kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

সা ক্ষা ৎ কা র

মনে রাখতে হবে আমরা কী মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি!

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩৭ মিনিটে



মনে রাখতে হবে আমরা কী মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি!

ছবি : কাকলী প্রধান

ষাটের দশকের কবি মোহাম্মদ রফিক জীবনভর নদী, জল, কাদামাটির সঙ্গে যুক্ত জীবনযাপনের চিত্র তুলে এনে তাঁর স্বাদু কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার ভাণ্ডার মণিরত্নে ভরে দিয়েছেন। কীর্তিনাশা, কপিলা, গাওদিয়া, খোলা কবিতা, বিষখালী সন্ধ্যা বা কালাপানি, অশ্রুমতির শব বা নোনাঝাউ তাঁর এসব কাব্য বাংলা কবিতায় অনন্য সংযোজন বলে স্বীকার করবে কবিতার পাঠক পদবাচ্যের যে কেউ-ই। জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার বেমরতা ইউনিয়নের বৈটপুর (বর্তমান চিতলী) গ্রামে। পিতা সামছুদ্দীন আহমদ ও মাতা রেশাতুন নাহার। আট ভাই-বোনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মোহাম্মদ রফিক ৬০-এর দশকে ছাত্র আন্দোলনে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। কীর্তিনাশা (১৯৭৯), খোলা কবিতা ও কপিলা (১৯৮৩), গাওদিয়া (১৯৮৬), স্বদেশী নিঃশ্বাস তুমিময় (১৯৮৮), মেঘে এবং কাদায় (১৯৯১), রূপকথা কিংবদন্তি (১৯৯৮), মৎস্যগন্ধা (১৯৯৯), মাতি কিসকু (২০০০), বিষখালী সন্ধ্যা (২০০৩), নির্বাচিত কবিতা (২০০৩), কালাপানি (২০০৬), নির্বাচিত কবিতা (২০০৭), নোনাঝাউ (২০০৮), দোমাটির মুখ (২০০৯), অশ্রুমতির শব (২০১১), কালের মান্দাস (২০১২), ঘোরলাগা অপরাহ্ন (২০১৩), বন্ধু তুমি প্রসন্ন অবেলায় (২০১৫)—এসবই মোহাম্মদ রফিকের কবিতাগ্রন্থ। ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে কীর্তিনাশা, গাওদিয়া ও কপিলা নিয়ে কাব্য সংকলন ত্রয়ী (২০০৯)। ১৯৮১ সালে কবি আলাওল পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ২০১০ সালে একুশে পদক পেয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন

 

প্রশ্ন : আপনি এ অঞ্চলের মাটি, মানুষ, জনসংস্কৃতিকে আপনার কবিতার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনার পর সবার মধ্যে যেন একটা ভীতি ঢুকে গেছে। এ দশায় করণীয় কী বাঙালির। বাঙালি এখন কী করবে?

মোহাম্মদ রফিক : তুমি যে বাঙালি বলছ তার মধ্যেই উত্তর দিয়ে দিয়েছ। বাঙালি আরো বাঙালি হবে। বাঙালিকে আরো বাঙালি হতে হবে। আমরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম এবং এদের বিরুদ্ধেই তো মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। এদের মতো ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা কিছু মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা কী মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি! অন্য যা কিছু থাক, আমাদের মূল উদ্দেশ্যের জায়গা ছিল, আমাদের বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলাম এদের সঙ্গে লড়াই করে।

প্রশ্ন : অনেক তরুণ ধর্মীয় রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, এমনকি তারা জীবনের তোয়াক্কা করছে না। গুলশানের হামলায় বাচ্চা ছেলেরা ২০ জন মানুষকে জবাই করে হত্যা করেছে, তাদের এই মোটিভেশনের কারণ কী বলে মনে করেন?

মোহাম্মদ রফিক : আজকের তরুণদের বিভ্রান্ত হওয়ার বড় কারণ তাদের সামনে কোনো মন্ত্র নেই। তারা জানে না, তারা কেন জীবন ধারণ করছে। তাদের যদি এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করা যায়, যেটা আমাদের মতোই, রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করি যে তাদের বোঝাতে হবে—তুমি বাঙালি, তোমার বাঙালি সত্তাকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তাহলে দেখবে এই জঙ্গিবাদের ক্ষমতা অনেক কমে যাবে।

প্রশ্ন : সারা বিশ্বে জঙ্গিবাদের এই যে আগ্রাসন, উত্থান—এর কারণ কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?

মোহাম্মদ রফিক : জঙ্গিবাদের যে উত্থান হয়েছে, আমরা খুব ভালো করে জানি কেন হচ্ছে! মূল কারণ হচ্ছে, ধনতন্ত্র, ক্ষয়িষ্ণু ধনতন্ত্র তার মরণদশায় পৌঁছে গেছে। যেকোনোভাবে সে বাঁচতে চায়। এ জন্য একদিকে সে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্ম দিচ্ছে; অন্যদিকে আইএসকে জন্ম দিচ্ছে, আল-কায়েদার জন্ম দিচ্ছে। আমাদের তরুণদের কাছে বৈশ্বিক এই রাজনীতির জায়গাটা স্পষ্ট করতে হবে। তাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার দিকে, বাঙালি হওয়ার দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রশ্ন : গুলশান ও শোলাকিয়ার ঘটনায় সিএনএন বাংলাদেশের অবস্থাকে সিরিয়া, ইরাকের সঙ্গে তুলনা করেছে।

মোহাম্মদ রফিক : সিএনএন ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য এটা করেছে। এখনো আমাদের ও রকম অবস্থা হয়নি। আমি অন্তত এটা অনুভব করি না। হ্যাঁঁ, আমরা বিপন্ন, আমরা ব্যথিত। আমি মনে করি, আমাদের শক্তি যথেষ্ট। আমরা যদি সবাই নেমে আসি, প্রতিবাদ করি, ঘরে-বাইরে সমানভাবে নজর দিই, গানে-কবিতায় ফিরে আসি, তাহলে এমনিতেই এসব জঙ্গিবাদ উড়ে যাবে।

প্রশ্ন : আপনার মতে এখন এই জাতির করণীয় কী?

মোহাম্মদ রফিক : প্রতিবাদ শুধু না, এই জাতিকে এখন শক্তভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। এই আইএসওয়ালাদের বুঝিয়ে দিতে হবে, এত সহজ না, এটা বাংলাদেশ। এই দেশের মানুষ মাথা নত করে না। এই খেলা বহুদিন যাবৎ চলছে, এই খেলা উপনিবেশ আমল থেকে চলছে—বাঙালিকে ধ্বংস করো। কারণ বাঙালির যে আত্মশক্তি, ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি তাকে সারা পৃথিবী ভয় পায়, বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকানরা ভয় পায়। কারণ তুমি তাকালেই দেখতে পাবে, আমাদের মানুষের এগিয়ে যাওয়া কেউ থামাতে পারেনি। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার দেখ, আমাদের স্কলারদের সারা বিশ্বে অবদান দেখ। আমাদের নারীরা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, পৃথিবীর কয়টা দেশ পেরেছে? আমাদের দুর্বার স্পৃহা আছে। শক্তি আছে। পরিশ্রম করার সামর্থ্য আছে। তারা আমাদের দাবায়ে রাখতে চায়। আমি বঙ্গবন্ধুর কথাটাই পুনরুক্তি করতে চাই, আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমাদের দাবায়া রাখার কলকাঠি হলো এসব জঙ্গি হামলা। বাচ্চা ছেলেদের ভেতর ধর্মের বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া। আমাদের এসবের বিরুদ্ধে এক হয়ে সম্মিলিতভাবে লড়াই করতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। শিল্পের আশ্চর্য ক্ষমতার দিকে তরুণদের আকৃষ্ট করতে হবে। এমন সময়ে তাই শিল্পী-সাহিত্যিকদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল বলে মনে করি।

প্রশ্ন : ‘গাওদিয়া’র এই কপিটা পেয়েছি নীলক্ষেতে। ছান্দসিক আবদুল কাদিরের সংগ্রহের অনেক বইয়ের সঙ্গে। তাঁর বাড়ির কোনো লোক বোধ হয় সব একসঙ্গে বিক্রি করে দিয়েছিল। আপনার নিজের স্বাক্ষর করা ও লেখা—শ্রদ্ধাভাজনেষু, আবদুল কাদির, করকমলে। আমার খুবই ভালো লাগল আপনার সিগনেচার দেখে, আমি কিনলাম। আপনার কাছে কি এই সংস্করণের কোনো কপি আছে?

