kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

চি ত্র ক লা

বিমূর্ত শিল্পের রাজনীতি

শরীফ আতিক-উজ-জামান

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



বিমূর্ত শিল্পের রাজনীতি

কেনেথ নোলান্ডের ছবি

আধুনিক কালের আগে রাজনীতি ও শিল্পের সম্পর্ক কেমন ছিল তা একবার ঘেঁটে দেখা যেতে পারে। এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে ধ্রুপদি যুগে এথেন্সে গোথিক গির্জার শিল্পকর্মে ক্যাথলিক বিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল। রাজা বা সম্রাটদের প্রতিকৃতি চিত্রণে বীরত্বব্যঞ্জক বৈশিষ্ট্যের প্রাধান্য দেওয়া হতো, যার ভেতর দিয়ে তাদের অহংকার ও কর্তৃত্ব তুলে ধরার প্রচেষ্টা ছিল। দৃশ্যগ্রাহ্য বা অবয়বগত শিল্পের মাধ্যমে জনগণের ওপর রাজনৈতিক প্রচার চালানোর এই কৌশলটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু আধুনিক শিল্পগতিধারা সেই বিষয়টিকে কিছুটা হলেও পাল্টে দিতে সক্ষম হয়েছিল। যত বিতর্কই থাক না কেন, ‘শিল্পের জন্য শিল্প’—এই স্লোগান সামনে নিয়ে যাঁরা অগ্রসর হয়েছিলেন, তাঁরা শিল্পকে রাজনৈতিক অপকর্মে ব্যবহৃত হওয়ার থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। শিল্পের সঙ্গে রাজনীতির যোগসূত্র থাকতেই পারে, কিন্তু শিল্পী নিজেকে আর ক্ষমতাদর্পীদের অধস্তন হিসেবে দেখতে কিংবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের সৃষ্টিশীলতাকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হতে দিতে চাইছিলেন না। সংবেদনশীল সামাজিক ঘটনাবলি যার মাঝে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ রয়েছে, এমন বিষয়ে শিল্পী প্রভাবশালীদের নির্দেশ না মেনে বা তাঁদের স্বার্থরক্ষার কাজটি না করে নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবনার প্রকাশ ঘটাতে লাগলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, ‘সব রাজনৈতিক শিল্প খারাপ, কিন্তু সব ভালো শিল্প রাজনৈতিক।’ বিমূর্তায়নের সূচনালগ্নে রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে শিল্পের সঙ্গে যে মধুচন্দ্রিমা যাপন করে আসছিল তাতে ছেদ পড়ল। সম্পূর্ণ নতুন এই শিল্পধারা অবয়বগত বা দৃশ্যগ্রাহ্য পরিপার্শ্বকে বিবেচনায় না নিয়েই নির্মিত হতে লাগল আর বুঝিয়ে দিল যে শিল্পী সহজবোধ্য কোনো অর্থের তোয়াক্কা না করে তাঁর মনোজগতের নির্মাণকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। অর্থের জন্য তিনি আলোকিত ও সংবেদনশীল ব্যক্তি বা শিল্পব্যবসায়ীর ওপর নির্ভর করতে লাগলেন; সেই শাসককে পরিহার করতে শুরু করলেন, যাঁরা তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রচারকার্যে ব্যবহার করে আসছিলেন।

তবে বিমূর্তায়নকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল এমন নয়। শাসকশ্রেণি শিল্পীর ওপর থেকে কর্তৃত্ব হারিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু গির্জা আর কোনো মাইকেল অ্যাঞ্জেলো বা বার্নিনি খুঁজে পায়নি। এমনকি কর্মজীবী শ্রেণি গয়া বা দ্যমিয়েরের মতো চিত্রীও পায়নি। তবে অবয়বগত চিত্রকলা যত সহজে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রচার করতে পারে, ঠিক একইভাবে প্রভাবশালীদের এজেন্ডা প্রচার এড়িয়েও যেতে পারে। মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক জর্জ লুকাস মনে করেন, বিমূর্ত চিত্রকলা এর কোনোটাই করতে পারে না। বিমূর্ত শিল্পের বোধগম্যহীনতার মাঝেই এই শিল্পের ধ্বংস ও পলায়নপরতার বীজ নিহিত আছে। তাঁর মতে, কল্পনা ও বেশিমাত্রায় বিষয়মুখিনতা শিল্পের উচ্চমার্গীয় দাবি মেটায়। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের দাবি মেটাতে অনেক শিল্পী নান্দনিক সেবা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন যে রাজনৈতিক চাহিদা মেটানো শিল্পের মূল কাজ নয়! তাই পরবর্তীকালে তাঁরা এই ধরনের শিল্পচর্চায় আর উৎসাহ খুঁজে পাননি। আবার লিয়ন ট্রটস্কির মতো মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক লুকাসের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। স্টালিনের নিগ্রহ অবলোকন করে তাঁর মতো অনেকের মনে হয়েছে যে শিল্পচর্চার যেকোনো ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ ও বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া দরকার। যদি শুধু শাসকশ্রেণির নির্দেশ ও আজ্ঞা নিয়ে শিল্পচর্চা করতে হয়, তাহলে তার মর্ম ও গুরুত্ব হারিয়ে যায়।

