kalerkantho

সোমবার । ২২ আষাঢ় ১৪২৭। ৬ জুলাই ২০২০। ১৪ জিলকদ  ১৪৪১

উদ্যোগ

ওরা আছে জেগে

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনা নিয়ে আতঙ্কিত গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা এখনো খুব বেশি না হলেও পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় বোঝা মুশকিল। এদিকে খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষ পড়েছে খাদ্যসংকটে। তাদের সাহায্যে এবং করোনা প্রতিরোধে কাজ করছে একদল স্বপ্নবাজ তরুণ। সারা দেশে এমন কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে লিখেছেন জুবায়ের আহম্মেদগোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

 

শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন

ঢাকা, রংপুর, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকার নর্দমা, রাস্তা ও যানবাহনে জীবাণুনাশক স্প্রে করছে এ সংগঠনের সদস্যরা। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি হ্যান্ড স্যানিটাইজারও বিতরণ করছে স্বেচ্ছাসেবীরা। এ ছাড়া দুস্থ, অসহায় ও দিনমজুরদের হাতে তুলে দিয়েছে ৫০০ মাস্ক। ঢাকা, রংপুর, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইলের স্বেচ্ছাসেবকরা বিভিন্ন এলাকায় দুস্থ মানুষ ও দিনমজুরদের যারা কাজ পাচ্ছে না তাদের ১০ দিনের বাজার করে দিয়েছে ফাউন্ডেশনের সদস্যরা। রাজবাড়ীর স্বেচ্ছাসেবকরা প্রতিদিন শতাধিক ছিন্নমূল মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করছে। টাঙ্গাইলের স্বেচ্ছাসেবীরা প্রায় ৩০০ দুস্থ পরিবারকে বাজার করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সহায়তা হিসেবে ১০ কেজি চাল, ৩ কেজি আলু, ১ কেজি ডাল, ১ লিটার তেল,  ৫০০ গ্রাম লবণ, সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডার দেওয়া হচ্ছে প্রত্যেক পরিবারকে। এ ছাড়া আরো কয়েকটি জেলায় কার্যক্রমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা যেকোনো দুর্যোগে সরকারের পাশাপাশি জনগণের সেবার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। রাস্তায় থাকা কুকুর, বিড়ালের জন্যও ফাউন্ডেশনটি খাবারের ব্যবস্থা করছে প্রতিদিন।

 

বিবেক ফাউন্ডেশন

এরই মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে মসজিদ, রাস্তা ও বাজারে জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছে বিবেক ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা। এ ছাড়া ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতার প্রসারেও কাজ করছে ওরা। বিবেক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘CORONA-Update of Bangladesh’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। মাঝেমধ্যেই ডাক্তাররা গ্রুপে লাইভে এসে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, পরামর্শ দিচ্ছেন। ‘প্রাণের জন্য ত্রাণ’—এই স্লোগান সামনে রেখে ঢাকার অসহায় মানুষের মাঝে জরুরি ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি। বড় পরিসরে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম।

 

কাশফুল ফ্যাক্টরি

কলেজপড়ুয়া তিন বন্ধু মিলে প্রথমে শুরু করে ঢাকাকে পরিষ্কার করার পরিকল্পনা। এরপর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে সংগঠনটি। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি স্থানে ৫০০ লিটারের বেশি জীবাণুনাশক ছিটিয়েছে তারা। আপাতত ২৫টি দিনমজুর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে ওরা। মানুষের সমাগমে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে—এ কথা চিন্তা করে তারা ঠিক করেছে মানুষের বাড়িতেই পৌঁছে দেবে সাহায্য। ঘরে বসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তারা পরিকল্পনা করছে। ছোট ছোট দলে কাজ ভাগ করে নেয়। ফেসবুকের মাধ্যমে অর্থ জোগাড় এবং তা দিয়ে সামগ্রী ক্রয় ও প্যাকেটজাত করে। গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫টি (গড় সদস্যসংখ্যা ৪) পরিবারের কাছে গিয়ে এক সপ্তাহ চলার মতো পরিমাণ চাল, ডাল, আলু, তেল, সাবান, লবণ পৌঁছে দেয় তারা। এ ক্ষেত্রেও দলে দলে না গিয়ে তারা দুজনের টিম বানিয়ে কাজটি সম্পন্ন করেছে।

 

ভিক্টোরি অব হিউম্যানিটি অর্গানাইজেশন

কুমিল্লার লাকসামে করোনাভাইরাস সচেতনতায় তৎপর শিক্ষার্থীদের মানবিক সংগঠন ‘ভিক্টোরি অব হিউম্যানিটি অর্গানাইজেশন’। করোনা প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টিতে লিফলেট ও মাস্ক বিতরণ, বেসিন স্থাপন, জীবাণুনাশক স্প্রে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সুরক্ষারেখা (লেভেল মার্কিং) অঙ্কন এবং পথশিশুদের মধ্যে খাবার বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করছে তারা। জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে লাকসামে ১০ হাজার লিফলেট বিতরণ, শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সার্জিক্যাল মাস্ক বিতরণ, জনবহুল স্থানে কয়েকটি হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও যানবাহনে তিন হাজার লিটার জীবাণুনাশক স্প্রে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ফার্মেসি, মুদি, কাঁচাবাজার ও ব্যাংকের সামনে সুরক্ষারেখা অঙ্কন, শতাধিক পথশিশুর মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করেছে তারা। শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিতরণসহ করোনা প্রতিরোধক আরো বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