মোহাম্মদ রফিক : না, নাই।

প্রশ্ন : এই বইটা দিয়ে শুরু করার কারণ, গাওদিয়ার শুরুতে, প্রারম্ভপত্রে আপনি লিখেছেন, ‘গাওদিয়া, হতে পারে একটি গ্রাম/ শহর কিংবা গঞ্জ/এমনকি সারাটা বাংলাদেশ’। ১৯৪৩ সালে আপনার জন্ম, এখন পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ের কাব্যচর্চায় আপনি বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, কষ্ট, বেদনা—এগুলো আসলে আপনার কবিতায় অনেক বেশি মূর্ত হয়ে উঠেছে। তার চেয়ে বেশি শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে এই অঞ্চলের মানুষের অদম্য চেতনা বা স্পিরিটের গল্প। বলা যায়, রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার গল্পও। জানতে চাই, আপনার যে পোয়েটিক ফিলোসফি বা কাব্যদর্শন, তা দাঁড়াল কিভাবে?

মোহাম্মদ রফিক : শোনো, তুমি যে প্রশ্ন তুললে, এর উত্তর দেওয়া এত সহজ নয়। কারণ যখন আমি কাজ শুরু করেছি, তখন এত কিছু চিন্তা করিনি। যেকোনো কবিই যে কাজ করে, তা তার বেড়ে ওঠার সঙ্গে, জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সাযুজ্যপূর্ণ। কতগুলো ব্যাপার আমার মধ্যে প্রভাবিত করেছে, এখন বুঝি, ফিরে তাকানোর চেষ্টা করি, আমি যে এখানে দাঁড়ালাম, কিভাবে দাঁড়ালাম! যা হয়ে উঠলাম, কিভাবে হয়ে উঠলাম! আমার ওপর একটা বিরাট প্রভাব পড়েছে আমার দাদার। আমার দাদা খুব শিক্ষিত মানুষ ছিলেন না, কিন্তু স্বশিক্ষিত ছিলেন। সেই আমলে তিনি সিক্স পর্যন্ত পড়েছিলেন। এন্ট্রান্স পরীক্ষা তখন একটা মানদণ্ড। তিনি সেটা দিতে পারেননি। তিনি আমাদের অঞ্চলে একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। উনিশ শ বিশ থেকে শুরু। তার আগ থেকেও হতে পারে। তবে তিনি রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে খুব সচেতন ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে সুভাষ বোসের শিষ্য ছিলেন। তখন সমগ্র বাংলাই সুভাষ বোসে মুগ্ধ।  ধর্মীয়ভাবেও তিনি খুব সচেতন ছিলেন। নামাজ পড়তেন, কোরআন শরিফ পড়তেন, হাদিস পড়তেন এবং শুধুই পড়তেন না, জেনে-বুঝে পড়তেন। উদার ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘দ্যাখ, ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে, ধর্ম করার অধিকার যেমন আমার, ঠিক তেমনি আমার পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর, সে যদি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও হয় তাহলে তারও নিজের ধর্ম পালন করার একই অধিকার আছে। সে অধিকার যেন রক্ষিত হয়, সেটা দেখাও আমারই দায়িত্ব। এটা ধর্মই আমাকে শিক্ষা দিয়েছে। তুই আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারিস, তাহলে কেন আমি এত ধর্ম পালন করি। তার উত্তর হচ্ছে, আমি একটা ধর্ম পালনকারী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি, ধর্ম পালন করা আমার ওপরে দায়িত্ব হিসেবে বর্তেছে। আমার সংস্কৃতির অংশ হিসেবে। সেটা রক্ষা করাটাও তাই আমার দায়িত্ব এবং অতি শৈশবকাল থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্র নিয়ে আমার মনে একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আমার এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে, ১৯৪৭ বা ৪৮ সালে যখন পাকিস্তান হলো, তখন আমার দাদা ওই অঞ্চলের ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। আমাদের ওখানে যে স্থানীয় স্কুল আছে, সেখানে সেদিন প্রথম পাকিস্তানি পতাকা তোলা হবে। সব লোক সেজেগুজে যাচ্ছে, কিন্তু দাদা বসে আছেন। তিনি যাবেন না। বাবা তখন তাগড়া যুবক। তিনিও যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। দাদাকে বলছেন, ‘বাপজান, চলেন।’ দাদা বললেন, ‘যেতে হলে তোমরা যাও। একটা জালেম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে এই পাকিস্তান।’ আমি গেলাম বটে সেই উৎসব দেখতে, কিন্তু আমার মনে দাদার ওই দৃঢ় মুখ আর কথাটা কোথায় যেন গেঁথে রইল। দ্বিতীয়ত, আমাদের গ্রামে মূলত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বাস করত। নদীর ধার ঘেঁষে তাদের পাড়া প্রথমে, তারপর মুসলমানদের বাড়িঘর ছিল। ছেলেবেলা থেকে আমার বন্ধুত্ব ছিল ওই হিন্দু পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে। তারাই কিন্তু তখন লেখাপড়া করত, বই আদান-প্রদান করত। বাংলা উপন্যাস, বাংলা কবিতার বই, ইংরেজি উপন্যাস, ইংরেজি কবিতা—এসবের সঙ্গে যোগাযোগ আমার শৈশবে ওই হিন্দু পরিবারের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে দিয়েই হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি, ঢাকা কলেজে আসার আগ পর্যন্ত আমি মুসলমান ছেলেরা কেমন হয় জানতাম না। আমার প্রথম বাঙালি মুসলমান বন্ধু হচ্ছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বলা যায়, এখন পর্যন্ত সে-ই আমার একমাত্র বন্ধু, কারণ তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ জীবন, মানে যত দিন সে বেঁচে ছিল আমরা একসঙ্গে থেকেছি, আমাদের শিল্প-সাহিত্যচেতনার আদান-প্রদান, হাসি-ঠাট্টা আমরা করেছি। খুব অল্প বয়সেই বামপন্থী রাজনীতির প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বোধ করেছি, ফলে সম্পৃক্ত হয়েছি।

প্রশ্ন : সম্পৃক্ত হলেন কিভাবে?

মোহাম্মদ রফিক : সেটাও মজার ঘটনা। আমি কিন্তু মার্ক্স লেনিন পড়ে বামপন্থার প্রতি আকৃষ্ট হইনি। আকৃষ্ট হয়েছিলাম দস্তয়ভস্কির উপন্যাস পড়ে।

প্রশ্ন : দস্তয়ভস্কি আপনার প্রিয়তম লেখক!

