kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

স্মৃ তি ক থা

রমনা বটমূল, ছায়ানট এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

সন্‌জীদা খাতুন

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৫ মিনিটে



রমনা বটমূল, ছায়ানট এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি : শেখ হাসান

সন্‌জীদা খাতুন। ৮৬ বছর পার হয়েও বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি একাধারে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষক। ষাটের দশকে শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রবীন্দ্র শতবর্ষ উদ্যাপনের অগ্রগণ্য সৈনিক তিনি। রমনা বটমূলে বর্ষবরণ আয়োজনের পথিকৃৎ। ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, এখন সভাপতি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে পেয়েছেন রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার ও দেশিকোত্তম পুরস্কার। এ ছাড়া কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে তাঁকে ‘রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য’ উপাধি প্রদান করে। ১৯৩৩ সালে ঢাকায় সন্‌জীদা খাতুনের জন্ম। তিনি জাতীয় অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেনের মেয়ে। এই মহীয়সী ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯৫৫ সালে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও ১৯৭৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সন্‌জীদা খাতুন আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা। তাঁর এই স্মৃতিকথা অনুলিখন করেছেন দীপংকর গৌতম

 

সেবার রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছিল। এই যুগান্তকারী আয়োজন বাংলার সংস্কৃতিসচেতন মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। আর এর মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রচর্চার জগতে সংস্কৃতিবানদের মধ্যে একটা জায়গা করে নিই। মূলত ১৯৬১ সাল থেকেই ‘শ্রোতার আসর’ নামে ঘরোয়া আসর করতাম। এর পেছনের লক্ষ্য কী ছিল, তা রাষ্ট্রপক্ষ তখন অনুধাবন করতে না পারলেও যারা করেছিলাম, তারা ঠিকই বুঝেছি কী করব। আমাদের লক্ষ্য ধীরে ধীরে ঠিক করে ফেলেছি। আমরা তখনই অনুভব করেছি, দেশে চর্চার সংকট রয়েছে, রয়েছে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীর অভাবও। এই অভাব দূর করতে হলে প্রয়োজন একটি রবীন্দ্রচর্চার প্রতিষ্ঠান, প্রয়োজন একটি সংগীত বিদ্যালয়ের। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠান উদ্‌যাপন শেষে এক বনভোজনে গিয়ে কবি সুফিয়া কামাল, মোখলেসুর রহমান, সায়েরা আহমদ, শামসুন্নাহার রহমান, আহমেদুর রহমান, ওয়াহিদুল হক, সাইদুল হাসান, ফরিদা হাসান, মীজানুর রহমান, সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক, আমিসহ আরো অনেক অনুপ্রাণিত কর্মী সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমিতি গঠন করার সিদ্ধান্ত নিই। ১৯৬৩ সালে ছায়ানটের যাত্রা শুরু হলো। এরপর রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, শুদ্ধ সংগীত, পল্লীগীতিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ শুরু হলো। আমরা তখন মানুষের ঐতিহ্যপ্রীতি বাড়াতে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন করার রীতি শুরু করি। ছায়ানট ধীরে ধীরে মহীরুহ হয়েছে। যাঁরা শুরুতে ছিলেন, তাঁরা অনেকেই আজ নেই। ছায়ানট পহেলা বৈশাখের যে সংস্কৃতি চালু করেছে, তার বিন্যাস বিশাল, তার ব্যাপ্তি আকাশসমান। সারা বিশ্বের বাঙালি পহেলা বৈশাখকে ঘিরে যে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চা করে, তার পথপ্রদর্শক ছায়ানট। শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৯৭১ সাল ছাড়া প্রতিবছরই রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ উদ্‌যাপন করে আসছি ছায়ানটে। ঢাকার রমনা উদ্যানে অশ্বত্থগাছের নিচে ১৩৭৪ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রভাত, ইংরেজি ১৯৬৭ সালের মধ্যএপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ছায়ানটের প্রথম অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানস্থলের নাম করা হয় বটমূল।

‘রবীন্দ্রনাথের জীবন দর্শনের পথরেখায় সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি রচনার অনুসারী আমরা। ১৯৫৬ সালে উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাজভাষা করা হলেও নানাভাবে চলেছে পাকিস্তান সরকারের আগ্রাসন। কিন্তু তারা এ দেশের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের মাধ্যমে আমরা সরকারের চরম শত্রুতে পরিণত হই।

মূলত আমরা সংস্কৃতির আশ্রয়ে এ দেশের মানুষের স্বাধিকারের কথা বলতে চেয়েছি। ১৯৬৭ সালের পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদ্যাপনের মাধ্যমে আমরা সে কথারই জানান দিয়েছি। ছায়ানট গঠন ও তৎকালীন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটা কেমন ছিল, তা বোঝাতে তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালের জুন মাসে পাকিস্তানের তদানীন্তন তথ্যমন্ত্রী, ঢাকার নবাববাড়ির খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচারের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিলেন—এই সংগীত পাকিস্তানের আদর্শের বিরোধী। ১৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক এই নির্দেশনামার বিরোধিতা করে বিবৃতি দিলেন। এতে রবীন্দ্রনাথকে ‘বাংলাভাষী পাকিস্তানির অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে’ দাবি করা হয়। পাল্টা বিবৃতি দিলেন রবীন্দ্রবিরোধী, পাকিস্তানপন্থী ব্যক্তিরা। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত হলো বুলবুল ললিতকলা কেন্দ্র—বাফা, ছায়ানট, ক্রান্তির সম্মেলক অনুষ্ঠান। বইতে শুরু করল জোর রবীন্দ্র হাওয়া। উপমহাদেশের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর নামে ঢাকায় বাফা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৫ সালে। বাফায় রবীন্দ্রসংগীত শিখিয়েছেন কলিম শরাফী, ভক্তিময় সেনগুপ্ত এবং আরো পরে আতিকুল ইসলাম। “বাফা রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা ভালোভাবেই চালিয়ে গেছে সেই সময়। এমনকি শান্তিনিকেতন থেকে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যের দল নিয়ে এসে তারা অনুষ্ঠান করেছে। কলকাতা থেকে দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সুপ্রীতি ঘোষদের নিয়ে এসে তারা অনুষ্ঠানে গান গাইয়েছে। বাফার ভূমিকাটা তখন খুবই ভালো ছিল।”

