kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

গ ল্প

দক্ষিণ দিকের জানালা

হাবিব আনিসুর রহমান

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



দক্ষিণ দিকের জানালা

অঙ্কন : চঞ্চল

কলোনি থেকে মাইল দুয়েক দূরে সুগার মিল। ঘর থেকে বের হলেই বিশাল মাঠ—ছোলা, মটর, মুগ, মসুর এসব ফসলে ভরে আছে। ওই মাঠের ভেতর সরু রাস্তা ধরে অফিসে যান আবুল হাসান। এই যে ভাঙাচোরা কলোনির ঘর সেটা পেতেও কম অপমান সহ্য করতে হয়নি তাঁকে। —কেন ভাই, মিলের কাছে কলোনিতেই থাকতে হবে এমন কথা লেখা আছে কোথাও? ইউনিয়নের সভাপতি বলেছিলেন। তা লেখা নেই, তবে মেয়েদের স্কুলটা কাছে তাই, আমতা আমতা করে উত্তর দিয়েছিলেন আবু হাসান সাহেব।

অফিস আর বাড়ি, বাড়ি আর অফিস এর মাঝখানে নিজের সংসারের জন্য বাজার-সদাই ছাড়া অন্য কিছু ভাবার ফুরসত নেই তাঁর।

তিরিশ বছর একই অফিসে কলম পিষছেন আবুল হাসান।

থাকেন সুগার মিলের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের কলোনিতে। চন্দ্র-সূর্য প্রতিদিন যেমন একই কক্ষপথে ঘুরে আসে, আবুল হাসান সাহেবও তাঁর নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরছেন। বিনোদন কী জিনিস তা জানেন না তিনি।

তবে এসবের ভেতরেও নিজের একান্ত একটা ভালোলাগার কিছু বিষয় ছিল হাসান সাহেবের, সন্ধ্যার একটু আগে ঘরে ফেরার সময় পাশের স্টেশন আর রেললাইনের দিকে তাকাতেন, গোধূলি বেলায় একটা ট্রেন আসত পোড়াদহ স্টেশন থেকে, ঝিকঝিক শব্দে মাথার ওপর কালো রঙের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ছুটে যেত কুষ্টিয়ার দিকে। সূর্যটা ডুবছে পশ্চিমে। চারপাশে কেমন থমথমে, শীতশীত ভাব। বিশাল মাঠজুড়ে গাঢ় হলুদ সরষে ফুল ফুটে রয়েছে। তার ভেতর দিয়ে ইটবিছানো চিকন রাস্তা ধরে কলোনিতে ফিরছেন আবুল হাসান। চাকরির প্রথম দিকের গল্প এসব। সেই ট্রেনটা এখন আর যায় না।

বাষট্টি বছর আগে মিল যখন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তখন যেসব জারুলগাছ লাগানো হয়েছিল, ওরা এখন আকাশ ছোঁয়া, বিশাল আকার ধারণ করেছে, একটু বাতাসেই ফুলসমেত শাখা-প্রশাখা দুলে ওঠে, কখনো বৃষ্টি ঝরে, ঠাণ্ডা বাতাস বয়, নিজের অফিসে বসেই আবুল হাসান এসব দৃশ্য দেখতে পান।

পত্রিকায় দেখেছেন, দেশে চিনি উৎপাদন করার থেকে বিদেশ থেকে আমদানি করাই ভালো, লাভ বেশি হবে। দূর-দূরান্ত থেকে ওয়াগনে করে আখ চাষিদের যে আখ আসে, ওজনের সময় চার শ মণকে করে পাঁচ শ মণ, পাঁচ শ মণকে দেখানো হয় ছয় শ মণ। কাগজে-কলমে পাঁচ শ মণ, ছয় শ মণ আখ দেখালেও বাস্তবে চিনি হচ্ছে চার শ মণ, পাঁচ শ মণের। এত লুটপাট করলে মিল বাঁচে! মিলটা ধুকপুক করছে, যেকোনো সময় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ মিল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে কর্মচারীরা সবাই বাড়ি করে ফেলেছে শহরে। ব্যাংকে টাকা জমেছে।