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁঁ, অন্যতম প্রিয় লেখকদের একজন। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। দস্তয়ভস্কির ‘লাঞ্ছিত এবং নিপীড়িত’ উপন্যাসটি খুলনা থেকে কিনে এনেছিলাম। এই উপন্যাসটি পড়ার পর থেকে আমার মধ্যে কেন যেন বামপন্থার প্রতি এক ধরনের দুর্নিবার আকর্ষণ তৈরি হয়। যত দিন আমি সক্রিয় বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছি, আমার জায়গা থেকে নড়িনি।

প্রশ্ন : আপনার কবিতার কথা জানতে চেয়েছিলাম।

মোহাম্মদ রফিক : আমি যে আমাদের সমাজ বোধ, জীবন, বেদনা, সমাজজীবন নিয়ে কাজ করেছি, এসবই শুধু দানা বেঁধেছে, এটাই শুধু নয়; কিছু জিনিস আমি কবিতায় খুব সচেতনভাবে করতে চেয়েছি। ইউরোপীয় সভ্যতা, যা দিয়ে আমরা খানিকটা মোহাচ্ছন্ন বলব। এই ইউরোপীয় সভ্যতা মূলত গড়ে উঠেছে গ্রিক পুরাণের ওপর নির্ভর করে। এই পুরাণ, মিথটা একটা জাতির মেরুদণ্ড গঠন করার জন্য খুব প্রয়োজন। একটা কথা আছে প্রত্নতত্ত্ব প্রতিভা। আমি ইংরেজিতে বলি আর্ক জিনিয়াস। আমি যদি বঙ্গবন্ধুর কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখ বাঙালিদের এমন অনেক লোকের চেহারা কিন্তু ভেসে ওঠে। বাঙালি ভাবলেই যাদের চেহারা তার মধ্যে তিনি অন্যতম। তোমার সামনেও ভেসে উঠতে বাধ্য, কারণ কোনো লোক, শুধু শিকড় না, তার মাটি থেকে বিচ্যুত হয় না। মাটির সব ঐশ্বর্য নিয়েই সে বেড়ে ওঠে। আমি সচেতনভাবে যেটা ভেবেছি, বাঙালির, একেবারেই বাঙালির, একটা নিজস্ব পুরাণ গ্রহণীয়। সচেতনভাবে আমার কবিতায় সেটা করার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন : হ্যাঁঁ স্যার, চরিত্র হিসেবে আপনার কপিলায় এ দেশের মাঠ-ঘাটের মানুষই মিথ হয়ে উঠেছে। ঈশা খাঁর বংশের বঁধু না পলাইতাম আমি কিংবা ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া মলুয়ার চরিত্র যেখানে কবিতায় উঠে এসেছে। কিংবা গাওদিয়ার কথা যদি বলি!

মোহাম্মদ রফিক : নিয়েছি বাঙালি লোকগাথা, লোককাহিনি; এমনকি বাংলা উপন্যাসকেও ব্যবহার করেছি। শুধু কপিলায়ই নয়—মহুয়া, বেহুলা, দামোদর এই চরিত্রগুলো পুরাণ থেকেই আমার কবিতায় তুলে আনতে চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন : স্যার, বলা হয়ে থাকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের একটা বড় ধরনের হাহাকার ছিল। কপিলা যেটা একভাবে অবসিত করেছে বলে মনে করি। কপিলা নিয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে, কপিলার যে মূল শক্তির জায়গা, এটা পরবর্তী প্রজন্ম একভাবে আবিষ্কার করেছে। আপনি যখন কপিলা লেখা শুরু করেন, সেই প্রস্তুতির সময়টা যদি বলেন।

মোহাম্মদ রফিক : আমি মানুষের মুক্তিতে বিশ্বাস করি। অবশ্যই আমি মানুষের অর্থনৈতিক সাম্যে বিশ্বাস করি। মনে করি, প্রত্যেক মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। শুধু তাই নয়, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। নারীশক্তি যতটা বিকশিত হবে, সমাজ ততটাই বিকশিত হবে। এটা আমার বিশ্বাস। কপিলাতে গিয়ে সেই নারীশক্তির বিষয়টাকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। ওইখানে প্রতিমা হয়ে আসছে বারবার কপিলা, কপিলার ভূমিকায় নারী। এ রকমই ইদানীংকালে আরেকটা বই লেখা হচ্ছে বেহুলার অপর পরিচয়। আরেকটা লেখায় হাত দিয়েছি, সেটা হচ্ছে মহুয়াকে নিয়ে একটা দীর্ঘ কাব্য, আশি পৃষ্ঠার বেশি। কপিলাও কিন্তু আশি পৃষ্ঠা। কপিলা, মহুয়া ও বেহুলা—এই তিনটা নিয়ে একটা জগৎ তৈরি করতে চাই, যে জগতে এই নারীশক্তির বিকাশকে অন্তত আমার জায়গা থেকে পূর্ণমাত্রায় অবলোকন করতে পারব। আমাদের সমাজে নারী যতটা বিকশিত হবে, নারী যতটা এগিয়ে আসবে, নারী যতটা হাল ধরতে পারবে, তখন আমাদের সমাজে ভেতর থেকে একটা অবশ্য পরিবর্তন হবে। সেই পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছি।

প্রশ্ন : গত কয়েকটা বইমেলায় আপনার যে বইগুলো বেরিয়েছে, প্রথমা থেকে অশ্রুমতির শব, শুদ্ধস্বর থেকে ঘোরলাগা অপরাহ্ন, রূপসী বাংলা থেকে বন্ধু তুমি প্রসন্ন অবেলায়, বেঙ্গল থেকে কালের মান্দাস, শুদ্ধস্বর থেকে দোমাটির মুখ। আমার প্রশ্নটা ছিল স্যার, সব বইয়ের শিরোনামই কেমন মৃত্যুগন্ধী! এটা কেন?

মোহাম্মদ রফিক : খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। গত কয়েক বছরে আমি হঠাৎ কয়েকবার অসুস্থ হয়েছি। গত চার-পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় পাঁচ-ছয়বার হাসপাতালে গেছি। আমার মাতৃবিয়োগ ঘটেছে। দীর্ঘদিনের ভালোবাসার কর্মস্থল জাহাঙ্গীরনগর ছেড়ে এসেছি। কবিতা তো যাপন থেকে আলাদা কিছু নয়। এটা একটা কারণ ছিল। দ্বিতীয়ত, মনে হয়েছে যে যাওয়ার বেলায় একটা নিজস্ব কথা উচ্চারণ করে যাওয়া ভালো। এখন আমি নিজের ভেতরে এক ধরনের উজ্জীবন অনুভব করছি। মনে করি, এই উজ্জীবনের নেশাটা রেখে যেতে চাই। ইদানীংকার একটা কবিতায় লিখেছি, মৃত্যুকে জয় করাই হচ্ছে জীবনের, বেঁচে থাকার মূল অনুষঙ্গ। আমার ভেতরে মানবমুক্তির, সব মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর একটা তাড়না আছে।

প্রশ্ন : হ্যাঁঁ স্যার, কালাপানির কবিতায় তো লিখেছেন, ‘শীত শীত/ দু হাঁটুতে সিঁধিয়েছে মৃত্যুভীতি/ মনে লয়/ আসন্ন বিলয় / সর্বমানুষের দ্যাখ, ন্যাড়া কঞ্চিতে ধরেছে ফুল/ পূর্ণিমার। আপনি সব সময়ই সব মানুষের হতে চেয়েছেন। সব মানুষের আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতিফলনের কথাই যেন মনে করিয়ে দেয় এ কবিতা। সব মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকেই কি আপনার কবিতা মুদ্রিত হয় সাদা খাতার পাতায়? এবং আপনার কবিতার চরিত্ররা যেন সুলতানের আঁকা ছবির সেই দৃঢ়, ঋজু, পেশিবহুল মানুষগুলো, এইখানে স্যার জানতে চাই, সুলতানের যে চিত্রকলার জগৎ, সেটার সঙ্গে আপনার কবিতার জগতের একটা অস্পষ্ট মিল আছে।

