kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

অপ্রকাশিত টেলিনাটক
১৩ পর্বের একটি টেলিনাটক

উড়ে যায় মালতি পরি

সৈয়দ শামসুল হক

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪৯ মিনিটে



উড়ে যায় মালতি পরি

অঙ্কন : বিপুল শাহ

কিছু কথা

কবি-সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হকের মঞ্চনাটক সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই, কিন্তু বলার আছে তাঁর টেলিভিশন নাটক সম্পর্কে। তাঁর শিল্পফসল সংখ্যায় বিপুল ও বৈচিত্র্যে বর্ণিল। এর মধ্যে অনেক শিল্পকর্মই জীবদ্দশায় তিনি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে যেতে পারেননি। তরুণ পরিচালকদের অনুরোধে এবং অনেক সময় হয়তো আত্মতাগিদেও তিনি টেলিভিশন নাটক রচনা করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে নিজেরই উপন্যাস অথবা গল্পকে নাট্যরূপ দিয়েছেন। নিজেরই লেখা ‘উড়ে যায় মালতি পরি’ (২০০৫) উপন্যাসটি তিনি ১৩টি পর্বে এবং ১১৪টি দৃশ্যে নাট্যরূপ দিয়েছেন। প্রয়াণের পর তাঁর ল্যাপটপে পাওয়া ফাইল থেকে আমরা এটি উদ্ধার করেছি, যা এখন পর্যন্ত পত্রিকায় বা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়নি। এই টেলি নাট্যরূপে ধরা রইল তাঁর নাট্যনিরীক্ষার এক বিশেষ নিদর্শন। আমরা আশা করি, ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানে তাঁর এমন আরো বহু নাট্যকর্মের সন্ধান পাওয়া যাবে।

আনোয়ারা সৈয়দ হক

 

[লেখককে দেখা যায় পর্দাজুড়ে। ইচ্ছা করলে এই চরিত্রটি মূল লেখক নিজে করতে পারেন। লেখক একটা খালের পারে দাঁড়িয়ে। গ্রামের ছবি। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। মানুষ ঘরে ফিরছে। কিষান মাঠ থেকে। গরু নিয়ে ফিরছে কিষান ছেলে সামু; আবু বকর তার সড়কের পাশে টংঘর দোকানে হারিকেন জ্বালাচ্ছে।

খালের পানি স্থির। লেখক তাকিয়ে দেখছে। হঠাৎ সেই পানির ভেতর থেকে সোনার চুড়ি পরা হাত জেগে ওঠে; লেখক অবাক হয়। আবার ফিরে দেখে হাতটি নেই। পানি আগের মতোই। লেখক ঘরের দিকে ফেরে। সূর্য ডুবে যায়। অন্ধকার আকাশে একটা সাদা আঁচল পরির পাখার মতো ভেসে যায়। স্বর্গীয় সংগীতের সুর। লেখক কলম নিয়ে লিখতে শুরু করে। খাতার পৃষ্ঠায় বড় বড় করে শিরোনাম লেখে, ‘উড়ে যায় মালতি পরি’। সঙ্গে সঙ্গে গান হতে থাকে নেপথ্যে—খালের পানিতে চাঁদের ছায়া। তার ওপরে কলাকুশলী ও শিল্পীদের নাম একের পর এক পার হয়ে যায়।]

গান :  আসমানে ওই পরির পাখা উইড়া যায় উইড়া যায়।

            মানবজনম দুঃখভরা জগৎ দেইখা যায়—

            সুখের আশা ভালোবাসা জলে ভাইসা যায়।

            পরির পাখায় লেইখা যায়।

            পূর্ণিমায়—পূর্ণিমায়

ভালোবাসার কিস্সা কথা জলের লিখন লেইখা যায়।

কপালে কী লিখন লেখে আন্ধা বিধাতায়।

এক হাতে দেয় আরেক হাতে কাইড়া নিয়া যায়।

পরির পাখা উইড়া যায়—

পূর্ণিমায়—পূর্ণিমায়

[আকাশে আঁচলটি ভেসে যায়। মনে হয়, পরিটিকেও এবার দেখা যায়।]

 

দৃশ্য-১

[আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। বাঁশিতে করুণ সুর। ধীরে মেঘ এসে তাকে ঢেকে ফেলে। আবার চাঁদ বেরিয়ে আসে মেঘ থেকে। নিচে গ্রাম। গাছপালা। বাড়িঘর। সড়ক। সবই রাত্রিকালে পূর্ণিমার আলোয়। নেপথ্য কণ্ঠে পাঠ চলতে থাকে।]

নেপথ্য কণ্ঠ : সব পূর্ণিমা আনন্দের নয়। কোনো কোনো পূর্ণিমা বড় দুঃখিত। আবছা আবছা। কালিমাখা। যেন তার চোখের কাজল কাঁদতে কাঁদতে গলে গিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো কোনো পূর্ণিমা আসে চঞ্চল পায়ে। এই এসেছে, এই সে চলে যাওয়ার জন্য ছটফট করে। মেঘের সঙ্গে সে আড়াআড়ি করে। তারপর রাগ করে চলে যায় জগৎ কাঁদিয়ে।

[তিনটি যুবককে দেখা যায়। তারা বাস থেকে নামে।]

প্রথম যুবক     :           আসতে আসতে রাতই হয়ে গেল।

দ্বিতীয় যুবক   :           জলেশ্বরী থেকে হস্তিবাড়ী।

তৃতীয় যুবক    :           আঠারো মাইল।

প্রথম যুবক     :           বিকেলে রওনা দিয়েছিলাম।

দ্বিতীয় যুবক   :           পথে কত জায়গায় থামলাম।

তৃতীয় যুবক    :           পথে কত জায়গায় কতজনের কাছে                                    মালতির কথা জিজ্ঞেস করলাম।

প্রথম যুবক     :           তাই দেরি হয়ে গেল। শুনেছি,

                        মালতি খুব সুন্দরী ছিল।

দ্বিতীয় যুবক   :           হয়তো সেটাই তার কাল হয়।

তৃতীয় যুবক    :           সেই রূপ তার কাল হয়।

প্রথম যুবক     :           তাই তাকে আত্মহত্যা করতে হয়।

দ্বিতীয় যুবক   :           আত্মহত্যা? না, তাকে খুন করা হয়?

তৃতীয় যুবক    :           কারা করে? মালতিকে খুন করে?

 

দৃশ্য-২

[আমরা দেখতে পাই, মালতি দৌড়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে। তাকে ধাওয়া করছে কয়েকজন সন্ত্রাসী। তারা মালতিকে হারিয়ে ফেলে। মালতি দৌড়ে খালপারে এসে থামে। সন্ত্রাসীরা খুঁজছে। মালতি খালপারে থমকে দাঁড়ায়। পানিতে ঝাঁপ দেবে কি না ভাবছে। সন্ত্রাসীরা তাকে দেখতে পায়। মালতি পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য উদ্যত হয়। হঠাৎ নেপথ্যে বাচ্চা কেঁদে ওঠে : মালতি থমকে যায়। সে যেন স্পষ্ট দেখতে পায় তার শিশুকন্যা কাঁথার ওপরে চিৎকার করছে ‘মা মা’ বলে ঘুমের ভেতরে। মালতি চমকে ওঠে—]

মালতি            :  এই যে মা! এই যে আমি! যাই!

[মালতি উল্টো দিকে ফিরে দৌড় দেয়। শিশুর কান্না হতেই থাকে।]

 

দৃশ্য-৩

[যুবকরা হাঁটতে হাঁটতে এসে একটা জায়গায় এসে স্থির হয়। ঝাঁপবন্ধ একটাই দোকান। পাশে বড় একটি গাছ। দোকানের পাশ দিয়ে একটা সড়ক গ্রামের ভেতরে চলে গেছে। প্রথম যুবক আঙুল তুলে দেখায়।]

প্রথম যুবক     :           এইটাই আবু বকরের দোকান।

দ্বিতীয় যুবক   :           শুনিছিলাম, আবু বকরের সাথে                                মালতির ভালোবাসা ছিল।

তৃতীয় যুবক    :           সে কথা শোনা কথা।

দ্বিতীয় যুবক   :           চলো, আবু বকরের বাড়ি যাই।

                        ঘটনার বিবরণ তার কাছে জানি।

তৃতীয় যুবক    :           দোকানের পাশে এই রাস্তা দিয়াই                              তার বাড়ি শুনিছি।

প্রথম যুবক     :           চলো, খোঁজ করি।

[ওরা হাঁটতে থাকে। পাশের সড়কে ঢুকে যায় ওরা।]

 

দৃশ্য-৪

[যুবকরা কথা বলতে বলতে চলেছে।]

প্রথম যুবক     :           তবু ভালো। আজ পূর্ণিমা :                             দিনের মতো ফটফটে আলো হে।

দ্বিতীয় যুবক   :           রাস্তাঘাট পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

তৃতীয় যুবক    :           এই রকম এক জোছনায়, একাত্তরে,              সেই যুদ্ধের সময়ে, আমাদের                          মান্দারবাড়ির মুক্তিযোদ্ধা আকবর                          হোসেন নাকি পথ হারায়।

দ্বিতীয় যুবক   :           কোন আকবর হোসেন?

প্রথম যুবক     :           কী! ভুলি গেইছো হে! আকবর                                   হোসেনের কথা? এই এলাকার বড়                           মুক্তিযোদ্ধা, তার কথা ভুলিগেইছো?                        মানুষ যে কিভাবে ভুলি যায়!

দ্বিতীয় যুবক   :           সে কথা বাদ দেও। এই রকম                                     জোছনার রাতে মালতিকে ধর্ষণ করা                         হয়।

তৃতীয় যুবক    :           নগেন মাস্টারের মেয়ে মালতি?

প্রথম যুবক     :           মালতির বিবাহ হয়েছিল। সুখের                              সংসার ছিল তার। বাপের বাড়ি এই             হস্তিবাড়ী এসেছিল নাইয়রে।

দ্বিতীয় যুবক   :           মালতির কোলবয়সী একটা মেয়ে ছিল।

[তাদের ওপরে শিশুকন্যার ক্রন্দনের শব্দ আছড়ে পড়ে।]

 

দৃশ্য-৫

[মালতি দৌড়ে এসে ঘরে ঢোকে। বাচ্চার কান্না আবার।]

মালতি            :   মা! মা! এই যে!

[মালতি অন্ধকার ঘরে বিছানার ওপরে তার মেয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর ঠিক তখনই সন্ত্রাসীদের একজন তাকে চুল ধরে টেনে তোলে।]

 

দৃশ্য-৬

[আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। বাঁশিতে তীব্র হাহাকারমাখা সুর।]

নেপথ্য কণ্ঠ : মালতির ধর্ষণের খবরে হস্তিবাড়ী শিউরে

            ওঠে : মান্দারগ্রাম কেঁপে ওঠে :

            জলেশ্বরী টাউন পর্যন্ত সে খবর পৌঁছে। শুকনো খড়ের পালানে আগুনের মতো চড়চড় করে খবর ছড়ায় চোখের পলকে।

[যুবকরা চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারা আবু বকরের বাড়ি খুঁজছে।]

দ্বিতীয় যুবক   :           আবু বকরের বাড়ি কোনটা হে!

[তারা এবাড়ি-ওবাড়ি খোঁজ করে। তাদের পাশ দিয়ে কিষান একটি ছেলে হনহন করে চলে যাচ্ছিল।]

প্রথম যুবক     :   এই, দাঁড়াও হে! দাঁড়াও।

[কিষান ছেলেটি দৌড় থেকে থমকে দাঁড়ায়।]

দ্বিতীয় যুবক : এই, এদিকে আয়।

[কিষান ছেলেটি ভয়ে ভয়ে কাছে আসে।]

প্রথম যুবক     :           তোর নাম কী রে?

কিষান            :           সামাদ। সকলে সামু বলি ডাকে।

দ্বিতীয় যুবক   :           ওই যে রাস্তার পাশে দোকান।                                   দোকানটা আবু বকরের নয়?

সামু     :           হয়, হয়।

তৃতীয় যুবক    :           চিনিস তাকে?

সামু     :           হয়, হয়। মুঁই তো তারে কাম করি।                            কিষানের কাম।

প্রথম যুবক     :           চল তো, তার বাড়ি চিনেয়া দিবি।                            তার সাথে কথা আছে।

সামু     :           তাঁই তো বাড়ি নাই।

দ্বিতীয় যুবক   :           কোটেট গেইছে?

সামু     :           তার দুলাভাই আসিছিল ইন্ডিয়া হতে।                       তাকে বর্ডার পার করায়া দিবার গেইছে।

তৃতীয় যুবক    :           তবে আর কি! চলো হে! আরেক দিন

                        আসা যাইবে। আরেক দিন বুঝিয়া

                        দেখা যাইবে আবু বকরের ভালোবাসা

                        ছিল কি না মালতির সাথে।

[মালতির নাম হতেই কিষান ছেলে সামু চমকে ওঠে।]

সামু     :           কার কথা কন?

দ্বিতীয় যুবক   :           মালতি। মালতি।

[সামু মাথা নাড়ে আর পেছন দিকে হাঁটতে থাকে। তারপর হঠাৎ ঘুরে দৌড়ে চলে যায়।]

প্রথম যুবক     :           এ তো বড় তাজ্জব ব্যাপার হে! মালতির নাম শুনিয়াই ডরাইল কেন?

দৃশ্য-৭

[পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে। দ্রুত মেঘ এসে ঢাকতে থাকে। বাঁশিতে হাহাকার তীব্র। নেপথ্য কণ্ঠ শোনা যায়।]

নেপথ্য কণ্ঠ    : মালতির ধর্ষণ, তারপর মৃত্যু, এ খবর

                           আগুনের মতো দিকে দিকে ধায়।  

                           আশপাশের দশ-বিশ গ্রামের যুবতিরা      

                           তাদের নারীজীবনের ভয়ে ঘরে লুকায়।

[পর পর ছবি দেখা যায়। শূন্য পুকুরের ঘাট। শূন্য সড়ক। শূন্য মাঠ।]

নেপথ্য কণ্ঠ : পুকুরঘাটে নারীরা আসে না। সড়কে             নারী দেখা যায় না। মাঠেও নারীরা আর স্বামীর জন্য পান্তা নিয়ে আসে না। তারা নিজেদের আর মানুষ বলে ভাবতে পারে না। কসাইয়ের চোখে মাংস বলে ভাবে।  মালতির পরিণতি তারা শুনেছে।

 

দৃশ্য-৮

[খালপার। রাতের বেলা। সন্ত্রাসীরা মৃত মালতির দেহ টেনে এনে খালের পানিতে ফেলে দেয়।]

নেপথ্য কণ্ঠ : শুধু ধর্ষণ করেই ওরা ক্ষান্ত হয় না। সুন্দরী মালতির সমস্ত শরীর ওরা ফালা ফালা করে, আগুনের ছেঁকা দিয়ে মুখ পুড়িয়ে দেয়, তারপর পাগল্লির খালে ছুড়ে ফেলে। ওরা চলে যায়। হস্তিবাড়ীর নারীরা বলাবলি করে, লাশ পানিতে পড়ার সাথে সাথে নাকি এক আশ্চর্য ব্যাপার হয়।

[সোনার চুড়ি পরা এক জোড়া হাত খালের পানির তল থেকে জেগে ওঠে। সেই হাত মালতিকে জড়িয়ে ধরে সাঁতার কেটে নিয়ে যায়।]

 

দৃশ্য-৯

[সেই তিন যুবক ফিরতি পথ ধরে আবু বকরের ঝাঁপবন্ধ দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়।]

তৃতীয় যুবক    :           দূর দূর! এসব নারীদের কল্পনা।

দ্বিতীয় যুবক   :           এও কি হবার পারে? পানির তল থেকি সোনার চুড়ি পরা হাত মালতির লাশ নিয়া পাতালে যায়। দূরো!

প্রথম যুবক     :           অনেক সময় কত কী হয়! শোনো নাই আকবর হোসেনের কথা। সেই যে মুক্তিযোদ্ধা। আজও পূর্ণিমার রাতে আকবর হোসেনের ডাক শোনা যায়। সাথি যোদ্ধাদের ডাক দিচ্ছে—এ এ এ রে! আগাও রে! ওই যে খান সেনার ঘাঁটি দেখা যায়!

দ্বিতীয় যুবক   :           এও মানুষের কল্পনা! কবে মুক্তিযুদ্ধ! আর কবে আকবর হোসেন।

তৃতীয় যুবক    :           চলো, চলো, টাউনে ফিরি যাই।

দ্বিতীয় যুবক   :           মরা মানুষ কি ঘুরি আসে দুনিয়ায়?

প্রথম যুবক     :           আসে! আসে! তার আত্মা যদি অশান্ত হয়, আবার ফিরি আসে।

[ওরা পথের পাশে দাঁড়ায় বাসের অপেক্ষায়।]

নেপথ্য কণ্ঠ    :           মালতিও ফেরে। সে ফিরে আসে। মানুষ নয়, পরির বেশে মালতি ফেরে হস্তিবাড়ীতে।

 

দৃশ্য-১০

[আকাশে ভাঙা চাঁদ ভাসছে।]

নেপথ্য কণ্ঠ  : আকাশে চাঁদ বাঁ দিক থেকে ভাঙতে শুরু করেছে। চাঁদটিকে কামড়ে কামড়ে খেয়ে চলেছে অমাবস্যা। তখন ভরসন্ধেয় খলবল করে ওঠে পাগল্লির খাল। হঠাৎ ফোয়ারার মতো পানি ওঠে খালের বুক থেকে। কিষান ছেলে সামু গরু নিয়ে খাল সাঁতরে আসছিল এপারে, তার গায়ে পানির পিচকিরি লাগে। সে অবাক হয়।

 

দৃশ্য-১১

[কিষান ছেলে সামু গরু নিয়ে খালপারে আসছে। গরুটাকে সে তাড়া দেয়।]

সামু    :    আরে, হট, হট, এ রে রে। সইন্ধা হয়া

              যায়। দিক করিস না রে। চল, চল।

[গরু নিয়ে সে খালের পানিতে নামে। তারপর গরু আর সে সাঁতরাতে থাকে ওপারের দিকে। হঠাৎ খালের পানি অস্থির হয়ে ওঠে; ফোয়ারার মতো পানি ওঠে খালের বুক থেকে। সামুর গায়ে পানির পিচকিরি লাগে। সে অবাক হয়।]

সামু   :   আরে কী হয়! কী হয়!

[সামু খালের এপারে এসে ওঠে : বস্ফািরিত চোখে পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ নূপুরের শব্দের মতো সংগীত হয়। সামু চমকে চারদিকে তাকায়। তারপর আকাশের দিকে চোখ তোলে। আকাশে ভাঙা চাঁদ। হঠাৎ যেন সে দেখতে পায়, সাদা আঁচল ভেসে যাচ্ছে। আঁচলটি বড় দীর্ঘ, পুব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত।  চোখ কচলে ভালো করে তাকাতেই দেখে, আঁচলের অন্য প্রান্ত গিয়ে ঠেকেছে এক বেগুনি রঙের শাড়িতে আর সেই শাড়িটি জড়ানো এক নারীর শরীরে। আরো সে দেখতে পায়, সেই নারীর পিঠে রাজহাঁসের পাখার মতো এক জোড়া ডানা। তবে তো এ নারী নয়। পরি! কিষান ছেলেটি বাগ্রুদ্ধ হয়ে দেখে, তার মাথার ওপর দিয়ে ডানায় ভর করে নিঃশব্দে সহাস্যে উড়ে যাচ্ছে অপূর্ব সুন্দরী এক পরি। খালপারে মূর্ছিত হয়ে পড়ে যায় সামু। তার চোখ বোজা, নিথর হয়ে পড়ে আছে পারের জমিতে। একটু পরে তার মুখের কাছে যুবতির দুটি পা এসে স্থির হয়। একটু পরে সামুর বোজা চোখের ওপর টপটপ করে পানি পড়ে। দেখা যায় মালতিকে। পরির বেশে।  সামু চোখ খোলে। দেখতে পায় মালতি পরিকে। সামু অবাক হয়। ধড়মড় করে উঠে বসে। গরুটা হাম্বা করে লেজ তুলে ছুটে পালায়। মালতি সামুর দিকে স্নিগ্ধ হাসিমাখা মুখে তাকিয়ে থাকে। বলে—]

মালতি            :           আমি মরি নাই রে, সামু। মালতি মরে নাই।

সামু     :           মালতি দিদি!

[সামু উঠে দাঁড়ায়। হাত বাড়ায়।]

সামু     :           পরি নন তবে! মালতি দিদি!

[হাত বাড়াতেই মিলিয়ে যায় মালতি। সামু অবাক হয়ে তাকায়। তার পরেই চিৎকার করে দৌড় লাগায়।]

সামু   :             ওরে বাপ! মরিছোঁ রে মরিছোঁ। বকর ভাই

            গো! বকর ভাই!

[সামু দৌড়াতে থাকে বাড়ির দিকে।]

 

দৃশ্য-১২

[সন্ধ্যাকাল। আবু বকরের বাড়ি। আবু বকরের মা পাকঘরের দাওয়ায় বসে আনাজ কুটছে। উঠানে চিৎকার করে সামু ঢোকে।]

সামু     :           বকর ভাই গো! বকর ভাই!—আম্মা গো। বাঁচান মোকে।

মা        :           কিরে, কী হইছে? গরুটা কোনঠে?

সামু     :           আর গরু! মোর বলে জান আছে কি নাই—গরুর কী উদ্দিশ!

[নেপথ্যে ঠিক তখনই গরু হাম্বা ডেকে ওঠে ঘন ঘন।]

সামু     :           ওই দ্যাখেন, গরু বা কেমন ভয় পাইছে। গরুও দেখিছে। দুইজনাই দেখিছোঁ, খালপারে পরি। পরি আসমান হতে নামি আসিল।

[এর মধ্যে আরেকটা ঘর থেকে দাওয়ায় এসে দাঁড়ায় আবু বকর। তাকে বেশ অসুস্থ ও জ্বরাগ্রস্ত দেখা যায়। তার ওপরে সামুর কথাগুলোর প্রথম খানিকটা শোনা যাবে।]

সামু     :           হয়, হয়, আম্মা, সাক্ষাৎ পরি। এই বড় পাখনা তার। ভয়ে মুঁই জ্ঞানহারা হয়া যাই। মোর মুখে পানির ছিটা দিলে। ফির কইলে, ডরাইস না সামু। মুঁই মালতি!

[আবু এগিয়ে আসে।]

আবু     :           কী কইলি রে! মালতি!

মা        :           আরে, তোর জ্বর গায়ে। পাগলের কথা শুনি উঠি আসলি কেনে?

সামু     :           পাগল নয়, মা। পষ্ট দেখিনু। তার পরে নাই হয়া গেল। আশপাশে আর নাই।

[আবু বকর এগিয়ে আসে সামুর কাছে।]

আবু     :           তুই চিনিলু কী করিয়া মালতি?

সামু     :           নাম কইলে যে! পরি নিজ মুখে নাম কইলে—মালতি।

আবু     :           ঠিক দেখিছিস? মালতি তো মরি গেইছে।

সামু     :           কেনে, মানুষ কি ফেরে না, ভাই? অবিকল মালতির মুখ দেখিলাম! তোমার দোকানে কত দিন আইসছে না!

[আবু চিন্তিত হয়ে পড়ে। মা ছেলের ভাব দেখে উদ্বিগ্ন হয়।]

মা        :           যা, ঘরে যা, বকর। জ্বরের মুখে এই সব কথা শোনা ভালো নয়।

আবু     :           আত্মা তো ঘুরি আসে, মা, এই জগতে যদি অশান্ত হয়া জীবন তার চলি যায়!

মা        :           ওগুলা কথা না কইস, বাপ। মালতির কপালে তার ভগবানে কী লেখিছিল। জানোয়ারগুলার হাতে ধর্ম নাশ হইল, জীবন দিল। নারীর জনম, বাপ, জগতে শুয়ারের পালের ভিতরে বাস করা।

[ফ্ল্যাশব্যাক—ভেসে ওঠে প্রথম পর্বের সেই দৃশ্য—যেখানে মালতি তার বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরেছিল, তার চুল ধরে টেনে তুলছে সন্ত্রাসীরা।]

মা        :           আর এই তুই হারামজাদা সামু, নষ্টের গোড়া, তুই সানঝের বেলা এই কথা ধরি আসিছিস। জানিস না ব্যাটা হামার জ্বরে কাতর। কী দেখিতে কী দেখিছিস—মালতি বলি দৌড় দিয়া আসি খাড়া হলু!

সামু     :           আম্মা, মালতি দিদিই হয় গো। পষ্ট দেখিনু। তবে মরি গিয়া আরো সোন্দর হইছে। দুধের মতো রং।

[আবুর চোখের সম্মুখে ভেসে ওঠে মালতির এই অপরূপ চেহারা। তার ওপরে সামুর কথা নেপথ্যে।]

সামু     :           য্যান গোলাপবাগানের ভিতর দিয়া হাঁটি গেইছে। গোলাপি ঠোঁট। য্যান চাম্পার গাছে ফুল ধরিছে। য্যান দিদি হামার আষাঢ়ের ম্যাঘ থেকি নামি আইসছে। ঘন কালো কোঁকড়ানো চুলের ঢল। হাতে পায়ে গলায় সোনার অলংকার। বুকে ফুলের মালা।

[ধীরে ছবিটা কোমল ও আবছা হয়ে আসে।]

 

দৃশ্য-১৩

[বাজারে একটা দোকানে বসে কয়েকজন প্রৌঢ় আড্ডা দিচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন রহমত চাচা। তার ওপর থেকে দৃশ্য শুরু হয়। হাতে তার চায়ের গেলাস।]

রহমত :          পরি নাই। আবার আছেও। অবিশ্বাস করি কী করিয়া? এ কথা তো অস্বীকার হবার নয় যে মাস্টারের বেটি মালতিকে যখন মারিধরি পাগল্লির খালে ফালায়া দেয় শয়তান রাজাকারের পা চাটার গুষ্টি পচা পনিরের দল—

[তত্ক্ষণাৎ একজন ভীত গলায় বলে ওঠে।]

একজন            :           চাচা, পচা পনিরের নাম না করেন। আশেপাশে তার দলের চ্যাড়ারা থাকিবার পারে। কানে গেইলে বিপদ হয়া যাবার পারে।

[রহমত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।]

রহমত :           হয়, হয়। কী হতে কী হয়া যায়। মুখ ফসকি নামটা বের হয়া গেইছে। তার বাদে কথা হইল—এমনও তখন শোনা গেইছে যে মালতির লাশ যখন খালের পানিতে ফেলায়, সোনার চুড়ি পরা হাত আসি তাকে পানির অতলে নিয়া যায়।

আরেকজন      :           এগুলা কথা কি সত্য হবার পারে?

রহমত :           দ্যাখ, হামার চুল পাকি শণের লাহান হইছে। সেই বাল্যকাল হতে শুনি আসিছোঁ, বাপ-দাদায় কইছে—মান্দারবাড়িতে যে রাজা আছিল, সেই রাজবাড়ির কোন এক রানি পাগল হয়া যায়। শরীরের সব বস্ত্র ফেলিয়া দিয়া, গায়ের সমুদয় সোনার অলংকার ঝমঝম করিয়া, পূর্ণিমার এক ঘোর রাইতের বেলা—রাজবাড়ির রানি সেই মান্দারবাড়ি হতে হস্তিবাড়ী দৌড়ি আসে, তার পরে এই হস্তিবাড়ীর খালে ঝাঁপ দিয়া আত্মহত্যা করে। সেই হতে খালের নাম পাগল্লির খাল। কতবার পূর্ণিমার রাইতে বাপ-দাদারা নিজের চক্ষে খালের পানি হতে সোনার চুড়ি পরা হাত ভাসি উইঠতে দেখিছে।

আরেকজন      :  কন কী! সত্যই দেখিছে?

রহমত :           মুরব্বির কথা! সত্য হবার নয় কেনে? মুরব্বির কথা এখন তরকারির খোসা—বঁটির আগায় ছিলিয়া ফেলেয়া দেও! এখন যুগ মন্দ, এখন ঘোর কলিকাল। তবু কি দুনিয়া হতে সত্য উঠি গেইছে? মালতির ওপর যখন অত্যাচার হয়, জগৎ কি কান্দে নাই? হামার বিশ্বাস, হামার মন তো এই কথা কয় যে মালতিকে যে পানির অতলে নিয়া যায় সে সেই রানির সোনার চুড়ি পরা হাত। শোকেতাপে তাকে মায়ের মতো স্বর্গে নিয়া যায়।

[একজন হঠাৎ দূরে লক্ষ করে—সামু বাজারে এসেছে থলি হাতে।]

একজন            :           আরে! ওই তো সামু! বকর মিয়ার কিষান যায়। ওরে এত্তি আয়, এত্তি আয়।

[সামু থমকে দাঁড়ায়। তারপর দৌড়ে পালাবে কি না ভেবে ইতস্তত করে। দু-এক পা পেছনে যায়।]

আরেকজন      :  ডরাইস না। একখান কথা শুনি যা।

[সামু কাছে আসে।]

সামু     :           আচ্চালামমো আলেকুম।

রহমত :           ওলেকুম ছালাম।

একজন            :           আদব চলন ঠিকে আছে তোর। মোছলমানের মতো ছালাম দিবার ভুলিস নাই। আচ্ছা, তবে এক কথা ক দেখি? পরি কি তুই সত্যই দেখিছিস? মালতি পরি হয়া গেইছে? তোর কাছে আসি সাক্ষাৎ দিছে?

[সামু ঢোক গেলে। তারপর ভয়ে ভয়ে বলে—]

সামু     :           হয়, হয়।

আরেকজন : পরি কাকে কয়, কেমন দেখা যায়—তুই চিনিস? পরি তুই বুঝিলি কী করিয়া?

সামু     :           রসগোল্লার দোকানে দেখিছোঁ না! সাইনবোর্ডে ছবি আছে। পরি ফুলের মালা

                        গলায় দিয়া, হাতে রসগোল্লার থালা ধরিয়া, আসমান দিয়া উড়ি যায়।

একজন            :           সই পরি? নিজ চক্ষে তুই?

[সামু সবার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকায়। ঢোক গেলে।]

সামু     :           হয়, হয়। হামার টাইম নাই। আম্মা মাছ কুটিবে বলি বসি আছে। মোর বেলা হয়া যায়। মাছের বাজার বা খতম হয়া যায়। যাঁও।

[সামু দৌড়ে চলে যায়। একজন অবিশ্বাসের গলায় বলে—]

একজন            :           এই চ্যাংড়ার কথায় বিশ্বাস কী! পরি দেখিছে! হ্যাঁহ্।

[রহমত এবার গলায় কাশি দেয়। চাওলাকে আরেকবার চা দিতে বলে পরির কথা পাড়ে।]

রহমত :           ওই হে, আরেক গেলাস চা দেও হামাক। কাশিটা বড় টাবল দিচ্ছে।—শোনেন তবে, পরি চক্ষে কেবল দেখা কেনে, অন্য পরে কথা কী!—মুঁই নিজেই একবার এক পরির সাথে কথাবার্তাও কই।

একজন            :           কন কী! পরির সাথে কথাবার্তা?

আরেকজন :   সে কবে?

রহমত             :           সেই একাত্তর সালে। সংগ্রামের সময়ে। পাকিস্তানের মেলেটারি যখন জলেশ্বরী পর্যন্ত আসি যায়, যখন আধকোষা নদী পার হয়া গ্রামগঞ্জে নামি পড়ে মেলেটারি, মানুষ খুন করিতে থাকে, মেয়েদের ইজ্জত নিবার থাকে, তখন। তখন উপায়-অন্তর না দেখিয়া এক গুনিনের কাছে গিছলোম। তারা তো আসমান-জমিনের অনেক খবর রাখে।

 

দৃশ্য-১৪

[ফ্ল্যাশব্যাক। এক গ্রাম্য ওঝা। মাথায় জট। লাল সালু পরা। চোখ বুজে বসে আছে। রহমতকে দেখা যায় তার কাছে আসতে। এসে লম্বা সালাম দেয়। পকেট থেকে একটা রুপার টাকা বের করে সামনে রাখে।]

গুনিন :           হ্যাঁ, বল। বল তোর কোন বিপদ?

