kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

গ ল্প

দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট

আনিসুল হক

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

‘বস! একটা কথা!’

‘বলো। কথা বলার আগে এত গৌরচন্দ্রিকা আমি পছন্দ করি না।’

‘বস। আপনি যে লেটারটা আমাকে দেখতে বলেছেন, এটাতে ভুল আছে। আপনি লিখেছেন, হি গো টু স্কুল রেগুলারলি। এটা গো’স হবে। থার্ড পারসন সিংগুলার নাম্বারের শেষে প্রেজন্ট ইনডেফিনিট টেন্সে এস বা ইএস বসে।’

‘আমাকে গ্রামার শিখাইতে আইস না। আমি কি তোমার ক্লাস ফোরের ছাত্র। আর তুমি হেডমাস্টার। আমি স্পেল চেকার দিয়ে চেক করাইছি। এই লেটারের সব কিছু ঠিক আছে।’

‘বস। হি গো টু স্কুল এটা হয় না?’

‘তর্ক করো ক্যানো? তুমি বেশি জানো, নাকি কম্পিউটার বেশি জানে। আমি স্পেল চেকার দিয়ে চেক করাইছি।’

‘বস। এটা গ্রামার চেকার লাগবে। স্পেল চেকার না।’

‘যাও মিয়া। বেশি কথা বলো। যাও। আজকালকার ছেলেপুলে খালি মুখে মুখে তর্ক করে। এগুলাকে যে কোত্থেকে ধরে আনে।’

আমি মন খারাপ করে চলে এলাম নিজের ডেস্কে।

রিপা এলো। দূর থেকে সে সব খেয়াল করছিল। বলল, কী হয়েছে?

আমি দাঁতে দাঁতে চেপে বললাম, এই লোকটা এত খবিশ কেন? ইংরাজি জানে না। আমাকে দেখতে বলল, আমি ভুলটা ধরিয়ে দিলাম। আমাকে বলে, কম্পিউটারের স্পেল চেকার বলেছে, ঠিক আছে। কেমন লাগে। হি গো টু স্কুল। এটা হয়?

রিপা হাসল। বলল, হয় যদি ভুল হয়!

আমি বললাম, হয়। যদি বস লেখে।

রিপা বলল, রাইট। দেখো না, আমার টেবিলের সামনের বোর্ডে আমি কী লিখে রেখেছি।

রুল নম্বর ওয়ান : দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট।

রুল নম্বর টু : ইফ দ্য বস ইজ রং, সি রুল নম্বর ওয়ান।

হুম। দেখেছি—আমি রিপার দিকে তাকালাম। রিপা হাসছে। এর একটা দাঁত আরেকটা দাঁতের ওপরে তোলা। হাসলে ওকে খুব সুন্দর লাগে।

আমি বললাম, এই কাগজ একটা আমাকেও প্রিন্ট দাও তো। আমিও আমার বোর্ডে লাগিয়ে রাখব। দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট।

একটু পরে বস ডাকলেন রিপাকে। রিপা রিপা এদিকে আসেন।

রিপা বসের রুমে ঢুকল।

আমার চিত্তচাঞ্চল্য দেখা দিল। যা একটা খবিস লোক। রিপাকে না জানি কী বলে?

পরে আমি রিপাকে জিজ্ঞেস করলাম, রিপা, কী বলল?

বলল, রিপা তোমাকে মনজুর সঙ্গে বেশি ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। কথা বলতে দেখা যায়।

তুমি কী বললা?

আমি বললাম, জি বস। আমরা দুজনেই সেলসে জব করি। একসঙ্গে ক্লায়েন্ট মিট করতে হয়। এই জন্য একটু ঘোরাফেরা করতে হয় আর কী!

বস কী বলল?

বস বলল, এই অফিসের নিয়ম অফিশিয়াল সম্পর্ক হবে অফিশিয়াল। নিজেদের মধ্যে আমি যেন আবার কোনো সম্পর্ক হতে না দেখি।

তুমি কী বললা?

