kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

খে লা

বিশ্বকাপ জিতলেই ‘অবিভক্ত’ বাংলাদেশ!

মাসুদ পারভেজ

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



বিশ্বকাপ জিতলেই ‘অবিভক্ত’ বাংলাদেশ!

উৎসবের কেন্দ্রস্থলে বেদনার বিউগলে হারানোর সুর যেন বাজিয়েই চলেছেন এক তরুণী। কিন্তু তা মাতোয়ারা জনারণ্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে খুব সামান্যই।

মুখে তাঁর লেপ্টে আছে সদ্য মাখা হলুদ বাটা। পরনের হলুদ শাড়ি আর উপযোগী সাজসজ্জা দেখে বোঝাই যায় যে মাত্রই তাঁকে গায়েহলুদের অনুষ্ঠান থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। নিয়ে এসেছেন যিনি, একটু আগেও তিনি নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। ‘একটু আগে’ বলতে তখন মধ্যরাত ছুঁই ছুঁঁই, মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম এলাকায় বাংলাদেশ-ভারতের ২০১১-র বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের আগের দিন রাত।

সেই রাতেও স্টেডিয়ামের চারপাশে হাজারো জনতার ঢল। চোখ-ধাঁধানো আলোর রোশনাইয়ে উৎসবে শামিল তারাও। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) তখনকার সভাপতি ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের পরিকল্পনাই ছিল যে দেশের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপকে সর্বজনের করে তুলবেন। এরই অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করা হলো আলোকসজ্জার কত শত উপকরণ! সেসব দিয়েই স্টেডিয়াম এবং এর আশপাশের এলাকা সাজল বাহারি সব আলোর মালায়। তাতে তখনকার মিরপুর এমন রূপবতী হয়ে উঠল যে সন্ধ্যা ঘনাতে না ঘনাতেই সেখানে নামে উৎসবে মিলতে চাওয়া জনস্রোত।

ওই জনস্রোতে ভেসে এসেছিলেন নিজেই গাড়ি চালিয়ে আসা সেই ভদ্রলোকও। পরদিন তাঁর বড় আদরের মেয়েকে পরের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা। তাই তড়িঘড়ি গায়েহলুদের অনুষ্ঠান শেষ করে মেয়েকে বললেন, ‘আয় মা, মিরপুরের লাইটিং দেখে আসি।’ দেখতে আসার কিছুক্ষণ পরই গাড়ির ড্রাইভিং হুইলের ওপর মুখ থুবড়ে পড়েন তিনি। তিনি যখন সচেতন আর অবচেতনের মাঝামাঝি পড়েন, তখন হলুদসন্ধ্যা শেষ করে আসা তরুণী মিরপুর ১০ নম্বরের ফায়ার সার্ভিসের সামনে একটুখানি সাহায্যের প্রত্যাশায়।

বাবার বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কায় ক্রন্দনরত তরুণী কারো কারো সহানুভূতি পেলেনও। উৎসবে আসা পথচলতি কেউ কেউ এগিয়েও গেলেন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া দরকার। তবে তাঁর গাড়িটা চালিয়ে নেওয়ার মতো লোকও ওই মুহূর্তে সেখানে নেই। তাই শেষমেশ ভদ্রলোককে তুলে দেওয়া হলো এই লেখকের মোটরসাইকেলে। গন্তব্য খুব কাছের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন। কিন্তু জনসমুদ্র সেটিকেও ততক্ষণে বানিয়ে রেখেছে অনেক দূরের পথ। সেই পথ পাড়ি দিতে দিতেও কতবার যে কানের কাছে এসে আছড়ে পড়তে শুনলাম এমন হাহাকার, ‘বিশ্বকাপটা আর দেখা হলো না আমার।’