অফিস থেকে ফেরার সময় আবুল হাসান আজও বাসার কাছে এসে দেখলেন দক্ষিণ দিকের প্রাচীরের ওপর বসে আছে বখাটেগুলো। সিগারেট খাচ্ছে অবলীলায়। ওরা হাসান সাহেবকে দেখে প্রাচীর থেকে নামে না। সিগারেট লুকায় না। শুধু মুখটা একটু ঘুরিয়ে রাখে, এটুকুুই। ওদের দেখে আবুল হাসানের নিজেরই লজ্জা লাগে। কিন্তু ওরা নির্বিকার। সব কিছু উচ্ছন্নে যাচ্ছে। চারপাশে বিশ্রী রকমের অনিয়ম, ঘুষ। বড়রা দুর্নীতিতে ভরে দিচ্ছে দেশটা, আর চ্যাংড়াগুলো বেয়াদবি আর মাস্তানি করে গোল্লায় যাচ্ছে। বখাটেগুলো পাত্তা দেয় না মুরব্বিদের, কোনো কথা মানতে চায় না, এ কেমন কথা? এসব দেখেশুনে মাঝেমধ্যে রক্তচাপ বেড়ে যায় আবুল হাসানের, কিন্তু কী করার আছে তাঁর। বিস্ময় প্রকাশ করেন! এসব ছেলের কি ঘরবাড়ি নেই? মা-বাবা নেই! মাথার চুলে ভুলেও চিরুনি স্পর্শ করে না কখনো। উষ্কখুষ্ক চুল। জিনসের টাইট ফুলপ্যান্ট। আবুল হাসান জোরে জোরে হাঁটছেন। যুবকগুলোর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, দিব্যি সিগারেট ফুঁকছে প্রাচীরের ওপর বসে। ছাতাটা একটু নিচুতে নামিয়ে নিজের মুখটা আড়াল করে বাসার দরজার সামনে দাঁড়ালেন। খটখট শব্দে দরজার কড়া নাড়লেন। দরজা খুলল মেজো মেয়ে।

হাসান সাহেবের কোনো ছেলে নেই। তিন মেয়ে ফারহানা, তাহমিনা, জুবাইদা। বড় দুজন পড়ে কলেজে, ছোটটা স্কুলে। মেয়েদের নিয়ে ভাবলেই বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে আবুল হাসানের। কখন কী অঘটন ঘটে যায় খোদা জানে। মেয়ে দুটিকে কলেজে পড়াতে চাননি তিনি। তবুও পড়াচ্ছেন, বাসায় থাকলেই বরং বিপদের আশঙ্কা বেশি। সে জন্যই কলেজে দিয়েছেন। বড় মেয়েটার বিয়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন। হাসান সাহেবের স্ত্রীর একটা ছেলের খুব শখ ছিল। ছেলে একটা হয়েছিল দুই মেয়ের পর, কিন্তু আটাশ দিনের মাথায় মারা গেল। তবুও হাল ছাড়েননি তাঁরা, কিন্তু সবার শেষে আবার মেয়ে হলো, এসব ক্ষেত্রে ভাগ্যই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। এখন তাঁদের তিন মেয়ে। ঘরে ঢুকে ছাতাটা রেখে সোজা শোবার ঘরে চলে গেলেন আবুল হাসান। এ কি! আজও দক্ষিণের জানালাটা খোলা! বখাটেগুলো বসে আছে প্রাচীরের ওপর। তিনি দুম করে বন্ধ করলেন জানালাটা। স্ত্রীকে ডাকলেন—রেহানা, রেহানা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দ্রুত সামনে এসে দাঁড়ালেন তাঁর স্ত্রী। শাড়ির আঁচলটা মাথার ওপর টেনে দিয়ে বললেন,

কী হয়েছে বলেন?