মোহাম্মদ রফিক : তুমি খুব ভালো একটা প্রসঙ্গ তুলেছ। আশির দশকের শুরুতে, তখন বোধ হয় আমার কীর্তিনাশা বেরিয়েছে, কপিলা বোধ হয় লেখা হয়েছে, খোলা কবিতা লেখার আগে আগে, একবার যশোর গেলাম। এরপর খুব ইচ্ছা হলো নড়াইল যাব, সুলতান ভাইকে দেখে আসব। তখন কিন্তু উনাকে চিনি না। নাম শুনেছি, প্রচুর কল্পকাহিনি শুনেছি। যশোর থেকে দুটি ছেলেকে বললাম, আমি নড়াইল যাব। একদিন সকালবেলা যশোর থেকে রওনা দিলাম আমরা তিনজন। ১০টা-১১টা নাগাদ সুলতান ভাইয়ের ভাঙা বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। সুলতান ভাই তখন একা থাকেন এবং সঙ্গে তাঁর একজন মহিলা থাকেন, যিনি রান্নাবান্না করে দেন। বাঁশের একটা মাচার ওপর খাঁচার ভেতরে একটা বেজি, সাপ, শকুন—এসব পালেন তিনি। মাচার নিচে ওই ডাম্প জায়গায় গাদা মারা তাঁর ছবি। আমাদের মনে হলো, সেই সকালবেলায়ই তিনি গঞ্জিকা ছাড়া আর কিছু সেবন করেননি। এর মধ্যেই কথাবার্তা চলছে। হঠাৎ বললেন, আপনারা কিন্তু দুপুরবেলা এখানে খেয়ে যাবেন। আমরা কিছুতেই রাজি হচ্ছি না। তিনি জোর করছেন। বলছেন, না, খেয়ে যেতেই হবে। তখন যে মহিলা সুলতান ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন, তিনি আমাদের ডেকে নিয়ে বললেন, ‘উনি যে আপনাদের খেয়ে যেতে বলছেন, বাড়িতে তো কিছুই নেই। চালও নেই। কী খাবেন?’ আমি আস্তে আস্তে তাঁকে বললাম, ‘ভাববেন না, উনি বলে ফেলেছেন, আমরা ব্যবস্থা করছি।’ আমি গিয়ে তখন অশোক সেন নামে আমার সঙ্গে যে দুজন গেছে, তাদের একজনকে টাকা দিয়ে বললাম, বাজার করে নিয়ে আসো। সে দ্রুত গিয়ে মাছ, শাকসবজি এসব নিয়ে এলো। মহিলা রান্নাবান্না করল। সুলতান ভাইসহ আমরা খেলাম। সুস্বাদু রান্না অবশ্যই। অদ্ভুত ব্যাপার, সুলতান ভাই একবার জিজ্ঞেসও করলেন না, এই খাবার কোত্থেকে এলো, অথচ প্রসন্নচিত্তে খেয়ে নিলেন! সুলতান ভাই এমনই সরল ও জগত্সংসারের ভাবনাহীন মানুষ ছিলেন। সন্ধ্যায় সেই অজপাড়াগাঁয়ে অন্ধকার নামলে আমরা চলে এলাম।

প্রশ্ন : সুলতান কি জাহাঙ্গীরনগরে গিয়েছিলেন?

মোহাম্মদ রফিক : জাহাঙ্গীরনগরে প্রান্তিকের কাছে যে বাসায় থাকতাম, হঠাৎ একদিন দেখি, সুলতান ভাই হাজির। কী ব্যাপার! ভাই, আমি তো আপনার এখানে থাকতে এসেছি। সুলতান ভাই প্রায় ছয় মাস আমার সঙ্গে কাটিয়ে গেলেন। প্রতিদিন সকালে উঠে আমার একটা ছবি আঁকতেন। বাসা বদলে আসার পর সেই ছবিগুলো যে কোথায় হারিয়ে গেছে তার কোনো খোঁজ নেই এখন। এঁকে এঁকে তিনি আমার খাটের ওপর বিছানার নিচে রেখে দিতেন। তখন আমিও খুব মদপানে আসক্ত ছিলাম। দেখতাম, উনি সকালবেলা উঠেই গাঁজা নিয়ে বসেছেন। ফরীদি (হুমায়ুন) ছিল আমাদের ছাত্র, আরেকজন ছিল মেহেদী—দুজনেই মারা গেছে। উনি ওই দুজনকে দিয়ে গাঁজার ব্যবস্থা করাতেন। আমি বললাম, সুলতান ভাই, গাঁজা খেলে তো শরীর নষ্ট হয়। উনি খুব ছেলেমানুষ ছিলেন, অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প করতেন! আমাকে বললেন, আচ্ছা রফিক, কী করি! আমি বললাম, আপনিও আমার সঙ্গে মদপান করেন। উনি রাজি হলেন। তখন ফরীদিকে বললাম, একটা ব্যবস্থা তো করতে হয়। ও ঢাকা থেকে একটা ভালো মদ জোগাড় করল। আমরা তো বাংলা খেতাম, বুঝতেই পারো। সুলতান ভাই খাবে বলে একটা ভালো বিদেশি মদ ফরীদি নিয়ে এলো। খুব আয়েশ করে আমি, ফরীদি আর সুলতান ভাই বসলাম। একটু খেয়ে সুলতান ভাই বললেন, ‘এটা তো জল, এটা তো কিছু হয় না। এটা আমি খাব না।’ উনি যে গাঁজায় একেকটা টান দিতেন, তুমি বা আমি যদি দিই ও রকম, আমি নিশ্চিত আমাদের বুক ফেটে যাবে। সুলতান ভাই সকালবেলায় উঠে ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না, কিছু করতে পারতেন না, কিন্তু গাঁজায় টান দেওয়ার পরই বলতেন, এইবার ভালো লাগছে। এই হচ্ছে সুলতান ভাই।

প্রশ্ন : আপনারা দুজনেই এই অঞ্চলের মানুষের যাপনের মূল সুরটা ধরেছেন, নিজেদের সৃষ্টিকর্মে প্রোথিত করেছেন।

মোহাম্মদ রফিক : করতে পেরেছি কি না জানি না, তবে এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি। এই হচ্ছে আমার সঙ্গে সুলতান ভাইয়ের সংশ্রব। আমার মনে হয়, সুলতান ভাইয়ের এই নেশায় থাকার সুযোগ নিয়ে এই দেশে অনেকে অনেক ব্যবসা-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে। অনেকেই ব্যবসা করছে এই দেশে। এখনো করছে। আমার সময়ের দুই বড় শিল্পী সুলতান ভাই ও কামরুল হাসান—দুজনের সঙ্গেই আমার খুব হৃদ্যতা ছিল; এমনকি কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গেও। 

প্রশ্ন : সম্প্রতি আর্টসে ভিডিওসহ ছাপা হওয়া কবিতাগুলোও এই মে মাসের মধ্যেই লেখা দেখলাম।

মোহাম্মদ রফিক : বেহুলাও লিখে ফেলেছি অনেক। তোমাকে দেখাতে পারি পাণ্ডুলিপিটা, মহুয়া যে লিখছি সেটারও একই অবস্থা।

প্রশ্ন : মহুয়া বলতেই সেলিম স্যারের কথা মনে পড়ল। আপনার বন্ধু এবং শত্রু, একসঙ্গে বলা যায়। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের আপনারা দুজন দুর্দান্ত কিছু সময় ও অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছেন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তুলেছেন। আপনার শেষ সময় পর্যন্ত খুব অল্পকালের আমার যে অভিজ্ঞতা তাতেও একটা অনিন্দ্যসুন্দর সময় আপনারা দুজনই জাহাঙ্গীরনগরকে দিয়েছেন।

মোহাম্মদ রফিক : সেলিম ও আমি, সেলিম মনে হয় চাকরিতে যোগ দিয়েছে আমার মাস ছয়েক আগে। আমি গিয়ে দেখি যে সেলিম আছে। তার আগে থেকেই ছিল! আমি থাকতে থাকতেই ও মারা গেল। ওর সঙ্গে আমার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল।

প্রশ্ন : ঠিক মারা যাওয়ার পর পর আপনি একটি দৈনিকের পাতায় লিখেছেন, বড় আবেগঘন সে লেখা, তার শিরোনাম?