রহমত             :           বিপদ। বিপদ তো হামার একেলার নয়। সারা দ্যাশের। পাকিস্তান তো বাঙ্গালীকে শ্যাষ করি ফালাইলে। বঙ্গবন্ধু এক বড় ভরসা ছিল। তাকেই নাকি বান্ধি নিয়া গেছে। এলা উপায়? আপনার তো অনেক এলেম-কালাম আছে, জিন-পরি আপনার বশ। একবার কাউকে ডাক দিয়া গুনিয়া কন তো কবে এই দজ্জালের শ্যাষ হইবে?

গুনিন :           হুম্! এক আছে দানাপরি। ডাক দেই তাকে?

রহমত             :           ডর করে!

গুনিন :           ঘাবড়ান কেনে?

[গুনিন এই বলে সামনের মালসায় ধূপ দেয়। ঘর ধোঁয়ায় ভরে ওঠে; গুনিন মন্ত্র পড়ে বিড়বিড় করে। রহমত চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। তার ওপরে আলো কোমল হয়ে মিশে যায় পরের দৃশ্যে।]

 

দৃশ্য-১৫

[একাত্তরে পাকিস্তানি মিলিটারিদের বর্বরতা ও গণহত্যার কিছু দৃশ্য।]

 

দৃশ্য-১৬

[রহমত ও বাজারের দৃশ্যে ফিরে যাই আমরা।]

রহমত :           মনে আছে সেই সব দিনের কথা? সেই অত্যাচারের কথা? নাকি ভুলি গেইছেন সকলে?

[গল্প শুনতে আরো কিছু ভিড় জমেছে রহমত চাচাকে ঘিরে। তাদের ভেতরে বৃদ্ধ একজন বলে—]

বৃদ্ধ      :           ওহ্, যা গেইছে সেইকালে! স্মরণ আছে গো! এলাও স্মরণ আছে।

রহমত :           চাচা, তোমার তো স্মরণ থাকিবেই। তোমার দুই-দুই ব্যাটাকে মারিছিল না মেলেটারি? তোমারে তো স্মরণ থাকিবে।

[বৃদ্ধ চোখের পানি মোছে।]

রহমত             :           তার বাদে সেই গুনিন। তখন রাইতের বেলা। চাইরদিক আন্ধার। গুনিন কী কী মন্ত্র পড়িল, আন্ধার ঘরে মুঁই তার সামনে বসা। আকাশ হতে পরি নামি আসিল। তাকে না চোখে দেখিলোম, কেবল আবছা ধুন্দুলা একখান আলো পড়িল ঘরের মইধ্যে। গুনিন কইল, পরি গো, দয়া করি যদি পায়ের ধুলা দিছেন, ইয়ার প্রশ্নের উত্তর দিয়া যান। পরি তখন মানুষের স্বর ধরিয়া, চ্যাঁওচ্যাঁও করিয়া কইল, বেশিদিন নাই! শয়তানের গোড়ায় আগুন ধরান সকলে মিলিয়া।

[ভিড়ের সবাই অবাক হয়ে যায় কথা শুনে। রহমত বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে বলে—]

রহমত             :           কী! পরির কথা ঠিক হইছে কি হয় নাই? সবাই একজোট হয়া যুদ্ধ করিলেন, দ্যাশ স্বাধীন করিলেন, করিলেন কি না কন? পরিই তো কয়া দিছিল সমুদয়। সেই পরি অবিশ্বাস করি কী করিয়া?

 

দৃশ্য-১৭

[আবু বকরের বাড়ি। সেই যুবক তিনজন এসেছে। মায়ের সম্মুখে দাঁড়ানো।]

প্রথম যুবক     : আমরা জলেশ্বরী থেকে আসছি। আবু 

                বকর আপনারে তো ব্যাটা?

[মা ভীত গলায় প্রশ্ন করে।]

মা        :           কেনে বাপ? দূর হতে সইন্ধ্যাকালে আইসছেন, সে কোনো দোষ কইরছে?

প্রথম যুবক     : না, চাচিমা। দুই-একটা কথা, আলাপসালাপ আর কি!

মা        :           তোমরা কি মোর ব্যাটাকে চিনিতে? জলেশ্বরী কলেজে পড়িত। তোমরাও কি তার সাথে পড়িছেন?

[যুবক তিনজন মিথ্যা করে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে।]

মা        :           ও। দ্যাখা কইরতে আইসছেন? তার শরীরে তাপ। জ্বর আইজ তিন দিন। দুব্বল।

প্রথম যুবক     : ডাক্তার করেন নাই?

মা        :           ডাক্তার! ডাক্তার কী করিবে? পরিতে যদি পায়—জুয়ান ব্যাটা দুবলা হয়া যায়।

[যুবকরা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।]

মা        :           জ্বরতাপ হয়। মুখের রুচি চলি যায়। খালি একে চিন্তা। পরি রক্ত চুষি খায়? দ্যাখো, তোমরা যদি বুঝেয়াসুঝেয়া মাথা থেকি পরির খেয়াল ছাড়াইতে পারেন। ঘরে আসেন। বকর শুইয়া আছে।

[মা তাদের ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়।]

 

দৃশ্য-১৮

[আবু বকর শুয়ে আছে চোখ বুজে। মা যুবকদের ঘরে নিয়ে আসে।]

মা        :           বকর রে। দ্যাখ তোর দোস্তরা আইসছে।

[আবু চোখ খোলে।]

আবু     :           কে?

[আবু তাদের চিনতে পারে না। আধো উঠে বসে।]

মা        :           যাই, নামাজের ওক্ত বয়া যায়।

[মা চলে যায়।]

আবু     :           আপনারা?

প্রথম যুবক     : আমরা জলেশ্বরীর। অনেক কথা শুনেছি। আপনি এখানে দোকান দিয়েছেন, সে দোকানে মুক্তিযুদ্ধের ওপর আপনি অনেক বই রেখেছেন, গ্রামের ছেলে-মেয়েদের উৎসাহ দেন বই পড়তে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে—বই আপনি তাদের ধার দেন—আমরা সবই শুনেছি।

[প্রশংসার কথা শুনতে শুনতে আবু ম্রিয়মাণ হয়ে যায়।]

আবু     :           তবে এটাও কি শোনেন নাই, এর জন্যি আমার দোকানের ওপর হামলা হয়। বই সব রাস্তায় ফেলি দেয়া হয়। আমি গ্রামে একধারে পড়ি আছি। মাঝে মাঝে মন সাহসহারা হইয়ে পড়ে। আপনারা কি সাহস দিতি পারিবেন?

[যুবকরা পরস্পর অপ্রতিভ দৃষ্টি বিনিময় করে।]

দ্বিতীয় যুবক   : না, মানে, আমরা পরির বিষয়ে—মানে আপনার মাও কইলেন—আপনাকে নাকি পরিতে পায়।

আবু     :           পরিতে পায়! পরিতে পায়! আমাকে!

[উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে আবু।]

আবু     :           সেই গল্প শুনতে আসিছেন? একটা মেয়েকে, নগেন মাস্টারের মতো নিরীহ এক শিক্ষকের মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়, খুন করা হয়, নগেন মাস্টারের ভিটাজমি দখলের জন্যি ধমকি দেয়া হয়—সে কথার তালাশ নিতে আপনারা আসেন নাই। তার কোনো বিচার নাই। আর আমি একা তাদের কথা রাত্রিদিন চিন্তা করি বলে আমাকে বলা হয় পরিতে আমাকে পায়! যান, বেরিয়ে যান। চলে যান।

[এ কথা বলতে বলতে আবু ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।]

 

দৃশ্য-১৯

[উঠান। আবু বকর হনহন করে বেরিয়ে যায় বাড়ি ছেড়ে। গরু ডেকে ওঠে হাম্বা রব তুলে। মা জায়নামাজ থেকে মোনাজাতের হাত ফিরিয়ে আবুর চলে যাওয়া দেখে। ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ায়। যুবকরা ঘর থেকে উঠানে নেমে আসে। মা তাদের অনুনয় করে।]

মা        :           বাবারা, যান, উয়াকে ফিরান। অসুস্থ শরীল তার। বুড়ি হয়া গেইছোঁ, তা-ও আল্লা হামাক নেয় না। আবু বকরের দোকান বন্ধ। দোকানের রোজগার বন্ধ।  ব্যাটা না হারাই এই দফায়। উয়াকে ঘরে নিয়া আসেন। খালপারে ফির গেইছে।

প্রথম যুবক     : খালপারে?

[যুবকরা পরস্পর অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করে।]

 

দৃশ্য-২০

[সন্ধ্যাবেলা আবু গ্রামের পথ ধরে খালপারে যাচ্ছে হনহন করে। তার ওপরে ডাক শোনা যায় যুবকদের।]

যুবকরা (ওভি) : আবু বকর! আবু বকর! আবু বকর!

[ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় সে ডাক। যুবকরা ডাকতে ডাকতে অগ্রসর হয়। আবুকে দেখা যায় খালপারে দাঁড়িয়ে আছে। যুবকরা এসে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আবু ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে।]

আবু     :           তামশা দেখিতে আসিছেন! তামশাই বটে! জগৎ এক তামশা! মুক্তিযুদ্ধ তামশা! বঙ্গবন্ধু তামশা! যান, যান, টাউনে যায়া ফুর্তিতে মজি থাকেন! বিপক্ষের দলে গিয়া যোগ দেন। এদিকে আমরা উৎসন্ন হয়া যাই, তোমাদের টনক না নড়ে! মালতি পরি হয়া গেইছে শুনি পরি দেইখতে আসিছেন। মালতি দেখা দিবে! তোমার ঘাড় ভাঙ্গিতে ও-ই উড়ি আসিবে!

[যুবকরা ভীত হয়ে আকাশের দিকে তাকায়। সন্ধ্যায় ঘোর হয়ে আছে দিগ্বিদিক। বাস্তব-অবাস্তব পরস্পর ঠোকাঠুকি করছে, যেন মর্ত্যে ও আকাশে। খালের পানিতে অস্তগত সূর্যের বেগুনি লাল ঢালা। ওপারে কাশবনে সাদা ফুলের ওপর হাওয়ার দাপাদাপি।

হঠাৎ খলবল করে ওঠে পানি। যুবকরা পেছোয়।

আবু বকর পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। এই সব ছবির ওপরে নেপথ্য কণ্ঠ শোনা যায়।]

নেপথ্য কণ্ঠ    :           যুবকরা ভয় পায়। আবু বকরের উন্মত্ত চেহারা দেখে তারা জলেশ্বরীর পথ ধরে। অনেক সময় এগোবার জন্য মানুষকে পেছন দিকে যেতে হয়। মালতি পরির এই কাহিনি নিয়ে আর অগ্রসর হওয়ার আগে আবু বকরের জীবন আমরা খানিকটা পেছন থেকে জেনে নিই না কেন! গ্রামের ছেলে আবু বকরের স্বপ্ন ছিল, জলেশ্বরী কলেজ থেকে পাস করতে পারলে সে একটা সরকারি চাকরি নেবে। আবু বকর স্বপ্ন দেখত, সরকারি চাকরিতে উন্নতি করতে করতে সে একদিন রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তখন আর তাকে পায় কে? পেছনে পড়ে থাকবে হস্তিবাড়ী।

[আবু আপন মনে উচ্চারণ করে—]

আবু : আর কত নারী তোর মতো প্রাণ দিবে রে, মালতি!

 

দৃশ্য-২১

[আবু বকরের বাড়ি। আবু ঘরের ভেতরে স্যুটকেস গোছাচ্ছে। মা পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছলছল চোখে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা তিন-চারটি বই আবু স্যুটকেসে নেবে কি নেবে না, ভাবে। তারপর স্যুটকেসে রাখে।]

মা        :           এইগুলা তো গল্পের বই। পড়াশুনা করিবার কালে গল্পের বই পড়া ঠিক না, বাপ।

[আবু বকর হেসে বলে—]

আবু     :           গল্পের বই নয়, মা। গল্পকথা নয়। ইতিহাস! আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাস। কেমন করিয়া স্বাধীন হইলাম। কেমন করিয়া বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা বলিয়া ডাক দিলেন। দ্যাশের যুবকরা মুক্তিযুদ্ধ করিল। পাকিস্তানিরা হামার মানুষ মারিল। বাপজানও তো পাকিস্তানের মেলেটারির হাতে—

[মা ফুঁপিয়ে উঠে চোখ মোছে। আবু তাকে জড়িয়ে ধরে।]

আবু     :           কান্দে না, মা। কান্দিলে তো বাপজান ফিরিবে না। চলো, চলো, বেলা হয়া যায়। বাস চলি যাইবে। বিদায় দেও।

[তারা ঘরের বাইরে যায়।]

 

দৃশ্য-২২

[ঘর থেকে স্যুটকেস হাতে বেরিয়ে আসে আবু বকর ও মা। তারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মা আবুর মাথায় দোয়া পড়ে ফুঁ দেয়। নেপথ্যে শোনা যায়।]

নেপথ্য কণ্ঠ : আবু বকর কলেজে পড়তে যাচ্ছে।       আঠারো মাইল দূরে জলেশ্বরী টাউনে কলেজ। সেখানে ভর্তি হয়ে এসেছে গত সপ্তাহে। আজ রওনা হয়েছে হস্তিবাড়ী থেকে। এই প্রথম সে গ্রামের বাড়ি থেকে বাইরের জগতে যাচ্ছে।

আবু     : মা, তবে যাই।

মা        :           যাই কয় না, বাপ মোর। আসি!

আবু     :           আসি। তোমার মন ছনমন করে, মা। আমাকে ছাড়িবার না ইচ্ছা করে। হয় কি না হয়?

মা        :           কোন মায়ে ব্যাটাকে ছাড়িয়া একলা বাড়িতে বাস করে রে! তার মতন জগত্দুঃখী যে নাই। তবে আশা ধরি বুক বান্ধি থাকিব, লেখাপড়া শেষ করিয়া মানুষ হইবেন। মায়ের দুঃখ দূর করিবেন। জগৎ আলো হয়া উঠিবে।

[আবু বকর মাকে সালাম করে।]

 

মা        :           শহরে অপরের বাড়ি জায়গির থাকা! কী বা খাইতে দেয়! কেমন বা তারা। চিন্তা হয়।

আবু     :           না, মা। রহমত চাচা কয়া দিছে, সে বাড়ি বড় ভালো বাড়ি। মোল্লা সাহেব খুব ভালো মানুষ। রহমত চাচার খাতিরের মানুষ। চিন্তা না করেন। যাই—আসি!

[আবু বকর পথে নেমে পড়ে। মা তাকিয়ে থাকে।]

 

দৃশ্য-২৩

[আবু বড় সড়কের মোড়ে এসে দাঁড়ায়। সেখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল রহমত চাচা।]

রহমত :           তোরে জন্যি খাড়া হয়া আছি রে। মোল্লা সাহেবের বাড়ি যায়া উঠবি। তাকে আমার বলা আছে। জায়গিরের শর্ত কিছু ভারী নয়। দুইটা ছোট বাচ্চা, পড়া দেখায়া দিবার হইবে। সন্ধ্যাবেলা এক ঘণ্টা। তার বাদে তোর ফিরি টাইম। নিজের লেখাপড়া করিবি। পাস করিয়া হস্তিবাড়ীর মুখ উজ্জ্বল করিবি। বিএ পাস করিতে তো কয়টা মাত্র বচ্ছর!—ওই তোর বাস আসি গেইছে।

[বাস এসে যায়। রহমত চাচাকে সালাম করে আবু বকর বাসে উঠে যায়। বাস চলতে থাকে।]

 

দৃশ্য-২৪

[বাস চলছে। দ্রুত ধাবমান সড়ক। দ্রুত ধাবমান দুই দিকের দৃশ্য। আবু বকর চোখ পেতে সব দ্যাখে। নেপথ্যে বর্ণনা চলে।]

নেপথ্য কণ্ঠ : আবু বকর স্বপ্ন দ্যাখে। কলেজ পাস করেছে। চাকরি নিয়েছে। মাকে নিয়ে শহরে আছে। মায়ে-ব্যাটায় সুন্দর একটা সংসার। কিন্তু এখন তাকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। জলেশ্বরীতে মোল্লা সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছে, সেখানে দুটি ছোট ছেলে-মেয়েকে পড়াতে হবে। আর নিজের পড়া। আর তার শখের পড়া—মুক্তিযুদ্ধের ওপরে বই পড়া। আবু বকর স্বপ্ন দ্যাখে, তার যখন বাড়ি হবে—মুক্তিযুদ্ধের অনেক বই নিয়ে সে একটা লাইব্রেরি করবে।

[মোল্লার উল্লেখ থেকে এবার মন্তাজ দৃশ্য পর পর আসবে আর নেপথ্যে বর্ণনা চলবে। মোল্লার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে আবু বকর। মোল্লা তাকে তার বাড়ির বাইরের একটা ছোট ঘর দেখিয়ে দেয়—এখানেই আবু বকর থাকবে। আবু বকর কলেজে ক্লাস করছে।

আবু বকর ছোট ছেলে-মেয়ে দুটিকে পড়াচ্ছে। শহরে বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের বই দেখছে। একটা বই সে কেনে। আবু রাতে লণ্ঠনের আলোয় নিজের পড়া করছে। মায়ের কাছে চিঠি লিখছে। তাকে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছে হুরি। আবু বকর চোখ তুলে তাকায়। হুরি হেসে উঠে জানালা থেকে সরে যায়। আবু বকর ভাবে। অন্যমনা হয়ে যায় সে।]

নেপথ্য            কণ্ঠ : কিন্তু তার এই স্বপ্নের ভেতরে, মাকে নিয়ে সংসার করার কল্পনার ভেতরে এখন একটা মুখ এসে উঁকি দেয়। মোল্লা সাহেবের মেয়ে হুরি। নবম শ্রেণির ছাত্রী হুরি।

 

দৃশ্য-২৫

[আবু বকর লণ্ঠনের আলোয় পড়ছে। হুরি তার ঘরে এসে কোলের ওপর একটা বই ছুড়ে দিয়ে বলে—]

হুরি      : মাস্টার, আমার ইংলিশটা বুঝিয়া দেন তো!

[কোলে বই আছড়ে পড়তেই ধড়মড় করে ওঠে সে।]

আবু     :           এত রাইতে?

হুরি      :           মোটে তো নয়টা বাজে। জানি জানি, আমাকে তো পড়াবার কথা নয়। আমার ভাই-বোন দুটাকে। তা দিলেন না হয় আমাকেও পড়া বুঝিয়া!

[আবু বকর বই হাতে নেয়, গম্ভীর মুখে দ্যাখে।]

আবু     :           ক্লাস নাইন হতেই ইংরাজিটা পাকা করিতে না পারিলে পরে দেখিবে সব সাবজেক্টেই ফেল!

[আবু বকর বইয়ের পাতা ওল্টায়। হুরি দুষ্টুমি চোখে তাকিয়ে থাকে।]

আবু     :           কোনখানে? কোন পাতায়?

[আবু পাতা উল্টেই চলে।]

[তখন হুরি আবুর হাত থেকে বই নিয়ে বলে—]

হুরি      :           এই যে!

[বইয়ের খোলা পাতাটা দেখেই চমকে ওঠে। বইয়ের পাতায় পেনসিলে লেখা—ইংরেজিতে—আই লাভ ইউ! আবু বকর চোখ তুলে তাকায়। হুরি তাকিয়ে আছে।]

আবু     :           এগুলা কী! অ্যাঁ!

[হুরি একটু পরেই বই কেড়ে নিয়ে হাসতে হাসতে চলে যায়। আবু বকর বোকা হয়ে বসে থাকে। নেপথ্যে তার হতবিহ্বল মুখের ক্লোজআপের ওপর বর্ণনা।]

নেপথ্যে :         আবু বকর কিছু বুঝতে পারে না। যুবক বয়সে নারীর টান সে অকস্মাৎ অনুভব করে। কিন্তু ভয় হয়। যদি এ কথা হুরির বাবা মোল্লা সাহেবের কানে যায়, যদি তিনি এই অপরাধে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন! তাহলে? আশ্রয় সে হারাবে। তাহলে তার পড়াশোনার কী হবে! কিন্তু তার ভয়টা অকারণে। দুদিন পরেই সে টের পায়, সে যেমন পড়াশোনার স্বপ্ন দেখছে, মোল্লা সাহেবও স্বপ্ন দেখছেন তাকে নিয়ে।

 

দৃশ্য-২৬

[কলেজ থেকে বই-খাতা নিয়ে আবু বকর ফিরছে। মোল্লা তাকে পাকড়াও করে বাড়ির সম্মুখে।]

মোল্লা  :           বকর মিয়া, কলেজ হতে ফিরিলে?

আবু     :           জি।

মোল্লা  :           আইজ এত দেরি হইল যে, বকর মিয়া!

আবু     :           জি, লম্বা কেলাশ ছিল কয়েকটা।

মোল্লা  :           তাই কও! আমি দেখি মুখখান শুকনা কেনে! নাশতাটাশতা কিছু করো নাই?

[আবু চুপ করে থাকে।]

মোল্লা :           না, না, এইগুলান ভালো কথা নয়। না খায়া থাকিলে দেহ পড়ি যাইবে। তখন লেখাপড়া করিয়া চাকরিতে অফিসার নয়, হাসপাতালে যায়া রোগী হিসাবে ভর্তি!

[আবু আবছা হেসে ফেলে। মোল্লা তাকে ভেতরবাড়িতে নিয়ে যায় ডাকতে ডাকতে।]

মোল্লা  :           ওরে হুরি! হুরি! বকর চ্যাংড়াটা না খায়া আছে, নাশতার জোগাড় কর! আপেল ফল যে আনিছিলাম বাজার হতে, ওরে একখান কাটি দে, আর জিলাপি থাকিলে মুড়ি দিয়া।

 

দৃশ্য-২৭

[ভেতরবাড়িতে হুরি। সে বাবার ডাক শুনে তাকায়। বাবার শেষ কথাগুলো তার ওপরে ওভারল্যাপ। নেপথ্যে আবু বকরকে দেখে যেন তার মুখে আভা ফুটে ওঠে। তারপর সাড়া দেয়।]

হুরি      :           এই যাই!

 

দৃশ্য-২৮

[আবু বকর যে ঘরে থাকে, সেখানে এসে ঢোকে আবু বকর ও মোল্লা।]

মোল্লা :           বাবা হে, তোমাকে একখান কথা কই। নিজের বাড়ির মতো থাকিবে। কোনো শরম করিবে না। যখন যা দরকার চায়া নিবে। হুরিকে বলিবে। হুরি বড় টনেকা মাইয়া। হুরি আমাকেই দেখিয়া রাখে। তারে উপর আমার দিনের সমুদয় নির্ভর।

[আবু বকর খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে এ কথা শুনে।]

মোল্লা :           হুরির পড়া দেখিয়া দিচ্ছ কিছুদিন হতে, হুরি কি তোমাকে কিছু বলিছে? বলে নাই? ইস্কুলের রিপোর্টে তার এবার ত্রৈমাসিকে উন্নতি দেখা দিছে। ইস্কুলের কামিনীবাবু আমাকে বলিছে, হঠাৎ কী পরিবর্তন হয়া গেইলো হুরির, আমরা আচ্চয্য হয়া যাই। অঙ্কতে বাহাত্তর, ইংলিশে উনসত্তর, বাংলায় সাতাত্তর। এই রকম রেজাল্ট হইলে আর দিনে দিনে সে উন্নতি করিতে থাকিলে তার ফার্স্ট ডিভিশন ঠেকায় কে!

[হুরি নাশতা হাতে আসে। আপেল, মুড়ি, জিলাপি, চা।]

মোল্লা :           এই যে তোমার নাশতা আসি গেইছে। সবে তৈয়ার থাকে হামার বাড়িতে। খালি হাঁক দিয়া চায়া নিবে। খাও।

[বলে মোল্লা চলে যায়। হুরিও যাওয়ার জন্য এক পা বাড়িয়ে, ফিরে তাকিয়ে বলে—]

হুরি      :           খায়া দ্যাখেন তো, চায়ে চিনি কম হয় কি না।

[আবু বকর চায়ে চুমুক দিয়েই মুখ বিকৃত করে। চায়ে চিনির বদলে নুন। থু থু করে ফেলে না দিয়ে গেলে। হুরি খিলখিল করে হেসে উঠে চলে যায়। আবু বকর উদ্ভ্রান্ত হয়ে তাকিয়ে থাকে।]

 

দৃশ্য-২৯

[আবু বকরের গ্রামের বাড়ি। মা বসে আনাজ কুটছে। পাশে কিষান ছেলে সামু।]

সামু     :           আম্মা, ভাইজান আর কতকাল পড়িবে? পড়ার শ্যাষ নাই?

মা        :           এই আর এক-দেড় বচ্ছর। তার বাদে পাস হইবে তোর ভাইজান।

সামু     :           কতকাল বাড়ি আসে নাই। হামাদের কি ভুলি গেইছে?

মা        :           নয়, নয়, ভুলিবে ক্যানে? এইখানে তার জন্মনাড়ি পোঁতা। পড়ার চাপে অবসর নাই। আসিবে। শবেবরাতে আসিবে।

সামু     :           শবেবরাতের কয় দিন বাকি, আম্মা?

[নেপথ্যে ডাক শোনা যায় আবু বকরের।]

আবু     :           মা, মা।

[ডাক শুনেই মা চঞ্চল হয়ে পড়ে।]

মা        :           আরে! ওই যে! তোর ভাইজান!

[আবু বকর ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে।]

আবু     :           মা, মা, মাও গো!

মা        :           তোর কথায় হচ্ছিল, বাপ। সামু কয়, কবে আসিবে? আর সাথে সাথে তোর ডাক। তোর মুখখান যে শুকায়া গেছে, বাপ। টাউনে মোল্লার বাড়ি কি তোকে যত্ন করে না? খাবার ঠিকমতো দেয় না?

আবু     :           না, না, কী যে কও। তারা খুবে যত্ন করে। দুই বেলা খাওয়া। সকালে বিকালে নাশতা।

[বলতে বলতে আবু উঠে দাঁড়ায়। তার চোখেমুখে স্বপ্ন ফুটে ওঠে। সংগীতের সুরে মনটা ভরে যায়।]

 

দৃশ্য-৩০

[রাত। মা ঘরে আসে এক গ্লাস দুধ নিয়ে। আবু বকর শুয়ে আছে বিছানায়।]

আবু     :           আবার দুধ! এই তো ভাত খেলাম।

[মা হেসে বলে—]

মা        :           খেলাম! টাউনে যায়া তোর টাউনের মানুষের মতো ভাষা হইছে।

[আবু বকর হেসে ওঠে।]

আবু     :           বইসো, বইসো। দুধ পরে খাব। তোমাকে তার ছবি দেখাই। আমাকে দিয়া বলে, মাকে দেখাইয়ো।

[আবু দুধের গ্লাস নিয়ে পাশে রাখে। তারপর ব্যাগের ভেতর থেকে একটা ফটো বের করে। নিজে খানিকক্ষণ দ্যাখে। তারপর মায়ের হাতে দেয়। মা ছবিটা দ্যাখে। এবার আমরাও দেখি—হুরির ফটো। মা অনেকক্ষণ দ্যাখে। তারপর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে—]

মা        :           আমার কী সে ভাগ্য হইবে রে বকর! পরির মতো বউ কি আমার ঘরে আসিবে!

[মা-ছেলে দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।]

দৃশ্য-৩১

[মোল্লার বাড়ি। মোল্লা সিগারেট টানতে টানতে আসে আবু বকরের ঘরে।]

মোল্লা  :           কি, বকর মিয়া, জাগি আছ? রাইত তো বেশি হয় নাই।

[আবু বকর বই পড়ছিল চেয়ারে বসে। সে মোল্লাকে দেখেই বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়। মোল্লা আবুর বিছানায় বসতে বসতে বলে—]

মোল্লা  :           বইসো, বইসো। জীবনে সুখ নাই, বকর মিয়া। জীবন হতে সুখ উঠি গেইছে। মনের কথা কওয়ার মতো মানুষ জগৎ হতে উঠি গেইছে। তোমার কাছে দুই-একটা কথা কই। এককালে সুখ ছিল। বৈশাখের ঝড়িতে হুরির মাও যেদিন নদীতে তলেয়া গেল, মারা গেল, আমারও সুখ সে নিয়া গেল তারে সাথে। এখন নিজের সুখের কথা আর চিন্তা করি না। জীবন যা হোক চলিয়াই যাইবে। হুরির কথা চিন্তা করি। তার কি সুখ হইবে? বাপ হয়া তার সুখের তালাশ আমি বহুদিন করি নাই। থানার ঘরে চোরের মতো এখন নিজেকে আসামি বলিয়া বোধ হয়। কী কও?

আবু     :           জি।

[জানালার আড়ালে হুরি নিঃশব্দে এসে কান পাতে। সেটা আবু বা মোল্লা কারো চোখে পড়ে না।]

মোল্লা  :           মনটা বড় ছটফটায়। তাই আসিলোম তোমার কাছে। শিক্ষিত ব্যাটা তুমি। তোমার গোচরে দুনিয়ার কথা, বই-পুস্তকের কথা। তোমরাই বুঝিবে। হুরির মা মরি যাবার পরে আবার বিয়া করি। আইজের রাইতে হুরির সাথে তার নয়া মায়ের ঝগড়া হয়। দোষ হুরির নয়। দোষ তার নয়া মায়ের, এ কথা কইতেও আমার জবান আউলি যায়। হুরি কান্দিয়া একসার। কোন দিকে যাই? হুরি আর ছোট নয়। যদি একটা সম্বন্ধ হইলে হয়, বিয়া আর কি! তা হইলে নিশ্চিন্ত হইলাম হয়। মন দিয়া লেখাপড়া করো, বাবা। তোমার উপরে একটা মহব্বত পড়ি গেইছে হামার। আল্লা দেখি কোন দিকে নদীর সোঁত ঘুরায়! নেও, শুইয়া পড়ো। রাইত বড় অধিক হয়। যুবক মানুষ, রাত্রি জাগি থাকা ভালো নয়।

[এই কথা বলে মোল্লা হঠাৎ চলে যায়। আবু দাঁড়িয়েই থাকে ঘরে। হঠাৎ তার চোখ পড়ে জানালার দিকে। হুরি জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে। আবু জানালার কাছে এগিয়ে যায়। কোমল গলায় ডাকে—]

আবু     :           হুরি। হুরি।

[হুরি ধীরে মুখ ফেরায়। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। আবু বকর ইতস্তত করে। তারপর জানালার এপার থেকে হাত বাড়ায়। হুরির মুখখানা হাতের ভেতরে নিতে গিয়েও ভয় পায়। হুরি আশা করেছিল, তার মুখে আবু হাত রাখবে। যখন সে হাত ফিরিয়ে নেয়, হুরি তখন রাগ করে হঠাৎ দ্রুত চলে যায়। আবু গভীর চিন্তা করে।]

 

দৃশ্য-৩২

[মোল্লার বাড়ি। আবু বকর শুয়ে আছে বিছানায়। জ্বর। চোখ বুজে আছে সে। জানালা দিয়ে উঁকি দেয় হুরি। করুণ মুখ তার। তাকিয়ে দ্যাখে বিছানার পাশে ছোট টেবিলের ওপর বার্লির বাটি পড়ে আছে। তখন হুরি চলে যায়। তখন কী একটা শব্দ হয়। জেগে ওঠে আবু। উঠে বসে। কী ভাবে। তারপর টালমাটাল পায়ে উঠে স্যুটকেস খোলে। স্যুটকেসের ভেতরে অনেক বই। সব মুক্তিযুদ্ধের ওপরে লেখা বই। আবু বকর একটা বই পছন্দ করে বিছানায় আসে। জ্বরের ঘোলাটে চোখে বই পড়তে থাকে। নেপথ্য কণ্ঠে বর্ণনা।]

নেপথ্য কণ্ঠ : আবু বকরের জ্বর আজ তিন দিন থেকে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনেক বই সে এখন পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কিনেছে। তার স্যুটকেস ভরে গেছে। বই পড়ে। বইয়ের পাতায় লেখা মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি যেন জীবন্ত হয়ে তার চোখে ভেসে ওঠে। জ্বরের তাড়সে বিছানায় পড়ে ছিল আবু বকর। কাজের বুড়ি বেটি বার্লি দিয়ে গিয়েছিল। এখনো পড়ে আছে পাশে। গলার ভেতরে দারুণ পিপাসা। আবু বকরের মনে হয়, পানি নয়, একটু লেবুর শরবত পেলে বুঝি আরাম হতো। কী আশ্চর্য, সেই মুহূর্তেই কাজের বুড়ি বেটি গ্লাস নিয়ে হাজির হয়।

[কাজের বুড়ি ঘরে আসে শরবত হাতে। আবুর লাল চোখ দেখেই সে বলে ওঠে—]

বুড়ি     :           মাস্টারসাব, আহ্হা! জ্বর দেখি নামে নাই। জায়গিরবাড়ি থাকেন। বিদাশ-বিভুঁই। কত কষ্ট তোমার। নেও, খাও, খায়া নেও। লেবু মিছরির শরবত করি দিছে হুরি।

আবু     :           কে?