তোমার কি আক্কেল হবে না কোনোদিনও, কতবার বলেছি জানালাটা বন্ধ রাখবে, সামান্য কাজটা করতে পারো না। কি করো সারা দিন!

কেন জানালা তো বন্ধই ছিল! কে খুলল! আমতা আমতা করে বললেন, বন্ধ থাকলে ঘরটা অন্ধকার থাকে, আলো-বাতাস আসে না। দম আটকে আসে।

দম আটকে আসে, তাই না! ভাত রান্না ছাড়া আর কিসসু বুঝলে না। ফারহানা, জুবাইদা কোথায়?

পাশের বাড়ি বই আনতে গেছে।

বই আনতে গেছে! পাশের বাড়ি! ওদের ডাকো। মেয়েগুলো বড় হয়েছে। দেখছ না চারপাশে কী সব হচ্ছে। যারতার হাত ধরে বের হয়ে যাচ্ছে মেয়েরা, এসব কানে আসে না তোমার?

এতক্ষণ তো চলে আসার কথা। তাহমিনা, তাহমিনা, (মেজো মেয়ে এসে দাঁড়াল মায়ের সামনে) ফারহানাদের এক্ষুণি ডেকে আনো, যাও।

মনে হচ্ছে, আমি বাসায় না ফিরলে ওরা বাইরেই থাকত সারাটা বিকেল! তোমার কি বুদ্ধিসুদ্ধি সব কিছু লোপ পেয়ে গেল রেহানা! অফিসে গিয়েও কি তোমার মেয়েদের কথা ভাবতে হবে আমাকে।

আপনি হাত-মুখ ধুয়ে খেতে আসেন, যান।

জামা-কাপড় পাল্টাতে গেলেন হাসান সাহেব। হাত-মুখ ধুয়ে মেঝের ওপর পাতা পাটিতে খেতে বসলেন তিনি। পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া দিয়ে চিংড়ি মাছ চচ্চড়ি। ভাত খেতে খেতে বললেন,

মেয়েরা কলেজ থেকে ফিরেছে কখন?

দেড়টার দিকে।

ঠিক করে বলো কখন ফিরেছে? স্ত্রীর চোখের ওপর চোখ রেখে জানতে চাইলেন।

বেঠিক কি বললাম। বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি?

 বিশ্বাস! একটু হাসলেন হাসান সাহেব, তারপর আপন মনেই বললেন চারপাশে অবিশ্বাস। বিশ্বাস করব কাকে, নিজেকেই বিশ্বাস হয় না মাঝেমধ্যে।

মেয়েদের নিয়ে এত ভাবেন তো বিয়ে দিয়ে দেন ওদের। বয়স কত হলো খেয়াল আছে আপনার?

ভালো ছেলে পাব কোথায়? সব তো বেয়াদব। বংশটংশ বলে কিছু নেই।

অত বংশ দেখতে গেলে পারবেন না। মোটামুটি হলেই হলো। স্ত্রীর কথার জবাব না দিয়ে হাত ধুয়ে উঠে পড়লেন আবুল হাসান।

পরদিন বিকেলেও অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন আবুল হাসান। আজও দেখলেন শোবার ঘরে দক্ষিণ দিকের জানালাটা খোলা। বখাটেগুলো প্রাচীরের ওপর থেকে সোজা তাকিয়ে আছে খোলা জানালার দিকে। রাগে ফেটে পড়লেন তিনি। স্ত্রীকে ডেকে বকাঝকা করলেন। প্রতিদিনের মতোই মথা নত করে রাখলেন রেহানা বেগম। স্বামী একটু শান্ত হলে বললেন, গ্রামের বাড়ি থেকে লোক এসেছিল, ফারহানার বড় চাচা আপনাকে যেতে বলেছেন, জরুরি দরকার। খবরটা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন আবুল হাসান। এখান থেকে গ্রামের বাড়ি মাইল ছয়েক দূরে। তিনি ভাবলেন, আজ বিকেলে গিয়ে কাল সকালেই ফিরবেন। ফিরে এসে অফিস করবেন।

ভাত খেয়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

বাস থেকে নেমে এক কেজি মিষ্টি কিনে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন আবুল হাসান। বাড়ি পৌঁছে দেখলেন ভাই-ভাবি তাঁর অপেক্ষায় বসে আছেন। বিস্কুট-চা খেতে খেতে বড় ভাই বললেন, আমি সরাসরি তোমাকে বিষয়টা জানাতে চাই হাসান,

বলেন।

ফারহানা এখন কিসে পড়ছে?

