kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

গ ল্প

মিহি-মসৃণ প্রহেলিকা

ওয়াসি আহমেদ

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



মিহি-মসৃণ প্রহেলিকা

অঙ্কন : মাসুম

গাঁয়ের মুদি দোকানে আজকাল টিস্যু পেপারও পাওয়া যায়—এটা জানানোর মতো খবর কি না তা না ভেবেই শম্ভু দিনকয়েক আগে কথায় কথায় তারেককে ফোনে বলতে, তারেক জানতে চেয়েছিল, আর কী কী পাওয়া যায়? উন্নয়নের পয়লা চোটে না হয় টিস্যু পেপার, আর? শম্ভু সে সময় লাগসই কিছু একটা বলতে গিয়ে বলেছিল, খুঁজলে মনে হয় ভায়াগ্রাও পাওয়া যাবে; বাবা মানে ইয়াবা তো যায়ই। তুই কী চাস?

কথাবার্তার ডালপালা এরপর এদিক-ওদিক হেলে পড়তে আর কী কী পাওয়া যায় শম্ভু সে ফিরিস্তি লম্বা করার সুযোগ পায়নি। তবে হঠাৎই আজ দুপুরে স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে শিববাড়ির কোণে মানুষের জটলা দেখে সড়ক দুর্ঘটনার আঁচ পেয়ে তার মনে হলো, সেদিন তারেককে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারত। তারেক উন্নয়নের কথা বলছিল, এ তথ্যটা উন্নয়নের সঙ্গে খুব যায়। দুর্ঘটনা। শুধু দুর্ঘটনা বললে চলবে না, বলতে হবে রোড অ্যাকসিডেন্ট। গ্রামে রোড হয়েছে, বাঁশঝাড় বা খড়ের পালা বা পানাপুকুরের পাশ ঘেঁষে কাঁচা বা ইট বিছানো এবড়োখেবড়ো পথ না, বিটুমিনলেপা সলিড পাকাপোক্ত রোড; সে রোডে ছোট-বড় নানা জাতের গাড়ির পাশাপাশি ট্রাক-বাসও চলে। রোড থাকলে রোড অ্যাকসিডেন্ট হবে, এখানেও হয়—মুখোমুখি হয়, পাশ থেকে, পেছন থেকে হয়। উন্নয়ন মানে যে গতি কে না বোঝে, আর গতি মানে কী তা তারেককে বোঝাতে হবে না, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। তো মানুষ মারা পড়ে, ঘন ঘন মারা পড়ে, বিশেষ করে শিববাড়ির কোণে যেখানে রাস্তাটা ঢালু হয়ে ঝড়ের বেগে বাঁক নিয়েছে ওখানে। মারা পড়া মানুষকে বের করার কায়দা এলাকার লোকজন ভালোই রপ্ত করেছে, তার পরও খাদে বা খালে চিত হওয়া বাসের পেট থেকে শেষ লাশটা বের করতে কখনো দু-তিন দিনও লেগে যায়।

সে অন্য কথা, মরবে বলেই মানুষ জন্মায়। মূল কথাটা যা তারেককে বলা দরকার তা উন্নয়নের সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার সম্পর্ক। কলেজে একসঙ্গে পড়লেও তারেক এখন উঠতি বুদ্ধিজীবী, লেখাজোখা করে, মাঝেমধ্যে টিভি টক শোতেও আসে। শম্ভু গ্রামের স্কুলে কেমিস্ট্রি পড়ায়, নাইন-টেনের ছেলে-মেয়েদের পিরিওডিক টেবিল বোঝাতে গিয়ে মেজাজ খারাপ করে, ফাঁকে ফাঁকে উন্নয়ন দেখে। পকেটে সে রুমালই রাখে, সহকর্মীদের কেউ কেউ টিস্যু পেপার—নাক ঝাড়তে সুবিধা।

দুপুরে বাড়ি ফেরার পথে মানুষের জটলা দেখে শম্ভু যা আন্দাজ করেছিল, বাস্তবে ঘটনা তা-ই। দুর্ঘটনা। ইটবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে একটা প্রাইভেট কারের মুখোমুখি সংঘর্ষ। ট্রাক ড্রাইভার পালিয়েছে, যে জাদুবলে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাক ড্রাইভাররা অকুস্থল থেকে হাওয়া হয়ে যায় সেভাবে। সাদা রঙের টয়োটা জি করোল্লা গাড়িটা ট্যাপ খাওয়া ঢাউস অ্যালুমিনিয়ামের বদনার মতো রাস্তার পাশে কাত হয়ে পড়ে রয়েছে, ভেতরে তিন আরোহীর কেউ বেঁচে নেই।