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের পরই গড়ে ওঠে সমমনা সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্যোগে ‘ছায়ানট’। ঢাকায় রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের আবাহনী অনুষ্ঠান শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তান আমলে এগুলো ছিল প্রতিবাদেরই প্রকাশ। এই প্রতিবাদে শরিক হয় ছোট-বড় আরো সাংস্কৃতিক সংগঠন। আন্দোলনের নানা পর্বে নানা অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান। ‘সোনার বাংলা’ গাওয়া হয়েছে মিছিলে। অনুষ্ঠান হলে সেখানে ‘সার্থক জনম আমার’ গাওয়া হয়েছে। একটি গান আমরা আবিষ্কার করেছিলাম। ‘কে এসে যায় ফিরে ফিরে আকুল নয়ননীরে। কে বৃথা আশাভরে চাহিছে মুখ ’পরে, সে যে আমার জননী রে।’ তার পরের কথাগুলো ইম্পর্টেন্ট। ‘কাহার সুধাময়ী বাণী মিলায় অনাদর মানি। কাহার ভাষা হায় ভুলিতে সবে চায়, সে যে আমার জননী রে।’ এই যে গানটা, এটা রবীন্দ্রনাথ বহু আগে বাংলায় যে বক্তৃতা হতো না, তা নিয়ে দুঃখ করে গানটা লিখেছিলেন। আর আমরা ভাষা আন্দোলনের পরে এই গানটা নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এই গান আমরা তখন গাইতাম। তা ছাড়া পাকিস্তান আমলে আমরা যেটা করেছি, যখনই কোনো একটা বিরূপ ব্যাপার হতো, তখনই আমরা রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে আমাদের মনের ব্যথাটা প্রকাশ করতাম। যাঁরা দর্শক হয়ে আসত, তারা কিন্তু বুঝতে পারত। একটা অনুষ্ঠানে আমরা গেয়েছিলাম—‘কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো! বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো।’ অন্ধকারের মধ্যে গানটা শুরু করা হয়েছিল এবং সেটা বিশেষভাবে মানুষের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তা ছাড়া একবার পাকিস্তান আমলে, আইয়ুবের আমলে চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের গ্রামে শিশু-নারী-নির্বিশেষে আর্মি গিয়ে অত্যাচার করেছিল। সেই সময় বৌদ্ধরা কয়েকজন আমাদের কাছে এসেছিল। বলল, ‘আমরা কিছু তো করতে পারছি না, কিছু বলতে পারছি না। আমরা রবীন্দ্রসংগীতের একটা অনুষ্ঠান করতে চাই।’ ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’, বুদ্ধকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান আছে, সেই গানগুলো, সে সময় তারা আমাদের কাছে দেখে নিয়ে অনুষ্ঠান করেছিল। এটাও আন্দোলনই হলো। মুক্তিযুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথের গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নানা উদ্দীপক গানের সঙ্গে প্রচারিত হয় রবীন্দ্রনাথের গান। আমি আর ওয়াহিদুল হকের সক্রিয় উদ্যোগে গড়ে ওঠে গানের দল। আমরা ঘুরে বেড়াই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। আমাদের পালিয়ে যেতে হয়েছিল কলকাতায়। সেখানে গিয়ে আমরা ‘রূপান্তরের গান’ নামে একটি গীতি-আলেখ্য তৈরি করেছিলাম। তাতে ‘সার্থক জনম আমার’ ছিল। ‘সোনার বাংলা’ তো ছিলই। আরো গান ছিল। ‘দেশে দেশে ভ্রমি তব দুখ গান গাহিয়ে, নগরে প্রান্তরে বনে বনে। অশ্রু ঝরে দু নয়নে, পাষাণ হৃদয় কাঁদে সে কাহিনি শুনিয়ে।’ কিংবা আরেকটা গান ছিল, ‘ঢাকোরে মুখ চন্দ্রমা, জলদে’। মানে চাঁদকে বলা হচ্ছে মুখ ঢেকে ফেলো, বড় লজ্জার দিন, বড় কষ্টের দিন, দুঃখের দিন। এই গানগুলোকে আমরা নতুন করে আবিষ্কার করে তখন গাইতাম। কাজেই রবীন্দ্রসংগীত আমাদের আন্দোলনের মস্ত বড় একটা হাতিয়ার ছিল এবং এখনো আছে।

 