মোহাম্মদ রফিক : আমি মনে করি, আমাদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়াটা দুজনকেই প্রচণ্ডভাবে সাহায্য করেছে। সেলিম একদিন প্রান্তিকে আমাকে বলছে, আপনি কী লেখেন, কী পড়েন, তা জানতে আপনার পেছনে স্পাই লাগিয়ে রাখি। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে আর নেই। দুজন সৃষ্টিশীল লোক, যে মানেরই হোক, একজন তিনতলায়, আরেকজন দোতলায় থাকত শুরুতে, পরে ও দোতলায়, আমি নিচতলায়, রুম থেকে বেরোলেই দুজনের চেহারা দেখা যেত। তার আগে একজন দোতলায় আর একজন নিচতলায় চাকরি করছে। এই যে ঘটনাটা, আমার মনে হয় না যে বাংলাদেশে কোনো সাহিত্যচর্চায় এটা আর ঘটবে! সেই অর্থে ইলিয়াস ছাড়া কোনো বন্ধু না থাকলেও আমি সেলিমকে আমার বন্ধু মনে করি। কারণ সেলিমকে দিয়ে আমি উপকৃত হয়েছি, সেলিমও উপকৃত হয়েছে। দুজনের চরিত্রগতভাবে কিছু অমিল ছিল। ওর চরিত্র ঠিক আমার সঙ্গে যেত না!

প্রশ্ন : আপনাদের অনুসারী দলও তো ভিন্ন ছিল।

মোহাম্মদ রফিক : অনুসারীরা কখনো আসল লোক হয় না। অনুসারীরা কখনোই বুঝবে না আসলে ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী ছিল! কেউ কেউ যারা দুজনেরই অনুসারী ছিল। যেমন আমি ফরীদির নাম বলব। ফরীদি দুজনের সঙ্গেই তাল রেখে চলেছে। সুতরাং একেবারে যে আলাদা ছিল, তা নয়। এমনকি আনু মুহাম্মদও তাই। আনুর সঙ্গে দুজনের সম্পর্কই খুব ভালো ছিল। যদিও আনু ঠিক সৃষ্টিশীল লেখক নয়, স্কলার। অন্য জগতের লোক, এ রকম আরো দু-একজন আছে, যাদের উভয়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। তবে কবিতাকেন্দ্রিক যেসব সম্পর্ক তোমাদের সঙ্গে, তোমাদের আমি অনুসারী মনে করিনি কখনো, তোমরা আমার সহযাত্রী। ফজল মাহমুদের কথা বলতে হয়, সে মারা গেছে। ওর সঙ্গে দুজনেরই ভালো সম্পর্ক ছিল।

প্রশ্ন : সুনীল সাইফুল্লাহ?

মোহাম্মদ রফিক : সুনীলের সঙ্গে সেলিমের সম্পর্ক ছিল না। সব সময় নিজের ভেতরে থাকত। আত্মমগ্ন। ওর কিছু প্রবলেমের কথা আমাকে বলেছিল। আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত ওর আত্মঘাতী হওয়ার কারণ ওটাই। সুমন (রহমান), কফিল (আহমেদ) কিংবা (মাহবুব) পিয়ালের কথা বলতে পারো, ওরা যেমন আমার সঙ্গেই আড্ডা দিত বেশি। শামীমের (শামীম রেজা) আবার দুজনের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক ছিল।

প্রশ্ন : স্যার, দীর্ঘসময় শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা আপনাকে গ্র্যান্ড ফেয়ারওয়েল দিয়েছে, বিভাগে, বিভাগের বাইরে, উভয় জায়গায়ই।

মোহাম্মদ রফিক : ওই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটা কথা তোমাকে বলে নিই, মনে পড়েছে, আমরা যখন ষাটের দশকে লিখতে শুরু করেছিলাম, আমাদের মধ্যে এক ধরনের নির্বেদ ও অবক্ষয়বোধ কাজ করত। সেটা কিন্তু সবার মধ্যেই ছিল। এমনকি আমি রবীন্দ্রনাথের বলয়ে থাকলেও আমার মধ্যেও সেটা কাজ করেছে। সাতষট্টি সালে, তখন চট্টগ্রামে চাকরি পেয়ে গেলাম। চট্টগ্রামের ভূমণ্ডল একটু আলাদা—পাহাড়, সমুদ্র। আমাদের দক্ষিণবঙ্গ সেই তুলনায় সমতল। আমার মূল ভূমি কিন্তু দক্ষিণবাংলা, বরিশাল, বাগেরহাট—এসব জায়গা। বরিশাল, বাগেরহাটের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে খুব একটা পার্থক্য নেই, যেটা আছে বরিশাল ও চট্টগ্রামের মধ্যে। সেই পাকিস্তানি নির্বেদ ও অবক্ষয়বোধ কাটিয়ে ওঠার একটা তাগিদ, অনুভব, চেষ্টা ছিল আমাদের মধ্যে। আমার মধ্যে বিশেষ করে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতা একটা বিরাট তোলপাড় ঘটিয়েছে। আমি লিখেছি একটা কবিতা, ব্যাঘ্রবিষয়ক-এ। ওই বক্তৃতা শোনার পরে আমার হঠাৎ মনে হলো, এত দিন শিয়াল ছিলাম, এই বক্তৃতা আমাকে বাঘে রূপান্তর করে দিল। তার পরই লেখা কবিতা ব্যাঘ্রবিষয়ক। আমি যে বঙ্গবন্ধুকে বাঘ বলেছি তা নয়, ওই ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে আমার ভেতরে যে অনুভূতিটা হয়েছিল সেটাকে আমি ওইভাবে ধরার চেষ্টা করেছি। সেই বক্তৃতাকে আমার মনে হয়েছিল একটা শ্রেষ্ঠ কবিতা। আমার মনে হয়, যারা শুনেছিল সেই বক্তৃতা, তারা প্রত্যেকেই...

প্রশ্ন : শৃগাল হইতে ব্যাঘ্রে রূপান্তরিত হইয়াছিল!

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁঁ। যখন পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানিরা ক্র্যাকডাউনটা করল, তারপর আমি মানুষের যে চেহারা দেখেছি, এটা ছাত্রদেরও বলেছি, সেই চেহারা আজকে আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, যখন শুনি একটা গারো মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে, তখন আমি অবাক হয়ে যাই, কারণ বাঙালি এমন নয়। আমি এই জাতির সবচেয়ে বড় বিপদের সময়ও তাদের যে চেহারা দেখেছি, এই চেহারা তাদের ছিল না।

প্রশ্ন : স্যার, ৭ই মার্চের পর শৃগাল থেকে ব্যাঘ্রতে পরিণত হলেন।

মোহাম্মদ রফিক : তুমি যদি আমার আগের লেখা পড়ো, ‘বৈশাখী পূর্ণিমায়’ ও ‘কীর্তিনাশা’ যদি মিলিয়ে পড়ো, তাহলে বুঝবে আমি নতুন জন্ম নিয়েছি। তোমাকে তো বলেছি, মুক্তিযুদ্ধ নতুন আমাকে জন্ম দিয়েছে। আমার পিতা সামছুদ্দীন আহমদ; কিন্তু পুনর্জন্মের পিতা হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

প্রশ্ন : স্যার, আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ১ নম্বর সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পলিটিক্যাল অফিসার হিসেবে ছিলেন। এই বিষয়গুলো নিয়ে আপনি কখনোই প্রকাশ্যে বলেননি, দেনা-পাওনার হিসাব করেননি। অনেক কবি-সাহিত্যিকই সেটা করেছেন, সুবিধা নিয়েছেন। এই বিষয়গুলো আপনি কখনোই রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাননি বা তুলে ধরেননি। কেন?