ক্লেমেন্ত গ্রিনবার্গের অবস্থানও প্রচারধর্মী শিল্পকলার বিপক্ষে। তাঁর মতে, সমগ্রতাবাদ বা পুঁজিতন্ত্রের আজ্ঞানুবর্তিতার মাঝেই শিল্পের ধ্বংসের বীজ নিহিত আছে। বিমূর্তায়নের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তিনি বর্ণিল জমিন চিত্রকলার (Colour Field Painting) দৃষ্টান্ত টেনেছেন। বিষয় ও নির্দিষ্ট অর্থকে পরিহার করে বিমূর্তায়নের মধ্য দিয়ে জ্যাকসন পোলোক, মার্ক রোথকো, মরিস লুইস, কেনেথ নোল্যান্ড প্রমুখ চিত্রী প্রকারান্তরে দৃশ্যগ্রাহ্য প্রতিরূপের ওপরই বেশিমাত্রায় মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। এভাবে রাজনীতির বন্ধন থেকে শিল্পের মুক্তি নিশ্চিত হয়েছে। মার্ক্সবাদী সমালোচকরা গ্রিনবার্গের এই বক্তব্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক নির্মাণ বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে হয়ে থাকে এবং ওই সব উদ্দেশ্যের মাঝে প্রতিষ্ঠিত দর্শন, বিশ্বাস বা অনুবর্তী আদর্শের প্রতিফলন থাকে। শিল্পকর্ম, এমনকি বিমূর্ত শিল্পকর্মও রাজনীতি থেকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করতে পারে না, কারণ তা সময়ের উপস্থাপনা, আর তাই শিল্পী যেমন তাঁর পৃষ্ঠপোষক, বিনিয়োগকারী, ক্রেতা, সমালোচকদের অবহেলা করতে পারেন না; তেমনি তাঁর লালিত আদর্শকেও ঝেড়ে ফেলতে পারেন না। শিল্পের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে শিল্প সমালোচনা সমসাময়িক শিল্পের সবচেয়ে নতুন ও আলাদা বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানেই ব্যাপৃত থাকে, প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সব প্রতর্ককেই কমবেশি কলুষিত করে। ক্লেমেন্ত গ্রিনবার্গ, হ্যারোল্ড রোজেনবার্গ ও আরভিং স্যান্ডলারের শিল্পপ্রবন্ধাবলির মাঝে জাতীয়তাবাদী উপাদানের সরব উপস্থিতি লক্ষণীয়। গ্রিনবার্গের বিশুদ্ধ নন্দনতত্ত্বের ধারণাটিও অনেকের কাছে ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়েছে; কারণ ‘বিশুদ্ধ শিল্প’ অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতোই।