বুড়ি     :           আর কে! যার জান পোড়ায়। হুরি আমাকে পাঠেয়া কইলে, বার্লি তো খায় নাই, পড়িয়াই আছে, এই শরবত ধরি দেও। শরবত খাইলে বিছানায় উঠি বসিতে পারিবে।

[আবু শরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে এক চুমুকে শেষ করে।]

আবু     :           মাও গো, জ্বর আর নাই। বাড়ির ভিতরে যায়া কন, এখন আমি সুস্থ। রাইতে আর কিছু খাব না। রাইতটা লঙ্ঘন দিয়া ভোরে দুটা ভাত যদি হয়!

বুড়ি     :           আচ্ছা, হুরিকে বলিব।

[বুড়ি যাওয়ার পর বকর অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে—]

আবু     :           হুরি!

 

দৃশ্য-৩৩

[রাত হয়ে গেছে। লণ্ঠন জ্বলছে। আবু তার বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। মোল্লা দুধের বাটি আর খই নিয়ে আসে ঘরে। আবুকে ঘুমাতে দেখে মোল্লা নিঃশব্দে তার পাশের টেবিলে দুধ ও খই নামিয়ে রাখে। তারপর আলগোছে আবুর কপালে হাত দিয়ে দ্যাখে। জ্বর অনেক কম দেখে নিশ্চিন্ত হয়। তারপর মৃদু স্বরে ডাকে—]

মোল্লা  :           মাস্টার, ও মাস্টার! বকর! বকর মিয়া।

[আবু মিয়া ধড়মড় করে উঠে বসে।]

আবু     :           আপনি!

মোল্লা  :           হ্যাঁ, আমি, আমি। কী করি! কইতে গেলে তুমি এখন আমার পর মানুষ তো না! বুড়ি বেটি কইল রাইত নাকি লঙ্ঘন দিবা। না, না! কিছু তো মুখে দিবারই হয়। খই মুড়ি—ভালো পথ্য। খাও। হুরি বলিল, পরের ছাওয়া বাড়িতে না খায়া থাকিবে! হুরির জিদ তো জানোই। খায়া নেও।

[আবু উঠে বসে খই দুধ হাতে নেয়। মোল্লা তার বিছানার প্রান্তে বসে। আবু খেতে থাকে। হঠাৎ মোল্লার চোখে পড়ে বিছানার ওপর বই। মুক্তিযুদ্ধের ওপর বই। ক্লোজআপে মলাট দেখা যায়। মোল্লা চমকে ওঠে।]

মোল্লা  :           আহ্! কী বই! কী বই! এগুলা কী বই!

আবু     :           মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এই অঞ্চলে, আমাদের এই মান্দারবাড়ি, বুড়িরহাট, জলেশ্বরীতে যে যুদ্ধ হয়, তারে বই।

[মোল্লা উত্তেজিত ক্রুদ্ধ স্বরে বলে—]

মোল্লা  :           যুদ্ধ! সেই যুদ্ধের কথা আবার! সেসব কবে নিকাশ হয়া গেইছে। আবার কেনে? আঁ?

আবু     :           নিকাশ তো হয় নাই, মোল্লা চাচা। শত্রু এখনো আছে।

মোল্লা  :           তার মানে আবার যুদ্ধ! না। না। না।

[মোল্লা অনেকক্ষণ আবুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে—]

মোল্লা  :           মনে কিছু না করো। একখান কথা ভালো করি শুনি রাখো। আমি কন্ট্রাক্টর মানুষ। কাজের ধান্দায় পাঁচ অফিসে যাওয়া লাগে। দশজনের সাথে ওঠাবসা করিতে হয়। এই সব যুদ্ধটুদ্ধ শুনিলে তারা কী বা মনে করে। আমার ব্যবসা ফেল হয়া যাবার পারে। তোমাকে নিয়া আমার অনেক ইচ্ছা। তোমার কথা মনে করিয়া আমি একটা লোনের দরখাস্ত করছি ব্যাংকে। একটা কোল্ড স্টোরেজ দেব। তোমাকে সেখানে বসাব। কিন্তু সে পথে এখন দেখি বাধা তুমিই দিতাছ। আমার বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ আনিও না। যদি জিদ করো, তবে তোমার বিষয়ে আমার মন ঘুরিয়া যাইতে পারে। নিজের হাতে নিজের পায়ে কুড়াল মারিও না।

 

দৃশ্য ৩৪

[মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটা প্রামাণ্য দৃশ্য দেখা যায়। একাত্তরে রাজাকারদের মিটিংয়ের ছবি। একাত্তরে রাজাকারদের লিফলেট। একাত্তরে রাজাকারদের বিষয়ে সংবাদপত্রের কাটিং।]

 

দৃশ্য ৩৫

[মোল্লার বাড়ি। আবু বকর কলেজ থেকে ফিরে ঘরে ঢোকে। বই-খাতা রাখে। এমন সময় বন্ধ জানালায় টোকা। টোকার পর টোকা।]

আবু     :           আরে কে? কে ধাক্কায়?

[জানালাটা খোলে আবু। জানালার খিল নেই, দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। খুলতে সময় লাগে। খোলা জানালায় মুখ রেখে হুরি দাপটের সঙ্গে বলে—]

হুরি      :           খুলিতে এতক্ষণ লাগে!

[আবু বকর সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তার চেহারা দেখে হুরি হেসে ফেলে।]

হুরি      :           ডরাইছেন, মাস্টার?

আবু     :           না, না।

[হুরি ঘরের ভেতরে এসে বলে—]

হুরি      :           তবে ঘামিছেন কেন?

আবু     :           আরে কোথায় ঘামছি!

হুরি      :           চোখেই দেখি! নাকি বাপজানের কথায় এখনো ভয়ে আছেন?

আবু     :           কোন কথা?

হুরি      :           মুক্তিযুদ্ধের বই! বাপজান ধমক দেয় নাই?

আবু     :           না। হ্যাঁ। না। আমি কিছু মনে করি নাই, হুরি। অনেকেই ভয় পায়। ভুলে যেতে চায়। দূরে সরিয়ে রাখতে চায় আসল ইতিহাস।

[হুরি হাসতেই থাকে। কী হলো হুরির—আবু ভাবে।]

আবু     :           কোনো কথা আছে, হুরি?

হুরি      :           না, কথা নাই। কেবল এইটা কন, আপনার বাড়ি তো হস্তিবাড়ী?

আবু     :           হ্যাঁ, হস্তিবাড়ী। কেন?

হুরি      :           হস্তিবাড়ীতে শহীদ টিটু রোড আছে না?

আবু     :           আছে। আমার বাড়ি থেকে মেইন রোড। সেই রোডের নাম শহীদ টিটু রোড।

হুরি      :           জানেন মাস্টার, আমার ছোট খালুর ডাকনাম টিটু। ভালো নাম আনসার শেখ। ডাকনামেই পরিচিতি। পাকিস্তানিরা একাত্তরের কালে তাকে গুলি করে। খালু দলবল নিয়া বাধা দিছিল তো! যুদ্ধ হয়, মাস্টার। সেই যুদ্ধে শহীদ হয় টিটু খালু।

[আবু বকর অবাক হয়ে যায় এ তথ্য শুনে। সে হুরির দিকে আকৃষ্ট বোধ করে।]

আবু     :           মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়িবে, হুরি? আমার কাছে কিছু বই আছে।

হুরি      :           নাহ্। যদি গল্পের বই থাকে দ্যান। মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনিলে আমার গাও কাঁপি ওঠে। উঠানের বিষ্টি পিছল—রক্ত পিছল বলি মনে হয়!

আবু     :           মনে হয়? আমারও মনে হয়। আমারও মনে হয়, এই দেশের মাটি শহীদের রক্তে এখনো ভিজে আছে। কাল আমার বিএ পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবে। দেখি রেজাল্ট কেমন হয়। আশা তো—সেকেন্ড ডিভিশন পাবই পাব।

[হুরি চলে যেতে যেতে বলে—]

হুরি      :           এত বই পড়েন—সেকেন্ড কেনে—ফার্স্ট ডিভিশন পাইবেন।

আবু     :           তোমার কথাই যেন সত্যি হয়, হুরি।

 

দৃশ্য ৩৬

[জলেশ্বরী কলেজ। অনেক ছাত্র ভিড় করে এসেছে রেজাল্ট জানতে। একজন শিক্ষক বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাগজ হাতে রেজাল্ট ঘোষণা করছেন। পাস করেছে শুনে কেউ খুশিতে লাফ দিয়ে ওঠে। কেউ ফেল করেছে শুনে মাথা নিচু করে চলে যায়।]

শিক্ষক :           মোহাম্মদ আবু বকর।

[আবু আগ্রহভরে হাত তোলে।]

আবু     :           স্যার!

শিক্ষক :           ফেল! ফেল!

[আবুর সমুখে যেন জগৎ ভেঙে পড়ে।]

 

দৃশ্য ৩৭

[ব্যাংকের ম্যানেজারের চেম্বারে মোল্লা।]

ম্যানেজার :    না, আপনার লোন স্যাংশন করা যাবে না। অসুবিধা আছে। অনেক অসুবিধা। আপনার বাড়িতেই নাকি জয় বাংলার লোক। আমি আপনাদের এলাকার এখন যে নেতা, তার বিরুদ্ধে যেতে পারব না। আমারও চাকরি! উনার মত নাই আপনাকে লোন দেওয়া।

[মোল্লা হতভম্ব হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে তার চোখ ছোট হয়ে আসে। তার মনে পড়ে আবুর কথা। তার জন্যই এ দুর্ঘটনা।]

 

দৃশ্য ৩৮

[মোল্লার বাড়ি। আবু বকর উদ্ভ্রান্তের মতো আসে। হুরি দাঁড়িয়ে ছিল আগ্রহ নিয়ে পরীক্ষার ফল শুনবে। আবু তাকে দেখেই মাথা নাড়ে দ্রুত, তারপর মুখ নিচু করে নিজের ঘরে গিয়ে ঢোকে। হুরির মুখের হাসি নিভে যায়।]

 

দৃশ্য ৩৯

[আবু বকর তার ঘরে এসে বিছানার ওপর বসে পড়ে। মাথায় হাত দিয়ে সে বসে থাকে। হঠাৎ শব্দ পেয়ে মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে চোখ তুলে আবু দেখে সমুখে দাঁড়িয়ে মোল্লা। সে ত্রস্ত পায়ে উঠে দাঁড়ায়। মোল্লা তাকে হাতের ইশারায় বসতে বলে। নীরবে মোল্লা আজ আবু বকরের টেবিলের সমুখে হাতাভাঙা চেয়ারে বসে স্থির দৃষ্টিতে আবু বকরের দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেকক্ষণ পরে মোল্লা মুখ খোলে।]

মোল্লা :           রাগঝাল আমার স্বভাবে নাই। ঠাণ্ডা মাথায় কয়টা কথা বলি। তোমার খবর আমি বিকালেই পাই।

আবু     :           জি।

মোল্লা :           কলেজের পরীক্ষায় একবার ফেল করিলে আবার পরীক্ষা দেওয়া যায়। পাসও করা যায় আবার চেষ্টা করিলে। কিন্তু জীবনের কোনো কোনো অবতারণা আছে, একবার ফেল করিলে আর পাস নাই। 

আবু     :           জি।

[আবু বকর বুঝতে পারে না কথা কোন দিকে এগোচ্ছে। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।]

মোল্লা  :           আমার আশা ছিল অনেক দূর। তুমি পাস করিবে। না, না, পাস করিয়া চাকরি ধরিবে, সে আশা আমি করি নাই। তোমার জন্য সে পথও আমি চিন্তা করি নাই। আশা ছিল, পাস করিলে সম্মান হইবে। লোকে বলিবে বিএ পাস। আমাকেও বলিবে জামাই তোমার বিএ পাস। সে কথায় এখন ছাই পড়িল।

[আবু অবাক হয়ে যায় স্পষ্ট তাকে জামাই বলা শুনে।]

মোল্লা  :           তার পরে রহিল ব্যবসার কথা। আমার ব্যবসা দিনে দিনে বাড়িয়াই চলিছে। আশা ছিল বিএ পাস করিয়া সেই ব্যবসা কোনো একটা বুঝিয়া নিবে। এইটাই আমার হিসাব ছিল। ইচ্ছা ছিল হুরিকে সম্মানের সাথে বিয়া দিয়া ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়-সম্পত্তি দিয়া সুখের ঘর বান্ধিয়া দেওয়া হউক। তবে যদি কও, সে ইচ্ছায় বাধা কিসের? তা-ও ভাঙ্গিয়া কই। তোমার নিজের মতপথ!

[মোল্লা কথা বন্ধ করে। আবু বকর চোখ তুলে দেখে সে তারই দিকে তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে। বাইরে পথের ওপর কোনো কুকুর ঘেউঘেউ করে ডেকে ওঠে। পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে মোল্লা ধীরগতিতে একটা শলাকা ধরায়। এরপর হাতের মুঠিতে শলাটা নিয়ে কষে টান দেয়। আবু বকর কলসি থেকে পানি ঢেলে তার সমুখে ধরে। মোল্লা হাত দিয়ে গ্লাসটি সরিয়ে দিয়ে বলে—]

মোল্লা :           আমি ঠিক আছি! তবে তুমি ঠিক নাই! বিষয়টা আগেই আমার হিসাব করা উচিত ছিল। কিন্তু ছেলেমানুষ যুবকের খেয়াল, ঢলের আনন্দে মাতামাতি বলিয়াই এতকাল মনে করি। আমি তোমার মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে পাগলামির কথা কই।

আবু     :           মুক্তিযুদ্ধ! আমার পাস-ফেলের সাথে মুক্তিযুদ্ধের কী সম্পর্ক?

[জানালার ওপারে হুরি এসে দাঁড়ায়। মলিন মুখ তার।]

মোল্লা  :           সংক্ষেপেই সারি। কোল্ড স্টোরেজের কারবারটা তোমার হাতেই দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। ব্যাংকে লোনের জন্য তদবির করি। ব্যাংক ম্যানেজারও জানে কোল্ড স্টোরেজ হুরি আর হুরির জামাইয়ের ভাগেই হইবে। কিছুদিন হয় এই তদবিরের ফল দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা হয়। তিন কোটি টাকার লোনও প্রায় স্যাংশনই বলা যায়। এর মধ্যে তুমিও আইজ ফেল করিলে, আমিও এক খবর পাইলাম। মুক্তিযুদ্ধ নিয়া বেশি ফালাফালির কারণে তোমার সংস্রব থাকিলে লোন স্যাংশন হবার নয়! দলের স্থানীয় নেতারা এ বিষয়ে আমাকে আইজের দিনেও ডাকে। ডাকিয়া তারা পষ্টই বলি দেয়, কোল্ড স্টোরেজে তোমাকে রাখা দূরে থাউক, তোমাকে বাড়িতেই রাখা আর নয়। সালাম-আদাব করি তোমাকে নগদে বিদায় দিলেই ভালো। তুমি কি আমার ভালো চাও না?

আবু     :           চাই!

মোল্লা :           চাও?

আবু     :           তবে একটা কথা আমার। আমি রাজনীতি করি না। দলও করি না। কোনো মিছিল-মিটিংয়ে নাই। তবে বই পড়ি। মুক্তিযুদ্ধের বই নিয়া আমার খুব আগ্রহ আছে। কষ্ট করিয়া বই কিনি। নিজে পড়ি। অন্যকেও পড়াই। আওয়ামী লীগ অফিসে যায়া আলাপসালাপ করি। এইটা এমন কোন অন্যায় হইল যে নেতারা আপনাকে ডাকিয়া আপনার ভালো-মন্দর এত বড় শাসন করিল?

মোল্লা  :           ওইখানেই তো গলদ। রাজনীতি করো না! রাজনীতির অফিসে যাও। রাজাকারের বিচার দাবি করো। পুরান কথা নিয়া নাড়াচাড়া করো। যাউক সেসব কথা। পরিষ্কার কথা আমার। যদি বা আবার পরীক্ষা দিবার চাও তবে আমার আশা আর না করো। এ বাড়িতে আর তোমাকে রাখা আমার সম্ভব নয়। কোল্ড স্টোরেজ আমার কাছে বড় নয়। তবে হুরির কথা চিন্তা করি। তার সঙ্গে এমন মানুষের সম্পর্ক কখনোই হবার নয়, যার কথা শুনিলেই ব্যাংকের লোন অনিশ্চিত হয়া পড়ে। কাইল সকালের বেলা গরম ভাতটাত খায়া বাকসো-বিছানা নিয়া বাড়ি হতে বিদায় হও, এইটাই আমার সারকথা। এরে জন্য অসুস্থ শরীরে এতক্ষণ জাগিয়া ছিলোম। যাই।

[মোল্লা চলে যায়। আবু বকর হতভম্ব হয়ে বসে থাকে। পানির যে গ্লাসটি মোল্লা তখন ফিরিয়ে দিয়েছিল, আবু সেই গ্লাসটি হাতে নিয়ে এক ঢোকে সবটা পান করে। এতটা খিদে আর এতটা পানি, দুই মিলে অকস্মাৎ পেটের ভেতরে তীব্র ব্যথা ওঠে। আবু বকর বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে।]

 

দৃশ্য ৪০

[মায়ের বাড়ি। মা নামাজ পড়ে উঠে সামুকে বলে—]

মা        :           হ্যাঁরে, তোর ভাইজান যে এখনো না আসে। আইজ তার পরীক্ষার ফল হইবে। সেমাই পাক করি রাখছি। কখন বা তার মুখে দেমো খোশখবর শুনিয়া।

সামু     :           আইসবে, আম্মা। আইসবে। পাস করার আনন্দে দোস্তদের নিয়া তাঁই দ্যাখো ফুর্তি করিছে। সনঝার বাসেই আসি পড়িবে।

মা        :           বাপোরে, তুই বাস ইস্ট্যান্ডে যায়া পথ দ্যাখ না কেনে?

সামু     :           ভাইজান কি আর পথ চেনে না? ঠিকে আইসবে। মোর এলায় দুধ দোয়া বাকি আছে, আম্মা।

 

দৃশ্য ৪১

[মোল্লার বাড়ি। আবু বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে। রাত নিশুতি। কুকুর ডাকে। আকাশে ক্ষীণ চাঁদ ভাসে। আবুর ঘরে হুরি চোরের মতো আসে। আবু বকরকে ঠেলা দেয় আলতো করে। ধড়মড় করে উঠে বসে আবু বকর। হুরি তার মুখের ওপর আঙুল চাপা দিয়ে বলে—]

হুরি      :           আওয়াজ না করো। চোরের মতো আসছি। কেউ জাগিয়া না ওঠে।

[আবু বকর তার ঠোঁটের ওপর হুরির চাপা হাতখানা হাত দিয়ে চেপে ধরে।]

আবু     :           হুরি, এত পড়িলাম রে, তবু পাস না হইল। কত কী ভাবিছিলাম, সব মিছা হয়া গেইল। নাও ভিড়িয়াও ভিড়িল না রে। তোমার বাবা কয়, জীবন এক নদীর সোঁত। সেই সোঁত আমার পাশ ফিরিল রে। আমাকে শুকনা ডাঙায় ফেলিয়া সোঁত এখন দূরে চলি যায়।

হুরি      :           দুঃখ না করো।

[এই কথা বলে হুরি চেয়ারে বসে। আবু ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।]

হুরি      :           আহ্, ছি ছি, বেটাছেলে আবার কান্দে!

[এই বলে হুরি হেসে ওঠে। কিন্তু সে হাসিতে কান্না।]

হুরি :               গল্পের বই আপনার কাছে নিয়া কত পড়ছি। কলেজের লাইব্রেরিতেও গল্পের কত বই আছে। সেই বইয়ের নায়িকারা কতই না সাহসী। তারা নিজ ইচ্ছায় চলেফেরে।  ভালোবাসায় বাধা আসিলে বাধাকে তারা ভাঙিয়া দেয়। মিলন হয়। বাপে-মায়ে কী আপত্তি করিল না করিল, সমুদয় ভাসিয়া যায় তাদের ইচ্ছার কাছে। তাদের ইচ্ছাও আছে, শক্তিও আছে। আমার ইচ্ছা যদিও বা থাকে, শক্তি নাই, মাস্টার। যদি আপনি মনে করেন বাপের যা কথা আমারও সেই কথা, তবে তা নয়। তার জন্য এত নিশুত রাইতের কালে এত সাহস ধরি এইভাবে আপনার কাছে আসি।

আবু     :           তবে যে আসিলে, কেন আসিলে?

হুরি      :           হায়, মাস্টার। বুঝিয়াও না বোঝেন। তবে আসিলাম কেনে? আমার ক্ষমতা নাই আপনার জীবনের জন্য কিছু করিবার। পরাধীন পরনির্ভর নারী। তার জন্ম হয় এই অভিশাপ নিয়া। সেই অভিশাপ মাথায় নিয়া আমি নিশ্চল। আমার হাত নাই, পাও নাই। ইচ্ছা আছে, শক্তি নাই। মা নাই আমার। মা যার নাই, তার শক্তিও নাই। আমার জীবনের ওপর আমার নিজস্ব হাত নাই। বাসনা নাই। এই তিন বচ্ছরে যত বা তেজ আমার দেখেন আপনি, চুলার অগ্নির তেজ তো নয়, জোনাকির ঠাণ্ডা আগুন। আইজের বিকালে বাবা যখন সিদ্ধান্ত করিলে আপনাকে আর রাখা নয়, তখন প্রতিবাদ করিতেই তিনি কইলে, এই মাসেই বিয়া দেব তোর। আমি জানি কার সাথে দিবে। দিবে ওই বশার উকিলের ব্যাটার সাথে। কালা চশমা চোখে। জিন্সের প্যান্ট পরে। তার সাথে আমার বিয়া হইলে তিন কোটি টাকার লোন চক্ষের পলকে পাস হয়া যাইবে।

[আবু বকর চঞ্চল হয়ে পড়ে। সে হুরির হাত ধরে। এই প্রথম। হাত ধরে নিজের দিকে হুরিকে টানে, পরক্ষণেই তাকে ঠেলা দিয়ে পায়ের ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়।]

আবু     :           যাও, যাও। বিপদ হইতে কতক্ষণ!

হুরি      :           ইচ্ছা আপনার আছে, শক্তি কি নাই?

আবু     :           হুরি, পাগলামি না করো। ঘরে যাও।

হুরি      :           যাব। ঘরেই যাব, মাস্টার। আপনারও এ বাড়ি থেকে চলি যাওয়া ছাড়া উপায় নাই। যাবার আগে একখান বই দিয়া যান। সেই যে একখান বই আমাকে পড়বার জন্য বলিছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের বই।

আবু     :           হুরি, তোমার খালু টিটুর মতো কত মানুষ যুদ্ধে দিছে জীবন। তাদের কথা আছে এমন একটা বই রেখে যাব। কাইলের দিনে সূর্য উঠিবার আগেই তো বিদায় নিব। বইখানা বালিশের নিচ হতে তুলি নিয়ো তুমি।

[হুরির হাত ধরে থাকে আবু বকর। কিছুক্ষণ পরে হুরি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে চলে যায়।]

 

দৃশ্য ৪২

[ভোরবেলা। জলেশ্বরী শহরের আকাশে ফজরের আজানের ধ্বনি। মফস্বল শহরে ভোর কেমন করে আসে, কয়েকটি শটে সেই দৃশ্য রচনা করা যেতে পারে। বাজারে দোকানপাটের দেয়ালে লেখন দেখানো যেতে পারে—‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই’। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় কার্যকর করো’। দেখানো যেতে পারে পুলিশ লাইনে বিউগল বাজিয়ে জাতীয় পতাকা তোলা হচ্ছে।]

 

দৃশ্য ৪৩

[মোল্লার বাড়ি। আবু বকর তার ঘরে। বিছানার ওপর জামাকাপড়। গোছাচ্ছে। পাশে খোলা স্যুটকেস। আরেক পাশে মুক্তিযুদ্ধের ওপর ৫০-৬০টা বই। সে দেখতে থাকে। নিচে নেপথ্য বর্ণনার সময় যখন হুরির প্রসঙ্গ আসবে, তখন দেখা যাবে আবু বকর খাতার ভাঁজ থেকে হুরির ফটো বের করে দেখছে। নেপথ্যে বর্ণনা—]

নেপথ্য কণ্ঠ : আবু বকর আজ টাউনে তার জায়গিরবাড়ি মোল্লা সাহেবের বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বিএ ফেল করার পর সে দেশের বাড়ি যাচ্ছে। মোল্লা সাহেব তাঁর মেয়ে হুরিকে আবু বকরের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যুবক, মোল্লা সাহেব তাকে জামাই করতে যাচ্ছেন, এটা জানার পর—ব্যবসার জন্য তিনি ব্যাংকে যে তিন কোটি টাকা লোন চেয়েছিলেন, তা খারিজ হয়ে যায়। তিনি আবু বকরকে ভোরে সূর্য ওঠার আগেই চিরদিনের মতো তাঁর বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন।

[স্যুটকেসে জামাকাপড় ভরে নেওয়ার পর আবু বকর একটা বই আলাদা রেখে বাকি বইগুলো দড়ি দিয়ে বাঁধে। আলাদা বইটা সে এবার হাতে নেয়। তার ওপরে গত রাতের হুরির কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।]

হুরি      :           যাব। ঘরেই যাব, মাস্টার। আপনারও এ বাড়ি থেকে চলি যাওয়া ছাড়া উপায় নাই। যাবার আগে একখান বই দিয়া যান। সেই যে একখান বই আমাকে পড়বার জন্য বলিছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের বই।

[আবু বকর বইটার পাতার ভেতরে হুরির ছবিটা রাখে। রাখতে রাখতে আপন মনেই বলে—]

আবু     :           হুরি, তোমার বিবাহ ঠিক। তোমার বর হবে। তোমার ফটো আমার রাখা অন্যায়।

[ফটোসহ বইটা সে রেখে দেয় বালিশের নিচে। তারপর বইয়ের বস্তা ঘাড়ে করে, স্যুটকেস হাতে বের হয়ে যায়।]

 

দৃশ্য ৪৪

[আবু বাড়ি থেকে বেরিয়ে পথে ওঠার আগে একবার পেছন ফিরে তাকায়। হুরিকে যদি একবার দেখা যায়। বাড়ি নিস্তব্ধ। কেউ কোথাও নেই। আবু বকর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রওনা হয়। কাক ডেকে ওঠে কা কা করে।]

 

দৃশ্য ৪৫

[বিছানায় শুয়ে ছিল হুরি। তার ওপরে কাকের কা কা ডাক ওভারল্যাপ করে। সে ধড়মড় করে জেগে ওঠে। একটু পরেই মনে পড়ে যায় তার—এখন আবু বকরের চলে যাওয়ার সময়। সে মুখে ওড়না গুঁজে বসে থাকে।]

 

দৃশ্য ৪৬

[দ্রুত ধাবমান সড়কের ওপর শট। পরের শটে দেখা যায়, বাসে আবু বকর। বাস চলছে। নানা রকমের যাত্রী। কন্ডাক্টর ভাড়া নিতে এসে জিজ্ঞেস করে—]

কন্ডাক্টর          :           বকর ভাই! ছুটিতে বাড়ি যান?

আবু     :           না।

কন্ডাক্টর          :           বাড়িতে কোনো বিপদের সম্বাদ পায়া কি?

আবু     :           না। টাউন ছাড়ি দিলাম। এখন হতে গেরামে। হস্তিবাড়ীতে।

কন্ডাক্টর          :           কন কী? টাউন ছাড়িয়া গেরামে? মন বসিবে?

আবু     :           কেনে না বসিবে? হস্তিবাড়ীর মাটি কি মাটি নয়?

[কথা বলতে বলতে আবু বকর ভাড়া দেয়, খুচরা ফেরত নেয়। কন্ডাক্টর এগিয়ে যায় অন্য যাত্রীর ভাড়া নিতে। আবার ধাবমান পিচ রাস্তার ছবি। বাস চলছে।]

 

দৃশ্য ৪৭

[বাস এসে আবু বকরের বাড়ির রাস্তার মাথায় থামে। পাশেই বিরাট একটা গাছ। তার পাশে অনেকটা ফাঁকা। একদিন এখানেই আবু বকর তার টংঘরের মনিহারি দোকান দেবে। এখন অবশ্য জায়গাটা ফাঁকাই। এখানে বাস থামে। সেই সঙ্গে বাসের চাকাও পাংচার হয়ে যায় বিকট শব্দ করে। যাত্রীরা সব নেমে পড়ে। আবু কাকগুলোকে লক্ষ করে বলে—]

আবু     :           এ তো ভালো জ্বালা হইল। জলেশ্বরী হতে কাক হামার পিছু নিছে। সেইখানেও কা কা, বাড়ির কাছে আসিয়াও কা কা।

[একজন যাত্রী সেটা শুনে আমড়াগাছি গলায় বলে—]

যাত্রী    :           মানেন না মানেন, এ হামার জীবনে পরীক্ষিত— কাকের ডাক। শনির ডাক। বড় কুলক্ষণ।

[আবু যাত্রীটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ক্ষিপ্ত গলায় বলে—]

আবু     :           কাকের ডাক? হামার কচু করিবে!

[বাস ড্রাইভার চাকা বদলাচ্ছে। যাত্রীরা সাহায্য করছে। কোনো কোনো যাত্রী রাস্তার অপারে গিয়ে প্রস্রাব করছে। কিছু যাত্রী পান-সিগারেট-চায়ের খোঁজ করছে।]

যাত্রী ১             :           শালার এমন জায়গায় বাস খারাপ হইল, এলা পান পামো কোনঠে?