মোহাম্মদ রফিক : না, এটা তো আমার কাজ না। আজকে তোমাকে বলি, অনেক জায়গায় আমি বিভিন্নভাবে কাজ করেছি। যেমন—বগুড়া, রাজশাহীতেও আমার ভূমিকা আছে; রাজশাহীতে অনার্স তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে, রাস্টিকেট করা হয়েছে, আমি যে আজকে এ অবস্থানে পৌঁছেছি, সেটা আমার কর্মগুণে, ভাগ্যগুণে বলব না। সেসব কথা কখনো লিখতে হবে, ভাবিনি। সে আবার আরেক ধরনের ইতিহাস। এসব কথা যে আমাকে বলতে হবে তা কখনো বিশ্বাস করতাম না। মনে করতাম, আমার ব্যক্তিকর্ম অন্তরালে থাক, আমার লেখাই সামনে আসুক।

প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের ওই সময়টার আপনি যে ঘটনাগুলো বললেন, আপনি গেলেন এবং ১৬ই ডিসেম্বর আমরা...

মোহাম্মদ রফিক : আচ্ছা, তুমি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার কথা বলছ, তখন ১ নম্বর সেক্টরে কাজ করি, মেজর রফিক তখন ১ নম্বর সেক্টরে ছিলেন। আমি সেখানে কাজ করতাম, বেতনও পেতাম। পরে সেখান থেকে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ শুরু করি। এসব ব্যাপার মিলিয়ে আমি যে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি, তার কাগজপত্র তো আমার কাছে ছিল। পরে যখন ঢাকায় এসে নামলাম, মনে হলো, আমি তো এই কাগজপত্র নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে পারি। আমি মুক্তভাবে এই দেশ থেকে গিয়েছিলাম, মুক্তভাবে ফিরতে চেয়েছি। সব কাগজপত্র রানওয়েতে উড়িয়ে দিয়ে আমি দেশে প্রবেশ করেছি। আমি দেশে ফিরলাম ১১ জানুয়ারি ১৯৭২, তখন সেখানে আমাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতে হয়েছিল বলে ফিরতে একটু দেরি হয়। ফিরে দেখি, চাকরি নেই। তখন নোমান সাহেবের কাছে যাই। উনি তখন শিক্ষা দপ্তরের দায়িত্বে আছেন। আমি গিয়ে বললাম, স্যার, আমার তো চাকরি নেই। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমি জানি, তুমি দেশের জন্য কী করেছ। সুতরাং তুমি যাও, তোমার চাকরি আছে।’ আমি গিয়ে চিটাগংয়ে যোগ দিলাম। যাওয়ার কিছুদিন পর, আমি আবার নোমান স্যারের প্রিয় ছাত্র, আমি, ইলিয়াস (আখতারুজ্জামান) উনার ছাত্র, মান্নান (সৈয়দ) উনার ছাত্র। আমি ঢাকা কলেজে এলাম। এক লোক আমার কাছে এলেন। বললেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা। আমি তখন অবাক হলাম। কী বলেন এসব! আপনাকে ২১ না জানি ২৬ ডিসেম্বর কফি হাউসে দেখেছি, আপনি তখন বলেছেন, আপনি ওই দিনই দেশ থেকে এখানে এসেছেন, তাহলে আপনি কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হন! তিনি, হে হে করছেন, আমতা আমতা করছেন, আমি তো, অবাক। তখন তাঁকে বললাম, আমি তো জানি আপনি মুক্তিযোদ্ধা নন। আসলে আমি এটাও জানি, এ দেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যাঁরা সত্যিকার অর্থেই মুক্তিযোদ্ধা, যাঁদের কোনো সার্টিফিকেট নেই, আমরা মুক্তিযুদ্ধের পর সব যোদ্ধাকে অস্ত্রহীন করে তাদের গ্রামে পাঠিয়ে দিলাম, দেশটাকে দখলের চেষ্টা করলাম। এখান থেকেই আমাদের বিয়োগান্তক কাহিনির শুরু। আমার কিছু গল্পে এসব ঘটনা আছে এবং লেখার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন : স্যার, মুক্তিযুদ্ধের ৪৪ বছর চলে গেছে। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বরাজনীতিতেও অবদান রাখতে শুরু করেছি।

মোহাম্মদ রফিক : আরো অনেক অবদানই আমাদের থাকবে। তোমাকে একটা কথা বলি, তুমি যখন আমাকে এই প্রশ্ন করেছ তখন বুঝেছি, আমি যখন আইওয়াতে গেলাম, আমার কাছে ব্যাপারটি স্পষ্ট হলো, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকা বা অন্যান্য দেশের লেখকদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হলো। আমি বোঝালাম, তাদের বললাম, তারাও জানতে আগ্রহী হলো, আমি তখন বুঝলাম, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এত উৎসাহ কেন! আমরা সাধারণত বলে থাকি, আমাদের দেশে গ্যাস, তেল পাওয়া যায়, এসব তারা দখল করতে চায়। কথাটা কিছুটা হলেও সত্য। তুমি দেখ, পৃথিবীর এই যে মানচিত্র, এই মানচিত্র তৈরি করেছে কারা? শুধু ব্রিটিশরাই নয়, পশ্চিমারাও। আমরা যাদের পশ্চিমা বলি, আমাদের দেশের সীমারেখা নিয়ে যাদের সমস্যা, আবার ভারতের সঙ্গে চীনের বা চীনের সঙ্গে অন্যান্য দেশের; তেমনি লাতিন আমেরিকায়ও সীমান্ত সমস্যা আছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এ সমস্যা লাগিয়ে রেখেছে। এখানে শুধু ব্রিটিশরা একা নয়, টোটাল পশ্চিমাজগৎ। তার সঙ্গে যুক্ত আমেরিকাও। এখন আমাদের এখানে কারা সমস্যা তৈরি করেছে, লাইবেরিয়ায় কারা তৈরি করেছে, ওরা। আর বাংলাদেশ তৈরি করেছে কারা! স্বাধীন করেছে কারা?

প্রশ্ন : কিভাবে?

মোহাম্মদ রফিক : আমরা বাংলায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছি ১৯১৩ সালে, আর তোমরা (আমেরিকানরা) পেয়েছ ১৯৩৬ সালে। সো, ডোন্ট ফরগেট ইট। আমি বলি, আজ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারটি শুধু রবীন্দ্রনাথের জন্যই সৌভাগ্য বহন করে না, সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য এই সৌভাগ্য বহন করে নিয়ে এসেছে। এটা কেউ ভাবে না! রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দেওয়ার পেছনে ব্রিটিশ শক্তি কাজ করেছে। আর ওরা ভেবেছিল রবি দ্বারকানাথ ঠাকুরের বংশধর, জমিদার, ওকে পার্মানেন্টলি আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারব। সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যার প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ করলেন এবং যখন চিঠিটি লিখলেন, প্রত্যাখ্যানের, এককথায় অসাধারণ। ওদের মুখের মধ্যে থুতু মেরে দিল। তখন তারা বুঝল, আরে, এটা কী হলো! তারপরের কাজটা করল সুভাষ বসু। সুভাষ বসু যখন তাদের চাকরি লাথি মেরে চলে এলো, তখন তারা বুঝল, খবরদার, বাঙালিকে তো একসঙ্গে রাখা যাবে না। রাখলে ওরা আমাদের ওপরই খবরদারি করবে। সো, ডিভাইড অ্যান্ড রুল। ওরা একইভাবে চেষ্টা করেছে রবীন্দ্রনাথ যেন নাইট পান, আবার জগদীশ চন্দ্র বসু যেন নোবেল না পান। তাঁরা সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার চেয়ে বিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন যদি জগদীশ চন্দ্র বসু নোবেল পেয়ে যেতেন, তাহলে এর প্রভাব বাঙালি জাতির ওপর অন্য রকমভাবে পড়ত। তখন হয়তো হিন্দু-মুসলমান রায়ট বা ৬৫-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সম্ভব হতো না। ধরো, আমরা ইইউবিরোধী বা ইহুদিবিরোধী, ইহুদিরা যে কাণ্ডকারখানা করেছে, তাতে তাদের বিরোধী না হয়ে পারি না। আমরা চাই ইহুদিরা তাদের অধিকার পাক। সেটা কারো প্রতিশ্রুতির ভেতর দিয়ে না, তারা নিজেদের যোগ্যতায় সেটা পাক। তবে ইহুদিরা পৃথিবীতে চেতনার দিক দিয়ে বিরাট শক্তি। মানুষ শুধু অস্ত্র দিয়েই পৃথিবী শাসন করে না। এক অর্থে ইহুদিরাই পৃথিবী শাসন করছে। কারণ আমেরিকা যে খবরদারি করে সেটা তৈরি করেছে কারা!