ছায়ানট পহেলা বৈশাখ

পহেলা বৈশাখ ছিল আমাদের বাঙালিত্বের শপথ নেওয়ার দিন। পোশাক-আশাকে, আচার-আচরণে বাঙালিত্বের বলিষ্ঠ ঘোষণা হতো সেদিন। বাঙালির কবিতা, বাঙালির সাহিত্য, বাঙালির নৃত্যগীতে আমাদের অধিকার চিরন্তন—এসব কথা বলতে, বুঝে নিতে, বুঝিয়ে দিতে বটমূলের প্রভাতি সমাবেশ। সাতষট্টির সেই পাকিস্তান আমলে বছরের প্রথম দিনের এ উপলব্ধি যে কত জরুরি ছিল, তা তারাই মনে করতে পারবে, যারা বাঙালিত্ব ভোলানোর জন্য পাকিস্তানি নিগ্রহ প্রত্যক্ষ করেছে। পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলি। যেমন ধরুন, কলেজ শিক্ষকদের বেতন সে সময় কমই ছিল। তবু সাংবাদিকদের চেয়ে ঢের বেশি। তুলনা করে দেখা যায়, সরকারি মর্নিং নিউজের সাব-এডিটর যেখানে পেতেন ৮০ টাকা—বেতন+৪০ টাকা সানডে অ্যালাউন্স, কনভেনস ছিল কুড়ি টাকা। কলেজ শিক্ষক যেখানে পেতেন ২৪৮ টাকা+৫০ টাকা ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স। যত দূর মনে পড়ে, সাতান্ন সাল থেকে নিয়ে ষাট সালের পর পর্যন্ত সাংবাদিক ও কলেজ প্রভাষকদের বেতনের এই পার্থক্য বহাল ছিল। অবস্থা বদল হলো ক্রমে। খবরের কাগজ সব রকমের সংবাদ দেশের ভেতর চাউর করে দেয়। তাই সাংবাদিকদের হাতে রাখার পন্থা উদ্ভাবন হতে লাগল। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সস্তায় মোটরগাড়ি আমদানির সুযোগ করে দেওয়া হলো তাদের। সরকারি জমি বরাদ্দের সুবিধা এলো। তারপর বেতনও বৃদ্ধি হলো। সে এমনই বৃদ্ধি যে শিক্ষকদের আসন এক ধাক্কায় সাংবাদিকদের চেয়ে কয়েক হাত নিচে নেমে গেল। সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজ বোর্ড চালু হয়েছিল।

সাংবাদিকরা পশ্চিম পাকিস্তানে তো বটেই, বিদেশেও ট্রেনিংয়ের সুবিধা পেতে লাগল। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রয়োজন বোঝা গিয়েছিল ক্রমে, যখন ‘উর্দু একমাত্র উর্দুই...’ ইত্যাদি ঘোষণা আমাদের আপন সংস্কৃতি থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র স্পষ্ট করে দিল। প্রিয় বাংলা ভাষা আর বাঙালি ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্যের দিকে চোখ পড়ল তখন ভালো করে। মুসলমান হওয়া যেমন অসত্য নয়, বাঙালি হওয়াও নয় তেমনি অসত্য! কিন্তু শুধু মুসলমান হতে হবে আর বাঙালি সত্তাকে সম্পূর্ণ নিধন করে, আপন ভাষা ভুলে, তবেই হওয়া যাবে খাঁটি পাকিস্তানি। এ বিষয়গুলো শৈশব থেকেই এক ধরনের পীড়া দিয়ে আসছিল। অন্যদিকে মুসলমান বাঙালিতে বা পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বিরোধের কিছুমাত্র কারণ না থাকলেও কর্তাদের ইচ্ছায় কর্ম হলো, পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বেধে গেল দ্বন্দ্ব। বাঙালির বৈশিষ্ট্যগুলো চিনে নিতে হলো বাঙালিকে। কয়েকটি বিষয় ঘিরে বাঙালি মানস পরস্পর সন্নিহিত হলো। প্রথমটি তার ভাষা। ভাষার জন্য ভালোবাসা। একুশে ফেব্রুয়ারির স্মারক শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে একত্র হলো বাঙালি। দ্বিতীয় বিষয় পহেলা বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ বাংলা নতুন বছরের উৎসব আয়োজনটি বাঙালিকে আর এক বিন্দুতে ঘনিষ্ঠ করল।

বৈশাখের প্রথম দিনের এই উৎসব বাঙালির জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধানের সহায়ক হয়েছে। বহুকাল ধরে প্রচলিত গ্রামীণ বৈশাখী মেলা কি দোকানি পসারিদের হালখাতা অনুষ্ঠানের সঙ্গে নগরীর বর্ষবরণ এক রকম নয়, এটা অস্বাভাবিক ব্যাপার বা সমালোচনার বিষয় নয়। মনে রাখতে হবে, এর প্রয়োজন আমাদের সংকট থেকে সঞ্জাত। এ ছাড়া পহেলা বৈশাখ বিষয়টি নিয়ে একটা ভালো লাগাও আছে। এদিনে বাঙালি আন্তরিকভাবেই একে অন্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। বাঙালি বলে, বাঙালির সঙ্গে কোলাকুলি করে মেলাতেই এ অনুষ্ঠানের সার্থকতা।

