আগামীকাল বৃহস্পতিবার উপস্থাপন করা হচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট সরকারের প্রথম বাজেটকে একটি মাইলফলক বাজেট হিসেবেই প্রণয়ন করা হয়েছে। বাজেটের আকার হবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক একে উচ্চাভিলাষী বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সেই বাজেটের বিপুল ব্যয় মেটাতে বিপুল আয়েরও প্রয়োজন হবে। আর সে কারণে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের ওপর একটু বেশিই জোর দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার ব্যবসা সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখন তা কঠিন করে দিচ্ছে।
সরকারি হিসাবে দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে এক কোটি ১৭ লাখ, কিন্তু ভ্যাটের নিবন্ধন আছে মাত্র সাত লাখ ৭৫ হাজার। সরকার এই সংখ্যা উল্লেখযোগ পরিমাণে বাড়াতে চায়। সরকার এমন কিছু শর্ত আরোপ করতে যাচ্ছে, যার ফলে ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা চালানোই কঠিন হয়ে যাবে। কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ নেওয়া, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসে মার্চেন্ট হিসাব খোলা, ট্রেড বডির সদস্য পদ গ্রহণ-নবায়ন, প্রতিষ্ঠানের নামে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নেওয়া এবং বিআরটিএ থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহনের নিবন্ধন নিতে গেলে ভ্যাট নিবন্ধনের প্রমাণ দিতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা এক কোটি ১৭ লাখ, যা ২০১৩ সালে ছিল ৭৮ লাখ। এর মধ্যে ৯৯ শতাংশেরও বেশি হলো কুটিরশিল্প, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং তার ৭৪ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ ৭৫ হাজার, যার মধ্যে পাঁচ লাখের সামান্য বেশি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট রিটার্ন দেয়। ভ্যাটের জাল বাড়াতে সরকার বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বার্ষিক টার্নওভারের সীমা তিন কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকায় নামিয়ে এনেছে। পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠানই যেন ভ্যাট নিবন্ধনের আওতার বাইরে না থাকতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের এই উদ্যোগ নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ব্যবসায়ের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ নেওয়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ নেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রয়োজন হয়। এসব ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করলে তা ব্যবসা সহজীকরণের পথে অন্তরায়। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল ব্যবসা সহজ করা। নতুন শর্ত যোগ করে তা কঠিন করা নয়। তবে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন যদি করতেই হয়, তাহলে বিআইএন নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম সম্পূর্ণ অনলাইনে, স্বয়ংক্রিয় ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। এনবিআর কার্যালয়ে সরাসরি যাওয়ার প্রয়োজন থাকলে দুর্ভোগ ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়বে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই উদ্যোগ নিলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অল্প পরিমাণে ভ্যাট আদায় করা সম্ভব। তবে এই অর্থ যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে এর ফলে যেন ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত কোনো অনানুষ্ঠানিক পেমেন্ট (ঘুষ) বা অবৈধ খরচ না করতে হয়।’
আমরা আশা করি, সরকার সব দিক বিবেচনা করেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থনীতির স্বার্থে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সহজ করার পাশাপাশি হয়রানিমুক্ত রাখতে হবে।