প্রশ্ন : ইংরেজরা।

মোহাম্মদ রফিক : একটা কথা, আজ যদি বাংলা অবিভক্ত থাকত, তাহলে দেখতে এ অঞ্চলের শুধু নয়, পৃথিবীর চিন্তা-চেতনার সর্বক্ষেত্রে অধিকারটা বাঙালিরই থাকত। সেটা ভাঙার জন্য ১৯১৯ সাল থেকে ইংরেজরা উঠে-পড়ে লেগেছে। সেটা তারা বাস্তবায়ন করেছে। ১৯৩৬ সালের আগে হিন্দু-মুসলমান মারামারি হয়েছে? মারামারি তো অন্য বিষয়, জমি নিয়ে মারামারি বা সীমানা নিয়ে মারামারি, যাকে বলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সেটা ১৯৩৬ সালের আগে এ অঞ্চলে হয়নি। এটা ইংরেজের একটা প্ল্যান। শুধু ইংরেজরা বলব না, সব উপনিবেশবাদী চক্রান্ত করেছে এবং তারা বোঝাতে চেয়েছে—আমরা অসভ্য, অমুক তমুক, আমরা এটা জানি না, সেটা জানি না। তারা সব জানে।

প্রশ্ন : স্যার, অরুণ সেনের মতো লোক আপনার কবিতা নিয়ে অসাধারণ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন। সনৎ কুমার সাহা, গত বছর একুশে পুরস্কার পেলেন, নিয়মিতই লিখেছেন আপনার ওপর। তবু আমাদের সমালোচনা সাহিত্যে, আসলে সংকট আছে, তার মধ্যে এই পাওয়াগুলো কিভাবে দেখেন?

মোহাম্মদ রফিক : ইদানীং শুনছি সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন। আমি লেখাটা হাতে পাইনি। হাতে পেলে তোমাকে বলতাম। সেখানে তিনি বলেছেন, শুনেছি ওই পত্রিকায়, আমার কপিলা উনার ভালো লেগেছে। ওই ব্যাপারে কোনো দুঃখ নেই। বাংলা সাহিত্যের দুজন প্রধান লেখক, অরুণ মিত্র, তারপর আবদুল কাদীর সাহেব, তাঁদের প্রশংসা পেয়েছি। আমাকে মুখোমুখি বলেছেন, অন্যের সামনে বলেছেন।

প্রশ্ন : জি স্যার। অন্য একটা প্রসঙ্গে যাই। সেটা হলো, আপনি তো বললেনই স্যার যে বাংলা কবিতায় আপনি হলেন রবীন্দ্রবাদী।

মোহাম্মদ রফিক : রবীন্দ্রবাদী মানে ওই বলয়ের।

প্রশ্ন : ওই বলয়টা স্যার কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মোহাম্মদ রফিক : বৈষ্ণব পদাবলী বা গীতিকা বা আমার ইতিহাস হলো বাংলার সংস্কৃতি। বাংলার যে আবহমান সংস্কৃতি লালন এবং যার ভেতরে, বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। এই দক্ষিণাঞ্চলই এক অর্থে বাংলার সংস্কৃতিকে তৈরি করেছে। তুমি মাইকেল বলো, রবীন্দ্রনাথ বলো, লালন বলো—এঁরা সবাই এখান থেকে উঠে এসেছেন। হাসন রাজা বলো, সবাই এখান থেকে উঠে এসেছেন। দক্ষিণ বাংলা বাংলার জল, মাটি হাওয়ার বাংলা। আমি চেয়েছি, আমি মনে করি, আর্টারি, এই রক্তনালি যাকে বলে। বাংলার রক্তনালি হচ্ছে বাংলার নদী, বাংলার জল এবং আমি চেয়েছি যে আমার কবিতায় যেন শেষ পর্যন্ত জল কথা বলে, নদী কথা বলে।

প্রশ্ন : হাওয়া কথা বলে!

মোহাম্মদ রফিক : হাওয়া কথা বলে, মাঝি কথা বলে, পাখি কথা বলে। হ্যাঁঁ, এটাই চেয়েছি এবং এখনো যত দিন আমি বেঁচে থাকব, এটাই চেষ্টা করে যাব।

প্রশ্ন : এরশাদের আমলে?

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁঁ, তখন তাঁদের বলেছি যে আমাকে জোর করে বা চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখাতে পারবেন না। কারণ আপনি কাগজ খুলে দেখেন, আমি যখন ছাত্র, এই দেশে কিন্তু মার্শাল ল কোর্টে প্রথম যাঁদের বিচার হয়েছে, তার প্রথম নাম্বার আসামি আমি। আমার মার্শাল ল কোর্টে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে, ১৯৬২ সালে। হ্যাঁঁ, আমার কোর্টে যিনি প্রিসাইডিং অফিসার ছিলেন, তিনি পাকিস্তান আর্মির একজন ব্রিগেডিয়ার ছিলেন এবং আপনার প্রধান যিনি তাঁকে দেখলে তাঁর রুমে ঢুকতে সাহস করতেন না। তাঁকে স্যার স্যার বলে মুখে ফ্যানা তুলে দিতে হতো। সেই লোক আমাকে যখন শেষে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেন, তখন পুলিশ রিপোর্ট করা হয়। আমি হচ্ছি কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার। তিনি বোধ হয় জীবনে কমিউনিস্ট দেখেননি। তিনি বোধ হয় ভাবতেন কমিউনিস্টরা সব সময় আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকে। তিনি তাঁর এজলাস থেকে নেমে এসেছেন এবং আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আমি হাফপ্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছি। আমি তখন প্রথম বর্ষ অনার্সে ভর্তি হয়েছি। তখন রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে অনার্স ছিল না। অনার্সটা পড়ানো হতো রাজশাহী কলেজে। আমি তখন হাফপ্যান্ট পরি। তিনি নেমে দেখছেন যে, হাফপ্যান্ট পরা একটা ছেলে কমিউনিস্ট।

প্রশ্ন : বাংলা একাডেমি পুরস্কার তিন বছর বন্ধ ছিল।

মোহাম্মদ রফিক : না, এক বছর বন্ধ ছিল। সে বছর মঞ্জুর-এ-মওলা ছিল। সে বলেছিল, লোক পাওয়া গেল না বলে দিলাম না। যাই হোক, বিষয়টা হচ্ছে সে চেষ্টা করেও আমাকে দিতে পারেনি। ইমোশনালি প্রবলেমটা আমাকে বলতেও পারেনি। পরে বলেছে।

