে থেকে চলে গেলে সেতু ক্ষুণ্ন হয়। আসলে একজনের মাঝে দুজনের সঙ্গে প্রেমের লীলায় মত্ত হয় নিজ অজান্তে। সচেতন সত্তা জাগরিত হলে, এ নিয়ে জীবনের বড় ক্রান্তিকালে তোমাকে পেয়েছি, রূপকথা সেতুর আঙুল নিজের আঙুলের সঙ্গে মূল জড়িয়ে বসে, বাড়িতে অভাব, অশান্তি।

এসব বোলো না আমাকে, চকিতে তাকায় সেতু। আমি তোমাকে নিয়ে এক সুন্দরা কাব্য তৈরি করেছি। এসব বলেই সেই রংধনুর বুদ্বুদকে বাতাসে নিয়ে যেতে দিয়ো না। তুমি বড় স্বপ্নে করো, রোদ্দুরের তেজোময় গ্রামে নিভৃতে জ্বলতে জ্বলতে বলে রূপকথা। তোমার কাছে লাল একটা অলৌকিক জগতের ছায়া পাই আমি, যা আমার জীবনবাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। কখনো ভালো লাগে, কখনো ভয় নাই। ভয় যেন, সেতুর মুখ উন্মুখ হয়।

তুমি যেন তুলোমেঘ, দেখে দুই হাতের আঙুলে ভরে নিতে চিত্ত উন্মাদ হয়, কিন্তু ভয়, দুটিই যদি বিলীন হও, আমার কাছে এসে নিজের জাগতির পৃথিবীটা পেছনে ফেলে এসো, রূঢ় কণ্ঠে বলেই সেতু নিজেকে সামলায়, তুমি আমার কিশোর রাজ্যের পরি, আমার এই স্বপ্নটার কী মুখে কালো কিছু ঢুকিয়ো না।

তোমার জগতের নারীরা বড় ফর্সা সুন্দর, সেতুকে মৃদু কাঁপিয়ে বলে রূপকথা, সেখানে আমাকে নিয়ে কিভাবে বিমূঢ় হও, তাজ্জব লাগে। আমি কখনো এসব বলিনি, প্রত্যয়ী সেতু টানটান, এসব ভাবনা তোমার আসে কোত্থেকে? তুমি যখন গল্প করো, ম্লান মুখ রূপকথার রাজ্যের গল্প করো তারা সবাই ফর্সা উজ্জ্বলের বিকশিত থাকে। সপ্রভিত সেতু যেন হাওয়া ঘোরায় হাত দিয়ে, ওসব সবার গল্পেই পরিরা, কাল্পনিক জগতের মানুষেরা তেমনই থাকে। রূপকথা প্রকৃতিতে মৃদু দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে বলে, অথচ আমার উল্টো, আমি শৈশব থেকে এসব বই পড়ার কোনো সুযোগ পাইনি, বোঝার বয়সের আগ থেকেই সংসারের ঘানি।

স্টপ : সেতু নিজের ভারসাম্য হারিয়ে আর্তনাদটি করেই সচেতন হয়, স্যরি এত জোরে বলা ঠিক হয়নি। সারি সারি কাল্পনিক বাতাস উড়ছিল সেতুর চোখের সামনে, যা নিমেষে মুছে দিচ্ছিল রূপকথা। হাওয়ার মধ্যে অদ্ভুত এক অদৃশ্য চিৎসাভারে নিজেকে সেতু যখন থিতু করতে যাবে, রূপকথা বলে, আমি আমার অতীতটাকে আমূল গিলে দেখে তোমার সঙ্গে জীবন কাটাব?

নিবিড় রোদ্দুরে ভিড়ছিল দুজন অরণ্যে সবুজদের সান্নিধ্য হাওয়ার সঙ্গেও। তুমি তো আমার সঙ্গে চলেই যাবে অন্য রাজ্যে। প্রত্যেক মেয়েই যায়। কেউ তার বাবার বাড়ির সংসারকে মাথায় নিয়ে যায় নাকি? তুমি আমাদের বাস্তবতা জানো না? রূপকথা এ নিয়ে বিপরীত কিছু বলার জন্য মুখিয়েও নিজেকে নিবৃত করে মনে মনে বলে, সমূলে কোনো মেয়েই এই অধ্যায় যে ত্যাগ করে কোনো দিন কোথাও যায় না, সেটা যদি বুঝতে তোমরা, জীবনেও অশান্তি হতো না।