যেভাবে গ্রিনবার্গ সমালোচকদের তোপের মুখে পড়েছেন, ঠিক একইভাবে যে শিল্পকর্মের পক্ষে তিনি ওকালতি করেছেন তা-ও বিরূপ সমালোচনার শিকার হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্ক্সবাদী সমালোচকরা (যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ‘মার্ক্সবাদী’ শব্দটি খুবই ক্ষীণকণ্ঠে উচ্চারিত হয়) ‘বিমূর্ত প্রকাশবাদী’ শিল্পকে মর্যাদার চোখে দেখতে শুরু করেছেন এই কারণে নয় যে অন্যান্য শিল্পগতিধারার ওপর তার কথিত মৌলিকত্ব রয়েছে বা সেই সময়ে সৃষ্ট অন্যধারা থেকে তা উত্কৃষ্ট। বরং এর শিল্প আদর্শ ও আমেরিকার ক্ষমতার প্রভাব একই সঙ্গে মিশেছে বলে। ম্যাক্স কজলফের মতে, নিউ ইয়র্ক ঘরানার শিল্পীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বামপন্থীদের প্রশ্রয় ও সমর্থন লাভ করেছিলেন বটে, কিন্তু তাঁরা স্বাধীনভাবে বিষয়ীমুখ শিল্প সৃষ্টির জন্য সেই সমর্থন ত্যাগ করেছিলেন। প্রকারান্তরে তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে স্বাধীনভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিল্পচর্চা একটি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং আমেরিকার মতো দেশকে সম্মান দেখানো যেখানে মুক্ত জ্ঞানচর্চাকে বিশেষভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। কজলফের মতে, আমেরিকার বিমূর্ত প্রকাশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী বিদেশনীতি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আর তা শাসক ও শাসিত উভয়েরই দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। কিন্তু অন্য সমালোচকরা তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন যে খুব সতর্কতার সঙ্গে শাসকশ্রেণি এই দুটি বিষয়কে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তারা দেখাতে চেয়েছে যে আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে সংস্কৃতিমান রাষ্ট্র এবং তারা শিল্পীর স্বাধীনতাকে বিশেষ মূল্য দিয়ে থাকে। আর তাই বিমূর্ত প্রকাশবাদকে অকস্মাৎ সৃষ্ট কোনো শিল্পগতিধারা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। এর মাঝে রাজনীতি ও শিল্পের এক গভীর যোগাযোগ রয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় আমেরিকা তার সাংস্কৃতিক প্রভুত্ব প্রমাণের জন্য একে উৎসাহ জুগিয়েছে। বিমূর্ত প্রকাশবাদী শিল্পকে তারা নৈরাজ্যবাদী ও নব্যফ্যাসিস্ট ম্যাককার্থিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মন্তব্য করতে ছাড়েনি। এর নান্দনিক বৈশিষ্ট্যকে কেউ অবজ্ঞা না করেও তারা একে আমেরিকার শীতল যুদ্ধে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে দেখেছে। সে ক্ষেত্রে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন যে শিল্পীরা কি তাহলে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে ব্যবহৃত হয়েছেন? কিন্তু শিল্পী বা সাহিত্যিকদের কোনো সৃষ্টিকর্ম দিয়ে যদি বিশেষ মতাদর্শ প্রচার করানো হয়, যা তাঁরা তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে বোঝাতে চাননি, তাহলে সেই শিল্পের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার দায় শিল্পীর ওপর বর্তায় কি? শিল্পের সামাজিক ইতিহাসে বিমূর্ত প্রকাশবাদ সম্পর্কিত বামপন্থী সমালোচকদের দুর্বলতা একটি স্বীকৃত বিষয়। এ কথা অনস্বীকার্য যে শিল্পকর্মে সামাজিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের প্রতিফলন রয়েছে এবং কোনো সমালোচনা এসব বিষয় এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে দাঁড়াতে পারে না। শিল্পের সামাজিক ইতিহাস রাজনৈতিক বা ভিন্ন কোনো আদর্শকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো ‘নিরপেক্ষতা’র তকমা লাগিয়ে সাফল্য পেতে পারে না। ডেভিড ক্র্যাভেন তাঁর Abstract Expressionism as Cultural Critique গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে লাতিন আমেরিকার অনেক বামপন্থী দেশ, যারা আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচিত ছিল, বিমূর্ত প্রকাশবাদী চিত্রকলাকে শীতল যুদ্ধকালীন সময়ের প্রচারধর্মী চিত্রকলা হিসেবে দেখেনি। তারা একে কোনো পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা শৈল্পিক কর্তৃত্বরূপে বিবেচনা করেনি। তারা একে বৈপ্লবিক এক শিল্পগতিধারা হিসেবে দেখেছে এবং নিকারাগুয়া ও কিউবার অনেক শিল্পী জ্যাকসন পোলোক ও মাদারওয়েলের অনুকরণে ছবি আঁকতে উৎসাহী হয়েছেন। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ কমিউনিস্টবিরোধী প্রচারণা হিসেবে একে দেখতে অস্বীকার করেছে। ডেভিড ক্র্যাভেনও প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে আমেরিকা বিমূর্ত প্রকাশবাদী চিত্রকলাকে কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেনি। কোনো চিত্রকলার আদর্শিক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সেই চিত্রকলার মধ্যে থাকে না, থাকে দর্শকদের মনে। এমনকি বুদ্ধিজীবীরাও কোনো শিল্পকর্মের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। প্রশ্ন উঠেছে যে যদি কোনো শিল্পকর্ম স্বচ্ছ ও সুস্পষ্টভাবে কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রকাশ না করে তাহলে, বা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করেন তাহলে ঐতিহাসিকরা কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে শিল্প ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করে থাকেন? ডেভিড ক্র্যাভেনের গ্রন্থও শিল্পের রাজনৈতিক ধাঁধা স্পষ্ট করতে পারেননি। যেমন নাজিরা নিেসর সমতার তত্ত্বকে অস্বীকার করে মানবগোষ্ঠীর ওপর আর্য সমাজের প্রভুত্বকে সত্য বলে বিশ্বাস করত, কিন্তু তা কি নিেস কখনো মেনে নিয়েছেন? তিনি প্রচণ্ডভাবে জাতীয়তাবাদবিরোধী ছিলেন, কিন্তু তাঁর ‘আদর্শ ইউরোপীয়’র ধারণা এবং আরব ও ইহুদিবিরোধিতাকে নাজিরা বিকৃত করে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। যেমন—১৯৭০ সালে মাদারওয়েল ও অন্য শিল্পীরা ভেনিস দ্বিবার্ষিক চিত্রকলা উৎসবে আমেরিকান প্যাভিলিয়ন থেকে নিজেদের ছবি নামিয়ে ফেলেছিলেন বহির্বিশ্বে আমেরিকার আগ্রাসী চরিত্র প্রকাশের কাজে তাঁদের ছবি ব্যবহৃত হচ্ছে এই অভিযোগে। তাঁরা সবাই বামপন্থী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের ছবিতে তাঁরা এই ধরনের বক্তব্যের উপস্থিতি অস্বীকার করেছেন। কিছুকাল আগে উন্মোচিত এফবিআইয়ের গোপন নথিতে দেখা গেছে যে শীতল যুদ্ধের সময় রোথকো, গটলিব, মাদারওয়েল, ক্রাজনার, নরম্যান লুইসের মতো শিল্পীরা কড়া নজরদারির মধ্যে ছিলেন এবং ক্রাজনারকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য সন্দেহ করা হতো। এর অর্থ হলো, এই শিল্পীদের শিল্পকর্মকে আমেরিকান জাতীয়তাবাদ ও পুঁজিতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের কাজে বাধা না দিয়ে আমেরিকা শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে—এমন একটি বার্তা বহির্বিশ্বে প্রেরণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মেয়ার শাপিরোর মতে, বিমূর্ত চিত্রকলায় যে ব্যক্তিগত প্রকাশভঙ্গি, তা আমেরিকার মূলস্রোতের সংস্কৃতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য। এখানে সৃষ্টিকর্মে শিল্পীর ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাস বা নিজের মুনিশয়ানা দেখানোর তাড়না যতটা আছে, দর্শকের একাত্ম হওয়া বা অংশগ্রহণের বিষয়টি ঠিক ততটাই কম। শাপিরো বিমূর্ত প্রকাশবাদের প্রশংসা করেন এর মৌলিকত্বের কারণেই নয়, বরং ব্যক্তিসত্তার উদ্বোধন এবং মার্ক্সীয় তত্ত্বানুযায়ী শিল্পের সামাজিক দায়িত্ব পালনের শর্তপূরণের কারণেও বটে। শাপিরোর সঙ্গে সুর মিলিয়ে ক্র্যাভেন বলতে চেয়েছেন, আধুনিক চিত্রকলার বিমূর্তায়ন প্রমাণ করে যে আলোকিত মন সমসাময়িক সমাজকে পরিত্যাগ করেছে। অনেকে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’কে যতই অপ্রয়োজনীয় প্রমাণ করতে চান না কেন, তার একটি সামাজিক গুরুত্ব আছে। আর তাই বিমূর্ত প্রকাশবাদী চিত্রকলা শীতল যুদ্ধের সময় আমেরিকার স্বরাষ্ট্র ও বিদেশনীতির সমর্থনে সুপ্তভাবে কাজ করেছে বলে যে প্রচারণা রয়েছে ক্র্যাভেনের Abstract Expressionism as Cultural Critique তার বিপ্রতীপে জোরালো অবস্থান নিতে সক্ষম হয়েছে। আর যে বুদ্ধিজীবীরা এই ধরনের চিত্রকলাকে নিতান্ত ‘ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি’, ‘খাঁটি গড়ন’ ও ‘পলায়নপরতা’ বলে অভিহিত করেছেন, তাঁদের একহাত নেওয়ারও চেষ্টা করেছেন। গড়ন বা গাঠনিক বিমূর্তায়ন এই শিল্পকলার একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়, কারণ তার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা যতটা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে ‘ইফেক্ট’। ছবি চিত্রতলের উপরিভাগে স্থির হয়ে থাকে না, বরং তা মানুষের মনে আসন গেড়ে বসে।