প্রশ্ন : আচ্ছা।

মোহাম্মদ রফিক : তারপরে যে ঘটনা ঘটল, আমি যায়যায়দিনে লেখালেখি করলাম। আমি চিঠি লিখলাম, আমার নাম যেন আর প্রস্তাবে না আসে। পরের বছর আবার পুরস্কার দেওয়ার সময় এলো। আমি তখন অনেক সময় নিজের বই নিজে বিক্রি করতাম। হঠাৎ দেখি ওই দিন বিকেলবেলা, আমার টেবিলের আশপাশে তখন কবিরা ঘুরঘুর করছে। নূরুল হুদারা। আবার আবু হেনা মোস্তফা কামাল। আমার বন্ধুবান্ধব চলে গেছে, আবু হেনা মোস্তফা কামাল খুব বড় রোল প্লে করেছেন। তিনি আবার আমার স্যার, একসময়কার রাজশাহীতে। যাই হোক, তিনিও খুব চাইলেন—আমি নিই। আমার সম্পর্ক তখন তাঁর সঙ্গে খুব একটা ভালো ছিল না। তিনি এটা তাঁর বক্তৃতায়ই বলেছেন। তখন পরবর্তী সময়ে আবার তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো হয়ে যায়। ওই দিন দেখি, হঠাৎ বিকেলের দিকে, নূরুল হুদা, শওকত ওসমান, কবীর চৌধুরী ও আবুল হোসেন আমার টেবিলের চারদিকে ঘুর ঘুর করছে। আমি বুঝতে পারলাম না যে কী হচ্ছে। কে জানি, এদের মধ্যে একজন এসে আমাকে বলল, আমরা এটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি এবং আমরা বলেছি যে তুমি যদি পুরস্কার না না-ও তাহলে আমরা অপমানিত হবো। আমরা কেউ এই কমিটিতে থাকব না। তুমি এটা নাও।

প্রশ্ন : এটা রিজেক্ট কোরো না।

মোহাম্মদ রফিক : শওকত ওসমান আমার নিজের শিক্ষক। দীর্ঘদিনের জন্য।

প্রশ্ন : একেবারে সরাসরি শিক্ষক।

মোহাম্মদ রফিক : তারপর আবুল হোসেন সাহেব। আমি দেখলাম, তাঁদের অপমান করে আমার কোনো লাভ নেই। এর পরে নূরুল হুদা এলো। এসে বলল, আপনি চলেন আমরা কোথাও যাব চা খেতে। এই আর কি।

প্রশ্ন : হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে পাওয়া, এতে বোধ হয় আপনার খুব একটা তৃপ্তি কাজ করে না।

মোহাম্মদ রফিক : না, খুব একটা যে করেছে, তা না। কারণ সেটা আমি বলব না। হুমায়ুনের লেখাটেখা যাই হোক, হুমায়ুনের মানে সব কিছু মিলিয়ে নিয়ে আমি খুব একটা সন্তুষ্ট নই। যদিও হুমায়ুনের ওপর আমি লেখাটেখা লিখেছি। মানে এখনো লিখব। তবে হুমায়ুনের কিছু ব্যাপারে আমার আপত্তিও আছে।

প্রশ্ন : আপত্তিও আছে!

মোহাম্মদ রফিক : হুমায়ুনের সঙ্গে আমার ছাত্র অবস্থায় যোগাযোগ হয়নি। যদিও আমি যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, ও তখন প্রথম বর্ষ; কিন্তু ও যখন চিটাগং বিশ্ববিদ্যালয়ে, তখনই সে প্রথম আমার বাড়িতে আসে। আমরা চট্টগ্রামে একটা হোটেলের ছাদে আড্ডায় বসতাম।

প্রশ্ন : একুশে পদক পেলেন ২০১০ সালে। আপনি বললেনই স্যার পদক বা পুরস্কারে কারো লেখার কোনো মূল্যায়ন হয় না। কিন্তু স্যার ওই যে টিকিটের দাম অর্ধেক রাখা, অজস্র কবিতা পাঠকের ভালোবাসা, শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, ওই রকম পুরস্কার তো প্রচুর পেয়েছেন।

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁঁ, মানুষের ভালোবাসার পুরস্কার। রাইট। সেই ভালোবাসার মূল্য আমি অবশ্যই দিই।

প্রশ্ন : যে কবির জীবন আপনি কাটালেন, সেই কবি জীবনে কোনো অতৃপ্তি কি আছে?

মোহাম্মদ রফিক : না, আমি লিখছি প্রচুর। আরেকটি কথা তোমাকে বলতে চাই, একজন কবি সব সময় তাঁর সব লেখার জন্য জনগণের কাছে পরিচিত হয় না। যেমন—নজরুল, আমরা তাঁকে চিনি বিদ্রোহী কবিতার জন্য। এটাই কি তাঁর পরিচয়?

প্রশ্ন : তাঁর আরো বহু ভালো লেখা আছে।

মোহাম্মদ রফিক : জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন বা রূপসী বাংলা—এটাই কি তাঁর পরিচয়?

প্রশ্ন : কিন্তু এটা গুরুত্বপূর্ণ।

মোহাম্মদ রফিক : এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বাহন। খোলা কবিতা লোকের ভালো লেগেছিল, এটা আমার নিজের প্রাপ্য। আমি নিজেও খোলা কবিতার সঙ্গে খুব উৎসাহী ছিলাম না। মনে করতাম, এটা আমার রাজনৈতিক কর্মেরই একটা অংশ। এটা কবিতা হিসেবে খুব উঁচু স্তরের নয়। এটা আমাকে প্রথম বলল মঞ্জুর-এ-মওলা। সে আমাকে একদিন কথায় কথায় বলল, এটা ঠিক না। এটা কবিতা হিসেবেও ভালো। তারপর অরুণ সেন, তাঁর প্রতিক্ষণ থেকে নির্বাচিত কবিতায় পুরো কবিতাটা ঢুকিয়ে দিল। আমি দেখে অবাক হয়ে বললাম, সে বলল ‘হ্যাঁঁ’। আইওয়া ইউনিভার্সিটির একটা ওয়েবসাইটে তুমি দেখবে, পুরো কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ আছে।

প্রশ্ন : এখন আপনার জীবনযাপনটা কেমন? আপনি তো সারা দিন একাই থাকেন!

মোহাম্মদ রফিক : আমি প্রথম রাত থেকে শুরু করি, রাত ৯টায় বিছানায় যাই, ভোর সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে উঠি। উঠে এক ঘণ্টার মধ্যে সব ঠিকঠাক করে, ওষুধপত্র গোছগাছ করে, ঠিক ৫টায় বই-খাতা নিয়ে লিখতে বসে যাই। সাড়ে ৭টা পর্যন্ত লিখি। তারপর আড়মোড়া ভেঙে পৌনে ৮টায় উঠে যাই। ৮টায় নাশতা করি। একটু রেস্ট নিয়ে হাঁটতে যাই। ফিরে এসে স্নান করে হালকা নাশতা করি। তারপর দৈনিক কাগজ দেখি। সারা দিন এভাবে কাটে। যদি ইচ্ছা করে লিখি। লিখাটা এখন আমার মূল কাজ। তাগিদ বোধ করলাম তো লিখতে বসে গেলাম।  সন্ধ্যার পর আর সেভাবে কাজ করতে চাই না। সন্ধ্যার পর বসে থাকি।

প্রশ্ন : অনেক ধন্যবাদ স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : হ্যাঁঁ, এটাই হচ্ছে আমার মূল কথা। তোমাকে আবারও বলি, আমি মনে করি, কাব্যের মুক্তি এবং মানুষের মুক্তি দুটি এককথা নয়; সব মানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না। সুতরাং ওই চিন্তা আমাদের আপাতত করে যাওয়া, সাধনা করে যাওয়া। মানুষকে উজ্জীবিত করে যাওয়া। যদি কোনো দিন সেই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে, হয়তো আরেকজন বঙ্গবন্ধু, হয়তো আরেকজনের নেতৃত্বের মধ্যে, বঙ্গবন্ধুর মতো সেই ঘটবে। সেই দিনের আশায় বসে দিন গুনছি।

(শ্রুতিলিখন সহায়তা : জব্বার আল নাঈম ও আমেনা তাওসিরাত)

মন্তব্য