মরণাপন্ন রোগীর হাতের নাগালের মধ্যেই থাকা বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে না চাওয়া তাঁর পরম ক্রিকেটাবেগেরও প্রকাশ। অথচ উৎসবের সেই রাতে তাঁকেই গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছিল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। সেখান থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে পেরেছেন বলেও পরে জেনেছিলাম। যদিও সেই রাতে তাঁর ফিরে আসাই ছিল অনিশ্চিত। এ তো শুধুই এক সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীর গল্প। ওই বিশ্বকাপের সময়ই অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে পড়ে শুধুই পাক খেতে থাকা এক মিরপুর নিবাসীর গল্পও ক্রমেই রূপকথাকে হার মানিয়েছে। হয়ে উঠেছে ফিরে আসার এক অসাধারণ গল্পও। যে গল্পে শুধুই ‘ক্যারিয়ার-যুদ্ধ’ ছিল না, ছিল হারানোর ভয় বুকে নিয়ে প্রতিটি ক্ষণ পার করতে থাকা এক ‘জীবনযুদ্ধ’ও।

তাঁর বাসা মিরপুরেই, হোম অব ক্রিকেট থেকে খুব দূরে নয়। চোট কাটিয়ে বিশ্বকাপ দলে ঠাঁই পাওয়ার লড়াইয়ে মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে যখন ঘাম ঝরাচ্ছেন, তখনই হারানোর খাতায় টোকা হয়ে যায় প্রথম

দুঃসংবাদটি। মিরপুরের একাডেমি মাঠে একদিন অনুশীলন করছিলেন আর একই সঙ্গে আশায় ছিলেন যে বিশ্বকাপ দলে হয়তো শেষ পর্যন্ত জায়গা হয়ে যাবে তাঁর। কিন্তু অদূরেই হওয়া সংবাদ সম্মেলনে তাঁর নাম উচ্চারিত না হওয়ার খবরে ভেঙে পড়েন কান্নায়। এমনই সে কান্না, যা ছুঁয়ে যায় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। তাতে ভাগ্য বদলায়নি। পুরো ফিট নন বলে কারণ দেখান নির্বাচকরা। তাই দেশের মাটিতে হওয়া বিশ্বকাপে রীতিমতো দর্শক বনে যেতে হয় তাঁকে। সেই হতাশায় সাজসজ্জায় আলোকিত মিরপুরের প্রতিটি রাত তাঁর জন্য আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছিল একেকটি অন্ধকার রাত্রিও।

এরপর বিশ্বকাপ শুরু হলো। দেশের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ শুরু হয়ে যেতেই উৎসবও তুঙ্গ ছুঁয়ে ফেলল আরো। ঢাকা আর চট্টগ্রামে বাংলাদেশের একেকটি ম্যাচ আনন্দ-বেদনার মহাকাব্যও রচনা করতে থাকল যেন। চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর উল্লাসরত জনতার আরোপিত অবরোধে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম এবং এর আশপাশের এলাকা কার্যত অচল হয়ে থাকল গভীর রাত পর্যন্ত। তাতে কারোরই যেন কোনো অভিযোগ নেই। আবার মিরপুরে ৫৮ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জায় লাল বাংলাদেশে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বাসে ঢিল পড়ার ঘটনাও ঘটল। ২০১১-র বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য ছিল এমনই অম্ল-মধুর। দলের পারফরম্যান্সের এমন ওঠানামার মধ্যে বাদ পড়া সেই ক্রিকেটারটির খোঁজ নেওয়ার সময় কোথায় কার! তবু কেউ কেউ খোঁজ রাখলেন। তাতেই জানা গেল যে জীবনযুদ্ধের আরেক বাঁকে আটকে আছেন তিনি। তলিয়ে আছেন আরেক অন্ধকারে। প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে যাওয়া স্ত্রীর প্রাণ যায় যায় অবস্থা। ডাক্তাররা বেঁচে থাকারও নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। একে তো নিজের বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়ার যন্ত্রণা, সেটি সামলে ওঠার আগেই সংকটাপন্ন স্ত্রীকে নিয়ে রীতিমতো দমবন্ধকর অবস্থা তাঁর। পাড়াময় আলো আর সেই ক্রিকেটারের নিজের ঘরে দ্বৈত বেদনায় ভর দিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের আগের রাতে অসুস্থ সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমী আর বাদ পড়া সেই ক্রিকেটার এভাবেই যেন দেশের মাটিতে হওয়া বিশ্ব আসর নিয়ে একই বিন্দুতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মিশেছিলেন একই আবেগের মোহনায়। একজন মাঠে বসে খেলা দেখতে না পারার হতাশায়। অন্যজন নিজে মাঠে থেকে খেলতে না পারার বেদনায়। একজন কাতর ছিলেন নিজের অসুস্থতায়। অন্যজন ব্যথিত ছিলেন প্রায় মৃত্যুশয্যা নিতে যাওয়া আপনজনকে নিয়ে। এই দর্শক এবং ক্রিকেটার, দুই পক্ষই দেশের ক্রিকেটের গাঁথুনি মজবুত করার ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রভাবক। অবদান কারো চেয়ে কারো কম নয়। দর্শক-সমর্থকদের অন্ধ সমর্থন এবং বিশ্বাস ক্রিকেটারদের দিয়েছে উত্তুঙ্গ তারকাখ্যাতি। এতে ক্রিকেটারদের যত বড় হওয়ার কথা নয়, তাঁরা হয়েছেন তার চেয়েও বড়। এমনই সে বিশ্বাস যে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েও মানুষের ভালোবাসায় ধন্য হয়েছেন কোনো কোনো ক্রিকেটার। রুবেল হোসেন তাঁদেরই একজন। ২০১৫-র বিশ্বকাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে যাওয়ার আগে নারীঘটিত ঝামেলায় মামলা-মোকদ্দমায় পড়ে জেলেও যেতে হয়েছিল এই ফাস্ট বোলারকে। জেল থেকে বেরিয়ে বিশ্বকাপে যাওয়া রুবেল অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ড বধের নায়কও বনে যান। সেই জয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার ঘটনায় বয়ে যেতে থাকে প্রশংসার বন্যাও। এর মধ্যেই আলাদাভাবে নজর কেড়েছিলেন রুবেলের নিজের জেলা বাগেরহাটের এক প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাও। ঘোষণা দিয়েছিলেন, রুবেল চাইলে তাঁর দুই মেয়ের যেকোনো একজনকে বিয়ে করতে পারেন! তিনি সানন্দেই কন্যাদান করতে রাজি!