লাশ তিনটা বের করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। গাড়ির পেছনের একটা দরজা খুলে পড়ে গিয়েছিল, তাই পেছনের সিট থেকে একজন বয়স্ক পুরুষ ও একজন তরুণীকে বের করতে কোনো ঝামেলাই হয়নি। অন্যজন, মানে তিন নম্বরকে নিয়ে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। দুই পাশের দরজা দুটি খোলার উপায় ছিল না, চাপ খেয়ে এমনভাবে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল, টানাটানিতে কাজ হচ্ছিল না। এ অবস্থায় লোকজন গাড়ির সামনের ভাঙা কাচটাকে ঠুকে ঠুকে ফেলে দিয়ে তিন নম্বরকে, মানে রক্তমাখা একটা দলা পাকানো পিণ্ডকে টেনে-হিঁচড়ে বের করেছিল। তিনজনকে বয়ে নিয়ে অল্প দূরে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিতে কারা যেন হোগলার চওড়া চাটাই দিয়ে তাদের ঢেকে দিয়েছিল।

বছরে কয়েকবার এ জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটে বলে এলাকার মানুষের, বিশেষত যাদের বাড়িঘর কাছেপিঠে তাদের এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতি থাকে। যেমন—দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্র ছুটে এসে জখমি বা মৃতদের বের করা, কে মৃত আর কে জখমি সে বাছবিচারে না গিয়ে বের করাই পয়লা কাজ। খালি হাতে না পারলে হাতুড়ি, শাবল, বড় আকারের হ্যাকস ব্লেড দিয়ে কাজ চলে। একবার তো মানিক সাহা, বাজারে ইলেকট্রিকের দোকান চালায়, ড্রিল মেশিন এনে খাদে ওল্টানো বাসের পেট ফেড়ে দুটি লাশের সঙ্গে একটা দুই-আড়াই বছরের জ্যান্ত বাচ্চাকে বের করেছিল। মানিকের সেবার খুব নামডাক হয়েছিল। একসময় যখন ফুটবল খেলত, গোলপোস্টে ঝলমলে জার্সি গায়ে বল পেলে তো বটেই, না পেলেও ডানে-বাঁয়ে শরীর মোচড়ে নানা কায়দা-কসরত করত, তখনো সে নামিই ছিল। কয়েক বছরের বিরতিতে আবার তার নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে সে নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়েছিল। বলা যায় না, এমনও হতে পারে, সে চায় নামডাক চালু রাখতে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটুক। সে যে ব্যাটারিচালিত নতুন ড্রিল মেশিন কিনেছে, কী কাজে লাগাতে?

সন্ধ্যা হয় হয় এমন সময় মানিকের কাছেই শম্ভু আগাগোড়া দুর্ঘটনার বৃত্তান্ত শুনল। মানিক বলল, ছার, কী কমু, গাড়ির ডেরাইবার এক্কেরে লাড্ডু হয়া গেছে। মানিক হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, এই বছর দশ মাসে কয়টা এস্কিডেন হইল, কন তো? আমি কই নয়টা, আমার হিসাব পাক্কা, বাজারে মবিন ডাক্তার আজাইরা তর্ক করে, কয় সাতটা। আমার ভুল হয় ক্যামনে, হিসাব রাখি না?

হিসাব রাখোস?

রাখি। গত বছর ছয়টা, এর আগের বছর এই নয়-ই। এই বছরের আরো দুই মাস বাকি। কওয়া যায় না, আরো দুই-একটা হইতে পারে।

তুই তো সাংঘাতিক।

সাংঘাতিক ক্যান?

রেকর্ড করতে চাস।

কী যে কন! এস্কিডেনে কাউর হাত থাকে! না, কথা হইল এই যে বছর বছর এতগুলা মানুষ মরে, খামোখা মরে, এর হিসাব রাখা দরকার না? আর এস্কিডেন হয় ধরেন গিয়া ওই রাস্তার মোচড়ের পাঁচ-ছয় শ গজের মইদ্যে। গত বছর মাত্র ছয়টা হইলেও মানুষ মারা গেছিল বেশি, তেষট্টিজন। এই বছর এখন পর্যন্ত নয়টা হইলেও আইজকার তিনজন নিয়া মোট পাচ্চল্লিশ।

হিসাব কি লেখা থাকে, না মুখে মুখে?