বাংলায় অনার্স পড়ছে।

কবে পাস করে বের হবে?

আর বছর দেড়েক আছে, কেন বড় ভাই?

ওর একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, সে জন্যই তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি।

ছেলে কোথাকার, কী করে?

ছেলের বাড়ি ঝিনাইদহ, সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, ছেলে ভালো।

আজকালকার বিয়ে মানে তো ছেলের নানা রকম চাহিদা থাকে, এরা কী চায়?

চায় মানে স্কুলে আসতে-যেতে কষ্ট হয় খুব, তাই একটা মোটরসাইকেল চেয়েছে ওরা।

আমি তো মোটরসাইকেলের দাম জানি না, কত হতে পারে জানেন আপনি?

কত আর হবে—এক লাখ, দেড় লাখ এমন হবে।

মেয়েদের নিয়ে আবুল হাসানের দুশ্চিন্তা বাড়ছে দিনদিন। তিন-তিনটা মেয়ে। ওদের লেখাপড়া, বিয়ে এসব তো তাঁদেরই দেখতে হবে। ভাই-ভাবি যখন এসব বিষয়ে সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছে এটা তো সুখবর! আবুল হাসান বড় মেয়ের এই বিয়ের সম্বন্ধটাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করলেন।

সব কিছু শুনে আবুল হাসান বললেন, কাল দশটায় মিটিং আছে, একদম ভুলে গিয়েছিলাম। এখনো হাতে সময় আছে ভাবি। লাস্ট বাসটা পাওয়া যাবে। ভাইয়ের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও বাস ধরতে রওনা দিলেন।

শেষ বাসটা ধরার জন্য অনেকেই অপেক্ষা করে আছে বাসস্ট্যান্ডে। বাস আসতেই ধাক্কাধাক্কি করেই বাসের ভেতর ঢুকে গেলেন আবুল হাসান। বসার জায়গা নেই। দাঁড়ানোও কঠিন ব্যাপার। দুর্বল ইঞ্জিন আর ঠাসা যাত্রী নিয়ে কোনো রকমে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল বাসটা। রাস্তার মাঝখানে এসে বোমা ফাটার মতো প্রচণ্ড শব্দে সামনের চাকাটা ফেটে গেল। কোনো কিছু বোঝার আগেই একটা বড় গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মুখথুবড়ে পড়ল বাসটা। হাসান সাহেব শক্ত করে ওপরের রড ধরে ছিলেন বলে রক্ষা। তবুও থুতনি কেটে রক্ত বের হতে লাগল। অনেকেই আহত হলো, ভাগ্য ভালো কেউ মারা যায়নি।

ড্রাইভার-কন্ডাক্টর দুজনেই বাস রেখে পালাল। আহত যাত্রীরা সবাই জটলা করে অপেক্ষা করতে লাগল। রাস্তার ওপর ট্রাক অথবা অন্য কোনো কিছুর আশায়। শেষে রিকশা-ভ্যান এলো কয়েকটা। শক্ত-সামর্থ্যরা ভ্যানের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। অনেক কষ্টে আবুল হাসান ফিরে এলেন। ভ্যান থেকে নেমে বাসার দিকে হাঁটতে লাগলেন। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত আবুল হাসান নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করলেন।