যাত্রী ২             :           মোর তো চায়ের নিশা ধরিছে।

[আরো কিছু যাত্রীর একই কথা। কোথাও দোকান নেই। আবু বকর তাদের কথাবার্তা খানিক শোনে। তারপর সড়ক থেকে তার বাড়ির দিকে চলে যায়।]

 

দৃশ্য ৪৮

[আবু বকরের ঘরে চোরের মতো আসে হুরি। ঘর ফাঁকা। আলনা ফাঁকা। টেবিল ফাঁকা। বালিশের নিচে একটু বেরিয়ে আছে বই। বইটা সে হাতে নেয়। বইয়ের ভেতর থেকে তার ফটোটা মাটিতে পড়ে যায়।  হুরি তাকিয়ে থাকে। হুরি ফটোটা তোলে। তারপর কুটি কুটি করে ছেঁড়ে। হুরি চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ে।]

 

দৃশ্য ৪৯

[মায়ের বাড়ি। এখন রাত। আবু বকর তার নিজের ঘরে নিজের বিছানায় শুয়ে। পাশে লণ্ঠন জ্বলছে। বইয়ের সেই দড়ি বাঁধা মোট পড়ে আছে মেঝের ওপর। মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে আবু বকরের।]

মা        :           বাবা, তবে তুই আর পড়বি না? আমার যে কত আশা ছিল।

[আবু বকর চুপ করে থাকে।]

মা        :           সেই যে ফটোখানা দেখাইছিলি রে, বকর! চোখ হতে মোছে নাই সে ছবি!

আবু     :           আমার চোখ হতে তো মুছিয়া গেছে। তবে তোমার চোখে কেন ছবি? মনে করো পত্রিকায় দেখিছ ছবি। পত্রিকায় কত রঙের কত ঢঙের যুবতির ছবি ছাপা হয়। তারে একখান ছবি না হয় দেখাইছিলাম তোমাকে। সেই মনে করিয়া সান্ত্বনা ধরো মনে, মাও গো!

[আবার খানিকক্ষণ চুপচাপ দুজনই।]

মা        :           তবে তুই বিদাশ যাবার চেষ্টা কর। তোরে বড় ভাই আলম-কালাম লক্ষ টাকা আয় করে বিদাশের চাকরিতে। জমিজমা করিচ্ছে তারা। বাড়ি তুলিচ্ছে। তুইও তাদের রাস্তা ধর। তাদের কাছে চিঠি লেখিয়া পায়ে ধর। বড় ভাইদের পাও ধরিতে লজ্জা নাই। লিখি দে, তোমরা আমার যাবার বন্দোবস্ত করো।

[আবু বকর শক্ত গলায় বলে—]

আবু     :           না! যে টাকা মানুষকে অমানুষ করে, সেই টাকায় আমার কোনো আকাঙ্ক্ষা নাই। আলম ভাই আর কালাম ভাইয়ের নাম আমার সমুখে উচ্চারণ করিয়ো না। তারাও যেমন, তাদের বউও তেমন। হাসনা আর জোছনা। জোড়ায় জোড়ায় মিল। নামেও, স্বভাবেও। একবারও আসে তারা? তোমার দুই ব্যাটাও বিদাশ গেইছে, তারাও বাপের বাড়ি গেইছে।

মা        :           ও কথা মনে করিলে পরান ফাটি যায়।

আবু     :           আমার এই ভালো। মা, তুমি আছ, তুমি ভালো। বাপ-দাদার এই ভিটা আছে, এর চেয়ে ভালো আর কোনঠে? আমার এই হস্তিবাড়ী ভালো। কও মা, আর কোন গ্রাম আছে, যার বুক চিরিয়া চলিয়া গেছে শহীদ টিটু রোডের মতো সড়ক?

মা        :           তবে তুই খাবি কী করিয়া? মাঠে মাটির ঢেলা তো আর তুই ভাঙিতে পারবি না। আর জমিই বা কতটুকু? মাত্রই তিন-সাড়ে তিন বিঘা!

আবু     :           মা, শোনো, মাটির মূল্য মাপে নয়, মাটির মূল্য মাটির গুণে। তা সে কথা বাদ দেও। কামলা-কিষান জমিজমা যেমন চাষ করিচ্ছে করুক। গাভি দেউক দুধ। সামু আছে, দুইবে, বাজারে বিক্রি করিবে। মায়ে-ব্যাটায় খুব চলিয়া যাবে।

[আবু এবার উঠে বসে। মায়ের মুখোমুখি হয়।]

আবু     :           মানুষ বড় অমানুষ হয়া গেইছে, মা, চতুর্দিকে। দুনিয়া দাবড়ি বেড়াবার দরকার নাই আমার। মনে মনে ভাবিছি, মাও গো, দোকান দেব একখান।

[মা অবাক হয়ে যায় ছেলের কথা শুনে।]

মা        :           দোকান! বাপো-দাদা কোনোকালে দোকান করে নাই, দোকানের তুই কী বুঝিস?

আবু     :           বাস থেকিয়া তো টিটু রোডের ওপর নামিলোম, মা। বাস সেইখানেই পাংচার হয়া বসিল। প্যাসেঞ্জার সবাই নামি পড়িল। জাহাজের মতো বাস। তার পাছা তোলেন। পাংচার চাকা খসান। তার বাদে নয়া চাকা লাগান। আধাঘণ্টার কমে হবার নয়। আমিও বাড়ির পথ না ধরিয়া তামশা দেখার জন্য খাড়া হয়া গেলাম। সেইকালে লক্ষ করি, মানুষজনে বিড়ির দোকান খোঁজে, বিস্কুট খোঁজে, চা খাবার জন্য ছটফট করে। কিন্তু আশেপাশে রোডের ওপর একখানও দোকান নাই। দেখো কী কাজ!

[হা হা করে হাসতে থাকে আবু বকর। হাসতে হাসতে চোখ ভেঙে তার পানি আসে।]

আবু     :           তার বাদে প্যাসেঞ্জার সকলের হায়-হুতাশ দেখিতে না দেখিতেই মনের মধ্যে কে কথা কয়া ওঠে। আরে, বকর, এই রোডের ওপর দোকান দিস না কেনে? চা থাকিবে, বিস্কুট থাকিবে, তেল-সাবান থাকিবে, মনিহারি সকল কিছু থাকিবে। মা, রোডের সেই তেঁতুলগাছের তলা, সেই তেঁতুলের গোড়ায় দোকানের বড় চমৎকার সুসার হয়, মাগো! বোধ হয় ইউনিয়ন বোর্ডের কাছে পারমিশন নেওয়া লাগবে। তা সেটা কিছু সমস্যা নয়।

 

দৃশ্য ৫০

[মা পরিবেশন করছে। আবু বকর ভাত খাচ্ছে।]

আবু     :           সমস্যা পুঁজিপাট্টার। নগদ টাকা কোথায়? তোমারও নাই, আমারও নাই। নাই দিয়া কি দোকান হয়? দোকানের খরচা কত। টিনের চালা তুলিতে হবে। জিনিস কিনিতে হবে। দোকান দিলেই তো আর রাতারাতি জমি ওঠে না। টাইম লাগে। সেই টাইমে নগদ খাওয়া-পরা আছে। সে খরচেরও জোগাড় চাই। তবে না দোকান! তা না হয় বাড়ির বারান্দার টিনের চাল খুলিয়া, নিজে কামলা খাটিয়া দোকানঘর করা গেইল। 

[মা একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ খুশি গলায় বলে—]

মা        :           আগে তুই ভাত কয়টা শেষ কর। তার পরে তোর সাথে আমার কথা আছে।

[আবু বকর অবাক হয়ে যায় মায়ের গলায় খুশির টান লক্ষ করে। তার ওপরে নেপথ্য বর্ণনা।]

নেপথ্য কণ্ঠ : সন্তানের বুক ছলছল করে ওঠে। ধরণির খাঁ খাঁ বুক কখনোই হয় না। মাটির গভীর অতলে পানি কুলকুল করে। জগতে মায়ের ভাণ্ডারও কখনোই শূন্য হয় না গো! সন্তানের মুখে মিঠা দেবার জন্য মায়ের যদি কিছুই না থাকে, জগতের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র যে পিঁপড়া, সেই পিঁপড়া চিনির দানা মুখে করে এনে মায়ের ঘরে জমা করে।

 

দৃশ্য ৫১

[প্রকৃতির দৃশ্য। চাঁদ আকাশে। ভোর হয়। দুপুরের সূর্য। আবার সন্ধ্যা হয়। বাঁশিতে প্রাণভাঙা সুর। আমরা দেখি সামু বাড়ির পেছনে গাছে হেলান দিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে। তার ওপরে বর্ণনা।]

নেপথ্য কণ্ঠ : রাত্রি যায়, চাঁদ ওঠে, রাত্রি শেষে ভোর হয়। দুপুর হয়। দুপুরের পর বিকেল, বিকেলের পরে আবার সন্ধ্যা। সন্ধ্যায় গাভি ওঠে গোয়ালে। আকাশে তারারা বেরোয় একটি-দুটি করে। বৃষ্টিভেজা বুনো লতাপাতার ঘ্রাণে ঘন হয়ে ওঠে বাতাস। মা কাউনের পায়েস রান্না করেন।

দৃশ্য ৫২

[মা পাকঘরে। আবু তার সমুখে উবু হয়ে বসে।]

মা        :           খা বাবা, কাউনের পায়েসখানা খুব তুই হাউস করিস। না, না, খোরার সবটা তোর খাওয়াই লাগবে।

আবু     :           মা, তুমি? তুমি খাইবে না?

মা        :           হারে পাগল, মায়ের মুখে পায়েসও যে নুনে রন্ধন, যদি না সেই পায়েস লাগে সন্তানের ভোগে। তবে তোকে একখান কথা কই, বাপ। নির্ধনের ধন কিছু টাকা আছে আমার কাছে। মান্দারবাড়ির পোস্টাপিসে জমা আছে। কত কষ্ট। তবু না ভাঙি সেই টাকা। আট-দশ হাজার তো হইবেই।

[চমকে ওঠে আবু বকর।]

আবু     :           কে দিল এত টাকা? কোথায় তুমি পাও?

মা        :           পুত্র যদি পর হয়, কন্যা তো পর হয়া যায় না। সে যত দূর দেশেই যায়া সংসার করে। তোর বুবু আয়েশা ইন্ডিয়া হতে পাঠায়। জামাই আনি জমা করি দেয় পোস্টাপিসে। তোর বুবুর সেই টাকায় দোকান দে তুই। চিন্তা কিসের? বারান্দার চাল না ভাঙিয়া নতুন টিনে দোকান গড়ি নে।

আবু     :           ওহ্, আয়েশা বুবুর কথা তুমি বহুদিন বাদে মনে করায়া দিলে, মা। বহুদিন তাকে চোখে দেখো নাই। ইন্ডিয়াতে আছে। দুলাভাই বা কেমন আছে!

[আবু বড় বোনের কথা মনে করে কোমল হয়ে ওঠে।]

 

দৃশ্য ৫৩

[রাস্তার ওপরে টংঘরে দোকান সাজাচ্ছে আবু বকর। তাকে সাহায্য করছে কিষান ছেলে সামু।]

আবু     :           ওরে সামু। হাত চালা, হাত চালা। আইজ শুক্কুরবার। জুম্মার নামাজের পর দোকান বিসমিল্লাহ বলে শুরু করব।

সামু     :           ভাইজান, মোর মুখ চুলকায়!

আবু     :           মুখ চুলকায়! কেনে রে?

সামু     :           খুশিতে।

আবু     :           খুশিতে মুখ চুলকায়! এমন কথা তো বাপের জন্মে শোনো নাই।

সামু     :           তোমরা দোকান দিচ্ছেন! খুশিতে বাঁশি বাজাইতে পরান চায়। তাই মুখ চুলকায়।

আবু     :           ও, এই কথা। আচ্ছা, বাজা। একটু বাজিয়ে নে। তোর যখন মুখ চুলকায়!

[সঙ্গে সঙ্গে সামু লাফ দিয়ে ওঠে। দোকানের পায়ার কাছে লুকিয়ে রাখা বাঁশিটি নিয়ে সে খুশির সুর বাজাতে থাকে। সেই সুরের তালে আপনা থেকেই দোকানের তাকে জিনিসপত্র লাফিয়ে লাফিয়ে সজ্জিত হয়ে যেতে থাকে। সারি সারি বয়াম। বয়ামে বিস্কুট, কেক, লজেন্স। পাশেই তাকওয়ালা হাতবাক্স। বিড়ি, সিগারেট, ম্যাচ। পেছনে কাঠের তাক। সাবান, তেল, আটা, মসলা, আয়না, চিরুনি, আগরবাতি, ব্যাটারি, স্নো-পাউডার, চুড়ি, আলতা, সিঁদুর, সস্তা খেলনা, আরো কত কী! থাম থেকে ঝোলে লেস ফিতা, কেকের প্যাকেট, পাউরুটির প্যাকেট, কলার ছড়া। পাশে টিনঘেরা কেরোসিনের চুলা। চুলার ওপরে চায়ের কেটলি। টিনের পাতের ওপর চায়ের গ্লাস। আবু প্লাস্টিকের ছোট তাজমহলটা হাতে নেয়। অনেকক্ষণ দেখে। তাজমহলের ওপর ভেসে ওঠে হুরির মুখ। হুরির সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে। রাতের বেলা দেখা করতে এসেছিল আবু বকরের সাথে। (দৃশ্য ৪১ থেকে।)]

 

দৃশ্য ৫৪ : (দৃশ্য ৪১ থেকে রিপিট)

হুরি      :           হায়, মাস্টার। বুঝিয়াও না বোঝেন। তবে আসিলাম কেনে? আমার ক্ষমতা নাই আপনার জীবনের জন্য কিছু করিবার। পরাধীন পরনির্ভর নারী। তার জন্ম হয় এই অভিশাপ নিয়া। সেই অভিশাপ মাথায় নিয়া আমি নিশ্চল। আমার হাত নাই, পাও নাই। ইচ্ছা আছে, শক্তি নাই। মা নাই আমার। মা যার নাই, তার শক্তিও নাই। মতামত নাই। বাসনা নাই। এই তিন বচ্ছরে যত বা তেজ আমার দেখেন আপনি, চুলার অগ্নির তেজ তো নয়, জোনাকির ঠাণ্ডা আগুন। আইজের বিকালে বাবা যখন সিদ্ধান্ত করিলে আপনাকে আর রাখা নয়, তখন প্রতিবাদ করিতেই তিনি কইলে, এই মাসেই বিয়া দেব তোর। আমি জানি কার সাথে দিবে। দিবে ওই বশার উকিলের ব্যাটার সাথে। কালা চশমা চোখে। জিন্সের প্যান্ট পরে। তার সাথে আমার বিয়া হইলে তিন কোটি টাকার লোন চক্ষের পলকে পাস হয়া যাইবে।

 

দৃশ্য ৫৫

[দৃশ্য ৫৩-তে ফিরে আসি। আবু বকর অন্যমনস্ক হয়ে যায়। হঠাৎ বাঁশির সুর থেমে যায়। সামু মুখ থেকে বাঁশি নামায়।]

আবু     :           কী হইল রে!

সামু     :           না, ভাইজান। ছনমনা হয়া গেইলেন যে!

আবু     :           ও! কিছু না। কিছু না।

[তার ওপরে সানাই বেজে ওঠে।]

 

দৃশ্য ৫৬

[সানাইয়ের সুরের টানে আমরা দেখি হুরির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বশার উকিলের ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে। বর হুরিকে নিয়ে বাসরঘরে ঢুকে যায়।]

 

দৃশ্য ৫৭

[আবু দোকান করছে। কেনাবেচা চলছে। চা বানাচ্ছে।  খদ্দেরকে দিচ্ছে। এসে দাঁড়ায় শ্রী নগেন্দ্রনাথ বর্মণ। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।]

আবু     :           আসেন, নগেন কাকা। আদাব। কী দেব?

নগেন :           একখান গায়ে মাখা সাবান দে তো! মেয়েটা বড় হাউস কইরছে। কয় বলে, গোলাপ ফুলের গন্ধআলা হয় য্যান।

আবু     :           আছে। এই ন্যান।

[পয়সা লেনদেনকালে নগেনবাবু গল্প করে।]

নগেন :           হারে বকর, কাজের কাজ করেছিস। সামান্য সদাইয়ের কারণে সেই দেড় মাইল দূরে বাজারে যাইতে হতো। তোর দোকান হওয়াতে কত সুবিধা সবার।

আবু     :           দোয়া করেন, কাকা। ভগবানের কাছে আমার জন্য দোয়া করেন। কতজনে টিটকারি করে—কলেজে পড়িতে যায়া, ফেল করিয়া—শেষে মুদির দোকান!

নগেন :           ফেল কোনো চিরস্থায়ী কথা নয়। তা ছাড়া কেবল বিএ পাস করিলেই জগৎ আলো হয়া যায় না। বিএ না পাস করিয়াও মানুষ উন্নতি করে। আর তুই এক ফেলের কারণেই গাছতলায় দোকান দিয়া বসলিরে! তোর ওপর যে হস্তিবাড়ীর একটা আশা ছিল, বকর!

[আবু বকর হাসে।]

আবু     :           কাকা, তোমরা হইলেন স্কুলের মাস্টার। ছোটকালে তোমার কাছেই তো বাল্যশিক্ষার পাঠ নিছি। তোমাদের তো দুঃখ হইবেই। তবে পিয়নের চাকরির চেয়ে দোকান ভালো!

নগেন :           তা-ও যদি জলেশ্বরীতে দোকান হইত।

আবু     :           জলেশ্বরীর কথা আর না কন, কাকা! টাউনের মানুষ অমানুষ হয়া গেইছে।

[নগেন কী বোঝে, কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো তাকিয়ে থেকে মাথা দুলিয়ে কাঁচা রাস্তা দিয়ে নেমে যায় খালপারে তার বাড়ির দিকে। আবু তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ওপরে বর্ণনা।]

নেপথ্য কণ্ঠ : না, হতাশা তার নেই। সে ভালোই আছে। হুরিকে সে অনেক কষ্ট করে ভুলেছে। হুরি বলেছিল তার ইচ্ছা আছে, শক্তি নাই। ইচ্ছাই যে অন্য বাড়িতে অন্য জীবন। আবু বকরের কাছে এই দোকানই এখন তার জীবন।

[বাতাস ওঠে। বাতাসে দোকানের ভেতরে টাঙানো দুলদুল ঘোড়ার ছবি—পাখাওলা নারীর মুখসংবলিত ঘোড়ার ছবিটা দুলে ওঠে। আবু সেটা ঠিক করে রাখে।]

 

দৃশ্য ৫৮

[মা পাকঘরে রান্না করছে। আবু বকর কুয়ার পানি তুলে গোসল করছে। মা খাবার নিয়ে আসে। আবু বকর মাথা মুছতে মুছতে দাওয়ায় এসে বসে খেতে।]

আবু     :           মা, আইজ এক মানুষ ইন্ডিয়া যাচ্ছিল বডার পার হয়া। তার হাতে আয়েশা বুবুর জন্য সাবান আর গন্ধ তেল পাঠায়া দিলাম।

মা        :           ভালো করছিস, বাপ। খুশি হইবে। তারে তো টাকা। সেই টাকায় দোকান। কতকাল যে আসে না। এই তো ১০ মাইল গেলেই বডার। কতই বা আর দূর!

[আবু ভাত খেতে খেতে বলে—]

আবু     :           ওই দেখো, তোমার চোখ আবার ছলছলা হয়া উঠিল। বেটিকে তবে ইন্ডিয়াতে বিয়া দিলেন কেন? বেটি তোমার এখন ইন্ডিয়ার নাগরিক। ইন্ডিয়ার মানুষ। এখান হতে ১০ মাইল দূরে হইলেও—ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়া হতে আসা! পাসপোর্ট লাগে! আচ্ছা, দোকান জমি উঠুক, দুইটা পয়সা হাতে আসুক, আমি ইন্ডিয়া যায়া নিয়া আসব আয়েশা বুবুকে।

[মা চোখ মোছে আর পরিবেশন করে। আবু তাকে খুশি করার জন্য বলে—]

আবু     :           মা, আইজ চলো। একদিনও তো গেলে না। দোকানে চলো আইজ। কেমন দোকান দেখি আসো। তোমার পায়ের ধুলা পড়িলে বরকত পাইবে আমার দোকান।

[সে সামুর উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলে—]

আবু     :           ও রে সামু। সামু!

[সামু গোসল করছিল।]

সামু     :           কী কন, ভাইজান?

আবু     :           আইজ বিকালবেলা, মাওকে দোকানে নিয়া যাইস তো।

সামু     :           আচ্ছা।

 

দৃশ্য ৫৯

[ঝড়ের গতিতে বাস আসতে থাকে। বাসের হেলপার  দরজায় কারদানি করে ঝুলতে ঝুলতে বাসের বডিতে থাবড়া মারতে মারতে সুরেলা চিৎকার করে ওঠে—]

হেলপার          : হস্তিবাড়ী! হস্তিবাড়ী!

[বাস থেমে যায়। হেলপার লাফ দিয়ে নেমে চেঁচায়—]

হেলপার          : শহীদ টিটু রোড! টিটু রোড! টিটু! টিটু! টিটু রোড। পান-বিড়ি কিনিবার হইলে কেনেন কি পেচ্ছাপ ধরিলে কাম সারেন। বডারের আগে আর জিরান পাবার নন। হস্তিবাড়ী! বাস দুই মিনিট দাঁড়াইবে।

[আবু বকরের দোকানে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়।]

 

দৃশ্য ৬০

[গ্রামের পথে মাকে দেখা যায়। সামু নিয়ে আসছে।]

 

দৃশ্য ৬১

[আবু চা বানাচ্ছে দোকানে। কয়েকজন গ্রাম্য মাতবর বসে চা খাচ্ছে। তাদের একজনের চোখে পড়ে।]

একজন            :           আবু! তোমার মাও দেখা যায়।

আরেকজন      :           কতকাল বাদে পথে চলিতে দেখিলাম।

একজন            :           পথে বের হবে কি! বুড়া হয়া গেছে না!

[আবু বকর মাকে দেখেই দোকান থেকে বেরিয়েছিল। সে লোকটিকে বলে—]

আবু     :           ও কথা না কন, চাচা। মা—মা! মায়ের কোনো বয়স নাই। বুড়া নাই।

[মাকে হাত ধরে দোকানের সামনে আনে আবু।]

আবু     :           মা, দেখো। চায়া দেখো। তোমার নীল রং পছন্দ। দোকানে নীল রং দেখো। তাক নীল। থাম্বা নীল। আর এই দেখো, কাবা শরিফের ছবি। এই দেখো তসবি। এই দেখো—ইয়াকে কয় লেবনচুষ। খাবা?

[মা খুশিতে দোকান দেখছিল। দুই হাত তুলে বলে—]

মা        :           না, বাপ, দাঁত নাই।

আবু     :           হা হা হা। দাঁত লাগে না। লেবেনচুষ চুষিয়া চুষিয়া খায়।

মা        :           না, বাপ। জিদ করিস না।

[মাকে প্রায় কোলে করে দোকানে বসায় আবু।]

আবু     :           বইসো তবে। এক গ্লাস চা করি দিই। চা খাও।

[আবু চা বানাতে শুরু করে। তা দেখে মা হেসেই খুন। আবু চা বানিয়ে গ্লাসটা গামছা মুড়ে হাতে তুলে দেয়।]

আবু     :           একখান বিস্কুট খাও। বিস্কুট ডুবেয়া খাও, মা।

[আবু বিস্কুট দেয় মাকে। মা খেতে থাকে। দোকানে খদ্দের আসে। খদ্দেরের কাছ থেকে দাম নিয়ে আবু মাকে বলে—]

আবু     :           মা গো, ধরো পয়সা, নিজ হাতে বাক্সে রাখো। তোমার হাত বেহেশতের হাত।

[মা আলুথালু হয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে।]

মা        :           বাকেসা ভরি উপচি পড়ুক পইসা। সোনার জগৎ হউক রে তোর!

[এই সময়ে দুই যুবক আসে।]

আবু     :           কী চান? কী দেব?

যুবক   :           কী দিবেন? যা চাই তা আছে?

আবু     :           কন, কী চান?

যুবক   :           গাঞ্জা! গাঞ্জা নাই? গাঞ্জা রাখেন না?

আবু     :           না!

যুবক ২ :          আহা, রাগ করেন কেনে? গাঞ্জা রাখেন, ফেন্সি রাখেন, পয়সায় পয়সা, লালে লাল হয়া যাইবেন। চায়ের গেলাসে চামচ নাড়িয়া কয় পয়সা হইবে?

[আবু বকর বহু কষ্টে তার রাগ চেপে রাখে। বলে—]

আবু :   চা খাবার হইলে খান।

যুবক : চা! তোর চায়ে মুতি দেই।

[যুবকরা ক্রূর হেসে চলে যায়। আবু বকর ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মা ভীতস্বরে জিজ্ঞেস করে—]

মা        :           এরা কারা, বাপ?

আবু     :           জানোয়ার! মা, দ্যাশটা যে কী হয়া গেইল!

 

দৃশ্য ৬২

[আকাশে গোল চাঁদ। মেঘ এসে ধীরে ঢেকে ফেলে চাঁদ। দেখা যায় দাওয়ায় মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে আবু। মেঘে ঢাকা চাঁদ দেখছে।]

মা        :           আর কতকাল বাপ মোর? কতকাল একা নিরালা থাকবি রে? কতকাল বা মুই আর বাঁচিম! কোনকালেই বা বউ আসিবে ঘরে!

[আবু উত্তর দেয় না। মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। চোখেপুরনো দিনের ছবি ভেসে ওঠে। মা গল্প করে।]

মা        :           আমার যখন বিয়া হইল, এই বাড়িতে যে পরথম আসলাম, কী রোশনাই বাড়িতে। পূর্ণিমার চান্দও দুধের ধারা দুনিয়ার বুকে ঢালি দিছে। মানুষজনের খুশির আওয়াজে আঙিনা উঠান পাছবাড়ি পাকশালা দাওয়া বাংলাঘর ঝমঝম করি উঠে। আতরের গন্ধ। উঠানে খানা পাক হয়। পোলাও। মোরগ। খাসি। হাতা-বেড়ি-খুন্তির শব্দ। আর কত যে গীতগিদালি।

[হঠাৎ মায়ের লক্ষ হয় ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে।]

মা        :           হা রে মোর পাগল, তুই দাওয়ায় নিন্দ গেইলি! ঘরে চল।

আবু     :           না! ঘরে নয়। হেথায়!

[মা কপালে করাঘাত করে।]

মা        :           হা, ঘরেই বা কী আছে! ঘরে তো কেউ নাই যে কোমরের বিছা ঝমরঝমর করিয়া সংকেত দিবে, আইসো হে, মোর গতর ভরি ঘুম আসে!

আবু     :           রাখো ওইগুলা কথা! বউ আনিয়া তো দেখিছ দুই-দুইবার। কোনঠে গেইল তোমার হাসনা-জোছনা! হা! আমার মা-ব্যাটার সংসার ভালো!

[আকাশে চাঁদের বুক থেকে মেঘ ধীরে সরে যায়। মা ও ছেলের ওপর স্বর্গীয় আলো পড়ে।]

 

দৃশ্য ৬৩

[আবু দোকানে বসে আছে। খদ্দেরের ভিড়। সে চা বানাচ্ছে। টুকিটাকি বিক্রি করছে। একটা বই পড়ছিল সে দোকান করার ফাঁকে ফাঁকে। বইটা উল্টো করে রাখা ছিল ক্যাশবাক্সের ওপর। নেপথ্যে বর্ণনা চলে।]

নেপথ্য কণ্ঠ : আবু বকরের দোকান এখন জমে উঠেছে। জলেশ্বরী কলেজে পড়তে গিয়েছিল। ফেল করে গ্রামে ফিরে এসে সে এই দোকান দিয়েছে। জলেশ্বরীতে সে জায়গির থাকত মোল্লার বাড়িতে। মোল্লা সাহেবের মেয়ে হুরির সঙ্গে তার ভালোবাসা হয়েছিল। সেই হুরির কথা সে ভুলে গেছে। একবারও কি তার কথা মনে পড়ে না?

[বর্ণনার ঠিক এই জায়গায় এসে—আমরা দেখি—বাতাসে একটা ছবি খসে পড়ে। ছবিটা সাবানের বিজ্ঞাপনে মডেল কন্যার ছবি। ছবিটা তুলতে গিয়ে হঠাৎ হাতের ধাক্কায় ক্যাশবাক্সের ওপর থেকে খোলা বইটা মাটিতে পড়ে যায়। আবু এক হাতে ছবি, আরেক হাতে বইটা নিয়ে সোজা হতেই থমকে যায়। তার মনে পড়ে যায় হুরির কথা। হুরির ছবিটা ভেসে ওঠে।]

 

দৃশ্য ৬৪ : (দৃশ্য ৪১ থেকে রিপিট)

[ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায়—হুরি আবু বকরের ঘরে। মুখোমুখি তারা। হুরি বলছে—]

হুরি      :           গল্পের বই আপনার কাছে নিয়া কত পড়ছি। কলেজের লাইব্রেরিতেও গল্পের কত বই আছে। সেই বইয়ের নায়িকারা কতই না সাহসী। তারা নিজ ইচ্ছায় চলেফেরে। স্বাধীন মনে যা আসে তা-ই করে। ভালোবাসায় বাধা আসিলে বাধাকে তারা ভাঙিয়া দেয়। মিলন হয়। বাপে-মায়ে কী আপত্তি করিল না করিল, সমুদয় ভাসিয়া যায় তাদের ইচ্ছার কাছে। তাদের ইচ্ছাও আছে, শক্তিও আছে। আমার ইচ্ছা যদিও বা থাকে শক্তি নাই, মাস্টার। যদি আপনি মনে করেন বাপের যা কথা আমারও সেই কথা, তবে তা নয়। তার জন্য এত নিশুত রাইতের কালে এত সাহস ধরি এইভাবে আপনার কাছে আসি।

 

দৃশ্য ৬৫

[চায়ের কেটলিতে পানি ফুটে ভকভক করে ধোঁয়া উঠছে। আবু বকর তাড়াতাড়ি কেটলি নামায়। কে একজন চা চেয়েছিল, তাকে চা বানিয়ে দেয়। তারপর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ছবিটা ঝোলায়। বইটা মুড়ে পাশে রেখে দেয়।]

 

দৃশ্য ৬৬

[আবু বকরের ঘরের মেঝের ওপরে তার বইয়ের সংগ্রহ ছড়ানো। সে একটা একটা করে বই দেখছে। মা ঘরে আসে ভাতের থালা হাতে নিয়ে।]

মা        :           কিরে, বকর। হঠাৎ বই তামাম বের করিয়া!

[আবু বকর কথা বলে না।]

মা        :           ভাতটা খায়া নে।

[আবু বকর ভাতের থালা নিয়ে পাশে রেখে দেয়। মা পাশে বসে দু-একখানা বই হাতে নিয়ে দেখে।]

মা        :           এত বই! সব তুই পড়ছিস?

[আবু বকর হাসতে হাসতে বলে—]

আবু     :           মা রে, এই সব বই আমি পড়ছি।

মা        :           তার পরেও তুই ফেল করিলি পরীক্ষায়?

আবু     :           ফেল-পাস জীবনে আছে, মা। এক জায়গায় ফেল, আরেক জায়গায় পাস! বাংলাদেশও দেখো না! একবার পাস হয়, তার বাদে ফেল, আবার পাস করে!

মা        :           তোর কথা মোর মাথায় যায় না। ভাত খা।

আবু     :           খাব, খাব। এই দেখো, এই বইটা দেখো।

[আবু একটা বই খুলে মাকে ছবির পর ছবি দেখায়।]

আবু     :           তুমি তো পড়িতে পারো না। ছবি দেখো। এই যে বঙ্গবন্ধুর ছবি। ৭ই মার্চে ভাষণ দেয়। কও তো বঙ্গবন্ধু কে হয়?

মা        :           নেতা হয়।

আবু     :           খালি নেতা নয়। জাতির পিতা হয়। তারে নামে বাংলাদেশ যুদ্ধ করে একদিন। স্বাধীন

হয়। এই যে দেখো—পাকিস্তানিরা সারেন্ডার করে। ভালো করিয়া দেখো। পাকিস্তানের সেনাপতি নিয়াজি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী আর ভারতের কাছে সারেন্ডার করে।

[আবু বকর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে—]

আবু     :           জগতে আরো কত লক্ষ-কোটি বই আছে, মা। তার কোটি ভাগের এক ভাগও পড়ি নাই, মা রে, কত বই চোখে দেখি নাই।

মা        :           ভাত ঠাণ্ডা হয়া যায়, বাপ! অত বই কি তুই একায় পড়িতে পারিস!