বায়ান্ন সালে যখন ভাষা আন্দোলন হয়েছে, তখন তো মোটামুটি কাছাকাছি থেকেই জেনেছি। একুশে ফেব্রুয়ারি ক্লাসের পর বাড়ি চলে এসেছি। বিকেলবেলা শুনলাম গুলি হয়েছে। আজাদ পত্রিকার সান্ধ্য সংখ্যা বেরিয়েছিল। সেটায় দেখলাম, মেয়েদের একটা সভা হবে ২২ ফেব্রুয়ারি কামরুননেসা স্কুলের গলিতে। টিকাটুলিতে। আমার মা আমাকে নিয়ে ভয় পেতেন। আমি যাচ্ছি শুনে তিনিও আমার সঙ্গে গেলেন। পথে সেনারা পা দাপিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। মা উল্টো দিকে দৌড় দিচ্ছেন। আবার এগিয়ে যাচ্ছি। সেই সভায় আমি জীবনের প্রথম বক্তৃতা করি। আমি বলি, একুশ আমাকে ভাষা দিয়েছে। আমার মা ভয় পেয়ে আমার সঙ্গে গেলেন, অথচ তিনিই হলেন সেই সভার সভাপতি। সেই সভায় অনেক নারী নেত্রী ছিলেন; কিন্তু রক্তপাতের আশঙ্কায় কেউই সভাপতি হতে রাজি হননি। সেই সময়েই আমরা ‘সোনার বাংলা’ গাইতাম। আন্দোলনে গাইতে গাইতেই এটা আমাদের জাতীয় সংগীত হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে এই গান গেয়েছি আমরা। ১৯৬১ সালে আমরা সবাই একসঙ্গে হয়েছি রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন করব বলে, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী চিঠি দিয়েছিলেন আমাকে যাওয়ার জন্য। জি সি দেবের বাড়িতে এই সভা হয়েছিল। তারপর সবাই মহড়া করছে। ডা. নন্দীর বাড়িতে রিহার্সাল হচ্ছে। আমি সেই রিহার্সাল দেখতাম। শ্যামার মহড়া দেখতাম। মাঝেমধ্যে বলতাম, এই জায়গাটা এ রকম না। শ্যামা যখন প্রেমের ভাবে গান গাইছে, ‘নহে নহে এ নহে কৌতুক’, তখন যে মেয়েটি নাচছে, সে খুব বিষণ্নভাবে নাচছে। বললাম, না, এটা বিষণ্ন নয়। ও একটু ছলের ভাবে ঘুরে ঘুরে নাচছে। তো, বুঝেছিল তারা কথাটা। র‌্যাংকিন স্ট্রিটে মোখলেসুর রহমান সিধু ভাইয়ের বাড়িতে যেতাম। সরকারি চাকরি করি, তাই ওয়াহিদুল হকের পেছনে পেছনে আমি থাকি। হঠাৎ একবার দেখা গেল, চিত্রাঙ্গদার গান গাওয়ার কেউ নেই। বাফা থেকে চিত্রাঙ্গদা হবে। দুই দিনের নোটিশে গান তৈরি করে আমাকে গাইতে হলো। কোনো রকমে সে যাত্রা উত্তীর্ণ হলাম। এসব অনুষ্ঠানের পর সিধু ভাই বললেন, ‘চলো, আমরা সবাই মিলে একটা সংগঠন গড়ি, না হলে হবে না।’ জয়দেবপুরে গিয়েছিলাম আমরা বনভোজনে। খাওয়াদাওয়া করলাম। সিধু ভাই বলে উঠলেন, আমি যেন এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক হই। বললাম, সিধু ভাই, আমি সরকারি চাকরি করি, আমি পারব না। সাধারণ সম্পাদক হলেন ফরিদা হাসান, সাইদুল হাসান সাহেবের স্ত্রী। ছায়ানট সংগঠনটা হলো, তবে শুরুতে শ্রোতার আসর হতো। প্রথম আসরে গাইলেন ফিরোজা বেগম। দ্বিতীয়টায় গাইল আমার বোন ফাহমিদা। এরপর বারীণ মজুমদার, ইলা মজুমদার। কখনো সেতার বাজালেন খাদেম হোসেন খান—এ রকম হয়েছে। এগুলো হওয়ার পর একসময় অনুভব করলাম, আর বিশেষ শিল্পী নেই, যাদের দিয়ে গান গাওয়াব। আমি কিন্তু কখনো গাইতাম না। অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা করতাম। ওয়াহিদুল হক বলে বসলেন, ‘আমরা একটা স্কুল করব।’ এ কথা সভায় পাস করানো কঠিন। হাতে তো নেই কানাকড়ি। চলে সিধু ভাইয়ের টাকায়। ওয়াহিদুল হক বললেন, ‘আমরা সবাই চাঁদা দেব।’ আস্তে আস্তে কে কত দেবেন, কথা হলো। প্রস্তাবটা পাস হয়ে গেল। এভাবে ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তন হলো। সেই সংগীতবিদ্যায়তনে আমরা যে শুধু রবীন্দ্রসংগীতচর্চা করেছি, তা নয়। তত দিনে আমরা বুঝেছি, বাঙালি সংস্কৃতিটাই একটা বিপদের মুখে পড়েছে। পাকিস্তানিরা আমাদের পাকিস্তানি মুসলমান বানাতে চায়, বাঙালি বলে স্বীকার করতে রাজি নয়। এটা বুঝতে পেরে আমরা আমাদের স্কুলে নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নানা রকম যন্ত্র, রাগসংগীত শুরু করলাম। স্বাধীনতার পরে শুরু করলাম পল্লীগীতি। গণসংগীতেরও চর্চা করতাম।