অথচ সচেতন কোনো অভিভাবকের এমন প্রস্তাব দেওয়ার কথাই নয়। তবু দিয়েছিলেন, কারণ ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের এমনই মহিমা যে সাতখুনও মাফ! ক্রিকেটপ্রেমীদের এ রকম অবাধ প্রশ্রয়ের ছায়াতল খুঁজে পাওয়া ক্রিকেটাররাও নিয়মিতই পারফরম্যান্সের ফুল ফোটাচ্ছেন, যাতে সুরভিতও হয়ে চলেছে বাংলাদেশ। দেশকে সেই সৌরভে আরো সুরভিত করার প্রতীক্ষায় রেখে ক্রিকেটাররা এবার গেছেন আরেকটি বিশ্বকাপে। দেশের ইতিহাসের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ দেখাচ্ছে আরেক ধাপ এগোনোর স্বপ্নও। সেটি দেখাবেই না কেন? ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা বাংলাদেশ দুই বছর আগে এই ইংল্যান্ডেই খেলেছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালও। এবার আয়ারল্যান্ডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিমূলক আসরে এর আগে বারবার বহুজাতিক আসরের ফাইনালে উঠে জিততে না পারার মানসিক বাধাও ডিঙিয়েছে। ছয়বারের ব্যর্থতার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে এত দিন ‘অধরা’ থেকে যাওয়া ট্রফির ছোঁয়াও পেয়েছে। তাতে আত্মবিশ্বাসের পালে লাগা আরো জোর হাওয়ায় পুরোপুরি তৈরি হয়েই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ।