আবু     :           তুমি আমাকে গরাসে গরাসে তুলি দেও, মা। তোমার হাতে খাব! এইবার যখন দোকানের মাল আনিতে টাউনে যাব, একখান হইলেও নতুন বই কিনি আনব।

[মা হাতে করে ভাত খাইয়ে দিতে থাকে আবুকে।]

আবু     :           মা রে, আমার ইচ্ছা করে আমিও যদি বই লিখিতে পারিতাম! বই যারা লেখে তারা না জানি কত শক্তিমান বিদ্বান হয়, মা রে! আমার শক্তিও নাই, বিদ্যাও নাই।

[আবু বকর মায়ের হাতে ভাত খেয়ে চলে, আর বইগুলো নাড়াচাড়া করে।]

 

দৃশ্য ৬৭

[গ্রামের ওপরে বৃষ্টি নামে। ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ে। কয়েকটি সুন্দর দৃশ্যে বর্ষাটা ফুটে ওঠে। তারপর বৃষ্টি থেমে যায়। আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়।]

 

দৃশ্য ৬৮

[আবুর দোকানের সামনের পথ দিয়ে এক বুড়া কিষান যাচ্ছিল। দোকান থেকে আবু বকর তাকে দেখতে পায়।]

আবু     :           চাচা, ও চাচা, শুনি যান।

[কিষান আসে।]

কিষান            :           কী চাচা, বোলান কেনে?

আবু     :           দেখেন না, আইজের দিন কেমন? মেঘ করি আছে। ঝড়িবিষ্টি হবার পারে। আর কাইলের বিষ্টিতে পথঘাট কাদায় থিকথিকা হয়া আছে। বাড়ি যাবার পথে হামার মাকে কয়া যান, ভাত খাবার যাবার নই। ভাত য্যান সামুর হাতে দোকানে পাঠেয়া দেয়।

কিষান            :           আচ্ছা। তবে এক শলা সিরকোট দেন।

[আবু বকর তাকে সিগারেট দেয়। এক গ্লাস চা-ও দেয়।]

আবু     :           খান, চাচা, তরিবৎ করি খান। বিষ্টির শীতলে গাও গরম করি নেন। আমার কোনো জলদি নাই।

[সিগারেট ধরিয়ে বুক ভরে ধোঁয়া নেয় বুড়া। গলগল করে ছাড়ে অনেকক্ষণ পরে। আহ্! বলে আয়েশে চোখ বুজিয়ে মাথা দোলায় কয়েকবার। তারপর আচমকা চোখ খুলে খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলে—]

কিষান            :           তোমরা তাও মানুষের দুঃখ বোঝেন! কথা কি জানেন, দুঃখ বুঝিবার মানুষ আর এ দুনিয়ায় নাই!

[সিগারেট পোড়ে। বুড়ার কথাও সমানে চলতে থাকে।]

কিষান            :           তোমরা তো সবই জানেন। এই যে সড়কের নাম শহীদ টিটু মিয়া রোড। একাত্তরে সেই সংগ্রামের কালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে টিটু তো অস্ত্র ধরিল পাকিস্তানি শেষ করিবে বলিয়া। হামার ব্যাটা চন্দনও গেইল তার সাথে। চন্দনও টিটুর সাথেই শহীদ হইল।

আবু     :           হ্যাঁ, চাচা, আমি জানি। কত মানুষ জান দিছে এই দ্যাশটাকে স্বাধীন করিতে।

কিষান            :           টিটু মিয়া যেদিন শহীদ হয়, এমন মানুষ মুল্লুকে সেদিন নাই যে কান্দে নাই। আর এখন? মানুষ পুছ করে, টিটু কাঁই? টিটুকে তারা চেনেয়ে না! আল্লার দরজায় সব শহীদ এখন নিগুম অচিন হয়া গেইছে।

[এমন সময় কিষান ছেলে সামু গামছায় থালা বেঁধে কচুপাতা মাথায় দিয়ে দোকানে আসে।]

সামু     :           নেও, দাদা! আম্মা বৌখুদা করি পাঠাইছে। কইলে বিষ্টির দিনে এমন ভাজা ভাত ভালো লাগিবে।

আবু     :           হ্যাঁরে, মার কি আর কাম নাই? এত কষ্ট করিবার কোন দরকার ছিল তার!

[কিন্তু সে খুশিই হয়। খুদের ভাত হলুদ, মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে ভেজে রান্না করা। পাশে শুঁটকির ভর্তা।]

কিষান            :           তবে আর কি? তোমার চা খাইলোম, সিরকোট টানিলোম। তোমার খানাও আসি গেইল, মুই তবে বিদায় হই।

[আবু বকর খেতে বসে।]

দৃশ্য ৬৯

[মায়ের ক্লোজআপ। আবু বকর নিজের ঘরে বইপত্র নাড়াচাড়া করছে।]

আবু     :           মা, তোমার বৌখুদা মুখে লাগিল যেন অমৃত। তোমার হাতের পাক! অমৃতের স্বাদ হইছে, মা!

মা        :           আর হামার হাতের পাক! বিয়া কর। বউ আসিলে বউ করিবে বৌখুদা, তবে না অমিত্যের স্বাদ, বাপ!

[আবু বকর হাসে।]

মা        :           বিয়া করিবু না তুই?

[আবু হাসে। বাইরে থেকে থেকে হাওয়ার তাড়নায় গাছপালা মাথা নাড়ে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি একটু জোর হয়, আবার নেতিয়ে পড়ে। মা বিরক্ত হয়ে বলে—]

মা        :           খালি বই আর বই। কী আছে বইয়ের ভিতরে?

[আবু বকর হাসতে হাসতে বলে—]

আবু     :           মা রে, এই সব বই আমি পড়েছি। তবে আছে জগতে আরো কত লক্ষ-কোটি বই। তার কোটি ভাগের এক ভাগও পড়ি নাই, মা রে, কত বই চোখে দেখি নাই।

মা        :           অত বই কি তুই একায় পড়িতে পারিস!

আবু     :           একা কেনে পড়িব, মা। সকলে মিলিয়া পড়িব। তবে না এই দ্যাশ সোনার মানুষের দ্যাশ হইবে।

মা        :           কী কইস তুই, হামার মাথায় আসে না। এইগুলা কোন কথা? বইয়ের সাথে দ্যাশের কী সম্পক্ক?

আবু     :           কও কী, মা! বই না পড়িলে, ইতিহাস না জানিলে, মানুষ কি মানুষ হবার পারে? মা রে, আমার ইচ্ছা করে আমিও যদি বই লিখিতে পারিতাম! বই যারা লেখে তারা না জানি কত শক্তিমান বিদ্বান হয়, মা রে! আমার শক্তিও নাই, বিদ্যাও নাই। তবে বিদ্যা এমন, লওয়াও যায়, দেওয়াও যায়।

[কথাটা মুখ থেকে পড়তে না পড়তেই আবু বকরকে ভাবে পায়। সে খপখপ করে বই তুলে ট্রাংকে ভরতে থাকে।]

 

দৃশ্য ৭০

[ভোরের সূর্য ওঠে। ভোরে দেখা যায় আবু বকর সামুর মাথায় বইয়ের ট্রাংক দিয়ে দোকানের দিকে রওনা হয়। মা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে।]

মা        :           টেরাংক ধরি কই যাইস, বাপ?

[আবু বকর জবাব না দিয়ে হেসে রাস্তা ধরে।]

 

দৃশ্য ৭১

[প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার নগেনবাবু রাস্তা দিয়ে আসছে। সে দূরে আবুকে দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।]

নগেন  :           ও, বকর! কোথায় যাও? ঢাকায়?

[নগেন কাছে আসে। আবু বকর ও সামুর মাথায় ট্রাংক ভালো করে দেখে বলে—]

নগেন :           তবে, আমার পরামর্শ মনে ধরল। দোকানপাটে কিছু হবে না। শহরে যেয়ে, রাজধানীতে যেয়ে ভাগ্য সন্ধান করতে হবে। ঢাকায় রওনা হয়েছ বুঝি?

[আবু বকর রহস্যময়ভাবে উত্তর দেয় মিটিমিটি হেসে।]

আবু     :           দেখি, নগেন কাকা, দেখি। বিকেলে দোকানে আসেন, এর উত্তর দেব। মুখে কিছু বলিব না। এক আশ্চর্য দেখিবেন।

নগেন :           আশ্চর্য! সেইটা আবার কী!

[কাট করে দেখা যায় মোটরসাইকেল একটা বহু দূরে। আসছে। তার ওপরে কারা বসে এখনো বোঝা যায় না। আবু চলে যায় সামুর সঙ্গে। নগেনবাবু কিছুক্ষণ থম ধরে দাঁড়িয়ে থেকে মাথা নাড়ে। হঠাৎ তার চোখে পড়ে সন্ত্রাসী পচা পনির ও তার একজন সঙ্গী মোটরসাইকেল চড়ে তার দিকেই আসছে। তাদের চোখে কালো চশমা। নগেন সন্ত্রস্ত হয়। পচা পনির মোটরসাইকেলে ভোম করে স্টার্ট দেয়। হঠাৎ যেন নগেনকে চাপা দেবে এ রকম ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে।]

পনির :           কী, কাকা! ভালো আছেন?

[নগেন ভীত মাথা নাড়ে। মুখে ভীত হাসি।]

পনির :           মালতি? মালতি ভালো আছে?

[নগেন ভীত হাসি থেকে মুক্তি পায় না। মুখে তার কথা ফোটে না।]

পনির :           মালতিকে অনেক দিন দেখি না। একদিন বাড়ি যাব মালতিকে দেখিতে। ডরান না! খুব খিদা তো! একদিন লুচি-মাংস খায়া আসব মালতির নিজ হাতে।

[পচা পনির মোটরসাইকেল চালিয়ে চলে যায়। নগেন ভীত চোখে তাকিয়ে থাকে। নগেন আপন মনে কথা বলে ওঠে। কথাগুলো তারই কণ্ঠে তারই ওপর অফ ভয়েস হিসেবে শোনা যাবে।]

নগেন (ওভি) : বিজলি চমকায়, ভালো। মেঘ ডাকে, ভালো। বাজ পড়ে, সেও ভালো। কিন্তু এই শয়তানগুলা যেন আকাশের বাজ হয়ে মাথায় না পড়ে, ভগবান!

[নগেন বাড়ির দিকে ফিরে যায় দ্রুত।]

 

দৃশ্য ৭২

[মালতি কাজ করছে ঘরে। নগেন আসে ডাকতে ডাকতে]

নগেন :           মালতি। মালতি।

মালতি            :           বাবা, ঘুরি আসিলে যে!

[নগেন উদ্বিগ্ন হয়ে তাকায় মেয়ের দিকে।]

নগেন :           তোর মাও কোনঠে?

মালতি            :           খালপারে গেইছে জল আনিতে। কী হইছে, বাবা?

নগেন :           না, কিছু নয়।

মালতি            :           কিছু তো নিশ্চয়। এই বাইরে গেইলে, এই ফিরি আসিলে।

নগেন :           না, মানে, মোটরসাইকেলের আওয়াজ কি শুনিছিস?

মালতি            :           মোটরসাইকেল? হয়, কারা য্যান বাড়ির পাশে চক্কর মারি গেইল। তা কত মানুষেই তো আসে। জমি খরিদ করিতে চায়।

নগেন :           খরিদ! খরিদ নয়, কাড়ি নিতে চায়, দখল নিতে চায়। বঙ্গবন্ধুও গেইছে, হামার ভরসাও গেইছে। দ্যাশটা শয়তানের হাতে চলি গেইছে। কালা চশমার যুগ পড়িছে, মা। কালা চশমা।

 

দৃশ্য ৭৩

[দোকানে আবু। তাক থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে ট্রাংক থেকে বই নিয়ে সাজিয়ে রাখছে। যেন একটি পাঠাগার স্থাপন করছে সে। সামু তাকে সাহায্য করছে।]

সামু     :           এইটা কী হবার লাগছে, ভাইজান? বই কিতাব বিক্রি করিবেন?

আবু     :           না রে, না। বিক্রি নয়। পাঠাগার।

সামু     :           কী কইলেন? কী আগার?

আবু     :           পাঠাগার। পা-ঠা-গা-র। যেখান হতে বই নিয়া মানুষ পড়িবে, পড়া হইলে ফিরত দিয়া আরেকখান বই নিয়া যাইবে। সেখান পড়িয়া ফির আরেকখান।

সামু     :           ফির আরেকখান?

আবু     :           ফির আরেকখান।

সামু     :           ক্যান? একখান পড়িলেই হয় না?

আবু     :           দূর পাগল। পড়ার কি শ্যাষ আছে? এই পাঠাগারের নাম কী দেব জানিস? এই যে সড়ক—শহীদ টিটু ভাইয়ের নামে। তারে নামে—শহীদ টিটু পাঠাগার।

 

দৃশ্য ৭৪

[বাস ছুটে যায় সড়ক দিয়ে—দোকানের সমুখ দিয়ে। গ্রামের পথ ধরে প্রবীণরা দোকানে আসে। বেঞ্চে বসে।]

প্রবীণ   :           কই, আবু মিয়া, চা খাওয়াও, বাহে। বিষ্টি যা হইছে, গাও শীতল মারি গেইছে। গরম চা খাইলে যদি জুত হয়।

[আবু চায়ের পানি চড়ায়। নগেনবাবু আসে। অবাক হয় দোকান খোলা দেখে। আবু বকর তো গ্রাম ছাড়ে নাই। চায়ের কেটলিতে পানি ফুটছে। বগবগ করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে কেটলির নল দিয়ে। গ্রামের প্রাচীনেরাও বাঁশের বেঞ্চে ঘন হয়ে বসে আছে। তবে কী এমন আশ্চর্য দেখাতে আবু বকর তাকে আসতে বলেছে? পায়ে পায়ে অগ্রসর হয় নগেনবাবু।]

আবু     :           আসেন, কাকা, আসেন।

[নগেন দোকানের সমুখে দাঁড়াতেই অবাক! পেছনে ওপরের তাকে নিচের তাকে মালসামগ্রী। শুধু মাঝের তাকে নেই। বোরাকের ছবি নেই। তাজমহলের ছবি নেই। দেব-দেবীর ছবি নেই। কাবা শরিফের ফটো নেই। মালা নেই। তসবি নেই। আয়না নেই। স্নো-পাউডার নেই। সব অন্য তাকে। এখন এই তাকে বই আর বই। এক তাক বই। গায়ে গায়ে হেলান দিয়ে বই। মোটা বই। পাতলা বই। লম্বা বই। খাটো বই।]

নগেন :           এ কিরে, বকর? একি! এত বই কিসের? আর কোথায় বা তুই পালু এত বই!

[আবু চা বানাতে বানাতে বলে চলে—]

আবু     :           চা খান, কাকা। বিস্কুট খান। আমার নিজস্ব বই। কত কষ্ট না করিয়া কেনা এই সব বই। আমার তো সব পড়া হয়া গেইছে। পড়া শ্যাষ হইলে বইয়ের পৃষ্ঠা তো আর সাদা হয় যায় না! এখন আপনারা পড়িবেন। লাইব্রেরি দিলাম দোকানঘরে। এই দেখেন খাতা। খাতায় দাগ দিয়া ঘর আঁকা। নাম লিখিবেন, বই নিয়া যাইবেন। বাড়িতে পড়িবেন। এক সপ্তা পরে ফিরত দিবেন। বই বাবদ আমাকে দিবেন ২০ পয়সা। বই ফিরত দিয়া আবার নতুন বই নিবেন।

[নগেন চা খেতে খেতে সখেদে কেবলই মাথা নাড়ে।]

নগেন :           তুই না বিএ ফেল করিছিলি রে? হা রে, কপাল, জগতে না কত বিস্ময় আছে! এমন মানুষও পরীক্ষায় ফেল করে রে!

[বইয়ের তাকের ওপর ক্যামেরা প্যান করে।]

 

দৃশ্য ৭৫

[আবু বকর দোকানের পাশে তালগাছের গায়ে গজাল ঠুকে ছোট্ট একটা সাইনবোর্ড লাগায়। শহীদ টিটু পাঠাগার। পরিচালনায় মো. আবু বকর। হস্তিবাড়ী। দেখা যায় কিশোর ও যুবকরা, এমনকি প্রবীণও দু-একজন বই নিচ্ছে আবু বকরের কাছ থেকে। ফেরত দিচ্ছে। আবার নিচ্ছে। সময় পার হচ্ছে। আর এই মন্তাজ দৃশ্যের ওপর নেপথ্যে শোনা যাবে এবং এই বর্ণনা অনুসারে শটগুলো আসবে একের পর এক।]

নেপথ্য (ওভি) : কিছুদিনের মধ্যেই জমে ওঠে আবু বকরের লাইব্রেরি। গ্রামের ছেলে-মেয়ে আর তাদের বাবা-চাচাদেরও কেউ কেউ বই ধার নিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের বই। বাংলার ইতিহাসের বই। বাংলাদেশের সেরা লেখকদের বই। আবু বকর নিজেও আবার পড়তে শুরু করে পুরনো পড়া বই। এখন আর দোকানে তার অলস সময় কাটে না। খদ্দেরের অবসরে বই খুলে বসে। অবাক হয়ে আবিষ্কার করে সে, অনেক দিন পরে পড়া বই আবার পড়লে নতুন অনেক কিছু চোখে পড়ে। ধীরে ধীরে তার একটি পাঠকচক্র গড়ে ওঠে। তাদের কেউ কেউ বই নিয়ে আলোচনা করে দোকানের বেঞ্চে বসে। তর্ক করে। বাদ-প্রতিবাদ করে। আবু বকরের মতামতও তারা জিজ্ঞেস করে।

একজন            :           আচ্ছা, স্বাধীনতার ঘোষক কি বঙ্গবন্ধু, না জিয়া?

আরেকজন      : জিয়া, জিয়া। পত্রিকায় লেখে, রেডিওতে কয়। জলেশ্বরীর আবদুর রহমান মিয়া সেদিন জনসভায় কইলে, জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক। তার কথা কি মিথ্যা হবার পারে?

একজন            :           মিথ্যা, সকল মিছা কথা। বানোয়াট কথা। বঙ্গবন্ধুই ঘোষণা দেয়—আইজ হতে বাংলাদেশ স্বাধীন। কী কন, আবু ভাই?

আবু     :           এইটাই সত্য। এইটাই ইতিহাসের সত্য কথা—বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। চট্টগ্রাম হতে প্রচার হয় সারা দেশে। সারা দুনিয়ার পত্রিকায় সেই কথা ছাপা হয়।

আরেকজন      : তবে যে হামার পত্রিকায় লেখে—জিয়া—

আবু     :           হামার পত্রিকা সকল যে এলা জিয়ার দল—তাদের দখলে, তারায় যে দ্যাশ এলা চালায়। তারায় ইতিহাস নাশ করিয়া নিজের মনগড়া কথা শোনায়। এই দেখো, বই হতে পড়িয়া শোনাই—

[আবু বকর একটা বই খুলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে শোনায়।]

 

দৃশ্য ৭৬

[ভোরের সূর্য ওঠে আকাশে। তখনো আঁধার ভালো করে ভাঙেনি। আবু বকরের বাড়ি। ঘুমিয়ে আছে আবুর মা। ঘুমিয়ে আছে আবু। তাদের ওপরে আবুর দুলাভাই কাশেমের ডাক ওভারল্যাপ হয়।]

কাশেম : আবু মিয়া। ও আবু মিয়া। আম্মা। আম্মা।

[আমরা দেখতে পাই কাশেম চোরের মতো চারদিক দেখতে দেখতে আঙিনায় এসে ঢোকে, কারণ সে ইন্ডিয়া থেকে বিনা পাসপোর্টে এসেছে। আবার সে ডাক দেয়।]

কাশেম            :           আবু মিয়া। আবু। আবু বকর! ইন্ডিয়া থেকে কাশেম আসে।

[আবুর মা ধড়ফড় করে ওঠে।]

মা        :           কার গলা? জামাই না? আবু দ্যাখ, তোর কাশেম দুলাভাই বুঝি আইসছে।

[আবু আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে। মায়ের গলা শুনে সে দরজা খুলে বেরোয়।]

 

দৃশ্য ৭৭

[উঠান। আবু বেরিয়ে এসেই দেখা পায় কাশেমের।]

আবু     :           আরে, দুলাভাই!

কাশেম            :           চুপ চুপ। শোর না করো।

আবু     :           ক্যান, কী হইছে?

কাশেম            :           আরে, ইন্ডিয়া হতে চোরাপথে আসা। কাঁই বা শুনি ফালায়, দেখি ফালায়।

[মা বেরিয়ে আসে। কাশেম তাকে কদমবুসি করে।]

কাশেম            :           আম্মা, ভালো আছেন?

মা        :           আর হামার থাকা। একা আসিলে যে! আয়েশাকে আনিলে না?

কাশেম            :           বডার পার হয়া রাইতের আন্ধারে আসা। তাকে কি সাথে আনা যায়?

আবু     :           আচ্ছা, আগে আরাম করি বইসেন তো, দুলাভাই। তার বাদে কথাবার্তা। হাত-মুখ ধোবার পানি দিই।

[আবু চলে যায় কুয়া থেকে পানি তুলতে।]

মা        :           বাবা, আয়েশাকে আনিলে হয়। কতকাল দ্যাখো না।

কাশেম            :           তাকে কি সাথে আনা যায়? ১০ মাইল দূরে হইলেও তো বডারের ওপারে ভিন দ্যাশ।

মা        :           কী যে দ্যাশ ভাগ করি গেইছে বিটিশ! এই দ্যাশে চান্দ উঠিলে ওই দ্যাশে দেখা যায়! এই মাঠে হাঁক পাড়িলে ওই মাঠে শোনা যায়! এই সাঁঝে বাতি দিলে ওই সাঁঝে আলো হয়! আর আমার বেটি এত কাছে, তাকে না একঝলক দেখিবারও পাই!

কাশেম            :           দেখিবার তো সাধ হয়। বেটি যে! আমারে আসা জান হাতে করিয়া!

[আবু পানি আনে। কাশেম হাত-মুখ ধোয়।]

কাশেম            :           এক কাপ চা কি হবার নয়, আম্মা!

আবু     :           কেনে চা হবার নয়, দুলাভাই! তোমরা দাওয়ায় উঠি বইসো। চোখের পলকে পরির পাখায় চা আসি যাইবে! মা ও তুমি কথা কও। চা আমার ডিপার্টমেন্ট। চা খায়া কইবেন দুলাভাই তোমার শালা পারে না এমন কোনো কাম নাই!

[আবু বকর চা বানাতে চলে যাওয়ার পর কাশেম দাওয়ায় উঠে বসে।]

দৃশ্য ৭৮

[দাওয়ায় বসে কাশেম। মা তাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে।]

কাশেম            :           আপনার জমা টাকা দিয়া আবুকে দোকান করি দিছেন, আয়েশা বড় সন্তুষ্ট। সে কয়, ভাইয়ের মতিগতি তবে ঠিক পথেই আছে। তবে যুবক বয়স বলিয়া কথা! কোনো বাহির টান তো নাই তার?

মা        :           না, না! তোমার শালা দোকান আর বাড়ি ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। তার ওপরে বই আছে তার। রাইতের দিনের সকল সময় বই তার কোলের পরে।

[কাশেম ভ্রু কুঞ্চিত করে।]

কাশেম            :           বইয়ের কথা বুঝিলোম না, আম্মা। কলেজের পরীক্ষা তো ফেল করিয়াই পড়া শ্যাষ হয়! ফির বই আসে কোথা হতে?

মা        :           এ বই সে বই নয়। দুনিয়ার ভালো ভালো কথার বই। নিজেও পড়ে, দশজনকে পড়ায়। এই নিয়া মাতিয়া থাকে।

[কাশেম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে—]

কাশেম            :           সেটাও মন্দ নয়। তাস-পাশার চেয়ে বই ভালো। তবে তার দোকান কেমন চলে? আয়-রোজগার কেমন? দোকানও মানুষের মতো, আম্মা! তারও বৃদ্ধি আছে। যদি লাগে, আমি আরো কিছু টাকা দেব। দোকান বড় করিতে কন আপনার ছেলেকে। আপনার বেটি আয়েশারও এই কথা!

[আবু বকর চা নিয়ে আসে।]

আবু     :           খায়া কন, দুলাভাই! জগতে কয়জনের হয় শালার হাতে তৈয়ার চা খাওয়ার ভাগ্য?

[কাশেম চায়ে চুমুক দিয়ে ঠোঁট সরু করে বলে—]

কাশেম            :           আহ্! দোকানে চা কেমন চলে? সদাই সামগ্রী কেমন রাখিছ?

আবু     :           আসেন, একবার দেখি যান। একবেলা আপনি দোকানে বসেন না কেন?

[কাশেম সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে।]

কাশেম            :           না, সময় হবার নয়। সন্ধ্যা নামিলেই ওপারে বাড়ি ফিরি যাব। কাউকে বলার দরকার নাই যে আমি আসিছি।

মা        :           কেনে, বাপ? মোরগ জবাই হইলেই তো মোরগ করকরাইবে! সবাই জানিবে।

কাশেম            :           না! না! মোরগের দরকার নাই, আম্মা। একখান কাজের কথা দিয়া আয়েশা আমাকে পাঠেয়া দিল।

মা        :           আয়েশা বেটির খবর আগে কও। পোয়াতি কি নয়? তবে যে শুনিছিলোম!

কাশেম            :           আরে মানুষের কানে কানে কত কথাই ছড়ায়! সে ভালো আছে। আপনার তিন তিন নাতি-নাতনি, আর কত চান?

মা        :           মায়ের মন! এক কুড়িও যদি হয়, তবু একজন কম থাকি যায়!

কাশেম            :           সেই দিন আর নাই, আম্মা। এখন দিনকাল বড় মন্দ। ইন্ডিয়ার কথা আর না কন। হিন্দুর রাজত্বই বুঝি হয়া যায় ইন্ডিয়া। আমার বইন নূরজাহান, তাকে তো ছোটকালে দেখিছেন। এলায় ডাঙর। নূরজাহানের জন্য চিন্তা হয়। মোসলমান ঘরের বেটি, মোসলমানের দ্যাশেই তার ভবিষ্যৎ। তারে জন্য আসা।

[কথাটা বলে কাশেম মায়ের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে অর্থপূর্ণভাবে।]

 

দৃশ্য ৭৯

[আবু বকরের দোকান। বাস আসে। যাত্রী নামে। পান-সিগারেট কেনে। বাস চলে যায়। মালতিকে দেখা যায়। একখানা বই বুকের কাছে ধরে মালতি আসছে। আবু বকর দেখতে পায় তাকে। মালতি কাছে আসে।]

আবু     :           মালতি, আইসো। তোমাকে দেখিলেই মন খুশি হয়া ওঠে।

[মালতি লজ্জা পায়। আবু সেটা বুঝতে পেরে দোষ কাটাবার জন্য বলে—]

আবু     :           তোমার নামটা যে সুন্দর। তাই খুশি লাগে। মালতির অর্থ জানো?

মালতি            :           না, জানি না।

[আবু তাক থেকে একটা ডিকশনারি নামায়।]

 

আবু     :           এই দেখো ডিকশনারি। এই দেখো মালতি। মালতি মানে ফুল। মালতি মানে সুগন্ধ। মালতি মানে জোছনাও হয়। পূর্ণিমার ফকফকা আলোকে কওয়া যায় মালতি!

[মালতি নিজের নামের এতগুলো অর্থ শুনে বুঝি লজ্জা পায়। তত্ক্ষণাৎ তার ওপরে নেপথ্য কণ্ঠ—]

নেপথ্য            : মালতি শব্দের অর্থ যদি জোছনার আলো, ইস্, একদিন, অচিরেই সেই এক জোছনা রাতেই তো মালতি ধর্ষিত হয়!

[মালতি তার হাতের বইখানা আবুর হাতে দেয়।]

মালতি            :           এই বইখান পড়া হয়া গেছে বাবার। আরেকখান দ্যান। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের বই চাইছে।

[আবু তাক থেকে বইটা বের করে মালতিকে দেয়।]

আবু     :           এই নেও।

[মালতি বই নিয়ে একটু ইতস্তত করে বলে—]

মালতি            :           আমাকেও একখান বই দ্যান না?

আবু     :           তুমি পড়বে? বলো, কী বই?

মালতি            :           আপনার পছন্দে দ্যান।

আবু     :           আমার পছন্দে? তোমার পছন্দ নাই?

মালতি            :           গল্পের একখান ভালো বই দ্যান। দুঃখের বই য্যান না হয়। দুঃখের বই আমার ভালো লাগে না, বকর ভাই।

]আবু চমকে ওঠে। তার ওপরে নেপথ্যে শোনা যায়—]

নেপথ্য            : আবু বকর চমকে ওঠে। বহুদূর থেকে একটা কী কথা যেন দূর বিজনে আপন মনে ভাসতে ভাসতে ভেসেই চলছিল, হঠাৎ পারে ঠেকে যায়। জলেশ্বরীতে হুরির কথা স্মরণ হয়। কষ্টের বই সেও পড়তে চায়নি। একাত্তরের বই পড়লে তার কাছে উঠানের পিছলও রক্ত পিছল বলে মনে হয়!

[কাট করে দৃশ্য ৩৫ থেকে শট দেখা যায়। হুরি বলছে—]

হুরি      :           যদি গল্পের বই থাকে দ্যান। মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনিলে আমার গাও কাঁপি ওঠে। উঠানের বিষ্টি পিছল রক্ত পিছল বলি মনে হয়!

[ছবিটা ফ্রিজ হয়ে যায়। তার ওপরে নেপথ্য কণ্ঠ—]

নেপথ্য            : আবু বকর কিন্তু আসার সময় হুরির জন্য বালিশের তলায় একখানা কষ্টেরই বই রেখে এসেছিল। একাত্তরের রক্ত পিছল বই।

[মালতির মুখের দিকে আনমনা চোখে তাকিয়ে থাকে আবু। মালতি চঞ্চল হয়ে পড়ে। মাথা ঝাঁকিয়ে বলে—]

মালতি            :           না, দুঃখের বইও ভালো। দ্যান তবে, আমাকে আপনার পছন্দে দুঃখের বই।

[আবু বকর মাথা নাড়ে। হাসে। বলে—]

আবু     :           সুখের বই পড়ো, মালতি। দুঃখের দিন তো পড়িয়াই আছে সামনে!

[মালতি বই হাতে নেয়। পাতা উল্টে দেখে। নেপথ্য কণ্ঠ—]

নেপথ্য            : আবু বকর তাকে একখানা উপন্যাস দেয়। রাজধানীর গল্প। দুটি ছেলে-মেয়ের গল্প। তারা প্রেম করে। মালতি রাজধানী যায়নি। মালতি প্রেমও করেনি। আবু বকর রাজধানী যায়নি। তার জীবনে প্রেম ছিল কি না, আবু বকরের তা-ও জানা নেই। মালতি দোকান থেকে রওনা হয়, কাঁচা রাস্তা ধরে বাড়ির দিকে যায়।

 

দৃশ্য ৮০

[আবু বকরের বাড়ি। মা রান্না শেষ করে এনেছে। দাওয়ায় খাবার জায়গা করছে আবু বকর। পাটি বিছাচ্ছে। থালা-গ্লাস সাজাচ্ছে। কাশেম গোসল শেষে মাথা মুছতে মুছতে পাকঘরের সামনে এসে মাকে বলে—]

কাশেম            :           নূরজাহানের সাথে যদি আবুর বিয়াটা দেওয়া যায়, আপনার বেটির তাই ইচ্ছা, আর সে কারণেই জরুরিভাবে আসা। নূরজাহানকে তো আর ইন্ডিয়ায় রাখা তারও ইচ্ছা নয়, আমারও নয়। তার সাথে আবু বকরের বিয়ায় আপত্তি থাকিলে কন।

[মা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কাশেমের দিকে।]

 

দৃশ্য ৮১

[দাওয়ায় ভাত খেতে বসেছে কাশেম আর আবু। মা পরিবেশন করছে। কাশেম মাকে বলে—]

কাশেম            :           এসব কথা চিঠিতে হয় না। লোক মারফতও হয় না। তাই ঝুঁকি নিয়া আমার আসা।

[আবু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে—]

আবু     :           কোন কথা, দুলাভাই?