আমি মনে করতে লাগলাম নিউটনের বসসংক্রান্ত দুই রুল।

রুল নম্বর ওয়ান : দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট।

রুল নম্বর টু : ইফ দ্য বস ইজ রং, সি রুল নম্বর ওয়ান।

এই? কিছু বললা না।

বললাম, ইয়েস বস। অফ কোর্স বস। ইউ আর অলওয়েজ রাইট বস। ইউ আর অসাম বস। ইয়েস বস। উই আর এবসোলুটলি রাইট বস। শোনো আমি সিটে যাই। না হলে আবার ডেকে বলবে, মনজুর সাথে এত কী কথা!

আমাদের এই বসটার নাম ফাকরুল। আমি তাকে একবার মিন মিন করে বলেছিলাম, বস, নামের বানানটা একটু চেঞ্জ করেন। ফাকরুল না রেখে ফাখরুল করেন। তিনি বললেন, আমার বাপ দুইটা খাসি জবাই করে আমার নামের আকিকা করছে, তোমার কথা মতো তো আমি নাম চেঞ্জ করতে পারব না।

ইয়েস বস। খুব সুন্দর নাম। ইংরেজি বানানটা তাহলে ইউ দিয়ে করেন বস।

ভাগো এখান থেকে।

তিনি আমাদের ব্রাঞ্চের ম্যানেজার। আমরা মতিঝিলে একটা ২২ শ স্কয়ার ফিট অফিসে বসি। ফাকরুল সাহেব এটার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। কেন যে হেড অফিস এই লোকটাকে পাঠাল এখানে। তিনি অফিসে এসেই ল্যাপটপে পর্নো ছবি দেখেন কিছুক্ষণ। এই সময় তাঁর রুমে আমাদের ঢোকা নিষেধ। তিনি কম্পিউটারে দেখেন। একদিন আমি তাঁর ঘরে ঢুকে পড়লাম। তিনি বললেন, একটা ইম্পর্টান্ট ডকুমেন্টারি দেখছি। এটা হেড অফিস থেকে পাঠাইছে। তুমি পরে আসো।

তাঁর পেছনের দেয়ালে একটা বড় কাচে বাঁধানো ছবি আছে। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছবি। সেখানে কম্পিউটারের পর্দার প্রতিবিম্ব পড়েছে। দেখা যাচ্ছে, মিয়া কালিফা জন্মদিনের পোশাকে...

আমি বললাম, বস, ইম্পর্টান্ট ডকুমেন্টারিটা আমাদের সবার দেখা উচিত। আমি আপনার পাশে আসি। ভালো করে দেখি। অফিসের সবাইকে ডাকি।

ফাকরুল সাহেব বললেন, গেটআউট।

আমি গেটআউট হলাম।

বসের যেসব জিনিস আমার পছন্দ না :

১. তিনি কলমের খাপ কানে দিয়ে কানের ময়লা বের করে সামনের কাগজে মোছেন।

২. তিনি সবার সামনে টুথপিক দিয়ে দাঁত খিলান করেন।

৩. তিনি বেসিনে পা তুলে ওজু করেন।

তবুও বস ইজ অলওয়েজ রাইট। আমি কিছু বলি না।

আমাদের রিপার ছবি আঁকার শখ। নানা ধরনের রং, কৌটা, তুলি, রংপেনসিল সে সংগ্রহ করে। কতগুলো ছোট ছোট কালার স্প্রের কৌটা সে আনিয়েছে বিদেশ থেকে। নিজের টেবিলে রেখেছে।

বস তার টেবিলের সামনে দিয়ে গেলেন। একটা কালার স্প্রের কৌটা হাতে নিলেন।

সেটা হাতে করে তিনি আমার টেবিলের সামনে এলেন।

শোনো, তুমি অফিসটা সামলাবে। আমাদের অফিশিয়াল ট্যুর আছে। কক্সবাজার যাব। রিপাও যাবে। বুঝেছ?