কইতে পারেন লেখা-ই, মাথায়। হেইবার জেতা বাইচ্চাটারে বাইর করলাম, আমি তো চিন্তাও করি নাই বাইচা আছে, লাশ মনে কইরা ফিক্যা মারুম, ও মা, দেখি চোক্কের পাতা নড়ে।

তোর তো নাম ফাটছে। অ্যাকসিডেন্ট যত বেশি, তোর নাম তত ফাটবে, ঠিক না?

ছার, কী কন এই সব! মাইনষের মরা নিয়া কথা।

একটা কথা ক, ঠিক ঠিক কইবি। জখমি বা মরা লাশ টানাটানির সময় টেকা-পয়সা, মোবাইল, ঘড়ি, তারপর ধর মাইয়া মানুষের হাতের বালা, চুড়ি, কানের দুল এইসবে নজর পড়ে না? না, তোর কথা না, অন্য যারা হাত লাগায় তারা কি খালি খালি কষ্টটা করে?

ছার, বিপদে মাইনষের ধারে মানুষ যাইব না তো কে যাইব! আমি শিব ঠাকুরের কিরা কাইটা কইতে পারি, এইসব বদচিন্তা আমার মাথায় থাকে না। ক্যান, শুনছেনই তো, গত বছর একটা লাশের পকেটে টেকার বান্ডিল পাইয়া পুলিশরে দেই নাই? অন্য মাইনষের কথা কইতে পারি না, তয় একবার, তৈয়ব আছে না, আগে দর্জির কাম করত, হে নাকি একবার একটা বিফকেস লইয়া ভাগছিল। যাই, আপনের তো এখন কাম। ছাত্র আইসা পড়ব।

সন্ধ্যার পরে তিনটা ছেলে-মেয়ে আসে পড়তে—একটা ছেলে, দুটি মেয়ে। ঠিক সময়েই ওরা এলো, ছেলেটা মেয়ে দুটির মিনিট পাঁচেক আগে। মেয়ে দুটি টেবিলে না বসে ‘আদাব স্যার’ বলেই ভেতরের ঘরে গিয়ে ‘বউদি, বউদি’ বলে মিতালির সঙ্গে কী নিয়ে বকবক জুড়ে দিল। কিছু সময় পরে শম্ভু ডাকল, এই তোরা কই, আয়? আয়শা নামের মেয়েটা, যার সঙ্গে মিতালির ভালোই খাতির, পাশের ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল, স্যার, আইজ পড়া বাদ। শম্ভু জবাবে কিছু বলল না, মেয়েরা পড়বে না শুনে ছেলেটাকে মনে হলো মনমরা। শম্ভু বলল, তোরও কি পড়ার ইচ্ছা নাই? ছেলেটা তার মুখচোরা মুখ বেজার করে জানাল, দুপুরে দুর্ঘটনার জায়গায় গিয়েছিল, যেতে চায়নি, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে গিয়েছিল, লাশগুলো এত টাটকা, মনে হয়নি লাশ, এখন পর্যন্ত মুখগুলো চোখে ভাসছে। তার মানে তারও পড়ার ইচ্ছা নাই। ঠিক আছে, বাড়ি যা, বলে শম্ভু বসেই থাকল। ছেলেটার কথায়ই কি না, সে আনমনা হয়ে থাকল কিছুক্ষণ। মেয়ে দুটি পাশের ঘরে বেদম ক্যাঁচম্যাচ জুড়ে দিয়েছে।

এমন সময় তারেকের ফোন। কী রে, কী খবর? সেদিন তো টিস্যু পেপারের কথা বললি। আর কী কী পাওয়া যায়, বল। ও ভায়াগ্রার কথা বলছিলি, সত্যি নাকি, গ্রামের লোকজনও ভায়াগ্রায় ঝুঁকে পড়েছে, সত্যি যদি হয়, এটা একটা নতুন ডাইমেনশন।

তারেকের কথার পাশ কাটিয়ে শম্ভু বলল, আজ একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, তিনজন স্পট ডেড।

তোদের ওখানে তো অ্যাকসিডেন্ট একটা রেগুলার ফিচার। গত মাসেই না বললি একটা বড় অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।

হ্যাঁ, রেগুলার। এ বছর এখন পর্যন্ত নয়টা, বছর শেষ হতে আরো দুই মাস বাকি। টোটাল ক্যাজুয়ালটি ফর্টিফাইভ। গত বছর হয়েছিল ছয়টা, তবে ক্যাজুয়ালটি ছিল বেশি, সিক্সটিথ্রি, এর আগের বছর হয়েছিল এ বছর আজ পর্যন্ত যতটা হয়েছে ঠিক ততটা, নয়টা...