সে হাওয়ায় উড়ে দর্শকরাও চূড়ান্ত সাফল্যের দেখা পাওয়ার অপেক্ষায়। এ অপেক্ষা তো ১৪ জুলাই লর্ডসে বাংলাদেশ অধিনায়কের হাতে ট্রফি দেখারও। পারফরম্যান্স, লড়াইয়ের অফুরান প্রাণশক্তি এবং পাঁচ অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের সঙ্গে দুর্বার তারুণ্যের মিশেলে দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ দল—এ সব কিছু মিলিয়েই স্বপ্ন মুঠোবন্দি করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশ্বকাপে ক্রিকেটাররা। একেকজন ক্রিকেটার যেন হয়ে উঠেছেন স্বপ্নের তীরে ভেড়ার একেকটি বইঠা। তবে ওয়ানডে ক্রিকেটের এখন যে মারদাঙ্গা ঘরানা এবং এর সঙ্গে মানানসই ইংল্যান্ডের উইকেট জানাচ্ছে, স্বপ্নের নাগাল পেতে উজানেই বইঠা বেয়ে যেতে হবে। কঠিনতম সেই চ্যালেঞ্জে কাণ্ডারি যিনি, তাঁকেই কিনা ২০১১-র বিশ্বকাপ খেলতে না পারার বেদনায় বিলীন হতে হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সামান্য অনুসরণ করা পাঠকও নিশ্চয়ই লেখার এত দূর আসার আগেই এতক্ষণ অনুচ্চারিত থেকে যাওয়া মাশরাফি বিন মর্তুজার নামটি অনুমান করে নিয়েছেন।

২০১১-র বিশ্বকাপ খেলতে না পারায় বারবারই যাঁকে বলতে শোনা গেছে, ‘এই দুঃখ বিশ্বকাপ জিতলেও যাবে না।’ তবে সময়, সাফল্য এবং জনপ্রিয়তা হয়তো এত দিনে তাঁর সেই অপ্রাপ্তির বেদনাকেও প্রশমিত করে থাকতে পারে। আর কী আশ্চর্য ব্যাপার! তিনি হারিয়েছেন যা, ফেরত পেয়েছেন তার চেয়েও বেশি। তা নয়তো কী! ২০১১-র বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়ার পর তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারই যেখানে শেষের শুরু দেখে ফেলেছে বলে সংশয় ছিল অনেকের, সেখানে প্রথম অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফিই কিনা পর পর দুই বিশ্বকাপে নিয়ে যাচ্ছেন দেশকে। প্রবলভাবে ফিরে এসে দেশের ক্রিকেটে দারুণ প্রভাববিস্তারী ভূমিকা রাখার উদাহরণ হয়ে আছেন তিনি। যাঁকে নিয়ে মুশফিকুর রহিম একবার বলেছিলেন, ‘চ্যাম্পিয়নরা এভাবেই ফিরে আসে।’

মাশরাফি নেতৃত্বেও ফিরেছিলেন এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশ জিততেও ভুলে গিয়েছিল। ২০১৪-র নভেম্বরে জিম্বাবুয়ে সিরিজে আবার ওয়ানডে অধিনায়ক হওয়ার আগে বছরজুড়ে শুধুই হারের বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকা বাংলাদেশ তাঁর নেতৃত্বেই পেল হারানো পথের দেখা। ২০১৫-র বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল ও ২০১৭-র চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনাল ছাড়াও দু-দুটি এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলা বাংলাদেশ দলের কাছে এখন বিশ্বকাপ জেতার আশাকেও দুরাশা মনে হচ্ছে না কারো। ২০১১-তে এমন আশা করার দুঃসাহসও কারো ছিল না। অথচ আট বছর পর? একসময় বাংলাদেশের বাজে পারফরম্যান্সে সহধারাভাষ্যকারদের ঠাট্টা-উপহাস আতহার আলী খানের জন্য ছিল নিয়মিত উপদ্রব। কমেন্ট্রি বক্সে বসে দেশের ক্রিকেটের দিনবদলের সাক্ষী সাবেক এই ক্রিকেটার এখন এত দিনের উপেক্ষার চোখগুলো থেকে ঝরে পড়তে দেখছেন সমীহ ও সম্মান। ২০১৯ বিশ্বকাপের ২৪ সদস্যের ধারাভাষ্যকার প্যানেলে থাকা একমাত্র বাংলাদেশিও বুক বেঁধেছেন এবার তুঙ্গস্পর্শী সাফল্যের আশায়, ‘সবাই বলছে, বাংলাদেশ ৯টি ম্যাচ খেলতে যাচ্ছে। কিন্তু আমি বলছি, মাশরাফিরা যাচ্ছে ১১টি ম্যাচ খেলতে।’ ফাইনাল খেললেই না শুধু ম্যাচের সংখ্যা ১১টি হতে পারে!