আমি বললাম, ইয়েস বস।

রিপা কই গেছে?

একটা ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে গেছে বস।

আচ্ছা ও আসলে আমার কাছে পাঠায় দিও।

ইয়েস বস।

এই কৌটাটা কিসের বলো তো?

বস এটা মনে হচ্ছে কালার স্প্রে।

গাধা। এটা তো লেখা আছে রোজ পিংক।

জি।

তার মানে এটা একটা পারফিউম। কী বলো?

ইয়েস বস।

গোলাপের গন্ধ আমি পছন্দই করি। আমার বউ অবশ্য করে না। রোজ ফ্লেভারটা কেমন বলো তো!

খুব ভালো।

এটা একটু মাখি গায়ে। কী বলো?

জি বস।

তিনি কৌটার মুখ খুলে স্প্রেতে চাপ দিলেন বগল বরাবর। গোলাপি রং তাঁর সাদা শার্টে বাম বগলে ভরে গেল। এরপর তিনি ডান বগলে স্প্রে করলেন। সেটাও গোলাপি হয়ে গেল।

তিনি কৌটাটা নিয়ে নিজের ঘরে গেলেন।

আমি চুপচাপ বসে থাকলাম।

একটু পরে হেড অফিস থেকে একজন ডিরেক্টর আসবে। দেখা যাক, ঘটনা কী ঘটে।

ডিরেক্টর আসামাত্র তিনি নিজের চেম্বার থেকে বের হলেন। আসেন স্যার, আসেন।

ডিরেক্টর বললেন, আপনার শার্টের অবস্থা তো সাংঘাতিক। কী করে করলেন।

বিদেশি পারফিউম পেয়েছি স্যার। দেন আপনাকেও একটু দেই। বলেই নিজের টেবিল থেকে রিপার কালার স্প্রেটা নিয়ে তিনি ডিরেক্টরের বুক বরাবর স্প্রে করতে লাগলেন। ডিরেক্টর আর্তনাদ করে উঠলেন।

আমার ফাকরুল বসের চেহারার দিকে আমি তাকিয়ে আছি। তাঁর সামনে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার শার্টের বুক বরাবর গোলাপি রং। একেবারে ছ্যারাব্যারা অবস্থা।

ফাকরুল বস খেপে গেলেন। মনজু মনজু।

ইয়েস বস।

এটা কী?

এটা কালার স্প্রে বস।

এটা আমি যখন আমার গায়ে দিলাম, তখন তো এটা পারফিউম ছিল।

ইয়েস বস।

এখন এটা কালার স্প্রে কেমন করে হলো?

ইয়েস বস।

আমার শার্টেও কি রং লেগেছে?

ইয়েস বস।

তুমি আগে বলো নাই কেন?

বস ইজ অলওয়েজ রাইট বস।

তোমার চাকরি নট।

ইয়েস বস।

ডিরেক্টর সাহেব বললেন, আপনি ওকে বকছেন কেন। যা মেস করার আপনিই করেছেন। এখন আমি বের হবো কী করে? এই শার্ট পরে তো আমি বের হতে পারব না।

আমি দেখতাছি বস। আমি শার্টের ব্যবস্থা করতেছি।

ফাকরুল নিজের বাথরুমে আয়নার সামনে গেলেন। নিজের শার্ট দেখে তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন।

একটু পর রিপা এলো।

ফাকরুল সাহেব তাকে ডাকলেন, রিপা এদিকে শোনো। অফিসে তুমি এইসব কী জিনিস রেখেছ। আমার অবস্থা দেখো। আর আমাদের ডিরেক্টর স্যারের অবস্থা দেখো। এ জন্য তুমি দায়ী। তোমার চাকরি নট।

ইয়েস স্যার।

কী বুঝলা। তোমার চাকরি নট।

রিপা বলল, আমার চাকরি আপনাকে নট করতে হবে না। আমি রেজিগনেশন লেটার লিখে এনেছি। এটা জমা দিচ্ছি। আমি আপনার সাথে কক্সবাজার যেতে পারব না।

ডিরেক্টর সাহেব বললেন, কক্সবাজারে যেতে হবে কেন?