শেখ লুৎফর রহমান আমাদের এখানে এসে অনেক গণসংগীত শিখিয়েছেন। একাত্তরের ২৫ মার্চের পর আমরা তো পালিয়ে ভারতে চলে গেলাম। ওখানে যাওয়ার পর আমরা কিন্তু লুৎফর ভাইয়ের শেখানো গান ‘জনতার সংগ্রাম’, ‘বিপ্লবের রক্তরাঙা’, ‘ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’—এই গানগুলোর চর্চা করি। তারপর শিল্পী রফিকুল আলম, ওর বড় ভাই সারওয়ার জাহান এলো। তখন ওরাও গান করল। এমনি করেই পুরো দেশের রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতিকে মিলিয়ে একটা নতুন জিনিস দাঁড়াল। কলকাতায় আমরা একটা দল করেছিলাম। ‘রূপান্তরের গান’ নামে একটা গীতি-আলেখ্য হয়েছিল। লিখেছিল শাহরিয়ার কবির। জহির রায়হান ‘স্টপ জেনোসাইড’ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সে আলেখ্য অনেক পরিবর্তন হয় পরে। রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান করি। আমাদের অনুষ্ঠানে এসে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র—সবাই গেয়েছেন। এই করে আমরা কিছু টাকা তুলি। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যেখানেই গান গাইতাম, সে টাকা এনে কেন্দ্রীয়ভাবে জমা দিতাম। রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ শুরু হয়েছিল ১৯৬৭ সাল থেকে। তার চার বছর আগে, মানে ১৯৬৩ সালে ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তন চালু হয়েছিল। প্রথম প্রথম পহেলা বৈশাখের মঞ্চে বিদ্যায়তনের উঁচু ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রায় সবাইকেই জায়গা দেওয়া চলত। আর একক গানের জন্য শিল্পীদের সংগ্রহ করতে হতো বাইরে থেকে। কলিম শরাফী, বিলকিস, নাসিরুদ্দিন, মালেকা আজিম খান, ফাহমিদা খাতুন, জাহানারা ইসলাম, মাহমুদা খাতুন, চৌধুরী আবদুর রহিম, পাকিস্তানের শেষ দিকে আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত সরকারের বিরাগভাজন আমলা শামসুর রহমানের পত্নী আফসারী খানমসহ আরো কতজন! তবে প্রথম যখন রমনা বটমূলে অনুষ্ঠান শুরু করি, তখন বটমূলের গোড়ায় বাঁধানো একটু বেদিই ছিল সম্বল। পরে চৌকিজুড়ে খানিকটা বাড়িয়ে নেওয়া হতো। প্রথম দুবারের অনুষ্ঠানে গাছ থেকে শুঁয়াপোকা ঝরে পড়েছে যত্রতত্র। গুরুজনদের ভয়ে শিক্ষার্থীরা বসে থেকেছে মাথা গুঁজে। দ্বিতীয়বার ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে পোকা সরানোর জন্য একেকটা কাঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কারো ঘাড়ে পোকা লেগে লাল চাকা বেঁধে গিয়েছিল। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর একবার আমাদের মঞ্চের পাশে উঠল জগদ্দল চেহারার মঞ্চ। লোকজন জায়গাই পায় না। দুটি মঞ্চের পর আর কতটুকু জায়গা থাকে। তামাশা দেখার ভাব নিয়ে গাছের ওপর উঠল অনেক লোক। আমাদের মঞ্চের ওপর ছুড়ে ফেলল মরা কাক। তার কিছুক্ষণ পর মোড়ের বিদ্যুতের খুঁটি থেকে তার বিচ্ছিন্ন করে দিল কারা যেন। মাইক্রোফোন বেকার হলো। জেনারেটর চালু করতে করতে সময় ব্যয় হলো, অনুষ্ঠানের বিশৃঙ্খলা স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেবার অনুষ্ঠান শেষে আলমগীর কবীর এসে বলেছিলেন, ‘আপনি চালিয়ে যান...থামবেন না...আমরা আছি।’ আরেকবার বিকেল থেকে টেলিফোন আসতে শুরু হলো, যাবেন না, মঞ্চে যাবেন না, নিচে টাইমবোমা রাখা আছে। সাবধান! তারপর মনে হলো, পুলিশে খবর দেওয়া যাক। টাইমবোমা আছে কি না তা চেক করে দেখার দায়িত্ব তো পুলিশের। ফোন করে হয়রান করে জানা গেল, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে স্টেডিয়ামে শিশুদের সমাবেশে প্রেসিডেন্ট উপস্থিত থাকবেন বলে পুলিশ ফোর্স সব সেখানে নিয়োজিত হয়েছে, আমাদের জন্য পুলিশের ব্যবস্থা করা যাবে না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় তাদের ওপর বর্তাবে বলে ফোন রেখে দিলাম।

ভোরে ছায়ানট সম্পাদকের সঙ্গে কথা হলো। এত ছেলে-মেয়ের দায়িত্ব নেবে কে? তিনি নিষেধ করলেন ‘বটমূলে’ যেতে। কিন্তু মনকে মানাব কী করে! গুটি গুটি পায়ে গিয়ে হাজির হলাম সকালে। মজার কথা, সম্পাদক নিজে গেছেন সেখানে ঠিকই! ছেলে-মেয়েদের ঘুণাক্ষরে কিছু না জানিয়ে মঞ্চে গিয়ে বসলাম। পুলিশ ছিল। তারা মঞ্চের তলাটা ভালো করে দেখেছে বলল। অনুষ্ঠান শেষে সম্পাদককে বললাম, দেখলেন তো, ভয় না করে ভুল হয়নি। যে বছর মঞ্চের তলায় বোমার কথা বললাম, তার পরের বছর মার্চের শেষে জারি হলো সামরিক আইন। নববর্ষ উৎসবের মহড়া চলছে, কিন্তু সমাবেশ অনুষ্ঠানের অনুমতি পাওয়া যাবে কোত্থেকে! পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে না কিছু।