মাই গড! তুই তো রীতিমতো ডাটা মেইনটেন করছিস, এ নিয়ে লিখলে পারিস, ছাপানোর ব্যবস্থা করে দেব। ভালো সাবজেক্ট। তোর মন-মেজাজ মনে হয় বেশ খারাপ। হওয়ারই কথা।

আরে না। জিজ্ঞেস করলি না, নতুন আর কী, তাই বললাম। গ্রামগঞ্জে ঘন ঘন অ্যাকসিডেন্ট তো নতুনের মধ্যেই পড়ে। আগে তো হতো না, রাস্তাঘাটই ছিল না, হবে কী করে!

ঠিক বলেছিস। সেদিন এক মন্ত্রী বলল না, দেশে বেশি বেশি অ্যাকসিডেন্টের কারণ উন্নত রাস্তাঘাট, বেশি বেশি গাড়ি, আর বেশি বেশি গাড়ি মানে বেশি বেশি উন্নয়ন। মানুষও যে বেশি বেশি মরছে এ হলো গিয়ে অপরচুনিটি কস্ট।

বলেছে নাকি? বলেই শম্ভুর মনে পড়ল, ঠিক এই কথাটা সে গতকাল ভেবে রেখেছিল তারেককে বলবে বলে।

তারেক বলল, বলেনি আবার! বুক ফুলিয়ে বলেছে। তাও পথেঘাটে না, একটা সেমিনারে। তুই একটা দুর্দান্ত ক্লু দিলি। আজ রাতে একটা টক শো আছে এক্স টিভিতে, বেশ রাতে, সাড়ে ১২টায়। পারলে দেখিস। ভাবছি এ কথাটা তুলব, সুযোগ পাব কি না কে জানে।

তারেক ফোন রেখে দিতে শম্ভুর মনে হলো, তারেককে কি সে সত্যিই কোনো ক্লু দিয়েছে?

পরদিন স্কুলে গিয়ে শুনল, আগের দিনের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এলাকার এমপি রাতে ঘটনাস্থল ঘুরে গণ্যমান্যদের সঙ্গে কথা বলে গিয়েছেন। আরো শুনল, ঢাকা থেকে খোদ পরিবহনমন্ত্রী নাকি প্রধানমন্ত্রীর ঝাড়ি খেয়ে সদলবলে আসছেন। এত তোড়জোড়ের কারণ আর কিছু না—একই এলাকায় এত এত সড়ক দুর্ঘটনা কেন ঘটছে, তা তদন্ত করে বের করা ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। এসবের মধ্যে কানাঘুষায় শুনল শিববাড়ির কোণে যে ছোট কালীমন্দির আছে সেটাকে কেউ কেউ দুষছে। এটা নতুন আবিষ্কার। বছর বছর এত দুর্ঘটনা হয়, মন্দিরের কথা কারো মুখে শোনেনি। মন্দির অবশ্য নামেই, ঝোপঝাড়ে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে কবে থেকে কে জানে। হয়তো এককালে জবা ফুল দিয়ে পূজাটুজা হতো, তবে ছোটবেলা থেকেই শম্ভু এটাকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখে আসছে। তবে কি মন্দির ভেঙে ফেলা হবে? মন্দির না থাকলে যদি গাড়িতে গাড়িতে টক্কর না লাগে, ভালোই।

বাড়ি এসে দেখল মিতালি এ নিয়ে যাকে বলে মহা উৎকণ্ঠিত, তার মানে খবরটা ভালোই চাউর হয়েছে। মিতালি বলল, এবার কী হবে?

শম্ভু বলল, কী হবে মানে? ওইখানে যে মন্দির আছে, দেখতে গেছ কোনো দিন!

মিতালির পাল্টা যুক্তি, মসজিদও আছে একটা শিববাড়ির আগে।

মসজিদ আর মন্দির এক! মসজিদ ভাঙা গোনাহ।

আর মন্দির?

জানি না।

তা জানবা ক্যান? ওইটা গোনাহ হইলে এইটা পাপ। কোনটা বড়, গোনাহ না পাপ?

শম্ভু একটা বেমক্কা হাই চাপতে চাপতে ক্যানক্যানে গলায় বলল, মনে হয় গোনাহ।

আসলে শিববাড়ির কোণঘেঁষা রাস্তাটায় যে দোষ আছে এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে না। বছর বছর এত মানুষ মরে, একটা কারণ তো থাকবে। যা-ই হোক, কালীমন্দির যে কারণ হতে পারে এ কথা এবারই প্রথম শোনা গেল। কয়েক দিন এ নিয়ে গুজুরগুজুর চলল, আর তা গাঁয়ের কয়েক ঘর হিন্দুদের মধ্যে। ব্যস, ওই পর্যন্তই। শম্ভু বুঝল, একটা সুযোগ খুঁজছিল কোনো মহল, সুবিধা করতে পারল না। না পারার অবশ্য তেমন কারণ নেই, রাতে হাতুড়ি-শাবল নিয়ে, বেশি না, চার-পাঁচজন নেমে গেলেই এইটুকু মন্দিরের দফারফা করতে কতক্ষণ!