কাশেম            :           সে কথা পরে হইবে। পরে তোমাকে বলা হইবে। এখন কথা এই, ইন্ডিয়াতে আমাদের অবস্থা খুব বেকায়দা। বাবরি মসজিদ ভাঙার কথা তো শুনিছ। সেই হতে কী যে শুরু হয়া গেল। এখন আবার নতুন এক কথা। অবৈধ বাংলাদেশি নাকি ইন্ডিয়ায় আছে। তাদের গলাধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হবে। আমার বইন নূরজাহানের কারণে চিন্তা হয়!

[মা আড়চোখে আবুকে একবার দেখে নেয়। কাশেম উত্তেজিত স্বরে বলে—]

কাশেম            :           রাজনীতি যদি কঠিন হয় তো হউক! হিন্দু থাকুক হিন্দুর দ্যাশে। মোসলমান থাকুক মোসলমানের দ্যাশে—বাংলাদেশে।

[আবু ভাতের পাতে মুখ নিচু করে ছিল, সে মুখ তোলে কথাটা শুনে।]

আবু     :           দুলাভাই, এটা কোন কথা কন? বাংলাদেশ তো খালি মোসলমানের দ্যাশ নয়। হিন্দু-মোসলমান সকলের দ্যাশ! মুক্তিযুদ্ধ করিয়া কি মোসলমানের জন্য দ্যাশ করিছিলাম? না, সকলের জন্য করিছিলাম? আর যদি কন বাংলাদেশ হইবে মোসলমানের দ্যাশ, তবে ইন্ডিয়ার এত মোসলমানের জায়গা কি বাংলাদেশে হইবে? তারা যাইবে কোথায়? ইন্ডিয়ার সমস্যা ইন্ডিয়া সামাল দিবে। আমার প্রবলেম আমার। আমার দ্যাশটা যাতে খালি মোসলমানের না হয়া মানুষ সবার জন্য হয়, সেই চেষ্টা করা নগদ এখন কাজ।

কাশেম            :           রাজনীতি নিয়া এত চিন্তা-ভাবনা না করো!

আবু     :           রাজনীতি আপনিও তো করেন না, দুলাভাই, কিন্তু রাজনীতির ঠ্যালায় তো আপনার জীবনেও কাতরানির ডাক ভাঙ্গি উঠিচ্ছে!

[শাশুড়ির তুলে দেওয়া মোরগের আরো এক টুকরো পাতে পড়তেই কাশেম হা হা করে ওঠে।]

কাশেম            :           আর নয়, আম্মা, কবজিভর খাইছোঁ।

মা        :           আয়েশাকেও যদি আনিতে, বাপ। কতকাল সে মায়ের হাতে রান্ধন খায় নাই!

[মা চোখের পানি মোছে।]

কাশেম            :           বেলা তো পড়ি আসে। আমারও যাওয়ার টাইম হয়। তবে সে কথার কী উত্তর, আম্মা?

[আবু বকর চকিতে ফিরে তাকায় দুলাভাইয়ের দিকে।]

আবু     :           কোন কথা?

[উত্তর দেয় না কাশেম। মা চোখ ফিরিয়ে রাখে।]

আবু     :           কোন কথা? কিসের কথা, দুলাভাই?

কাশেম            :           তোমার বিবাহের কথা, বকর!

আবু     :           আমার বিবাহ? কার সাথে?

[কাশেম শাশুড়ির দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিপাত করে।]

মা        :           নূরজাহানের প্রস্তাব পাঠায় আয়েশা।

[আবু বকর অনেকক্ষণ পর্যন্ত ধরতেই পারে না কার কথা বলা হচ্ছে।]

আবু     :           কে নূরজাহান?

কাশেম            :           আমার ছোট বইন। তুমি চমকি উঠিলে যে!

আবু     :           না, কিছু নয়। তবে, বিয়া এখন—আমার দোকান এখনো—

কাশেম            :           আচ্ছা, এদিক আসো।

[কাশেম পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে আবুকে আলাদা করে নিয়ে বাড়ির বাইরে যায়। মা তাকিয়ে থাকে।]

 

দৃশ্য ৮২

[বাড়ির বাইরে গ্রাম্য পথ। সেখানে এসে কাশেম একটা সিগারেট ধরায়। আবুকে সাধে। আবু মাথা নেড়ে জানায় সে সিগারেট খায় না। কাশেম একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলে—]

কাশেম            :           বিয়ার কথা শুনিয়া চমকি ওঠা ঠিক নয়। তোমার বয়স হইছে। সংসার বলিয়া কথা! সংসার সকলকেই করিতে হয়। আমাদের নবীজিও করেন। বাবা আদম হতে এই রীতি। বিবাহ রাজা করে, প্রজাও করে। ল্যাংড়া-খোঁড়ারও সংসার হয়। সন্তান হয়। জীবন অগ্রসর হয়। সন্তানের ভিতর দিয়া মানুষ স্বপ্নপূরণের আশা করে। মানুষের সাধ-আশা-স্বপ্ন আছে। তার কতক পূরণ হয়, অনেকখানিই হাওয়ায় মিলায়া যায়। সন্তান সেই অপূরণ স্বপ্নের সার্থকতা করিবে, পিতার এই আশা, মাতার এই আশা। তাই স্ত্রী-পুরুষ মাতা-পিতা হয়। যৌবন চিরকালের নয়। মা-ও চিরকাল থাকিবে না। তখন এই ভিটায় সানঝের বাতিই বা কে দিবে? কার রান্ধনের সুবাসেই বা আঙ্গিনা ভরি থাকিবে, যদি না বিবাহ করো?

[কাশেম সিগারেট শেষ করে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে—]

কাশেম            :           চলো, বাড়ির ভিতরে চলো। মায়ের কাছে আলাপ করি নেও।

[তারা ভেতরবাড়িতে আসে।]

 

দৃশ্য ৮৩

[মা তখনো দাঁড়িয়ে আছে ওদের প্রতীক্ষা করে। আবু বকর এসেই মায়ের দিকে তাকায়। মা জামাইয়ের সঙ্গে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করে জামাইকে বলে—]

মা        :           নূরজাহান নিশ্চয় সোন্দর হইছে, জামাই! কতকাল দেখি নাই তাকে।

কাশেম            :           দেখিলে তাকে পরিই কইবেন, আম্মা! নিজের বোন বলিয়া অধিক করি বলি না। তার রূপের কারণেই আমার আরো চিন্তা হয়। বাংলাদেশে থাকিলে আমার দুশ্চিন্তা আর না হয়। তবে সেটাও কোনো কথা নয়। নিজের বাড়ির ভিতরে এমন পাত্র থাকিতে বাহিরে পাত্র খোঁজে কোন আহাম্মকে! লোকেও বা আমাকে কী বলিবে! হাতের কাছে জামাই থাকিতে বোনটাকে অপরের কোন অপরা অধরা ব্যাটার হাতে তুলি দিলে হে!

[আবু বকর গভীরভাবে চিন্তা করে। তারপর মাকে সে জিজ্ঞেস করে—]

আবু     :           তোমার কী ইচ্ছা?

মা        :           তোর যা ইচ্ছা!

[আবু আর এ কথা নিয়ে অগ্রসর হয় না। আকাশের দিকে তাকায়। আকাশে মেঘ। ঘন কালো মেঘ।]

আবু     :           বিষ্টি বুঝি আসে। দোকানে যাই। দুলাভাই তো আইজ রাইতেই ইন্ডিয়া যাইবেন। আচ্ছা, আমি আগায়া দিয়া আসব।

[আবু দোকানের উদ্দেশে বেরিয়ে যায়।]

 

দৃশ্য ৮৪

[বৃষ্টি নেমে আসে অঝোর ধারে। গ্রামের দৃশ্য বৃষ্টির ভেতরে। ক্ষেত মাঠ। মানুষ। আবু বকর দোকানে আসে। সামু দোকানে ছিল, সে এখন ছুটি পেয়ে কচুপাতা মাথায় নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হয়।]

 

দৃশ্য ৮৫

[বাড়িতে মা ও কাশেমের মধ্যে কথা। কাশেম শুয়ে আছে। মা তাকে বাতাস করছে।]

কাশেম            :           আপনার তবে আপত্তি নাই?

মা        :           আমার কথার কি আছে, বাপ। যাই বিয়া করিবে তার মতামতেই মত।

কাশেম            :           আবুর মত পায়া গেছি। সে অরাজি নয়।

 

দৃশ্য ৮৬

[বৃষ্টির অঝোর ধারা। টিনের চালে ঝমঝম শব্দ। ডোবার পানিতে চড়বড় শব্দ। দোকানের চাল বেয়ে বৃষ্টি নামার ঝরঝর শব্দ। বৃষ্টির চাদরে চারদিক জড়ানো। গাছপালা পথঘাট উত্তর-দক্ষিণ। স্বপ্নের ভেতরে আবছা ছবির মতো দৃষ্টিপথে জগৎ। ভিজতে ভিজতে দৌড়ে এসে দোকানের ঝাঁপের নিচে কে একজন দাঁড়ায়। কোমর থেকে তার পা দুখানি কেবল চোখে পড়ে। দোকানের তাকের পেছনে তার বিশ্রামের স্থান ছেড়ে আবু বকর হামা দিয়ে সমুখে আসে। নীল ডোরা শাড়ির আঁচল মাথায় জড়ানো মানুষটিকে সহসা ঠাহর হয় না তার। মানুষটা তখন মুখ ফিরে তাকায়। বৃষ্টির পানিতে ভেজা অপরূপ একখানা মুখ দেখে ওঠে আবু বকর। মালতির মুখ।]

আবু     :           এ রে! এই বিষ্টিতে! মালতি! কোথায় বা এই দুর্যোগে যাও? নাকি কোথা হতে আসিলে বা তুমি!

[আবুর প্রশ্নের উত্তর দেয় না মালতি। ভেজা আবছা হাসি ফুটে ওঠে তার মুখে। যেন ঘন বৃষ্টির ভেতরে যাতায়াত করাটা খুবই স্বাভাবিক ও সাধারণ ঘটনা।]

মালতি            :           বিষ্টি বলিয়া তো আর সংসার বসি থাকে না! মরিয়মের কাছে গেছিলাম।

আবু     :           মরিয়ম?

মালতি            :           পোস্টমাস্টারের বেটি। আমার বান্ধবী। মরিয়মের বাচ্চার আজ মুখেভাত ছিল। তার নিমন্ত্রণ ছিল।

আবু     :           তোমার বান্ধবী? তার বাচ্চা? এত অল্প বয়সেই তার বিয়া হয়?

মালতি            :           আমারও তো অল্প বয়সে বিয়া হয়, বকর ভাই। বাচ্চা তো আমারও আছে। জন্মের সময় এতখানি ওজন ছিল। তাই তাকে ছটাকি বলিয়া ডাকি।

আবু     :           আর তোরও তো জামাই ব্যাটা তোকে ছাড়িয়া ইন্ডিয়া গেইছে।

মালতি            :           ওগুলা কথা থাউক।

[নত হয়ে শাড়ির প্রান্ত চিপে মালতি পানি ঝরায়। পায়ের গোড়ালি বুঝি অধিক প্রকাশিত হয়ে পড়ে। দ্রুত সে শাড়ি ছেড়ে দেয়। বৃষ্টির অঝোর ধারা দেখে ভীত হয় সে। সে আবু বকরের দিকে তাকায়।]

আবু     :           আইসো, দোকানে উঠি আসো, মালতি। এই বিষ্টি নগদে না যাবার! অপেক্ষা করি যাও। বিষ্টি ধরিলে যাও।

[মালতি ইতস্তত করে।]

আবু     :           আরে, আইসো, বিষ্টিতে যে ভিজিয়া সারা!

মালতি            :           পায়ে মোর কাদো!

আবু     :           কাদোতে কিছু না হইবে। উঠি আসো। কাদো আমি ধুইয়া নেব।

[সংকোচে সন্তর্পণে দোকানের পাটাতনে পা রাখে মালতি। ডান পা। পা তুলতেই পাটাতনে কাদা মাখা পায়ের ছাপ পড়ে। লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ যেন আলপনা থেকে পড়ে। বাঁ পা রাখে মালতি। ডান পায়ের ছাপের পাশে বাঁ পায়ের ছাপ পড়ে।]

[মালতি করুণ স্বরে বলে—]

মালতি            :           কাদো হয়া গেইল যে!

[দোকানের পাটাতনের ধার ঘেঁষে কিনারে বসে মালতি। পা মেলে ধরে টিনের চাল থেকে বৃষ্টির ধারায়। দুই পায়ে আলতার দাগ ফুটে ওঠে। কাদা ধুয়ে আলতার লাল বিকশিত হয়। মালতি পা টেনে নিয়ে হাত বাড়ায়। আঁজলায় বৃষ্টির পানি ধরে। সেই পানিতে পাটাতনে তার পায়ের কাদার ছাপ সে ধুতে থাকে। হাত দিয়ে পানি লেপন করে দেয়। আবু বকর যেন একটা ছবিই দেখে। হাওয়ার হঠাৎ ঝাপটায় পানির ছাঁট আসে দোকানের ভেতরে। দুজনেই চমকে ওঠে। একসঙ্গে। তারপর দুজনই হেসে ওঠে।]

আবু     :           মালতি, একটু চা করি দিই? এই বিষ্টিতে চা খাইলে সর্দি না বসিবে!

[মালতি নিঃশব্দে মাথা নাড়ে প্রবল বেগে। তার চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ে ঝাঁকুনির দাপে।]

আবু     :           এহ্, একেবারে ভিজিয়া গেছ। শরীলে তো অসুখ বসিবে। জ্বর বা না হয়!

মালতি            :           আমার জ্বর হয় না।

আবু     :           এ কোন কথা! শরীল থাকিলেই জ্বর হয়!

[মালতি মাথা নাড়ে।]

আবু     :           জ্বরের সাথে কি চুক্তি আছে তোমার যে বিষ্টিতে ভিজিলেও জ্বর তোমাকে ধরিবার নয়?

[হেসে ফেলে মালতি : বাদানুবাদের ইতি টানে সে ছোট্ট করে হাতের পাতা তুলে। আবু তার দিকে তাকিয়ে থাকে দূর চোখে। বৃষ্টি ক্রমে জোরালো হতে থাকে। এখন আর বাতাস নেই। খাড়া ধারে বৃষ্টির পানি পড়ে। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ পরে আবু বলে—]

আবু     :           একখান কথা কই। এই বিষ্টি কতক্ষণে ছাড়ে ঠিক নাই। আর আমার কাছেও ছাতা নাই যে ছাতা দিবার পারি। বাসের প্যাসেঞ্জার কচুবনের মানপাতাও সমুদয় সাবাড় করিছে। মাথায় দিয়া বাড়ি গেইছে। তোমার শরীলে পানি বসি যায়। ভিজিয়া তো চুপচুপা হইছ। যাও, পিছনে জাগা আছে, আউল আড়াল আছে, যায়া পানি চিপি ফেলাও।

[মালতি নিঃশব্দে উঠে যায়। তাকের পেছনে আড়ালে সে চলে যায়। আবু বকর উঁচু গলায় মালতিকে বলে—]

আবু     :           পাটাতনের কাঠে ফাঁক আছে দেখো। নিচে ডোবা। পানি ঝরিলে ফাঁক দিয়া ডোবায় পড়িবে। চিন্তা না করো।

[আবু বকর দোকানের পাটাতনের ওপরেই কেরোসিনের চুলা ধরায়। মালতি আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে আবু বকরকে চুলা ধরাতে দেখে হেসে ওঠে।]

মালতি            :           হাহ্, এইগুলা বেটিছাওয়ার কাম!

আবু     :           কোনগুলা?

[মালতি চুলার দিকে চোখের ইশারা করে। আবু বকর জ্বাল তেজি করতে করতে বলে—]

আবু     :           জননীর সন্তান জন্ম ছাড়া জগতের আর সকল কাজ নারীও পারে পুরুষও পারে। কাজের কোনো ছাওয়া বেটিছাওয়া নাই।

মালতি            :           না, আপনি সরেন, বকর ভাই!

[মালতি উবু হয়ে চুলার কাছে বসে। কেটলিতে পানি ভরে আগুনের ওপর চাপায়। আগুনের লালচে আলোয় তার মুখের একপাশ রঙিন ছবির মতো দপ করে ওঠে। আবু বকর দূরত্ব রেখে সরে বসে। তাকের গায়ে হেলান দিয়ে সে নিচু ঝাঁপের ভেতর দিয়ে বৃষ্টির ধারা দেখে। চোখে তার ঘোর লেগে আসে। মালতির চা বানানো দেখে সে। সে মালতির হাত থেকে চায়ের গ্লাস নেয়। সে আরো দূরে গিয়ে হেলান দিয়ে বসে। মালতিও নিজের গ্লাস নিয়ে যত দূর দূর হয় তত দূরে বসে। বৃষ্টি তার ধার ঘেঁষে পড়ে। এতখানি ঘেঁষে যে নিঃশ্বাসে সামান্যই নড়ে উঠলেই বৃষ্টির ধারা গায়ে পড়বে তার। মালতি হঠাৎ বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে বলে—]

মালতি            :           বকর ভাই! তোমার লাইব্রেরির সমুদয় বই কি দুঃখের?

[আবু বকর বিষাদিত হাসে।]

মালতি            :           বকর ভাই, জগতে দুঃখের বই কিম্বা সুখের বই অধিক?

[এর উত্তর জানা নেই আবু বকরের।]

মালতি            :           বকর ভাই, নতুন কোনো বই কি আনিছেন?

[ক্লিষ্ট আবু বকর মাথা নাড়ে।]

মালতি            :           বকর ভাই, এ কেমন আশ্চর্য চিন্তা করি তল না পাই। সুখের বই পড়িলে জগৎ দূরে সরি যায়, দুঃখের বই পড়িলে জগৎ আরো ঘন নিকট হয়া আসে! মরিয়মের কথা তবে শোনেন। অল্প বয়সে তার বিয়া হয় শুনিয়া চমকি উঠিছিলেন। আরো তবে শোনেন। অল্প বয়সে তালাকও তার হয়া গেইছে।

আবু     :           কও কী, মালতি!

মালতি            :           কেলাস নাইনে বিয়া হয়। দশম কেলাসে বাচ্চা আসে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায়

 

সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করে। পাসের খবর আসে। তালাকেরও চিঠি আসে তার। রংপুর হতে খবর পাওয়া যায় স্বামী আবার বিয়া করিবে। বাঁচিবার সাধ নাই আর। মরিয়ম কয়, নিজের জীবন নিজেই নিলাম হয়। বাচ্চার কথা স্মরণ হইলেই সব আউলিয়া যায়। মরিয়ম আইজ আমাকে বলে, পাঁচ মাসের বাচ্চা তার আঙুলে কিবা জোর! মরণের গহ্বর হতে জীবনের দিকে টান মারি আনে!

[মালতি আবু বকরকে ভাবনা করতে দেখে বলে—]

মালতি            :           আপনার কাছে গেরামের কোনো খবর নাই। আপনি আছেন দোকান নিয়া। বিভোর হয়া আছেন। মাকেও না বউ আনি দিলেন আপনি! সেদিন আমার মাওয়ের কাছে তাই দুঃখ করিল যে! কত দুঃখই না করিল! বলিল, ব্যাটা আমার সন্ন্যাসী হয়া গেইছে গো!

[কথাগুলো বলেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে মালতি। সমস্ত শরীরে নড়ে উঠে সে বাইরে ঝুঁকে তাকায়।]

মালতি            :           নাহ্, এ বিষ্টি ছাড়িবার নয়, বকর ভাই। বেলা পড়ি আসে। বাবা চিন্তা করিবে। যাই!

আবু     :           আর কতখন দেখি যাও।

মালতি            :           না, আমি যাই!

আবু     :           মালতি আর কতখন বইসো না কেনে? বইসো।

[মালতি বিস্মিত উত্সুক চোখে তাকায়। বুঝি কোনো কথা আছে আরো। কোন কথা? আবু বকর নীরব হয়ে থাকে। আবু বকর মালতির মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মালতি চোখ ফিরিয়ে নেয় না। সেও অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে। দুজন দুজনের দৃষ্টি নিয়ে বাঁধা পড়ে যায়। [আবু ঘোরলাগা গলায় বলে—]

আবু     :           মালতি, সন্ন্যাসী হবার ইচ্ছা যদিও বা ছিল, এই বৃষ্টির ধারায় আর তোরই সাক্ষাতে এখন সব গলিয়া ভাসিয়া গেল। যদি তোর সাথে সংসার হইত রে মালতি, তোকে না তালাক দিতাম! যত দুঃখ আসুক জীবনে, যত কষ্টে ভাঙুক এ বুক, স্বপনের ছবি যাক খানখান হয়ে, কঠিন জগতে তবু সন্তানের টানে আমি জীবনের পারে আসি উঠিতাম।

[দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের ওপরে নেপথ্য বর্ণনা—]

নেপথ্য            : কিন্তু এই কথাগুলো সত্যি সত্যি আবু বকর মালতিকে বলে না। এর একটি শব্দও সে উচ্চারণ করে না। বৃষ্টির এই দিনটি মালতিকে উপহার দিয়ে যায় তার কাছে। বৃষ্টির এই ঝরঝর শব্দ যেন আজ তারই জন্য সংগীত হয়ে এসেছে। আবু বকর এতক্ষণ মালতির দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে।

 

দৃশ্য ৮৭

[এখন রাত। লণ্ঠন জ্বলছে। কাশেম শাশুড়ির পায়ে সালাম করে।]

কাশেম            :           আম্মা, আসি তবে। আপনার বেটিকে তবে খুশির খবরটা দিই। হ্যাঁ, নূরজাহানকে নিয়া সুখী হইবেন। একটু সুযোগ পাইলেই তাকে নিয়া আসিব বডার পার করি। বিবাহটা এখানেই হইবে।

[আবু বকর দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে টর্চ।]

আবু     :           আসেন, আসেন, দুলাভাই। অনেকটা পথ।

[হঠাৎ কাশেমের চোখে পড়ে দুটো ব্যাগ হাতে আবু।]

কাশেম            :           এগুলা কী?

মা        :           কিছু শিলবিলাতি আলু, আয়েশা পছন্দ করে।

আবু     :           আর আমি দোকান থেকে কিছু খেলনা দিছোঁ বাচ্চাদের জন্য।

কাশেম            :           এই বস্তা হাতে বডার পার হওয়া! আচ্ছা চলো!

[ওরা রওনা হয়ে যায়।]

 

দৃশ্য ৮৮

[কাশেম ও আবু মানুষের চোখ এড়িয়ে বাঁধা সড়ক ছেড়ে মাঠের ভেতর দিয়ে, বনের ভেতর দিয়ে, ঘুরপথে সীমান্তের দিকে নিঃশব্দে হাঁটতে থাকে। মাঝে মাঝে টর্চের ফোকাস করে পথ দেখে নেয় আবু। হঠাৎ একসময় কাশেম বলে—]

কাশেম            :           তুমি সুখী হইবে!

আবু     :           দোয়া করেন!

কাশেম            :           আমি নিশ্চয় করিয়া জানি নূরজাহানের সাথে তুমি সুখী হইবে!

[আবু বকর চমকে ওঠে। ওরা পথ হাঁটতে থাকে। ওদের ওপর নেপথ্য কণ্ঠ—]

নেপথ্য            : নিশ্চয় করে যে কিছুই বলা যায় না আবু বকরের চেয়ে ভালো আর কে জানে। জলেশ্বরীতে মোল্লা সাহেবের মেয়ে হুরির কথা তার মনে পড়ে যায় কি? তার সাথেও তো ভালোবাসা ছিল। সুখের স্বপ্ন ছিল। মনের মধ্যে আশা মুকুল ধরে উঠেছিল। কোথায় গেল সেই নিশ্চয়! দেশটাও বা কোন দিকে গেল! নিশ্চয় যে মুক্তিযুদ্ধ, নিশ্চয় যে বঙ্গবন্ধু, নিশ্চয় যে ৩০ লক্ষ প্রাণ, নিশ্চয় যে নারীর ইজ্জত, কী হলো সেই নিশ্চয়ের। নিশ্চয় সব ভাঙনের, নষ্টের, পতনের।

[ওরা পথ পাড়ি দিচ্ছে।]

 

দৃশ্য ৮৯

[পথের আরেক বাঁকে। ওরা চলছে।]

কাশেম            :           কোনো কথা নাই তোমার মুখে?

[কাশেমের এ প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয় আবু বকর।]

আবু     :           আপনারা যা কন, মা-বুবু মিলিয়া যা ঠিক করেন, তার ওপরে আমার আর কথা কি? তবে কিছুদিনের অপেক্ষা যা করা দরকার।

কাশেম            :           অপেক্ষা? অপেক্ষা কিসের?

আবু     :           দোকান আরো বড় করার ইচ্ছা, বাজারে ঘর নেওয়ার ইচ্ছা, আরো মালসামগ্রী রাখার ইচ্ছা। লাইব্রেরিটাও বড় করিতাম!

কাশেম            :           লাইব্রেরির কথা ছাড়ো! আম্মার কাছে শুনিছোঁ তোমার লাইব্রেরির কথা। ওই সব চ্যাংড়ামি ছাড়িয়া দোকানের কথা, নিজের উন্নতির দিকে খেয়াল করো।

আবু     :           তা ছাড়া দোকানের জন্যও আমার টাইম দরকার। পুঁজিরও দরকার।

কাশেম            :           আমি পুঁজি তোমাকে দেব।

আবু     :           টাইমও তবে দিবেন! মায়েরও মন আমি ভালো করি বুঝি দেখি।

কাশেম            :           মায়ের কথা না কও। মা তোমাকে আইজ পারিলে আইজে বিবাহ দেয়।

আবু     :           মায়ের হাউসে মন ভরে, জগৎ চলে না দুলাভাই।

কাশেম            :           জগতের এতই বুঝিয়া ফেলাইছিস রে, বকর!

আবু     :           না বুঝিবার কী আছে? জগৎ বড় বাস্তব। কতটা যে বাস্তব, তবে দেখেন দুলাভাই, আপনিও সিধা বান্ধা পথ ছাড়িয়া জঙ্গলের ভিতর দিয়া বডারের দিকে হাঁটা দিছেন। বাস্তব যে কতখানি, আপনিও মাথার ওপর বিপদ নিয়া বিনা পাসপোর্টে চোরের মতো শ্বশুরবাড়ি আসিছেন নূরজাহানের ভবিষ্যৎ বন্দোবস্ত করিতে!

[আবু বকর হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলে—]

আবু     :           একটু ঘুরিয়া চলেন, দুলাভাই। এই দিক দিয়া গেলে শটকাটও হইবে, আমারও একটা কাজ হইবে।

[এর অধিক ব্যাখ্যা করে না আবু বকর। মাঠের পাশে জঙ্গলের ভেতর সে পা বাড়ায়।]

 

দৃশ্য ৯০

[একটা সরু রাস্তা। দুদিকেই বাঁশবন। বাঁশ নুয়ে পড়েছে তোরণ তৈরি করে। কঞ্চিগুলো এতটাই লম্বা আর নিচে নেমে এসেছে যে খেয়াল করে না চললে গা ছড়ে যায়, জামা ছিঁড়ে যায়।]

কাশেম            :           এ কোন জায়গা রে, বকর!

আবু     :           আসেন তো, দুলাভাই। এই জায়গার পরেই আমি বিদায় নেব, আপনি সোজা পথ ধরি বডারে চলি যাইবেন। আধা কোশ গেইলেই ধনবাড়ী পাইবেন। ধনবাড়ীতে বডার পার করার দালালের আড্ডা। ধনবাড়ী হতে দালাল ধরিয়া, তার বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করিয়া, ইন্ডিয়া পার হয়া যাইবেন। অমাবস্যার রাইতও আছে। চিন্তা নাই।

[বাঁশবনের ভেতর দিয়ে পথটা আরো আঁধার। চলতে গিয়ে কঞ্চির ঘায়ে কাশেমের শরীর চিড়বিড় করে। কাশেম বিরক্ত হয়ে বলে—]

কাশেম            :           এ কোন পথ দিয়া আনলি রে!

[আবু বকর কিছু না বলে নিঃশব্দে পা চালিয়ে চলে। হঠাৎ বাঁশবনটা শেষ হয়ে যায়। যেন একটা সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে জগতে তারা পা রাখে। উঁচু উঁচু ঘাস আর কাশে ছাওয়া ডান দিকটা। পায়ের নিচে কুশগাছের চাদর যেন। পা রাখতেই পায়ে কুশ ফোটে। কুশের ফলা পাজামায় আটকে যায়। কাশেম ভীত গলায় বলে—]

কাশেম            :           সাপে না কাটে!

আবু     :           দুলাভাই, সাপের চেয়ে মানুষকেই এখন বেশি ভয়!

[আবু বকরের এই দার্শনিক কথা কাশেমের একেবারেই পছন্দ হয় না। সে ব্যাগ দুটো আবু বকরের কাছ থেকে থাবা দিয়ে কেড়ে নিয়ে বলে—]

কাশেম            :           ফিরি যাও তুমি। আর তোমার পথ দেখানির দরকার নাই। তোমার পাছে পাছে চলিয়া না শেষে বিডিআর কি বিএসএফের সাক্ষাতে গিয়া পড়ি!

[ততক্ষণে একটা পুরনো ভাঙা কবরের কাছে এসে গেছে ওরা। আবু বকর টর্চের আলো ফেলে কবরের ওপর। কবরটা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।]

আবু     :           আমিও এখান হতেই ফিরি যাব, সে কথা তো হয়াই আছে। তবে দেখেন। এই যে কব্বর!

[ঘাস আর কাশবনের ভেতরে হঠাৎ একটা কবর। আশপাশে আর কোনো গোর নেই, শুধু এই একটাই। ইট দিয়ে বাঁধাবার চেষ্টা হয়েছিল কোনোকালে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কন্টিকারি গজিয়েছে। কবর ফুঁড়ে বুনো একটা মোটা গাছ উঠেছে। সাপের ফণার মতো একেকটা পাতা। সাদা ঝুরির মতো ফুল। তীব্র ঘ্রাণ। কবরের একদিক বসে গিয়ে গভীর গর্ত হয়ে আছে। কাশেম ভীত স্বরে প্রশ্ন করে—]

কাশেম            :           কার কব্বর রে?