 

জাতীয় সংগীত প্রসঙ্গে

১৯৫৬ সালে ঢাকায় পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন বসেছিল। পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ থেকে আসা সংসদ সদস্যদের সম্মানে কার্জন হলে আয়োজন করা হয়েছিল অনুষ্ঠানের। উদ্যোক্তা ছিলেন গণপরিষদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি মঞ্চে আসার আগে আমাকে বললেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়ার জন্য। কারণ তিনি চাইছেন পাকিস্তানিদের কাছে ‘সোনার বাংলা’র প্রীতি ও ভালোবাসার জানান দিতে। কিন্তু তখন গানটি আমার পুরো মুখস্থ ছিল না। বেকায়দা হলো, কারণ অত লম্বা পাঁচ স্তবকের গানটি যে আমার মুখস্থ নেই। গীতবিতানের খোঁজ পড়ল। বই হাতে পেয়ে কোনোমতে অত বড় গানটি গেয়েছিলাম আমি। গানটি বাঙালিকে কতখানি আবেগতাড়িত করে, সেটি বোঝানোর জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের গানটি শোনাতে চেয়েছিলেন শেখ মুজিব। তখনো ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি দেওয়া হয়নি তাঁকে।

১৯৬৭ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ঢাকার নওয়াব বংশোদ্ভূত খাজা শাহাবুদ্দিন বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করে ঘোষণা দিলেন, ‘রবীন্দ্রসংগীত আমাদের সংস্কৃতি নয়।’ এর সমর্থনে এগিয়ে এলেন ৪০ জন বাঙালি বুদ্ধিজীবী। যাঁদের মধ্যে শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক, আইনজীবী, গায়কও রয়েছেন। বাইশে শ্রাবণ উপলক্ষে তিন দিন ধরে সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ অনুষ্ঠান আন্দোলনে রূপ ধারণ করে। গভর্নর মোনেম খাঁর পুত্র অনুষ্ঠান পণ্ড করার অপচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। বঙ্গবন্ধু বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসেন। রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা জোগান। রবীন্দ্রসংগীতকে মর্যাদাদান এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তার প্রসার ঘটানোর জন্য সভা-সমাবেশে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন চালু করান, যার মধ্যে ‘আমার সোনার বাংলা’ ছিল প্রধান। সংগীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হক ছিলেন, যিনি এই আন্দোলনের মুখ্য সংগঠকের অন্যতম, তাঁর উপলব্ধি, “সাতষট্টির আন্দোলনের সবচেয়ে স্থায়ী ফসল ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির যথাযোগ্য প্রতিষ্ঠা।”

রবীন্দ্র-বিরোধিতা পাকিস্তানি আমলেই এ দেশে রবীন্দ্রনাথকে আরো বেশি শক্তিশালী করেছে। তাঁর গান ছড়িয়ে পড়ে জনারণ্যে। মানবমুক্তির হাতিয়ার হলো রবীন্দ্রনাথের গান, রাজনৈতিক সম্মুখ সমরে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় কেতনে আঁকা হলো রবীন্দ্র আলেখ্য। একাত্তরে পাক হানাদারদের বর্বরতার বিরুদ্ধে বাঙালির রক্তকে ফেনিয়ে তুলতে এবং স্বাধীনতার যুদ্ধে মৃত্যুর প্রতিরোধ ও জীবনের সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের গান ছিল পাথেয় ও প্রেরণা। সত্তর সালের গোড়ায় বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী জাহিদুর রহিমকে দায়িত্ব দেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের রেকর্ড প্রকাশের জন্য। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের রেকর্ড প্রকাশে ছায়ানটের শিল্পীরাও এগিয়ে আসেন। কলিম শরাফীর ব্যবস্থাপনায়, আবদুল আহাদের পরিচালনায়, আমার বাসায় বসেই তৈরি হয় গানটি। সম্মেলক কণ্ঠে ছিলেন, জাহিদুর রহিম, অজিত রায়, ইকবাল আহমদ, ফাহমিদা খাতুন, জাহানারা ইসলাম, হামিদা আতিক, নাসরীন আহমদ প্রমুখ। সর্বত্র বাজতে থাকে এই রেকর্ড। অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকালে বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজের কণ্ঠে এই গান ধ্বনিত হতো। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিল্পী কলিম শরাফী রমনা রেসকোর্সে লাখো জনতার উপস্থিতিতে ‘সোনার বাংলা’সহ রবীন্দ্রসংগীতের এক সেট গানের রেকর্ড উপহার দিয়েছিলেন সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিজয়ী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। সত্তর সালে জহির রায়হান তাঁর ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি ব্যবহার করেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় দিকে দিকে বেজে ওঠে ‘আমার সোনার বাংলা’। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই ভবিতব্য বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে জনগণ ‘আমার সোনার বাংলা’কে নির্বাচন করেছিল। আর এই গ্রহণের ক্ষেত্রটি তৈরি করেছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু।