ফাইনালে উঠলে তো আর একটিই ধাপ। মাশরাফি যদিও দেশ ছাড়ার আগে বলে গেছেন যে নকআউট পর্বে গেলে হতে পারে যেকোনো কিছুই। ওই পর্ব মানেই তো সেমিফাইনাল বা ফাইনাল। কে জানে যে শেষ ধাপটি পেরিয়ে ক্লাইভ লয়েড, কপিল দেব ও স্টিভ ওয়াহর মতো লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন না মাশরাফি! ট্রফি জেতার ওই শেষ ধাপে গেলে নিশ্চিতভাবেই গোটা বাংলাদেশ একীভূত হয়ে প্রার্থনায় বসে যাবে। কত ধর্মপ্রাণ মুসলিম যে সেদিন রোজা রাখবেন! মন্দিরে মন্দিরে পুজো দেওয়ার হিড়িক পড়ে যাবে। গির্জায় হবে সমবেত প্রার্থনা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে জয় দেখার আশায় উন্মুখ ৩২ কোটি চোখ আটকে থাকবে টিভিতে। তারপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি যদি এসেই যায়...।

এবার না আসুক, কোনো না কোনো দিন তো আসবেই। এই বাংলাদেশ দল অন্তত সেই বিশ্বাস ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। সেদিন এলে আর ২০১১-র মতো শুধুই আয়োজনের আনন্দে বাংলাদেশের রাত আলোকসজ্জায় আলোকিত হবে না। সত্যি সত্যিই নিজেদের একান্তই আপন আনন্দের রংমশাল হাতে রাস্তায় নেমে যাবে জনতা। রংবৃষ্টিতে ভিজেও কেউ আর নাকাল হয়েছেন বলে মনে করবেন না। কিংবা পথচলতি কোনো কিশোরীর গায়ে রং ছিটিয়ে ‘ইভ টিজার’ অপবাদও শুনতে হবে না কোনো কিশোরকে। নিজেদের আনন্দের সাতরঙে রাঙিয়ে বিভক্তি ভুলে একসুরেই বিজয়সংগীত গাইবে পুরো বাংলাদেশ, যে দেশে প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিভাজন আর বিভক্তি। সব শেষে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নিজ এলাকা নড়াইলে জনপ্রতিনিধি হওয়ার লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নিতেই যেমন ‘বিভাজিত’ হয়ে পড়েছিলেন মাশরাফিও। খেয়াল করে দেখুন, আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ জেতার পরই সেই বিভেদরেখাও উধাও। আনন্দের ক্ষণে ওই প্রসঙ্গ তুলে সদ্য সাফল্যের বিশালতাকে খাটো করার চেষ্টাও দেখা যায়নি কোথাও। ক্রিকেট সাফল্য একীভূত করার এবং একীভূত হওয়ার কী অসাধারণ এক হাতিয়ারই না হয়ে উঠেছে!

বিশ্বকাপ জিতলে সেই হাতিয়ার গর্জে উঠবে আরো, যার গর্জনে বিভেদ ভুলে এককাতারে দাঁড়িয়ে যাবে সবাই। ক্রমেই বাড়তে থাকা রাজনৈতিক মতবিরোধের দেশে স্রেফ খেলা নিয়েও তো কত বিভক্তি। বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই যে বিভক্তি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায়, ইউরোপিয়ান ফুটবলে সেটি রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনায়। লিওনেল মেসি-ক্রিস্টিয়ানো রোনালডোকে নিয়ে নিয়মিত তর্ক বেধে যায় ফুটবলপ্রেমীদের আড্ডায়। প্রতিটা বিভক্তি নিয়ে তর্ক কখনো কখনো সংঘাত পর্যন্তও গড়ায়। বিয়োগান্ত পরিণতিও ডেকে আনে কখনো কখনো। অথচ এর একটিও আমাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড নয়। নিজেদের বলতে বিশ্ব জয় করার মতো ব্র্যান্ড আপাতত একটিই। সেটি ক্রিকেট এবং মাশরাফিরা।

তাঁরা কিংবা পরের প্রজন্ম বিশ্বকাপ জিতলে নিশ্চিতভাবেই ‘বিভক্তি’র বাংলাদেশ হবে ‘অবিভক্ত’ বাংলাদেশ!

মন্তব্য