আবু     :           মান্দারবাড়ির মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেনের কব্বর।

[গা ছমছম করে ওঠে কাশেমের। সে ভয়ার্ত চোখে চারদিকে তাকায়।]

আবু     :           এই কব্বর দেখিলেই বুঝিতে পারিবেন আমার দ্যাশের অবস্থা কত দূর খারাপ। আমার বড় ইচ্ছা করে কব্বরটা বাঁধায়া দিই। লাইব্রেরির যে পয়সা পাই পাঠকের কাছ থেকে, সে পয়সা আমি আলাদা রাখি। শতখানেক টাকা জমা এখন। টাকা যখন আরো জমিবে, অনেক জমিবে, তখন আকবর হোসেনের এই কব্বরখানা বান্ধায়া দিব! এই কব্বরে যে পবিত্র লাশ।

কাশেম            :           লাশের চিন্তা ছাড়ান দিয়া জীবনের চিন্তা করো, শালা! লাশের কব্বর না বান্ধায়া নিজের জীবন বান্ধাও হে! আমি আগাই।

[বলে বটে কাশেম, কিন্তু ইতস্ততও করে। থম ধরে আরো খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বলে—]

কাশেম            :           নাহ্, তোমাকে টাইম দেওয়া যায় না। যা করিবার আশু করা দরকার। আমার ওদিকেও বিপদ। আত্মীয় যদি আত্মীয়র কাজে না আসে, তবে? নূরজাহানের ব্যাপারে আম্মার মত আছে। তার সাথে আমার পরিষ্কার কথা হয়। তোমারও অমত নাই বলিয়াই মনে হয়। তোমার বুবুও খুশি হইবে। খুশির চেয়ে বড় কথা, নিশ্চিন্ত হইবে তাঁই। তবে আর বিলম্ব কিসের? ভালো থাকিও। আর হ্যাঁ, দিন-তারিখ হইলে নূরজাহানকে হস্তিবাড়ী আনা হইবে। বিয়াটা তোলা বিয়াই হইবে। তুমি সুখী হইবে।

[অকস্মাৎ আবু বকরকে আলিঙ্গনে বাঁধে কাশেম। আবু বকর আচ্ছন্নের মতো পড়ে কাশেমের বুকে আটকা পড়ে থাকে। সে ফুঁপিয়ে ওঠে। কাশেম তাকে ঠেলা দিয়ে ছাড়িয়ে হাত ধরে কিছুক্ষণ থাকে। তারপর ঝট করে অগ্রসর হয়। কাশেম ঘনায়মান অন্ধকারের ভেতর দ্রুত বিলীন হয়ে যেতে থাকে। আবু বকর কবরের পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।]

 

দৃশ্য ৯১

[আবু বকরের দোকান। সন্ধ্যা। লণ্ঠনের আলো বাড়িয়ে দেয়। ক্রেতারা আসে। বাস থামে। বাস চলে যায়। তার ওপরে নেপথ্য বর্ণনা।]

নেপথ্য            : একদিকে তার দুলাভাইয়ের বোন নূরজাহানের সাথে বিয়ের প্রস্তাব। অন্যদিকে মালতি। গভীর এক ঘোরের ভেতরে আবু বকরের দিন অতিবাহিত হতে থাকে। মালতিকে নিয়ে এক বৃষ্টির বিকেলে সে যে মুহূর্তের জন্য সংসার কল্পনা করে উঠেছিল, মনে করতে ভালো লাগে তার। জলেশ্বরীর হুরির কথা সে হয়তো ভুলে গেছে, সময়ে-অসময়ে এখন তার মনে পড়ে যায় মালতিকে। মাঝে মাঝে সে মালতির বাড়িতে যায়।

 

দৃশ্য ৯২

[মালতির বাড়িতে আবু বকর আসে। তার হাতে একটা ছোট প্যাকেট। মালতি রান্না করছিল।]

মালতি            :           আইসো হে, বকর ভাই, খাওয়াদাওয়া করি যান। কত দিন পরে মনে পড়িল।

আবু     :           না রে, আমার টাইম নাই। মনে পড়িল, তাই আসিলাম। দোকান অধিকক্ষণ বন্ধ থাকিলে ক্ষতি।

[মালতি রন্ধন করতে করতে হাসে আর বলে—]

মালতি            :           ক্ষতিরই জগৎ। কন দেখি, ক্ষতি কোনখানে নয়?

[আবু বকর গম্ভীর চোখে তাকিয়ে থাকে। চুলার আগুনের তাপে মালতির মুখ যেন পুষ্পটি হয়ে আছে।]

মালতি            :           এইবার সংসার করেন। আর কত দিন?

আবু     :           কত দিনের কোনো দিন নাইরে, মালতি!

মালতি            :           না, না, কাকিমার দুঃখ দূর করেন। সংসারী হন। দোকানও তো ভালোই চলিচ্ছে।

আবু     :           কোনঠে আর ভালো! ওই চলি যায় কোনোমতে!

মালতি            :           তবু তো চলি যায়! ভগবান তো বিরূপ নয় আপনার পরে। সংসার করেন।

[আবু বকর হেসে বলে—]

আবু     :           আচ্ছা, দেখি!

[আবু বকর প্যাকেটটা মালতির দিকে বাড়িয়ে ধরে।]

মালতি            :           কী এইখান?

আবু     :           ধরো, তোমার বাচ্চার জন্য। খেলনা।

[মালতি প্যাকেটটা নিয়ে খুলে দেখে বলে—]

মালতি            :           আহ্, করেন কী, বকর ভাই! মিছা এত খরচা করেন।

[ঠিক এই সময়ে মালতির বাবা নগেন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।]

নগেন :           কে রে! আবু বকর! কতক্ষণ?

আবু     :           এই নগদে আসিছি। দোকানে যাব। কেমন আছেন, কাকা?

নগেন :           আর থাকা! বকর, দিন যে ক্রমে খারাপ হতে খারাপে হয়া যাইচ্ছে।

[আবু বকর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।]

আবু     :           কী কন, কাকা? কেন, কী হইছে?

নগেন :           সে কথা আর না কও, বকর মিয়া। পচা পনির ঘন ঘন আসে। দাবাড় দিয়া যায়। আমাকে কয়, তোমরা হিন্দুর দল নৌকায় ভোট দিছেন গতবার। এইবার নির্বাচনে নৌকায় যদি যান, তবে কল্লাখান রাখিয়া দিয়া নৌকায় উঠিবেন।

[শিউরে ওঠে আবু বকর। নগেন গামছা নিয়ে কুয়ার পাড়ে যায়। আঙিনায় তখন কোল পেতে বসে আছে মালতি। কোলে কন্যা। কন্যাকে সে খেলা দিচ্ছে।]

আবু     :           বেটির নাম কী রাখিছ, মালতি?

মালতি            :           ভালো নাম এখনো নাই। ছটাকি বলিয়া ডাকি।

আবু     :           ছটাকি?

মালতি            :           জন্মের সময়ে এতটুক ছিল যে, বাবা দেখিয়ায় কয়, ছটাকের ওজন! সেই হতে ছটাকি বলিয়া ডাকে বাবা। তার বাদে নামে হয়া যায় ছটাকি!

[মালতি নত হয়ে ছটাকির মুখে চুমু খায়। ছটাকির মুখে মুখ ঘষতে ঘষতে উম্ম্ম্ করে শব্দ তোলে। পাঁচ মাসের শিশু। খলখল করে হাসে। তারপর মায়ের হাতে থাবা বসায়। কিছুক্ষণ কাড়াকাড়ি করে ছটাকি হঠাৎ মায়ের একটি আঙুল অধিকার করে। হেসে ওঠে। তার ছোট্ট কচি মুঠোর মধ্যে মায়ের করে আঙুলটি সর্বশক্তি দিয়ে ধরে থাকে। আবু বকর বস্ফািরিত চোখে তাকিয়ে থাকে।]

মালতি            :           কী দ্যাখেন?

আবু     :           মনে আছে?

মালতি            :           কোন কথা, বকর ভাই?

আবু     :           সেই যে বিষ্টির দিনে দোকানে আসিয়া বলিলে জননীর কথা, জননীর কোলে সন্তানের কথা। বলিলে, বাচ্চার আঙুলে কিবা জোর! মরণের পার হতে জীবনের দিকে টানি ধরে!

[মালতি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে।]

 

দৃশ্য ৯৩

[আবু বকর দোকানে আসে। হঠাৎ সে দূর থেকে দেখতে পায় তার দোকানে ঝাঁপ বন্ধ। কাজের ছেলে সামু তেঁতুলতলায় বসে আছে। আবু বকর দাঁড়িয়ে পড়ে। একটা বিড়াল রাস্তা পার হয়ে যায়। কোথাও শিয়াল ডেকে ওঠে। আবু বকর এগোয়।]

আবু     :           কিরে, সামু? স্তব্ধ মারি বসি আছিস যে!

[সামু হা হা করে কেঁদে ওঠে।]

সামু     :           তোমার বই! সন্ধ্যার আগখানে আসিছিল। নিয়া গেছে!

আবু     :           আরে কইস কী তুই? ভাঙ্গিয়া ক।

সামু     :           বঙ্গবন্ধুর ছবি আছে যে যে বইয়ের ওপর, সেই বইগুলা পচা পনিরের দল আসি তালাশ করে। সমুদয় আউলিয়া দ্যাখে তারা। যে যেখান পায় তারা ছিঁড়িয়া ফালায়। তার বাদে ডোবার পানিতে ছুড়ি মারে। ধমক দিয়া যায়। যাবার কালে কয়া যায়, এইগুলা বই রাখিলে দোকানে তারা আগুন দিবে। আমি সেই হতে তোমার পথ চায়া বসি আছোঁ দোকান বন্ধ করি।

[স্তব্ধ হয়ে যায় আবু বকর।]

সামু     :           তোমার সাইনবোডও তারা ভাঙ্গি ফেলাইছে।

[আবু বকর দেখতে পায় ছেলেটির হাতে টিনের টুকরাটি। তার লাইব্রেরির নাম লেখা। দুমড়েমুচড়ে ফেলা। তার ভীষণ ভয় করে। সে টিনের টুকরাটা নিয়ে সতর্ক ভীত চোখে চারপাশে তাকায়। বিড়াল রাস্তা পার হয়। শিয়াল ডেকে ওঠে। আবু বকর দোকানের তালা টেনে টেনে পরীক্ষা করে দেখে। সাইনবোর্ডের দুমড়ানো টিনখানা দোকানের পাটাতনের নিচে গুঁজে রাখে।]

আবু     :           চলরে, বাড়ি যাই। সাইনবোর্ড বা বইয়ের এই কথা নিয়া দশকান না করিস! মা য্যান না জানে। জানিলে তাঁই খুব চিন্তায় পড়িবে। খবদ্দার!

[দুজনে পথ চলতে চলতে—]

সামু     :           না, কাউকে কব না! তবে, বুদ্ধি কী করিবেন? তারা যে অনেক অনেকজন!

[হঠাৎ এই সত্যের সমুখে পড়ে আবু হাবুডুবু খায়।]

 

দৃশ্য ৯৪

[বাড়িতে ঢুকে আবু বকর মাকে পাকশালে পায়। চুলার আগুনে মায়ের রাঙা মুখখানা দেখে সে স্তব্ধ হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর পিঁড়ি টেনে মায়ের কোল ঘেঁষে বসেই সে ছমছমে গলায় বলে—]

আবু     :           মা, এখন বিবাহের কথাবার্তা ছাড়ো!

[মা হতভম্ব হয়ে ছেলের দিকে তাকায়।]

মা        :           হঠাৎ এ কথা কেনে রে! দুলাভাইকে যে আগায়া দিতে গেইলি, পথে কোনো কথার বিবাদ হইছে?

আবু     :           না, বিবাদ হইবে কেনে? তার ভালো সে দেখিচ্ছে, আমার ভালো আমি দেখব না?

মা        :           তোর ভালো কিসে? তোর ভালো একা এই পাগলার মতো জীবন?

আবু     :           পাগলার জীবন তুমি কোথায় দেখিলে?

[একটু থেমে আবু রহস্যময় আরো একটা কথা বলে—]

আবু     :           তবে এই জীবনও সুস্থির সুস্থ জীবন নয়! কারো নয়!

[মা চমকে ওঠে। ছেলের বুকে হাত রাখে। চুলার আগুনে দপদপ করে বুকের ওপর মায়ের হাতখানা।]

মা        :           বাপো রে, জীবনের জীবন মোর।

[ঘোর কেঁদে ওঠেন মা।]

আবু     :           সুস্থ বা কোথায় আছে জগতে? তোমার কাছে আসিলে সুস্থ। তোমার মুখ দেখিলে সুস্থ। জননীর মতো যদি নারী হয় কোনো, তবে তার কথা আমাকে কইয়ো।

[তার ও মায়ের ওপরে শট। আবু খেতে বসেছে। আবু বিছানায় শুয়ে পড়ছে। মা বাতি নিভিয়ে দিয়ে ছেলের মাথায় হাত বোলাচ্ছে। নেপথ্যে বর্ণনা এবং সেইভাবে শটগুলো নিতে হবে বর্ণনা অনুসারে।]

নেপথ্য            : সারা রাত ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের মধ্যে আবু বকর তেঁতুলগাছের প্রাচীন গায়ে দুমড়ানো সাইনবোর্ড গজাল ঠুকে ঠুকে লাগায়। সারা রাত ডোবার পানিতে বইয়ের ছেঁড়া পাতা ভাসে। পাতাগুলোতে কালচে লাল রং ধরে। যেন একাত্তরের রক্তের মতো সেই রং। আবুর স্বপ্নের ভেতরে শ্রী নগেন্দ্র বর্মণ আর্ত-ভীত স্বরে ডেকে ওঠে, বকর, বকর রে! মালতির কন্যাটি কেঁদে ওঠে। আবু মালতিকে মাঠ ভেঙে ছুটে যেতে দেখে। স্তম্ভিত হয়ে যায়। মালতির শরীরে যে বস্ত্র নেই! সে একখানা শাড়ি নিয়ে মাঠ ভেঙে মালতির পেছনে পেছনে ছোটে।]

[আবু বকর ঘুম থেকে জেগে ওঠে ধড়মড় করে। শিয়াল ও খাটাশ ডেকে ওঠে।]

 

দৃশ্য ৯৫

[দোকানের পাশে আবু বকর আবার সেই শহীদ টিটু লাইব্রেরির দুমড়ানো টিনের ফলকটি ঠিকঠাক করে। কিন্তু তেঁতুলগাছের গায়ে লাগাতে গিয়েও ইতস্তত করে। সাহস হয় না। গাছের গায়ে ফলকটি ধরে, গজালের মুখে হাতুড়ি ধরেও ঠুকতে সে পারে না। তার হাত কাঁপে। হাজির হয় পচা পনির ও তার দল।]

পনির :           কিরে, বকর! কেমন আছিস?

আবু     :           চলি যায়! ভালোই আছি!

পনির :           ভালো থাকিলেও ভালো! চা দে!

[আবু বকর একটু চিন্তা করে।]

আবু     :           দিই।

[চা বানাতে বানাতে সে বলে—]

আবু     :           কাজটা কী করিলেন তোমরা? বইয়ের ওপর রাগ করা ভালো নয়।

পনির :           ভালো-মন্দ তুই নিজেরটা বুঝিয়া দ্যাখ। বেশি যদি বঙ্গবন্ধু করিস, তোর এই দোকানও একদিন যাইবে।

[আবু চুপচাপ চা বানাতে থাকে। তার ভেতরটা রাগে গজগজ করতে থাকে। রাস্তায় গর্জন করে ওঠে বাসের হর্ন। বাস এসে যায়। যাত্রীরা ওঠানামা করে। আমরা দেখি, হুরি বাস থেকে নামে। বাস থেকে নামা অন্য প্যাসেঞ্জাররা ঘুরে ঘুরে তাকে দেখে। কালো চশমা পরা এই নারী তাদের কাছে ঘোর রহস্যের বিষয় হয়ে যায়। হুরি দোকানের কাছাকাছি এসে পড়ে। দূর থেকেই আবু বকরকে সে চিনতে পারে। এত সহজে, এত নিকটে, একেবারে বাসস্টপের কাছেই আবু বকরের দেখা পাবে, সে আশাই করেনি। হুরি ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে। ওইখানে দাঁড়িয়েই সে আবু বকরকে দেখতে থাকে। মাথা নিচু করে, গভীর মনোযোগ দিয়ে, আবু বকর চা বানাচ্ছে। দোকানের বেঞ্চিতে তিনজন মানুষ। দাঁড়িয়ে আরো দুজন। তাদের সবার জন্য চা হচ্ছে। আবু বকর গ্লাসের পর গ্লাসে কেটলি থেকে লিকার ঢেলে চলেছে। ওই চামচ নাড়ছে সে দ্রুত। গ্লাসে চামচের অবিশ্রান্ত টিং টিং শব্দ এত দূর থেকেও পাওয়া যাচ্ছে। হুরি ইতস্তত করে। হুরি দোকানের দূরে, রাস্তার পাশে বুনো ঝোপের আড়ালে নিজেকে টেনে নেয়। দাঁড়িয়ে থাকে। যুবকরা চা খেয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে গ্রামের ভেতরে নেমে যায়। দোকান লোকশূন্য হয়ে যায়। হুরি ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে। আবু বকরের দিকে অগ্রসর হয়। হুরি দেখতে পায় ভীত একজোড়া চোখ! আবু বকরের চোখ স্থির হয়ে থাকে। হুরি চোখ থেকে কালো চশমা খোলে। মাথা-মুখ জড়িয়ে ছিল ওড়নার আঁচল। আঁচলটি সে ধীরে খুলে আনে। আবু বকরের চোখে প্রাণ আসে। চোখের পাতা ঘন ঘন পড়ে। আবু বকরের হাতের গ্লাস বালতির ঘোলা পানিতে টুপ করে পড়ে যায়। হুরি ডাকে।]

হুরি      :           মাস্টার!

[হুরির গলা শুনে আবু বিস্মিত হয়ে উঠে দাঁড়ায়।]

হুরি      :           আসিলাম!

[কথাটার অর্থ আবু উদ্ধার করতে পারে না। দোকানের নীল থাম ধরে সে প্রশ্ন করে—]

আবু     :           কোথায়?

হুরি      :           আপনারে কাছে।

[দোকান থেকে লাফ দিয়ে নেমে আবু বকর বলে—]

আবু     :           হুরি, তুমি এদিকে কোথায়?

হুরি      :           বলিলাম তো! আপনারে কাছে।

[আবু বকর বস্ফািরিত চোখে তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘ উপবাসী চোখে হুরিকে সে দৃষ্টি দিয়ে গ্রাস করতে থাকে। এই হুরি! সংসারী, ভার ভরাট, ঠোঁটে লাল দেওয়া, হাতে চুড়ি পরা, গলায় হার এই নারীর ভেতরে সেদিনের সেই ছিপছিপে তেজি মেয়েটিকে সে খোঁজে।]

হুরি      :           ফেরার বাস কোন টাইমে পাওয়া যাইবে?

আবু     :           আধাঘণ্টার ভিতরেই আসিবে।

[আবু বকর নির্বাক তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে—]

আবু     :           কেন আসিলে, হুরি? ভালো আছ, হুরি? কোন খেয়ালে আসিলে তুমি হস্তিবাড়ী? কী দেখিতে আসিলে? এই দেখিতে যে সব কিছু ক্রমে হস্তছাড়া? আমার দোকান ভাঙা, দেখিতে আসিলে? পিছনে ঢাকিয়া চাপিয়া রাখা বইগুলা দেখিতে আসিলে? ইচ্ছা ছিল, যদি দেখা হয়, যদি হস্তিবাড়ী আসো, এই দোকান দেখাব। তাক ভরা সামগ্রী দেখাব। বই দেখাব। বাকসো ভরা বেচাকিনার টাকা খুলিয়া দেখাব। দোকানে মানুষের ভিড় তোমাকে দেখাব। ভালো আছি তোমাকে দেখাব। তার বদলে তুমি এই উচ্ছন্ন দোকান দেখিলে! লুট হওয়া শূন্য তাক দোকানে দেখিলে! ছিঁড়া আমার বই দেখিলে। ভাঙা এই আমাকে দেখিলে!

[আবু বকরের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। কথাগুলো তার বুকের খাঁচায় ঝটপট করে। আছাড় খায়। চোখে পানি এসে যায়। সে চোখ মোছে। হুরি চোখে কালো চশমা আবার পরে নেয়। দ্রুত হাতে সে ওড়নায় মাথা ঢাকে, মুখ ঘিরে ওড়না জড়ায়। চারদিক সতর্ক সন্ত্রস্ত চোখে দেখে নেয় একবার। তেঁতুলগাছটি হঠাৎ ঝুরঝুর করে পাতা ঝরায় হুরির ওপরে। ওড়নার বস্ত্রে সবুজ চুমকি হয়ে আটকে পড়ে পাতা।]

আবু     :           বইসো, হুরি। চা করি দিই। কতকাল পরে দেখা! বাড়ি চলো। বাড়িতে মাও আছে। খাওয়াদাওয়া করিবে।

হুরি      :           মাথা খারাপের কথা কন, মাস্টার! অনেক কষ্ট করিয়া আসা। কেউ না দেখিয়া ফেলে। দেখিলে আর রক্ষা নাই। মারিয়াই ফেলিবে। কয়েকটা কথা। আপনিও ভালো নাই দেখি।

আবু     :           আমি ভালো আছি, কিন্তু তুমি ভালো? তোমার স্বামী? এদিকে বা কিসের জন্য হঠাৎ আসা পড়িল?

হুরি      : এ কেমন মানুষ? বলিলাম আপনারে কাছে আসা। একবার নয়, দুইবার তো বলিলাম। আমার সায়েব ঢাকা গেইছে। সেই সুযোগে আমার আসা। আপনার জানা আছে তার রাজনীতি কী?

আবু     :           জানা নাই। তবে তোমার স্বামী বশার উকিলের ব্যাটা যখন, ধারণা একটা হয়। একাত্তরে রাজাকার ছিল বশার উকিল। তার ব্যাটাও বাপের পথ ধরিবে, আশ্চয্য কী!

হুরি      :           পচা পনিরকে দেখিলাম আপনার দোকানে। সে আমার স্বামীর দলে আছে। এই দিকের দায়িত্ব সে পচা পনিরকে দিছে। সেই দিন পচা পনির বাড়ি আসে আমার। বাংলাঘরে লম্বা আলোচনা হয়। শ্বশুরের ব্যাটার কাছে সে রিপোর্ট দেয়, মুক্তিযুদ্ধের একখান লাইব্রেরি সে ভাঙ্গি দিছে হস্তিবাড়ীতে। হস্তিবাড়ী শুনিয়াই আমার জান উড়ি যায়। কার লাইব্রেরি? তখন আপনার নাম পচা পনির করে। বুক কাঁপি ওঠে। আমার স্বামী পুছ করে, বকর না তোমাদের বাড়িতে মাস্টার ছিল? আমি অতীত কথা গোপন করি। জবাব দিই, পড়িয়া ছিল বাহিরবাড়িতে! ফেল করি চলি গেইছে। বিদায় হয়া গেইছে!

আবু     :           বিদায়? বিদায় তো নিবার চাই নাই! তুমি ভালো করিয়াই জানো।

হুরি      :           আপনার কথা খুব মনে পড়ে। ভাতের গরাস মুখে তুলিয়া কত দিন মনে পড়িছে ভাত না খায়া একদিন বিদায় নিছে মাস্টার।

[দুপুরের খররৌদ্রে হঠাৎ এক তপ্ত হাওয়া আগুন আনে। হুরি ছটফট করে উঠে বলে—]

হুরি      :           যাওয়া লাগে! কোথায় কে দেখিয়া ফেলে! আমার স্বামীর কাছে পচা পনির রিপোর্ট দিছে, হিন্দুপাড়ায় আপনার ঘন ঘন যাওয়া-আসা, আপনি হিন্দুবাড়ি যান।

আবু     :           হিন্দুবাড়ি? নগেন কাকার বাড়ি যে হিন্দুবাড়ি, সে কথা অবান্তর।

হুরি      :           বান্তর কি অবান্তর, সেগুলা কথা নয়। সময় খারাপ। এত কী আপনার হিন্দুর সাথে? নিজের মঙ্গল না চিন্তা করেন? ভাবিয়া না দেখেন কিছু দিনকাল কেমন পড়িছে!

[আবু বকর হুরির শাসনের সম্মুখে কুঁকড়ে যায়। হুরি তার মঙ্গল-অমঙ্গল নিয়ে এখনো চিন্তা করে তবে? সে গভীর চোখে তাকিয়ে থাকে হুরির দিকে।]

হুরি      :           যান কি না হিন্দুবাড়িতে?

আবু     :           হিন্দুবাড়িতে না, নগেন কাকার বাড়ি যাই। সে স্কুলের হেডমাস্টার। জানে-শোনে অনেক। আলাপ করিয়া শান্তি হয়। শিক্ষিত মানুষ আর কোথায় এই গেরামে?

হুরি      :           ইন্ডিয়া হতেও আপনার কাছে লোক আসে। মাস্টার, আপনি ইন্ডিয়ার বডার পর্যন্ত নাকি গেইছিলেন?

আবু     :           সে তো আমার দুলাভাইকে আগেয়া দিতে।

[হুরি সে কথায় কান না দিয়ে তীব্র গলায় বলে চলে—]

হুরি      :           ইন্ডিয়া হতে মানুষ আসিয়া আপনার সাথে নাকি শল্লা করে? আমার বাড়িতে এই নিয়া আলোচনা হয়। বারে বারে পচা পনির আপনারে নাম করে। অস্ত্র ধরি চলে তারা। যখন-তখন মানুষের হাত কাটি দেয়। চোখ তুলি নেয়। আমার পরান কাঁপি ওঠে। আপনাকে সাবধান করিবার জন্য আমার আসা। হস্তিবাড়ীতে হিন্দুর ভোট হইলেও দেড় হাজার হইবে। নৌকায় ভোট দেয় হিন্দুরা। তারা কয়, আর নয়। এইবার জনমের মতো হিন্দুর ঘর ঠাণ্ডা করি দিতে হইবে। আর হিন্দুর পিছনে যে যে মোসলমান আছে, তাদেরও হাত ভাঙ্গি দিতে হবে আগোতেই।

আবু     :           আমি রাজনীতির মধ্যে তো নাই, হুরি! আমাকে নিয়া এগুলা কথা কেন তবে?

হুরি      :           রাজনীতি করেন না করেন, মুক্তিযুদ্ধের বই তো পড়েন, দশজনকেও পড়ান। আমাকে যে বই দিয়া যান যাবার সময়, বঙ্গবন্ধুর জীবনী কি নয় সেখান?

[আবু বকর খুশি গলায় জানতে চায়—]

আবু     :           তুমি পড়িছ সে বই?

হুরি      :           আমি পড়িলে বা কি? না পড়িলেই বা কি? আমার সাধ্য আছে শ্বশুর আর তার ব্যাটাকে ঠিক পথে আনি? বাদ দেন সেসব কথা, মাস্টার! তারা আপনাকে না ছাড়িবে। নগেন মাস্টারকেও না ছাড়িবে। তার কথায় নাকি হেথাকার সকল হিন্দু ওঠে-বইসে। ভোটের সময় সবাই ভোট দেয়?

আবু     :           হ্যাঁ, তার কথার মূল্য আছে তাদের সমাজে।

[হুরি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে—]

হুরি      :           এই কথা বলিতে আমার আসা হয়। সাবধানে থাকিবেন। আমার নিজের বিপদের কথা ভাবি না। আমার জন্য চিন্তা না করেন, মাস্টার। আমি যাই।

আবু     :           বাস তো এখনো আসে নাই। দেরি আছে।

হুরি      :           আপনার হেথায় থাকাও ঠিক নয়।

[হুরি হনহন করে পিচ রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে। আবু বকর পেছনে হাঁটতে হাঁটতে বলে—]

আবু     :           একদণ্ড দাঁড়াও। দোকানটা বন্ধ করি আসি।

হুরি      :           না আসেন। না আসেন, মাস্টার। ভালো থাকেন। সাবধানে থাকেন।

আবু     :           আচ্ছা।

[হঠাৎ হুরি থমকে দাঁড়ায়। আবুর দিকে ঘুরে বলে—]

হুরি      :           ভয় না করেন। ভয় করিলেই ভয়।

[সড়ক দিয়ে একটা রিকশা ভ্যান যাচ্ছিল। হুরি হাত দিয়ে থামিয়ে ভ্যানে উঠে যায়। যেতে যেতে একবার পেছন ফিরে দেখে। মাথার ওড়না আঁটো করে ঘিরে নেয় হুরি। ভ্যান রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায়।]

 

দৃশ্য ৯৬

[আবু বকরের ক্লোজআপ। সে এখন বাড়িতে। মা তাকে ভাত বেড়ে দিচ্ছে। সে খুশিমনে খাচ্ছে। তার ওপরে নেপথ্যে বর্ণনা।]

নেপথ্য            : এও এক বিভ্রম বলেই মনে হয় আবু বকরের। হুরি কি এসেছিল? নাকি কল্পনাই তার? আবু বকর চিন্তা করে। হুরি তবে এখনো তার কথা ভাবে! তার বিপদের আশঙ্কা দেখে সাবধান করতে এসেছে! বিপদের ভয়ে ভীত হওয়ার বদলে আবু বকরের ভেতরে খুশি লাফিয়ে ওঠে।

 

দৃশ্য ৯৭

[আবু বকর দোকানের পাটাতনের নিচ থেকে লাইব্রেরির দুমড়ানো ফলকটা বের করে আনে। গজাল ঠুকে ফলকটা তেঁতুলগাছের গায়ে লাগায়। দোকানের পেছন থেকে বইগুলো সমুখে আনে। সে একটা তাক খালি করে বইগুলো সাজাতে থাকে। হঠাৎ চোখ তুলে দেখতে পায়, পচা পনিরের দল গ্রামের ভেতর থেকে এসে সড়কের ওপর বাসের অপেক্ষায় দাঁড়ায়। তাদের দেখে সে হঠাৎ ভীত হয়ে পড়ে। একজন দূর থেকে আবু বকরকে বই সাজাতে দেখে কাছে এগিয়ে আসে।]

যুবক   :           কি, বকর মিয়া, বই মোছেন?

[আবু বকর বই মুছেই চলে। যুবকটি ধমক দিয়ে ওঠে।]

যুবক   :           আরে আমি কিছু জিজ্ঞাস করি!

আবু     :           বইয়ে বড় ধুলা পড়িছে।

[যুবকটির পাশে তার অন্য সঙ্গীরাও এসে ঘন হয়।]

যুবক   :           আবার কি লাইব্রেরি?

আবু     :           হয়, হয়।

যুবক   :           নতুন বই?

আবু     :           না, পুরান, পুরান বই। নতুন বই কেনার পয়সা নাই।

যুবক   :           কেনে? ইন্ডিয়া হতে টাকা আইসে না?

[আবু বকর চমকে উঠে তাকায়।]

আবু     :           কী কন?

যুবক   :           না, কই যে ইন্ডিয়া হতে টাকা আইসে না? সেই টাকা দিয়া নতুন বই কিনিবার পারেন!

[যুবকদের গলায় নির্মম বিদ্রুপের স্বর। আবু বকর তীব্র প্রতিবাদ করে ওঠে—]

আবু     :           এগুলা কথা কী কন আপনারা? ইন্ডিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক কী?

যুবক   :           ইন্ডিয়ার সাথে সম্পর্ক না থাউক, হিন্দুর সাথে তো আছে! মালতির সাথে তো আশনাই আছে! সুন্দরী যুবতি হে। গাও-গতর ঘষাঘষি তো খুব চলিচ্ছে!

[আবু চিৎকার করে ওঠে। ভাষা ফোটে না তার মুখে। পশুর যন্ত্রণাকাতর ধ্বনি বেরোয় তার কণ্ঠ থেকে। হা হা করে হেসে ওঠে যুবকরা। ঠিক এই সময়ে বাস এসে যায়। যুবকরা হৈহৈ করে বাসে উঠে পড়ে।]

 

দৃশ্য ৯৮

[পড়ন্ত বিকেলে নগেন্দ্রনাথ বর্মণ আবুর দোকানে এসে দাঁড়ায়। লোকটাকে ভীষণ চিন্তিত দেখায়। মুখখানা থমথম করছে।]

আবু     :           কাকা!

নগেন  :           এরে বকর, কী করিস?

[নগেনবাবুর চোখে পড়ে তাকের ওপর সাজানো সারি সারি বই। গভীর উৎকণ্ঠা ফুটে ওঠে তার কণ্ঠে।]

নগেন :           আবার দেখি বই তুলিছিস তাকের পরে।

আবু     :           হ্যাঁ।

[ভীত চোখে নগেনবাবু বইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।]

নগেন :           জলেশ্বরী যাব। বশার উকিল খবর দিছে। জরুরি দেখা করিতে বলিয়া পাঠায়।

আবু     :           কেনে? রাজাকারের দল খবর দিছে কেনে? ডাকিয়া পাঠায় কেনে?

