kalerkantho

সোমবার । ২২ আষাঢ় ১৪২৭। ৬ জুলাই ২০২০। ১৪ জিলকদ  ১৪৪১

উদ্ভাবন

ডুবুরির মাস্কে বাঁচবে জীবন

শত দুঃসংবাদের মাঝে একটি সুখবর দিয়েছেন ইতালির এক ডাক্তার ও কয়েকজন প্রকৌশলী। তাঁরা বের করেছেন ডুবুরির মাস্ককে ভেন্টিলেটরের মাস্কে রূপান্তরের কৌশল। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ডুবুরির মাস্কে বাঁচবে জীবন

যত দিন যাচ্ছে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা। বিশেষ করে ইতালি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে একসঙ্গে এত বেশি রোগী আক্রান্ত হচ্ছে যে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না চিকিত্সকরা। পাওয়া যাচ্ছে না পর্যাপ্ত চিকিত্সা সরঞ্জাম। এ রোগে আক্রান্তরা মূলত হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শ্বাসকষ্ট নিয়ে। তাই প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজন পড়ছে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বা ভেন্টিলেটরের। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

কিন্তু হঠাত্ করে এত ভেন্টিলেটর কোথায় পাওয়া যাবে? বিশেষ করে সংকট তৈরি হয়েছে ভেন্টিলেটরের মাস্কের। এর এক অদ্ভুত সমাধান বাতলেছেন ইতালির গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইসিনোভা’র কিছু প্রকৌশলী। শুধু প্রস্তাব করেই ক্ষান্ত দেননি তাঁরা। করেও দেখিয়েছেন। ডুবুরির মাস্ক দিয়ে বানিয়েছেন ভেন্টিলেটরের জন্য প্রয়োজনীয় সি-প্যাপ মাস্ক।

তাঁরা ব্যবহার করছেন মূলত স্নর্কেলিংয়ের মাস্ক। পানির নিচে সাঁতরানোকে বলা হয় স্নর্কেল। সে সময় বিশেষ ধরনের মাস্ক পরতে হয়। যেটা দিয়ে পানির নিচে মুখ রেখেই ওপরের বাতাস ব্যবহার করে শ্বাস-প্রশ্বাস চালিয়ে নেওয়া যায়। এটা দুই ধরনের হয়। একটাতে স্রেফ একটা টিউবের মাথায় মাউথপিস লাগানো থাকে। সেটা থাকে ডুবুরির মুখে। অন্য মাথা থাকে পানির ওপরে। এটাকে বলে প্লেইন স্নর্কেল মাস্ক। আরেকটার নাম ফুল-ফেসড স্নর্কেল মাস্ক বা ইন্টিগ্রেটেড স্নর্কেল মাস্ক। এটাতে পুরো মুখ ঢাকা থাকে। ওপরের দিকে থাকে টিউবের সংযোগ। এটাকেই রূপান্তর করে বানানো হচ্ছে সি-প্যাপ মাস্ক।

মূল ভাবনাটা অবশ্য ড. রেনাতো ফাভেরোর। তিনি ছিলেন ইতালির গার্দোন ভালট্রোম্পিয়া হাসপাতালের হেড ফিজিশিয়ান। সি-প্যাপ মাস্কের সংকটের মধ্যে তাঁর মনে হয়, স্নর্কেলিং মাস্ক দিয়েও তো কাজ চালানো যেতে পারে। তবে ভেন্টিলেটর মেশিনে সংযোগ দেওয়ার আগে তাতে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। সে জন্যই যোগাযোগ করেন ইসিনোভার দুই প্রকৌশলী ক্রিস্টিয়ান ফ্রাকাসি ও আলেসান্দ্রো রোমেয়োলের সঙ্গে।

এরপর দলে টানা হলো ফরাসি ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক কম্পানি ডেকাথলনকে। তারা জোগান দিল মাস্কের। তাই নিয়ে কাজে লাগলেন ইসিনোভার প্রকৌশলীরা। ভেন্টিলেটরে সংযোগ দেওয়ার জন্য তাতে কী কী পরিবর্তন আনতে হবে তা চিহ্নিত করলেন। তার ভিত্তিতে স্নর্কেলিং মাস্ককে রূপান্তর করা হলো সি-প্যাপ মাস্কে।

এবার পরীক্ষার পালা। প্রথম পরীক্ষা হলো কিয়ারি হাসপাতালে। রোগী ইসিনোভারই এক কর্মী। মাস্ক কাজ করল ঠিকঠাক। উত্সাহী হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরো এক রোগীর ওপর এই মাস্কের পরীক্ষা চালাল। এবারও শতভাগ নম্বর পেল রূপান্তরিত মাস্ক। মিলল সি-প্যাপ মাস্কের এক কার্যকর বিকল্পের সন্ধান এবং তাতে খরচও অনেক কম। একেকটা সি-প্যাপ মাস্কের দাম পড়ে ১০০ ইউরো। আর ডেকাথলনের মাস্কগুলোর দাম মাত্র ২৫ ইউরো।

শুধু বানিয়েই ক্ষান্ত দেয়নি তারা। পুরো প্রক্রিয়াটা তুলে দিয়েছে ইসিনোভার ওয়েবসাইটে। সেটা বর্ণনা করা হয়েছে সহজ পাঁচটি ধাপে। এমনকি সেটার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে ইউটিউবে। যাতে প্রয়োজন হলে যেকোনো হাসপাতাল নিজেরাই সেটা বানিয়ে নিতে পারে। ভেন্টিলেটরের সঙ্গে সংযোগ দিতে যে ভাল্বের প্রয়োজন হয়, তারও নকশা দেওয়া আছে ইসিনোভার ওয়েবসাইটে। অবশ্য সেটার  পেটেন্ট করিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেটাও ব্যবসা করার জন্য নয়। সুযোগে যাতে অন্য কেউ ব্যবসা ফেঁদে বসতে না পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য।

অবশ্য নির্মাতাদের পক্ষ থেকে বারবার করে বলা হয়েছে এটার ব্যবহার পুরোপুরি নিরাপদ নাও হতে পারে। তাই নিতান্ত বাধ্য না হলে ব্যবহার না করতে। কেননা এমনিতেই ইন্টিগ্রেটেড মাস্ক নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকেই এটা ব্যবহারে নিরুত্সাহ করে। সাধারণত শারীরিক কোনো দুর্বলতা না থাকলে প্লেইন স্নর্কেল মাস্কই ব্যবহার করতে বলা হয়। নির্মাতারা তাই বারবার করে জোর দিয়েছে পেশাদারদের দিয়ে এই মাস্ক বানাতে ও ব্যবহার করতে। সেটাও শুধু যখন নিতান্তই সি-প্যাপ মাস্ক পাওয়া যাবে না তখনই। তার পরও তাদের কৃতিত্বকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। নইলে যে মাস্কের অভাবে ভেন্টিলেটর মেশিন নিয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না!

মন্তব্য