‘আমার সোনার বাংলা’ গানে রবীন্দ্রনাথ বাউল সুর প্রয়োগ করেছিলেন। স্বদেশের বাণীকে সাধারণের মর্মমূলে প্রবেশ করানোই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যিনি সংগীত নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পত্রালাপ ও বাহাস করতেন, তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের বাউল, কীর্তন, ভাটিয়ালি প্রভৃতি বিশিষ্ট প্রাদেশিক—অর্থাৎ দেশি সুর-পদ্ধতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে, দেশের প্রাণের সঙ্গে যোগ তাঁর খুবই নিবিড় ছিল। সে জন্য বিদেশি সভ্যতার কল্যাণে পুষ্ট স্বাধীন চিন্তা ও সৃষ্টির ধারা এই দেশের, গ্রামের পলিমাটি কেটেই বইল।’

স্বাধীনতার পর ক্যাবিনেট ডিভিশনের সভায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত অনুমোদন করা হয়। ক্যাবিনেট সচিব এইচ টি ইমাম; টেলিভিশনের পক্ষে জামিল চৌধুরী সভায় আলোচনায় অংশ নেন। সভায় বঙ্গবন্ধু শোনেন যে স্বরবিতানের ছাপানো সুরের সঙ্গে আমাদের শিল্পীদের গাওয়া সুরের মিল নেই। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যে সুর গেয়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে, সে সুরেই আমাদের জাতীয় সংগীত গাওয়া হবে, সেটিই জাতীয় সংগীতের সুর।’ পরবর্তীকালে জামিল চৌধুরী ‘শ্রোতার আসর রেকর্ড ক্লাব’ থেকে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় গীতির একটি রেকর্ড বের করেন। দুটি পিঠে দুটি গান। যুদ্ধের সময় মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে যে সুরে ‘সোনার বাংলা’ গেয়েছিল, সেই সুরেই রেকর্ডে গাওয়া হয়। সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া সুরের অনুসরণে মুক্তিযুদ্ধের সময় গাওয়া সুরটি ধরে রাখার জন্য তা রেকর্ডে ধারণ করা হয়।

বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ডের সভায় উপস্থিত হয়ে তাঁরা জানালেন, ‘আমার সোনার বাংলা গানটি স্বরলিপি বইয়ে যেভাবে ছাপা আছে, সেটা আমরা গাই না। যে সুরটি প্রথম খুব সম্ভব সুচিত্রা মিত্র শিখেছিল ইন্দিরা দেবীর কাছ থেকে এবং রেকর্ডও করেছিল, বাংলাদেশের দরকার সেই সুরটির স্বরলিপি। শান্তিদেব ঘোষ, যিনি রেকর্ডে সুচিত্রা মিত্রের ট্রেনার ছিলেন, সভায় তিনিও ছিলেন। আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত জানাল, বিশ্বভারতী স্বরলিপি তৈরি করে বাংলাদেশের সরকারকে কিছুদিনের মধ্যে পাঠিয়ে দেবে। যথারীতি বিশ্বভারতী স্বরলিপি ছাপিয়ে পাঠিয়েছিল সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে।

মুক্তিযুদ্ধকালে সুচিত্রা মিত্র ১৯৭১ সালের মে মাসে এইচএমভি থেকে নতুন করে প্রকাশ করেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের রেকর্ড, যার নম্বর ৪৩৪১৫। যুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গানটির যে রেকর্ড বাজানো হয়েছিল, তা কলিম শরাফীর ইএমআই গ্রামোফোন কম্পানি কর্তৃক রেকর্ডকৃত ছিল। একাত্তরের ৩ এপ্রিল থেকে ২৫ মে পর্যন্ত শর্টওয়েভ ট্রান্সমিশনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে গানটি প্রচারিত হয়েছিল। চট্টগ্রামের রামগড়ে এই কেন্দ্র চালু ছিল। জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে ব্যবহৃত গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তৃতীয় পর্যায়ে প্রচারিত হয়েছিল।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথকে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়েছে অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা, সংগ্রাম-আন্দোলনের মাধ্যমে। দীর্ঘ পরাধীন একটি পশ্চাৎপদ জাতিকে তারা আত্মবোধনে উদ্বোধন করেছিলেন। আর সেই জাতিকে তার ভাষা, সংস্কৃতিসহ একটি রাষ্ট্র উপহার দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি বলে যে জাতির কথা রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু সেই জাতিকেই আবিষ্কার করেন সোনার বাংলায়। এনে দেন আত্মমর্যাদা, স্বাধীন সত্তা। এই বাংলাকে ভালোবেসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গান। আর বঙ্গবন্ধু তা একটি জাতির জাতীয় সংগীতে রূপান্তর করে চিরস্থায়ী করে দেন।

 

বটমূলের নববর্ষ উদ্‌যাপন

রমনার বৃহৎ বৃক্ষটিকে অশ্বত্থ জেনেও ‘বট’ নামে অভিহিত করায় ভুল নেই। গ্রামের অশ্বত্থতলায় হাট বসলে হাটের জায়গাটির সে নাম শুনতে বেশ মানানসই লাগে। আবার শহরের অশ্বত্থ মূল নববর্ষের মিলনমেলা হলে, বটমূল নাম দিব্যি সুশ্রাব্য লাগে। রমনার ওই বৃক্ষটির বিশেষ করে অশ্বত্থ বলতে হবে নিঃসন্দেহে, কিন্তু বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখের বৃহত্তম অনুষ্ঠানটিকে ‘বটমূলে’র অনুষ্ঠান বললে ভুল হবে না। সেই উনিশ শ সাতষট্টি সালে প্রথম যখন হাতে লেখা কার্ডে ‘বটমূল’ নামটি দেওয়া হয়েছিল, মনে মনে দ্বিধা ছিল ঠিকই। তারপর বাংলাদেশের জন্মের পরে ‘সচিত্র সন্ধানী’র ‘বটমূলের অনুষ্ঠান’ নামটিকে যথার্থ বলার চেষ্টা করেছিলাম। আরো কয়েকবার এ নিয়ে লিখেছি। কিছুদিন আগে এ প্রসঙ্গটি আবার উঠেছে, অভিধানের বরাত দিয়ে কথাগুলো ফিরে লেখা গেল।