ওয়াল্টার বেনজামিন শিল্পের শৈলীকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখেছেন। শিল্পকর্মে শিল্পীর ব্যক্তিসত্তার উপস্থিতিকে শাপিরো স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখলেও বেনজামিন তাঁকে নিপীড়নমূলক ও প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে বিবেচনা করেছেন। শিল্পীর স্বাধীনতার কথা জোরেশোরে চাউর করার অর্থ হলো বাজারে তাঁকে জনপ্রিয় ও লাভজনক করে তোলার একটা প্রচেষ্টা। তাঁর মতে, রাজনৈতিকভাবে অগ্রসরমাণ শিল্প নির্মাণ ও ধারণ উভয়েই গণতান্ত্রিক হবে। বেনজামিনের মতে, চিত্রশিল্প স্থিরচিত্র ও চলচ্চিত্রের মতো প্রযুক্তির মিশ্রণ ঘটাবে, যা শৈল্পিক নির্মাণকে অভিজাত ব্যক্তির ঘরে বন্দি করার চেয়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মাঝে ছড়িয়ে দেবে। শাপিরোর মতে,   প্রযুক্তির পৌনঃপুনিকতা ও শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমের বিনিময়ধর্মিতা পুঁজিতন্ত্রের অনৈতিক প্রভাবের কারণেই ঘটে থাকে, যা একজন শিল্পীর স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে খর্ব করে। দুই বামপন্থী শিল্প সমালোচক শাপিরো ও বেনজামিন মনে করেন যে শৈলী নির্ভুলভাবে একটি শিল্পকর্মের আদর্শগত বৈশিষ্ট্য বা অর্থ তুলে ধরতে সক্ষম হয় না, প্রযুক্তির একটি ভূমিকা থাকে। কিন্তু শৈলী বা শিল্পের প্লাস্টিক ভ্যালুর ওপর বেশি মাত্রায় জোর দেওয়ার অর্থ তার মানবিক ব্যাখ্যা এড়িয়ে যাওয়ার এক গভীর চাতুরী। এতে শিল্পের মাঝে কতটা স্বতঃস্ফূর্ততা বা ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ রয়েছে তা চাপা পড়ে যায়। সবাই ভুলে যায় যে শিল্পের প্রতীকী অর্থ অনুসন্ধানের চেয়ে উল্লিখিত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে একটি শিল্পকর্মের রাজনৈতিক গূঢ়ার্থ থাকার অর্থ এই নয় যে তা বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলবে। যদিও শাপিরো মনে করেন, একটি শিল্পের রাজনৈতিক বক্তব্য তার শৈলীর সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকে। শিল্প তখনই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তার মাঝে দর্শক নিজস্ব অনুভূতির ঐক্য খুঁজে পায়—এই মতের সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান নিয়ে শাপিরো বলেছেন, এই সময়ে যা শিল্পকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করেছে তা দর্শকের সঙ্গে তার যোগাযোগহীনতার বৈশিষ্ট্য। গ্রিনবার্গের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনিও বলতে চেয়েছেন যে প্রচলিত অভিজ্ঞতাজাত বিষয়বস্তুর ওপর থেকে মনোযোগ সরিয়ে শিল্পী নির্মাণমাধ্যম ও শৈলীর ওপর নিবদ্ধ করতে চেয়েছেন। শিল্প বিমূর্ত হয়ে এবং অবয়বগত শৈলী পরিহারের মাধ্যমে এমন এক বৈশিষ্ট্য পরিগ্রহ করেছে, যা যোগাযোগহীনতাকে উৎসাহ জুগিয়ে থাকে। যোগাযোগের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অস্বীকারের মাধ্যমে বিমূর্ত প্রকাশবাদীরা সমাজের মূলস্রোতের মূল্যবোধের বিপ্রতীপে অবস্থান নিয়েছে। তবে বিমূর্ত প্রকাশবাদ বিনোদন ও বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের জনপ্রিয় ধারা, যার বাজারে প্রবেশের তাত্ক্ষণিক ক্ষমতা ও পণ্য বিক্রয়ে বিশেষ প্রণোদনার সক্ষমতা আর্থিক দিক দিয়ে এর গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেছে। শিল্প সমালোচক এডর্নোর মতে, বিমূর্ত শিল্পকে যতই যোগাযোগে অক্ষম শিল্প বলে মনে করা হোক না কেন, যোগাযোগ স্থাপনই তাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। কিন্তু শাপিরোর স্ববিরোধিতাও লক্ষণীয়। যিনি বিমূর্ত শিল্পকে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শিল্পীর স্বতঃস্ফূর্ততা ও স্বাধীনতার রূপকধর্মী বৈশিষ্ট্যরূপে চিহ্নিত করেছেন, তিনিই বিমূর্ত চিত্রশিল্পীর ব্যক্তিগত মূল্যবোধ রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে বাহ্যিক পৃথিবীর স্বতঃপ্রণোদিত পরিহার বলে রায় দিচ্ছেন। ক্র্যাভেনের মতে, শিল্প তার স্রষ্টা, পৃষ্ঠপোষক বা দর্শকের একটিমাত্র আদর্শ বা আবেগ তুলে ধরে এমন নয়, বরং অনেকের আবেগের সমন্বয় ঘটে সেখানে। মাদারওয়েল যেমন বলেন যে শিল্পের আবেগ বহুমাত্রিক। তাহলে দর্শকরা যদি শিল্পকে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে দেখতে চায় তাহলে শিল্পের ব্যাখ্যাও বহুমাত্রিক। কিন্তু চিত্র সমালোচক ঈষধঁফব ঈবত্হঁংপযর মনে করেন যে শিল্প আসলে কোনো অর্থই প্রকাশ করে না, দর্শক বা শিল্পরসিকই তার ওপর অর্থ আরোপ করে, তা যা-ই হোক না কেন। বিমূর্ত চিত্রকলা দর্শকের জন্য এক ধরনের ‘ভাবনার পরীক্ষা’, যেখানে দর্শক নিজস্ব প্রশ্নের নিজস্ব ব্যাখ্যা তৈরি করে। বিমূর্ত চিত্রকলা নিয়ে দর্শকের অস্বস্তির জায়গাই হলো নিজস্ব ব্যাখ্যা তৈরি করা; সৃষ্ট ব্যাখ্যার ওপর মনোযোগ দেওয়া নয়।