শোনা যে গিয়েছিল পরিবহনমন্ত্রী আসবেন, ওটা ছিল গুজব। তবে দলেবলে সরকারি লোকজন কয়েক দফা কিসব তদন্ত করল, তারপর যে খবর পাওয়া গেল তা পাক্কা। জানা গেল, কয়েক বছর আগে রাস্তাটা যখন হয় তখন নাকি সুরকি-পাথর বসিয়ে ভারী রোলারের চাপে এবং পরে বিটুমিন ঢেলে আরো কয়েক দফা রোলার চালানোয় শিববাড়ির মোড় থেকে পথটা বেশিই মিহি-মসৃৃণ হয়ে গিয়েছিল। একে ঢালু রাস্তা, তার ওপর মিহি-মসৃণ, তার ওপর কিছু দূরে একটা বাঁক—এতেই নাকি যত গণ্ডগোল। এত মিহি-মসৃৃণ হলে দুর্ঘটনা ঠেকানো মুশকিল। লোকজন কথায় সায় দিল। কারণ তাদের স্পষ্ট মনে আছে, রাস্তা হওয়ার আগে এখানে যখন গরুর গাড়ি চলত, দুর্ঘটনা দূরের কথা, এইটুকু পথ পেরোতে গাড়োয়ানদের ঘণ্টার ওপর লাগত। এখন গাড়িতে—বাস-ট্রাক, টেম্পো, প্রাইভেট কার যা-ই হোক, পাঁচ-সাত মিনিটও কি লাগে? এত গতি ভালো না।

আর এ কথা তো অস্বীকারের উপায় নেই, এ এলাকায় রাস্তার কাজ যখন শুরু হয়, অনেকের ধারণা ছিল না গরুর গাড়ি একেবারে গায়েব হয়ে যাবে, বরং এমনও বলাবলি হচ্ছিল, গাড়োয়ানদের খাটনি কমবে, তারা বেশ আয়াসে চলাচল করতে পারবে—মানুষের যেমন, অবলা গরুগুলোরও দুর্ভোগ দূর হবে। বাস্তবে তা হলো না, গাড়োয়ানদের বেকুব বানিয়ে যখন দিনে দিনে নানা জাতের ছোট-বড় গাড়ি ধুন্ু্লমার চলতে শুরু করল, তখন এমন মিহি-মসৃণ রাস্তায় গরুর গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা পরখ করার সুযোগও তারা পেল না। গাড়োয়ানরা বেকার হয়ে মনের জ্বালা নিয়ে ক্ষেত-খামারে কামলার কাজে নামল, কিন্তু জ্বালা কি এতে দূর হয়! এ অবস্থায় এমন যদি কেউ ভেবে থাকে গাড়োয়ানদের মনঃকষ্টের সঙ্গে ঘন ঘন গাড়িতে গাড়িতে টক্কর লাগা ও মানুষ মারা যাওয়ার একটা যোগাযোগ রয়েছে, সেটাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।

তবে কি আবার গরুর গাড়ি? না, তা কেন? যা করা হবে তা সহজ-সরল—রাস্তাটাকে অসমান, মানে উঁচু-নিচু করতে হবে, ছেনি-শাবল দিয়ে মিহি-মসৃণকে ভাঙচুর করতে হবে, বেশ কিছু গর্তটর্ত মানে খানাখন্দও রাখতে হবে। গাড়িই চলবে, তবে এখন যেমন টানা শাঁইশাঁই চলে, সে রকম না। হেলেদুলে, ঝাঁকি খেতে খেতে, কাতরে কাতরে, কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে মানে বিস্মৃত নিরুত্তেজ গরুর গাড়ির একটা বেশ টাটকা, জ্বলজ্বলে স্মৃতি বয়ে চলবে। তখন দেখা যাবে দুর্ঘটনা কী করে ঘটে।

সিদ্ধান্ত পাকা, কাজ মানে ভাঙাভাঙি শুরু হয়ে যাবে যেকোনো দিন। এলাকার মানুষ প্রস্তুত। তারেককে কি শম্ভু একবার ফোন করবে? কী বলবে? এমন তো না, এটা একটা আচানক খবর বা নতুন কোনো ক্লু।

মন্তব্য