রিপা বলল, স্যার বলেছেন, অফিসের কাজ আছে কক্সবাজারে। আমাকে নাকি সাথে যেতে হবে।

ডিরেক্টর বললেন, আচ্ছা আমি দেখছি। ফাকরুল সাহেব, আপনি আপনার পারসোনাল জিনিসপাতি নিয়ে আজকেই হেড অফিসে চলে আসেন।

আর আপনি, আপনার নাম।

ফারহিন আহমেদ।

আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে যে উনি আপনাকে কক্সবাজার যেতে বলেছেন।

আছে স্যার। উনি আমাকে মেসেঞ্জারে অনেক আজেবাজে টেক্সট পাঠিয়েছেন। সব আছে। আপনাকে আমি স্ক্রিনশট দেখাতে পারি।

ওকে। দ্যাট উইল বি এনাফ।

ডিরেক্টর চলে গেলেন।

ফাকরুল বস আমার টেবিলের সামনে এসেছেন। বললেন, এই মেয়েটা তো একটা ডাইনি। শি ইজ আ বিচ। ডিরেক্টর সাহেবকে অনেক মিথ্যা কথা বলল। তুমি মনজু, তুমি বলো সব মিথ্যা কি না?

ইয়েস বস।

তাহলে তুমি আমার পক্ষে সাক্ষী দিবা?

ইয়েস বস।

আচ্ছা তোমার পিঠে এটা কি? এটা দিয়ে তো পিঠ চুলকায়, না?

ইয়েস বস।

(আসলে ওটা হলো এটা আগুন ধরানোর যন্ত্র। সুইচ টিপলে সামনে দিয়ে আগুনের শিখা জ্বলে ওঠে। বিদেশ থেকে আমার এক বন্ধু এটা এনেছে। কালকেই পেয়েছি। দুইবার আমাদের গ্যাসের চুলা ধরিয়ে আমি চা বানিয়ে খেয়েছি অফিসে।)

ফাকরুল বস সেটা দিয়ে পিঠ চুলকাতে লাগলেন।

তারপর সুইচ টিপে দিলেন।

তাঁর পিঠে আগুন জ্বলে উঠল।

তিনি মেঝেতে গড়াগড়ি করতে লাগলেন।

আমার সামনে একটা বড় জারে একটা গোল্ড ফিশ। আমি সেটা তুলে তাঁর পিঠে ঢেলে দিলাম।

ফাখরুলের চাকরি চলে গেছে।

আমাদের নতুন বস হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন রিপা।

রিপা বলল, এই আপনি কি আজ সন্ধ্যায় ফ্রি আছেন?

আমি বললাম, ইয়েস বস।

আপনি কি আমার সঙ্গে ডিনার করতে যেতে পারবেন?

আমি বললাম, ইয়েস বস।

এই তুমি এমন করছ কেন?

দ্য বস ইজ অলওয়েজ রাইট বস।

এই আমাকে বস বলে ডাকবে না।

ইয়েস বস।

বলছি বস বলবে না।

ইয়েস ম্যাম।

ম্যাম বলবে না,

ইয়েস... ইয়েসের সাথে একটা কিছু বলা দরকার।

ইয়েস রিপা বলো।

ইয়েস বেব...

চড় খাবা?

ইয়েস বেব...

কী?

চড় খাব। তবে এই অফিসে না। অফিসে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে।

কী বলো। আবার ভয়েস রেকর্ড হয় না তো?

না বস।

আবার বস?

কী বলব বলে দাও।

রিপা...

ইয়েস রিপা...

মন্তব্য