নগেন :           সামনে যে নির্বাচন আসিচ্ছে। আর কোন কারণ? সেই কারণ।

[নগেন দ্রুত পায়ে সড়কে যায়। রাস্তার ওপারে গিয়ে জলেশ্বরীর বাসের অপেক্ষা করতে থাকে। বাস অবিলম্বে আসে না। ]

 

দৃশ্য ৯৯

[আবু বকর দোকান বন্ধ করে বাড়ির দিকে যায়। বাড়ির সমুখে হঠাৎ সে থমকে পড়ে। তাকিয়ে দেখে, নগেন কাকা বাড়ির রাস্তার ওপরে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে।]

আবু     :           কাকা!

[নগেনবাবু ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। যেন পাথরের মূর্তি।]

আবু     :           কী হয়, কাকা? বশার উকিলের সাথে দেখা হয়?

[নগেন হঠাৎ উত্তেজিত স্বরে বলে ওঠে—]

নগেন :           কী মনে করিছে হামাক? ভয় দেখাইলেই ভয় পায়া গর্তে ঢুকি যাব?

আবু     :           কী, কইছে কী আপনাক? কী কয় তারা?

[সে কথার উত্তর না দিয়ে নগেন বলে—]

নগেন :           ভয় যে আমরা পাই নাই, দেখি যাউক তারা। তুইও তো লাইব্রেরি ভাঙ্গি দিবার পরে আবার লাইব্রেরি খাড়া করিছিস। দেখি যাউক। মুখের ওপরে কয়া দিয়া আসছি, ভয় না দেখান। নগেন্দ্রনাথ রাক্ষস দেখিয়া ভয় পাবার মানুষ নয়। রাইত অনেক হয়া যায়, বকর। বাদে সকল কথা হইবে।

[অন্ধকারে মিলিয়ে যায় নগেন কাকা। আবু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার ওপরে নেপথ্য বর্ণনা—]

নেপথ্য            : আবু বকরের কাছে এও আরেক বিভ্রম বলেই মনে হতে থাকে। বাস্তব যেন আর বাস্তব নয়। বিভ্রমই বটে। হুরি যে তার মঙ্গল কামনায় ছুটে এসেছিল, সেও বিভ্রম! নগেন কাকা যে বশার উকিলের সামনে দাপট দেখিয়ে এসেছে, এও আরেক বিভ্রম! এখন হয়তো বিভ্রমেরই কাল।

 

দৃশ্য ১০০

[পরদিন। গ্রাম্য দেবতার চালাঘর মন্দির। তার পাশ দিয়ে খালপারে হাঁটতে হাঁটতে নগেন্দ্রনাথ আবু বকরকে বলে—]

নগেন :           মন্দেরও শেষ আছে, বকর। আমাদের শাস্ত্রে আছে, মন্দ একদিন নিজেই নিজের শ্যাষ ডাকি আনে। এক অসুর। তার এত শক্তি, যা সে স্পর্শ করে সব ছাই হয়া যায়। পুড়িয়া-জ্বলিয়া চক্ষের নিমেষে সব ভস্ম হয়া যায়। জগৎ সে ভস্ম করিতে থাকে। দেবতাও না কিছু করিতে পারে তাকে। উল্লাসে তামাম জগৎ চষিয়া বেড়ায় অসুর।

[আবু গভীরভাবে চিন্তা করে। তার ওপরে নেপথ্য বর্ণনা—]

নেপথ্য            : আবু বকরের মাথার ভেতরে দাপাদাপি করে ভাবনা। অসুর কবে নিজেই নিজেকে ধ্বংস করবে, সেই আশায় বসে থাকা কতখানি সংগত? মানুষ তবে উদ্যমী হবে না? সক্রিয় হবে না? ভবিতব্যের ওপর সব দায় ছেড়ে দিয়ে মানুষ তবে বসেই থাকবে?

নগেন  :           বশার উকিলকে আমি বলি দিয়া আসিছি, আমার কথা কতখানি মানুষ শোনে জানি না। তবে আমি তাদের কব তোমরা মানুষ দেখিয়া ভোট দিয়ো। মুক্তিযুদ্ধ করিয়া এই দ্যাশ স্বাধীন করা হইছে। রক্তের সাথে বেঈমানি করার কথা আমাকে না কন!

 

 

দৃশ্য ১০১

[আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। নেপথ্য বর্ণনা।]

নেপথ্য            : পূর্ণিমার চাঁদ শুধু হস্তিবাড়ীতেই ওঠে না। চাঁদ জগত্জুড়ে ওঠে। উত্তর-দক্ষিণ, পুব-পশ্চিম আলো হয়ে ওঠে। মন্দ-ভালো সকল কিছুর ওপরে চাঁদের আলো পড়ে। সুখ-দুঃখ জীবনের দুই প্রান্তে আঁচল টান টান মেলে জোছনার বৃষ্টিধারা ধরে।

[এরপর একের পর এক শটে মন্তাজ দৃশ্য গড়ে তোলা হয়। জলেশ্বরী থেকে মান্দারবাড়ি পর্যন্ত আবার এক চাঁদের আলোয় ভেসে যায়। জলেশ্বরীতে বশার উকিলের বাড়িতে চাঁদ পড়ে। হুরির জানালা দিয়ে চাঁদ তেরছা হয়ে পড়ে। আধকোশা নদীর বুকে চাঁদ খলখল করে। নিজের ঘরে ঘুমের ভেতরে মাটির বুকে অচেনা শব্দ পায় আবু বকর। থরথর করে ওঠে মাটি। এক। দুই। তিন। পর পর তিনটি শব্দের ঝড় বয়ে যায় হস্তিবাড়ীর কাঁচা রাস্তা ভেঙে বর্মণপাড়ার দিকে। আবু বকর ঘুমের ভেতরে পাশ ফেরে। মা ঘুমের ভেতরে কেঁদে ওঠে। ধড়মড় করে উঠে বসে। শয্যা ছেড়ে উঠে এসে ঘুমন্ত আবু বকরের চাঁদে ধোয়া মুখখানি দেখে। আবু বকর ঘুমে তলিয়ে যায়। নগেন্দ্রনাথ বর্মণ পচা পনিরের দলের লাঠির আঘাতে আঘাতে অবসন্ন হয়ে পড়ে। অজ্ঞান তার দেহ আঙিনায় পড়ে যায়। মালতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পচা পনির। মালতি শিশুকে নিয়ে মাটিতে মাদুর পেতে ঘুমিয়ে ছিল। বস্ত্রে সে টান অনুভব করে। শিশুটি চিৎকার করে ওঠে। মালতি পচা পনিরের হাতে কামড় দেয়। মালতির দেহ থেকে বস্ত্র খসে পড়ে। পচা পনিরকে ধাক্কা দিয়ে মালতি আঙিনায় ছুটে বেরোয়। চাঁদের আলোর ভেতরে সে ছুটতে থাকে। তার পেছনে পেছনে পচা পনির ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে মালতি পাগল্লির খাল পর্যন্ত দৌড়ে যায়। পথের শেষ এখানেই। আর সে কোথায় পালাবে? খালের পারে সে থমকে দাঁড়ায়। ভরা পূর্ণিমার আলোয় পানি নাচে। পচা পনিরের দল নিকটবর্তী হয়। ওই তারা এসে যায়! ওই তারা মালতিকে ধরে ফেলে বুঝি! মালতি চিৎকার করে খালের পানিতে ঝাঁপ দেয়। পারের কাছে এসে থমকে যায় ওরা। দৌড়ের ঝোঁকে প্রায় টাল খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল পানিতে, সামলে নিয়ে তারা চিৎকার করে ওঠে—]

যুবক   :           উঠি আয়!

[মালতির কানে হঠাৎ তার বাচ্চার চিৎকার ভেসে আসে। তার মনে পড়ে, সে কোলের শিশুকে ফেলে এসেছে। কোমর পর্যন্ত পানিতে নেমেছিল মালতি। আর এক পা বাড়াতেই পায়ের নিচে অতল দেখে সে সাঁতার দিয়ে ওপারে যাওয়ার জন্য দুই হাত বাড়িয়েছিল, সন্তানের কথা মনে পড়তেই নিথর হয়ে যায়। ঝটিতি হাত ফিরে আসে। বিদ্যুদ্বেগে ঘুরে দাঁড়ায়। সন্তানের নাম ধরে মালতি চিৎকার করে ওঠে।]

মালতি            :           ছটাকিইইই!

[পূর্ণিমার চাঁদ কালো মেঘে ঢেকে যায়। মালতি খালের পানি ঠেলে দ্রুত উঠে আসতে থাকে পারে। যুবকরা নত হয়ে সাঁড়াশির মতো হাত বাড়িয়ে ঘের রচনা করে। যেন হাডুডু খেলা! মালতিকে ধরার জন্য যুবকরা দুই হাত বাড়িয়ে পায়ের ওপর ডানে-বাঁয়ে নাচানাচি করে। মালতির চোখেও পড়ে না। শিশুর কান্না শুনতে শুনতে অভিভূতের মতো সে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। এক পায়ের বেশি অগ্রসর হতে পারে না। পড়ে যায়। ভিজে সপসপে সায়া-ব্লাউজে তার পা আটকে যায়। সে উপুড় হয়ে পড়ে যায় খালপারে। মাটিতে মুখ বসে যায় তার। ‘ছটাকিইইই’ বলে ডাক ভেঙে ওঠে সে। যুবকরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। মুখে কাপড় গুঁজে দেয়। দুই হাত ধরে টানতে টানতে মালতিকে তারা ঘাসের ওপরে এনে ফেলে। পচা পনির ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর।]

নেপথ্য            : রক্তলাল পূর্ণিমার আলো। গাভির বাঁটেও অতঃপর দুধ-রক্তধারা দেখা দেয়। মালতিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। খালের পানি থেকে সোনার চুড়ি পরা হাত উঠে আসে। লালসা শেষে মালতিকে ওরা ছুড়ে ফেলে দেয় খালের পানিতে।

[মোটরসাইকেলের গর্জন। পচা পনিরের দল চলে যায় মোটরসাইকেল চালিয়ে। খালের পানিতে মালতির লাশ। খালের পানিতে একজোড়া হাত ভেসে ওঠে চুড়ি পরা। সেই হাত মালতিকে টেনে নিয়ে যায় পানির অতলে।]

নেপথ্য            : হস্তিবাড়ীর নারীরা স্মরণ করে ওঠে কবেকার সেই রাজবধূর কথা। সেই যে রাজবধূ, এক রাতে উন্মাদের মতো মান্দারবাড়ি থেকে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল খালে! সোনার চুড়ি পরা হাত দুটি বুঝি তারই। বর্মণপাড়া মণ্ডলপাড়া মালতিকে ভুলে রূপকথার জগতে প্রবেশ করে। অসহায় মানুষ যখন আর আশা দেখে না কোথাও, তখন এভাবেই তারা কঠিন বাস্তবতাকে বদলে নেয়। মালতি তাদের কাছে পরি হয়ে যায়।

[মাঠের ওপর দিয়ে ফিরতে ফিরতে সামু দেখতে পায়, আকাশে পরির আঁচল উড়ছে। সামু ভয় পায়। মালতি নেমে আসে পরির বেশে।]

মালতি            :           ডরাইস না, সামু। আমি মালতি। আমি তোর মালতি দিদি।

নেপথ্য            : মালতি কেন ফিরে আসে এই রূপে এই বেশে আবার তার জন্মগ্রামে? কী কথা তার না-বলাই রয়ে গেছে, বলতে আসে?

 

দৃশ্য ১০২

[আবুর দোকান। বেঞ্চে আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে রহমত চাচা ও আরো দু-চারজন বৃদ্ধ এবং দু-একটি তরুণ।]

রহমত             : সেই যে জিন নামায় পরি নামায় সেই গুনিন যদি থাকিত! তাকে যদি পাওয়া যাইত!

বৃদ্ধ ১   :           পাওয়া গেলে কী হইত!

রহমত             :           পরিকে ডাকিয়া সংবাদ নিতে পারিত।

বৃদ্ধ ২   :           কিসের সংবাদ? মালতিকে নাশ করিছে কারা, সকলেই জানে। পরির কাছ হতে নতুন কী জানিবেন!

বৃদ্ধ ৩ :           কত দিন আর এই কেয়ামত চলিবে!

রহমত             :           সেই একাত্তরের কথা মনে পড়ে, বাহে। তখন সেই গুনিন পরি নামায়। সেই পরি কয় কি নাই, শয়তানের গোড়ায় আগুন ধরান সকলে মিলিয়া। পরির কথা ঠিক হইছে কি হয় নাই? দ্যাশ কি স্বাধীন হয় নাই? শয়তান কি ধ্বংস হয় নাই?

[রহমত বিজয়ের ভঙ্গিতে সবার মুখের দিকে তাকায়।]

যুবক   :           শয়তান যদি ধ্বংসই হয়া থাকে, চাচা, তবে স্বাধীন দ্যাশে এরা কারা?

[রহমত যুবকদের দিকে ক্রুদ্ধ চোখে তাকায়।]

রহমত             :           তোমাদের কারণেই শয়তান মরিয়াও মরে নাই। তোমরা খুশিতে বাগবাগ হয়া ছিলেন। শয়তানকে না চিহ্নিত করিছেন, না তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিছেন। তোমাদেরই দোষে নতুন বেশে নতুন কালে শয়তান তাই আবার আসি দেখা দিছে। তার বিরুদ্ধে জোট বান্ধিতে পারেন নাই। এইবার এমন একজোট হন, রক্তবীজের শিকড় গোড়া হতে এমনভাবে তুলিয়া ফালান, আর য্যান জন্ম নিবার না পারে।

[রহমত চাচা কথাটা বলেই ঝট করে উঠে দাঁড়ায়। হনহন করে হাঁটতে থাকে বাড়ির দিকে। হঠাৎ উচ্চরবে গানের কর্কশ ধাতব আওয়াজ আছড়ে পড়ে। গান ও গর্জন করতে করতে লাউডস্পিকার মাথায় নিয়ে বাস ছুটে আসে। একটি নয়, দুটি নয়, পর পর তিন-তিনটি বাস। বাসের ভেতরে যুবকের দল। ছাদে যুবকের দল। বাসের সমুখে টানানো ব্যানার। বাসের হ্যান্ডেল থেকে ঝুলে নাচানাচি করছে যুবকরা। জানালা দিয়ে কেউ কেউ হাত বাড়িয়ে ডাল ভাঙা ফুলের ঝাড় নাচাচ্ছে।]

আবু     :           নির্বাচনে তবে বশার উকিলেরই জয় হইল!

বৃদ্ধ      :           দোকান এবার বন্ধই বুঝি হয় তোমার।

আবু     :           কেন?

বৃদ্ধ      :           দ্যাখো। আল্লা যা করে।

[বাস থেকে পচা পনির নেমে আসে। আবু বকর ভয় পায়। তার কণ্ঠ থেকে আর্ত শব্দ বেরোয়। অবিকল কোরবানির পশুর মতো। ছুরির সাক্ষাতে! পচা পনির মিটমিট করে হাসে। খিকখিক করে হাসে। ক্রমে তার শরীর দুলে দুলে ওঠে ক্রমবর্ধমান হাসির গমকে।]

আবু     :           এ রে, শহীদ টিটুর বাচ্চা, চা দে!

[আবু চা বানিয়ে দেয়। পচা পনির চা খায়। তার সঙ্গীরাও জুটে আসে। তারাও চা খায়।]

পনির :           এ রে বকর, তোর কিষান নাকি কয় নগেনের বেটি পরি হয়া গেইছে!

[আবু বকর এ কথার কোনো উত্তর দেয় না।]

আরেকজন      : মালতির সাথে এত পিরিত করিলি রে, খচ্চর। তাকে মোসলমান করিয়া বিয়াও যদি করিতিস!

[আবু বকর স্তম্ভিত হয়ে যায় শুনে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। পচা পনির সঙ্গীদের ধমক দিয়ে বলে—]

পনির :           বাদ দে এগুলা কথা! মালতির কথা আমরা কী জানি! কাঁই মালতি? কোনোকালে দেখি নাই। নগেনও বা কে?

[পচা পনির মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিতে দিতে বলে—]

পনির :           ভালো হয়া থাকিস, বকর! লাইব্রেরিখান বন্ধ করি দে। না করিলে দোকানে তোর আগুন দেব।

[গর্জন তুলে মোটরসাইকেল বেরিয়ে যায়। ঘোর ধূসর দীর্ঘ দেহ টেনে একটি সাপ আবু বকরের দোকানের পাশ থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর ডোবার দিকে রাজকীয় ভঙ্গিতে পেট টেনে সাপটি চলে যায়।]

 

দৃশ্য ১০৩

[সন্ধ্যার অন্ধকার, গ্রাম্য সড়কে সামু আসছিল। হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে সে চিৎকার করে ওঠে—]

সামু     :           পরি! পরি! ওই উড়ি যায়!

[গ্রামের দু-একজন মানুষ থমকে দাঁড়ায়। তারাও তাকায়। কিন্তু পরিটরি কিচ্ছু তারা দেখে না।]

লোক   :           এ রে, কোনঠে তোর পরি?

সামু     :           ওই! ওই যে!

লোক   :           কোনঠে?

লোক ২           :           আরে চলো, এ চ্যাংড়ার মাথা খারাপ হয়া গেইছে।

দৃশ্য ১০৪

[আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। অপার্থিব একটা আবহ সংগীত। আকাশে মেঘ। যেন মেঘ নয়, কারো শাড়ির আঁচল। কিংবা পরির বিস্তৃত ডানা। মাঠের ওপর দিয়ে সাদা পাতলা ওড়না উড়ে যায়। সংগীত তীব্র বাঁশিতে। সংগীত উত্তাল হয়ে ওঠে। মাঠঘাট খাল আবু বকরের দোকানের ওপর চাঁদের ধবল আলো।]

 

দৃশ্য ১০৫

[গভীর রাতে ঘন অন্ধকার আবু বকরের ঘরে। সে ঘুমিয়ে আছে। আগের দৃশ্যের তীব্র সংগীত এসে তার ওপরে কোমল ও অন্তরঙ্গ হয়। আবু বকর ঘরের ভেতরে যেন লঘু পায়ের শব্দ পেয়ে জেগে ওঠে। এরপর এই দৃশ্য না-বাস্তব না-স্বপ্ন, এভাবে চিত্রায়িত হবে। ঘরের ভেতরে পূর্ণিমার আলো পড়ে। সেই আলোয় সাদা স্বচ্ছ শাড়ি পরা মালতি যেন আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়।]

আবু     :           কে?

মালতি            :           আমি মালতি।

আবু     :           মালতি, তুমি তোমার সন্তান ছটাকিকে দেখিতে আসিলে?

[আবু বকরের শয্যায় যেন পালক পতনের শব্দ হয়। মালতি আবু বকরের বিছানার পাশে বসে। পালকের মতোই সূক্ষ্ম তার শরীরের ভার।]

মালতি            :           আসিলাম, বকর ভাই। সন্তান যে ছাড়ে না।

আবু     :           জননীও কি ছাড়ে?

মালতি            :           না। জননীও ছাড়িতে পারে না। জননীর আঙুল যদি সন্তান আঁকড়িয়া ধরে কঠিন মুষ্টিতে, জননীও কোলছাড়া করে না সন্তানে! আমার কোলে আনি দেন ছটাকিকে। বড় শীর্ণ সন্তান আমার।

[আবু বকর দ্রুত শয্যা ছেড়ে ওঠে। মাটিতে পা রাখে। আবু বকর দুয়ারের খিল খোলে।]

 

দৃশ্য ১০৬

[আবু বকর বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। দাওয়া থেকে নামে। আঙিনা পেরিয়ে ওপারের অন্য ঘরের দাওয়ায় সে ওঠে। সে দরজায় ধাক্কা দেয়। ঘুমন্ত চোখে দরজা খুলে মা আবু বকরকে দেখে চমকে ওঠে। কোনো বিপদ হয়নি তো? ছেলের মুখের দিকে ভালো করে তাকাতেই চোখে পড়ে আবুর চোখ দুটি বোজা! মা অবাক হয়ে যায়। ছেলের গায়ে হাতের ধাক্কা দিয়ে আর্তচিৎকার করে ওঠে—]

মা        :           কি, বাপ, কিরে কী হইছে তোর?

[আবু বকর জেগে ওঠে। চোখ খোলে। চোখের ভেতরে আলো-অন্ধকার খেলা করে। মাকে সমুখে দেখে, নিজেকে মায়ের চৌকাঠে দাঁড়ানো দেখে সে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ক্রমে সব মনে পড়ে তার। এই মনে পড়াটা সেই অপার্থিব সংগীতের মাধ্যমে ফোটাতে হবে।]

মা        :           নিন্দ্ না আসে তোর? আমার পাশে আসি শোও! কত জায়গা আছে আমার পাটিতে।

[আবু বকর ছটফট করে ওঠে।]

আবু     :           না, আমি ঘরে যাই।

[আবু নিজের ঘরের দিকে চলে যায় উঠান পেরিয়ে। মা শঙ্কিত চোখে তাকিয়ে থাকে।]

দৃশ্য ১০৭

[আবু বকর ঘরে ঢুকে দ্রুত শুয়ে পড়ে। চোখ বোজে। তার বোজা চোখের ভেতরে হাত বাড়িয়ে দেয় মালতি।]

মালতি            :           আমার কন্যা কই, বকর ভাই? তুমি যে আনিতে গেলে! তোমার কোল কেনে শূন্য?

আবু     :           শূন্য দেখি কাঁদিয়ো না, মালতি। এই কোল শূন্য নয়। এই কোলে দুঃখের ভার আমি বহন করি। বড় দুঃখ মানবজীবনে। মালতি রে, একেক সময় মনে হয়, দুঃখের সাগর বুঝি তার কোনো দিক নাই। সাগরে ডুবিয়া যায় পশ্চিমে যে সূর্য, ডুব দিলে তাকে যদি পাওয়া যায়! এত দুঃখের এই পৃথিবীতে তুমি আবার কেন আসিলে, মালতি?

মালতি            :           সন্তানের টানে।

[দৃশ্য ১০১ থেকে মালতির সেই শট রিপিট—সে খালের পানি থেকে শিশুর কান্না শুনে উঠে আসে। আবু মালতির হাত ধরতে যায়। কিন্তু তার হাত মালতির স্বচ্ছ হাতের ভেতর দিয়ে পার হয়ে যায়—ক্যামেরায় ডাবল এক্সপোজার বা মিক্সের মাধ্যমে এটা করা হবে।]

আবু     :           কই? কোথায়? মালতি? মালতি রে!

[আবু পাগলের মতো ঘরের ভেতরে মালতিকে সন্ধান করে। বাইরে মাঠের ওপর দিয়ে পূর্ণিমার ধবল আলোয় সাদা স্বচ্ছ ওড়না উড়ে যায়।]

 

দৃশ্য ১০৮

[গ্রাম্য পথের ধারে এক বৃদ্ধ টিউবওয়েল চেপে পানি খাওয়ার চেষ্টা করছে। হাতলে চাপ দিয়ে নলের কাছে আঁজলা পাততে না পাততেই পানি শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার সে চাপ দেয়। আবারও পানি ফুরিয়ে যায় আঁজলা পাতার আগেই। আবু বকর দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে। তার ওপরে নেপথ্য বর্ণনা।]

নেপথ্য            : অনেক সময় কত সামান্য তুচ্ছ ঘটনা আমাদের অনেক গভীরে গিয়ে কাজ করে। বুড়ো এই মানুষটিকে পানি খেতে বারবার ব্যর্থ হতে দেখে আবু বকর যেন স্বপ্নলোকের ঘোর থেকে মাটির কঠিন পৃথিবীতে ফিরে আসে। পৃথিবীর বাস্তবতা তাকে মূল ধরে টান দেয়। সে ছুটে গিয়ে টিউবওয়েলের হাতল ধরে।

আবু     :           চাচা, আমি চাপিয়া দিই। তুমি পান করো।

[ঝলকে ঝলকে গলগল করে টিউবওয়েলের নল থেকে পড়তে থাকে পানি। বুড়া কিষান আঁজলা পেতে পানি খেতে থাকে। ঠোঁট উপচে পানি পড়ে মুখ-দাড়ি-গেঞ্জি ভিজে যায় বুড়া কিষানের। তৃপ্ত হয়ে এবার সে কলের নিচে মাথা পেতে দেয়। যেন আবু বকরেরই উত্তপ্ত মাথায় শীতল ধারা নামে। সে হাসতে হাসতে বলে—]

আবু     :           চাচা, গোসল বা করিয়া নেন না কেনে?

                        বৃদ্ধ। গোসল? গোসল করিলেই কি জগৎ হতে সব ময়লা ধুয়া যায়?

[আবু বকর এ কথা শুনে স্তম্ভিত হয়।]

দৃশ্য ১০৯

[মালতির কাকার বাড়িতে দেখা যায় বুড়ি কাকিমার কোলে মালতির সন্তান ছটাকি। ছটাকিকে কাকিমা শান্ত করার চেষ্টা করছে। দুধ খাওয়াচ্ছে ঝিনুকে করে। আবু বকর সেখানে আসে। আবু বকর দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে। মালতির কাকা বাইরে থেকে মাছ ধরা জাল হাতে আসে। আবুকে দেখেই সে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে।]

কাকা :           বকর মিয়া?

আবু     :           আসিলাম, ছটাকিকে দেখিতে।

[কাকিমা ছটাকিকে কোলে নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে যায়। কাকা আবুর দিকে তীব্র চোখে তাকিয়ে থাকে। তারপর হাতের জাল দাওয়ায় নামিয়ে রেখে বলে—]

কাকা :           তোমরা আসিলেই হুজ্জত হয়, বকর মিয়া। কোন দিন না আমার ঘরেও আগুন দেয়।

[আবু বকর বিষণ্ন হয়ে বলে—]

আবু     :           না আসিতে কন তবে?

কাকা :           বউ-বেটি নিয়া থাকি তো! পচা পনিরের দল হামাকে নাশ করিবে। মালতি তো জীবন দিছে, আমাদেরও বা জীবন তারা নেয়।

[আবু স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরে বলে—]

আবু     :           বড় মন্দ দিন পড়িছে, কাকা। আপন মানুষও পর হয়া গেইছে! ভয় সবাকে গিলিয়া খাইছে! কিসের ভয়?

[কাট করে দৃশ্য ৯৫ থেকে রিপিট—]

হুরি      :           ভয় না করেন। ভয় করিলেই ভয়।

 

দৃশ্য ১১০

[আবু বকরের দোকানের সমুখে—একটা সাপ বুক টেনে টেনে চলে যাচ্ছে। আবু দাঁড়িয়ে দেখে। রাস্তার ওপারে পচা পনির মোটরসাইকেলে—চোখে কালো চশমা—তাকিয়ে দেখে এপারে আবু বকরকে। আবু বকরও তাদের দেখতে পায়। আবু বকর প্রথমে ভয় পায়। পচা পনিরও তাকে দেখতে থাকে। হঠাৎ আবু বকর একটা লাঠি নিয়ে সাপটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। আবু বকর দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে দোকান খোলে। পচা পনির মোটরসাইকেলে বসা অবস্থায়ই পায়ে পায়ে ঠেলে ব্যাক করে, যেন পশ্চাদপসরণ করছে আবু বকরের সাহসের সমুখে। আবু বকর চায়ের চুলায় ম্যাচ ধরাতেই আগুন গনগন করে ওঠে।]

 

দৃশ্য ১১১

[আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। মাঠের ওপর দিয়ে ভেসে যায় সাদা ওড়না। সামু ঘুমের ভেতরে চিৎকার করে ওঠে—]

সামু     :           ওই! ওই!

[মালতি সামুর কাছে নেমে এসে দাঁড়ায়।]

সামু     :           মালতি দিদি! তুমি না মরিয়া গেছ। ফির আসিলে?

মালতি            :           মাটির টান বড় শক্ত রে, সামু। মানুষ ফিরি ফিরি আসে। মরিয়াও না মরে।

 

দৃশ্য ১১২

[আবু বকর ঘুমিয়ে ছিল। তার ওপরে ওভারল্যাপ হয় দুলাভাই কাশেমের ডাক—]

কাশেম            : বকর! আবু বকর! বকর!

[মা ঘুমিয়ে ছিল। তার ওপরে ওভারল্যাপ।]

কাশেম            : আম্মা! আম্মা হে!

[আবু বকরের ঘুম ছুটে যায়। মা জেগে ওঠে তার ঘরে। আবু ছুটে গিয়ে দরজা খোলে। গোয়ালঘরে গাভি ডেকে ওঠে হাম্বা। মা বেরিয়ে যায় তার ঘর থেকে।]

 

দৃশ্য ১১৩

[পূর্ণিমার আলোয় ভেসে যাচ্ছে আঙিনা। আঙিনায় দাঁড়িয়ে আছে অপরূপ এক যুবতি। যেন এক পরি। সাদা পাখা তার পিঠের ওপর মেলন হয়ে আছে, আসলে শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে। আবু বকর বিহ্বল হয়ে যায়। স্বপ্ন না বাস্তব, নির্ণয় করতে পারে না। মা দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকে অবাক হয়ে। কাশেমকে এবার দেখা যায় যুবতির একটু দূরেই দাঁড়িয়ে। আবু এক পা এক পা করে সে অগ্রসর হয়। বাতাস লাগে পরির পাখায় যেন, পাখায় কাঁপন লাগে। কিন্তু সে উড়ে যায় না।]

কাশেম            :           আম্মা! আমি। বকর, আমি।

আবু     :           দুলাভাই! আপনি!

কাশেম            :           নূরজাহানকে আনিলাম।

[আবু বকর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে—তার চোখে পরি দর্শনের ঘোর।]

[আবু দেখতে পায় পাখার বদলে শাড়ির আঁচল। যুবতির পিঠের ঘের ছেড়ে আঁচলটি দীর্ঘ হয়ে বাতাসে ফুলে ফুলে উঠছে। কাশেম মায়ের কাছে গিয়ে বলে—]

কাশেম            :           নূরজাহানকে নিয়া আসিলাম, আম্মা! রাইতের অন্ধকারে বডার পার হয়া আসা কি সহজ?

[মা আলুথালু হয়ে পড়ে। দাওয়া থেকে ছুটে নেমে এসে মেয়েটির চিবুক তুলে ধরে। জোছনার দুধে ধুয়ে ওঠে নূরজাহানের মুখ। মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে মা ঘরের ভেতরে যায়। জোছনার আলোর ভেতরেই দাঁড়িয়ে থেকে কাশেম আবু বকরকে বলে—]

কাশেম            :           তুমি সুখী হইবে। তুমি চিন্তা না করিয়ো। দিন আবার হাসি উঠিবে।

[জগৎ কিন্তু শয়তানের নয়, জগৎ ফেরেশতার। জগৎ আবার পূর্ণিমার দুধে ধুয়া উঠিবে, আবু বকর।]

দৃশ্য ১১৪

[খালের পানিতে পূর্ণিমার আলো। পানির ভেতর থেকে উঠে আসে সোনার চুড়ি পরা দুটি হাত। কাট করে দেখা যায় খালের পারে দাঁড়িয়ে আছে লেখক। দেখছে। তার শরীর জড়িয়ে ধরে সাদা স্বচ্ছ ওড়না এসে ওড়ে। তারপর ওড়নাটি আবার নিজেই মুক্ত হয়ে ফ্রেম থেকে বেরিয়ে যায়। আকাশে পরির পাখার মতো ওড়না ভাসতে ভাসতে চলে যায়। লেখক ফ্রেমে টার্ন করে। কাট করে খাতার শেষ পৃষ্ঠায় লেখক লেখে—]

                        জগৎ শয়তানের নয়, জগৎ ফেরেশতার। শয়তানের দাপটে ভয়

                        করিলেই ভয়। সাহস করিলেই অতল কালো জল হতে অভয়ের

                        হাত জাগি ওঠে।

মন্তব্য