রাত ১২টার দিকে বাসার সামনে এসে পৌঁছলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লোহার কড়াতে হাত দিলেন, চমকে উঠলেন আবুল হাসান, দরজা খোলা! ভয় পেলেন তিনি। চোর ঢুকল নাকি, রেহানা কি দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছে আজ? বাঁ হাতে স্যান্ডেল দুটি তুলে নিয়ে পা টিপে টিপে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন।  শোবার ঘরে গিয়ে দেখলেন তাঁর স্ত্রী রেহানা আর ফারহানা ঘুমাচ্ছে। রেহানার শাড়িটা উঠে গেছে হাঁটুর ওপর। ডিম লাইটের সবুজ আভা পুরো ঘরে। পা টিপে টিপে ঢুকলেন মেয়েদের ঘরে। ছোট মেয়ে জুবাইদা বালিশ জড়িয়ে ধরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মেজো মেয়ে ঘরে নেই। বুকটা ধক করে উঠল তাঁর! কোথায় গেল সে? ড্রইং রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। দরজার পাশে দাঁড়ালেন। দরজা একটু ফাঁক। তিনি উঁকি মারলেন ঘরের ভেতর। ওপাশের জানালার ফাঁক দিয়ে আবছা একটু আলো এসে মিশেছে ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে। রহস্যময় আলো-আঁধারিতে দুজন যুবক-যুবতী জড়িয়ে ধরে আছে পরস্পরকে। চোখ দুটি পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল হাসান সাহেবের। কী দেখছেন তিনি। বিশ্বাস করতে পারছেন না। হঠাৎ তাঁর মাথায় রক্ত উঠে গেল, শরীরটা কাঁপতে লাগল। দুটাকেই খুন করবেন তিনি। লোক জানাজানি হয়ে গেলে সর্বনাশ। নিজেকে কোনো রকমে সংযত করে দ্রুত আবার বাড়ির বাইরে চলে গেলেন আবুল হাসান। একটু দূরে খোলা মাঠটাতে গিয়ে দাঁড়ালেন। কখন বেরিয়ে আসবে যুবক? দাঁড়িয়ে আছেন আবুল হাসান। একেকটা মিনিট মনে হচ্ছে যেন একেকটা ঘণ্টা। হঠাৎ পেছনের বাড়ি থেকে প্রতিবেশী সিরাজ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হাসান ভাই, আপনি এত রাতে! কোনো বিপদ হলো নাকি!’ ‘না, না, বিপদটিপদ কিছু না, এই একটু দাঁড়িয়ে আছি।’ হাসান সাহেবের কথা শুনে অবাক হয়ে সিরাজ সাহেব বললেন, এত রাতে! দ্রুত সামনে হাঁটতে লাগলেন হাসান সাহেব, উদ্দেশ্যহীন। একটু দূরে ঝোপের পাশে বসে পড়লেন। যেন কেউ দেখলে মনে করে তিনি প্রস্রাব করছেন। তাঁর চোখে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়ায়। এখন কী করবেন তিনি? বুঝতে না পেরে বোকার মতো বসেই থাকলেন রাস্তার ঝোপের পাশে! আলো-অন্ধকারের ভেতর বের হয়ে এলো যুবক, এদিক-ওদিক তাকিয়ে সোজা হাঁটতে লাগল সে। আকাশের দিকে তাকালেন হাসান সাহেব, প্রায় গোল একটা হলুদ চাঁদ ঝুলে আছে। চারপাশে ফ্যাকাশে জ্যোত্স্না। একটা ক্লান্ত অবসন্ন মন নিয়ে বাসার দিকে গেলেন আবুল হাসান।

দরজার কড়া নাড়তেই রেহানা বেগম দরজা খুলে দিয়ে জানতে চাইলেন, খেয়ে এসেছেন? আবুল হাসান উত্তর দিলেন, হ্যাঁ খেয়ে এসেছি।

ঘুুমে অচেতন সবাই। শুয়ে পড়লেন আবুল হাসান।

পরদিন বিকেলে অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন আবুল হাসান। কিন্তু আজ দেখলেন দক্ষিণের জানালাটা বন্ধ। তিনি কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে নিজেই খুলে দিলেন বন্ধ জানালাটা।

মন্তব্য