না থাক, নিজের এসব বিষয়কে আরো কঠিন গহ্বরের দিকে ঠেলে দিতে থাকে সে। দেখতে এত সুন্দর সেতু যার পারিবারিক অবস্থা ভালো, সে রূপকথাকে নিয়ে একটা ফ্যান্টাসির মধ্যে বাস করতে পারে, এ তো অপার্থিব ব্যাপার।

শূন্যতায় মাথা কুটে দিন কাটে তার। একমাত্র এখানে এসে মনে হয় স্বপ্নের অলৌকিকতায় পা রেখেছে সে। তার যা অন্ধকার গলি-ঘুপচিগুলো, যেখানে সারাক্ষণই সে আসে-যায়, সেসব যেকোনো অলীকে হারিয়ে যায়।

আসলেই কী হারায়!

তাহলে সে যেন সেতুর অসীম তরীতে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারে না? সেতুর স্বপ্নরাজ্যে খেলতে গিয়ে কেন তাকে এত প্রগাঢ় ভান করতে হয়?

সেতুর রূপ, অর্থ এসব নিয়ে সে কেন এত সচেতন? মাটির আষ্প্রাণে চারপাশ প্রণোদিত। মেঘপুঞ্জির মতো কী সব শিশিরেরা যেন সেতুর সামনে ঘোর তৈরি করলে নিজেকে নিয়ে ভাবনার তোড়ে পড়তে পারে রূপকথা। পুরুষের রূপ নিয়ে ভাবার কোনো অবকাশ ছিল না তার জীবনে। কিন্তু সেতু তার জীবনে আসতেই তার রূপের কারণে যত ধনাঢ্য মেয়ের ঈর্ষা দেখেছে রূপকথা। তারও পলেস্তারা জীবনে মুখরিত মানুষের মনোযোগে অলৌকিক জোয়ার এসেছে। একি কম পরম প্রাপ্তি?

জীবনে কল্পনাও করেছে সে এ কী করে অস্বীকার করে রূপকথা?

এ কী করে তার জীবন থেকে সে হারিয়ে ফেলে? কিন্তু তার পতনমুখী মন প্রায়ই ভয়ার্ত থাকে। সে কিভাবে যেন কোন ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করে তার সামনে যে সেতু বসে থাকে, সে যেন ঠিক তার প্রেমিক নয়, বন্ধু। কিন্তু তাকে আমূল জড়িয়ে ধরে কাঁপতে থাকে, সে যেন রূপকথা নয়, অন্য কাউকে স্পর্শ করে।

 

এই সব বিলোড়নের তলাকার মৃত্তিকা রূপকথা দেখতে না চাইলেও এক হিমহিমে ভয়ে প্রায়ই যে বিমূঢ় থাকে?

কোথায় হারালে?

এই প্রশ্ন করে সেতু হু হু বাতাসে রূপকথার উড়তে থাকা চুলে হাত দিয়ে বলতে থাকে, তোমার চুলগুলো যদি আরেকটু সিল্কি হতো অবশ্য এটা করা যায় পার্লারে শুনেছি, আর গায়ের রং, ইউরেকা, তাও করা যায়। মুহূর্তে আহত রূপকথার সামনে তার চেয়েও গভীর আহতে ভূপাতিত হয়, সেতু সত্যিকার রূপকথা যার জগতের কেউ এমন বানানো সুন্দরী ছিল না।

দুজনই কিছুক্ষণ, অথবা আকাঙ্ক্ষা সকলে ভেতরের তুমুল স্রোতে নিয়ে বিকল থেকে একসময় দেহের ভাঁজ ভেঙে গড়ায় সেতু, আমরা মনে হয় নিজেদের ফাঁসি দিচ্ছি, আমরা বলছি কেন, আমি, এভাবে যৌথভাবে একটি জীবন পার হয় না, হয়।

বিপরীত দিকে হাঁটতে হাঁটতে রূপকথা বলে, ভাবছি নামটা পাল্টে ফেলব, জলদি বাড়িতে ফিরতে হবে আমার, ছোট ভাইটার বাড়াবাড়ি রকমের জ্বর...।

মন্তব্য