বর্তমান সময়ের শিল্পকলার দিকে নজর দিলে দেখা যায়, তার মাঝে কমবেশি রাজনৈতিক উপাদান আছে। এর একটা বড় কারণ হলো, প্রযুক্তি বাস্তবের টুকরো টুকরো উপাদান তুলে আনতে উৎসাহ জোগায়, যা মানুষের অমানবিক চেহারার বৈশ্বিক দুঃস্বপ্নকে চিহ্নিত করে। আর যেকোনো শিল্পকলাই, তা যতটা বিমূর্তই হোক না কেন, রাজনৈতিক বলে অনেকে মনে করেন; কারণ তা অবশ্যম্ভাবীরূপেই সমাজ বা সংস্কৃতির বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। উনিশ শতকের আগে বিশ্বাস করা হতো যে শিল্পীকে দিয়ে ফরমায়েশি কাজ করানোর পেছনে গির্জা, রাষ্ট্র বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু শিল্পী এখন আর সেই ধরনের কোনো উদ্দেশ্য দ্বারা চালিত হন না। তাই আজকের দিনে অশিক্ষিত জনগণের নিম্ন রুচিকেও শিল্পে আনার বিষয়ে তাদের কোনো অনীহা কাজ করে না। উত্তরাধুনিক শিল্পীরা উচ্চ ও নিম্নশ্রেণির শিল্পের মাঝে কোনো পার্থক্য করেন না। তাঁদের কাছে এ দুই শ্রেণির চিত্রকলার মানের মধ্যেও কোনো পার্থক্য নেই। এর মধ্যেও সাম্যবাদী রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে বলে অনেক সমালোচক মনে করেন। তবে বিতর্ক অন্তহীন আর তা সুনির্দিষ্ট কোনো উপসংহার টানতে পারে না। একটি বিষয় নিশ্চিত যে চিত্রশিল্প, তা বিমূর্ত বা অবয়বধর্মী যে ধারারই হোক না কেন, রাজনীতি-নিরপেক্ষ নয়।

মন্তব্য