তের শ সত্তর সালের পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের সংগীত বিদ্যায়তনের উদ্বোধন হয়েছিল। মূল প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের প্রতিষ্ঠা বছর দুই আগে, তের শ আটষট্টির ভাদ্র-আশ্বিনের দিকে। গানের স্কুলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়েছিল তের শ একাত্তরের পহেলা বৈশাখে। তার পরের বছর তখনকার ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুল প্রাঙ্গণে উজ্জ্বল লাল ফুলের আনন্দ হিল্লোলিত কৃষ্ণচূড়ার নিচে মঞ্চ করে বিদ্যায়তনের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হলো বাংলা বছরের প্রথম সন্ধ্যায়।

অনুষ্ঠান শেষে অভ্যাগতরা অভিযোগ করলেন, ‘একি অনুষ্ঠান! আমরা আসি নববর্ষের গানের আশায় আর তোমরা করো স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান।’ নতুন বছরকে আহ্বান করে দু-একখানা গান হতো না তা নয়; কিন্তু বাঙালির দাবি বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের। ঠিকই তো! পহেলা বৈশাখের ভোরেই কেন নতুন দিনের আহ্বান হবে না? আর ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলের ওই সরু-লম্বা মতো অঙ্গনে কজন বাঙালি আর একত্র হতে পারে? কাজেই খোঁজা নতুন জায়গা। তার আগে খোলা জায়গায় আমরা শারদোৎসব করেছি, করেছি বসন্তোৎসব। পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের মতো একটা জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না? এ দর্শক-শ্রোতার দাবি, মানুষের দাবি।

বটমূল তো আজকের কথা নয়! আজ থেকে অনেক বছর আগে ভালোবেসে এ জায়গাকে ‘বটমূল’ নাম দিয়েছিলাম সবাই মিলে। কী ছিল সেসব দিন! দেশকে সোনার বাংলা বলতে পারব না। বাংলার ঐতিহ্য স্মরণ করতে-চর্চা করতে ভয় করবে! রবীন্দ্রসংগীত গাইলে হিন্দুয়ানির পরিচয় দেওয়া হবে। নজরুলের গান ছাঁটাই-বাছাই করে পাকিস্তানসম্মত করে নেওয়া চাই! সেই কালে ভোরের হাওয়াতে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলা, ‘আমরা বাঙালি’—এ আনন্দের তুলনা ছিল কোনো! অশ্বত্থগাছ থেকে শুঁয়াপোকা ঝরে পড়ত তখন। জনমানুষ চলাফেরা করত না সে এলাকায়! প্রশান্ত মুখে প্রভাতের বিমল আনন্দের কথা গাইতে হাত-পা নড়েচড়ে চঞ্চল হয়ে পোকা ঝেড়ে ফেলা যায় না! শান্ত স্বভাবের আহসান মুর্শেদের গা, হাত-পায়ে লাল লাল চাকা দাগ দেখা দিল অনুষ্ঠানের পর। প্রথম বছরের অভিজ্ঞতার পর সরু কাঠির মতো গাছের ডাল হাতে নিয়ে বলে দিতে হতো, ‘কেউ নড়বে না, শান্তভাবে পোকা সরিয়ে দেবে।’

তখন অনুষ্ঠান শুরু হতো ভোর ৬টায়। গানের শেষে দর্শক-শ্রোতারা সুগন্ধি ফুল বিনিময় করত, ছোটখাটো উপহার দেওয়া-নেওয়া হতো। সাজপোশাকে বাঙালির এ সমাবেশ—সবটুকু মিলিয়ে শাসকদের বিরুদ্ধে দ্রোহ ঘোষণা হতো। কিন্তু সুদৃঢ় এই সাংস্কৃতিক দ্রোহ। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে এই সাংস্কৃতিক মুক্তিচেতনার যে কী অপরিসীম মূল্য, সে কথা এত দিনে পরিষ্কার বোঝা যায়। সংগ্রাম বলতে সাধারণভাবে মনে হয়, অস্ত্রশস্ত্র, চিৎকার, চেঁচামেচি-আস্ফাালন। কিন্তু এই শান্ত সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ বল প্রকাশের বা পেশিশক্তি প্রদর্শনের অবকাশ নেই কোনো। ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি হৃদয়ে ধারণ করার ভেতরেই এর বলিষ্ঠতা। আপন জাতিসত্তার বোধে সুস্থ সংস্কৃতিমান বিকাশ যে দৃঢ় চরিত্র গঠন করে তোলে, তার শক্তি স্বাধীনতার অবিচল শপথের জনক। নববর্ষের কান্ত সুপ্রভাত আমাদের মুক্তিকামী করেছিল, এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বাঙালির রাষ্ট্রিক স্বাধীনতার পথে।

মন্তব্য