 

#nonestop247

কভিড-১৯-এর মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে গিয়েছিল অগণিত গুজবও। প্রথম দিকে মানুষ বুঝতেও পারছিল না, কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়। এই চিন্তা থেকেই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের শিক্ষার্থীরা চালু করেন একটি ফেসবুক গ্রুপ। দুই দিনের মধ্যেই তাঁরা বাংলাদেশে প্রথম নিজ উদ্যোগে হটলাইন সেবা শুরু করেন। যাতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে আশ্বস্ত হতো মানুষ। হটলাইনে ডাক্তাররা মানুষের সমস্যা শুনছেন ও সেই অনুযায়ী পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়েও মানুষকে সতর্ক করছেন তাঁরা। অনেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে হটলাইন চালুর পদ্ধতি জানার জন্যও। #nonestop247 পরিবারে এখন ১০০ সদস্য। এখন তারা আইইডিসিআরের হটলাইনের সঙ্গেও যুক্ত থেকে কাজ করছে। মানুষের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছানোর লক্ষ্যে Nonstop Healthline নামে একটি অ্যাপও তৈরি করেছে তারা।

এএনটিটি রোবটিকস

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া পাঁচ তরুণের ভিন্ন উদ্যোগ। কভিড-১৯-এর প্রভাবে প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল যন্ত্রপাতির স্বল্পতার কারণে ডাক্তার ও রোগীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে চিকিৎসাসামগ্রী পাচ্ছে না বলা যায়। এএনটিটি রোবটিকসের উদ্যোগে আবার ব্যবহারযোগ্য মাস্ক নিয়ে কাজ শুরু হয় মার্চের মাঝামাঝি সময়ে। সাধারণত ডাক্তাররা একটি মাস্ক সারা দিন কিংবা বারবার ব্যবহার করেন না। কিন্তু এই সংকটকালীন পুনরায় ব্যবহারযোগ্য মাস্ক ছাড়া উপায়ও নেই। তাই তারা এটি নিয়ে কাজ শুরু করে। তাদের বানানো মাস্কটির শুধু ফিল্টার বদলে বাকিটুকু সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব। তাদের মাস্কে তিন স্তরের একটি ফিল্টার রয়েছে। ওটা আমাদের দেশের ফিল্টার কাগজ দিয়েই বানানো সম্ভব। মাস্কটির ফিল্টার ছাড়া বাকিটা বায়ুরোধক। তা ছাড়া তারা ভেনটিলেটর নিয়েও কাজ করছে, যা কয়েক দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হবে বলে জানান এএনটিটি রোবটিকসের চেয়ারম্যান নাজিব আহমেদ।

 

ফেসবুক গ্রুপ

করোনা প্রতিরোধে সক্রিয় বান্দরবানের শিক্ষার্থীরাও। ২৩ মার্চ থেকেই বান্দরবানের লোকজন ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। ফলে নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষরা হয়ে পড়ে কর্মহীন। অসহায় মানুষগুলোর কথা ভাবছিল বান্দরবানের শিক্ষার্থী আফতাব আহমেদ। ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে দেখল, অনেকেই হাত ধোয়া কর্মসূচি নিয়েছে। কিন্তু অসহায়দের দুমুঠো ভাত কিভাবে জুটবে তা নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। তারপর ফেসবুকে একটি পোস্ট করে অসহায়দের সাহায্যের আহ্বান জানায় ও। পোস্টের কমেন্টে বান্দরবানের তরুণরা আগ্রহ দেখায়। তারপর আগ্রহীদের নিয়ে মেসেঞ্জার গ্রুপ খোলে আফতাব। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, ফেসবুকে একটি ইভেন্ট খুলবে। ইভেন্টের প্রথম দিন ২৬ মার্চ তাদের তহবিলে জমা হয় সাড়ে ১৪ হাজার টাকা। ২৭ মার্চ যোগ হয় আরো ৩৫ হাজার টাকা। টাকার পাশাপাশি সাহায্য হিসেবে আসে চাল, আলু, পেঁয়াজ ও তেল। ৩০ মার্চ বান্দরবান পৌরসভার ৭, ৮, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৪৭টি পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে ওরা।

 

চাঁদপুরের শিক্ষার্থীরা

চাঁদপুর শহরের কিছু শিক্ষার্থী মিলে উদ্যোগ নিল যে কর্মহীন মানুষদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করবে। নিজেদের বন্ধু ও পরিচিত লোকদের কাছ থেকে চলে তহবিল সংগ্রহের কাজ। ২৪ মার্চ সন্ধ্যা থেকে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ ও হাত ধোয়ার সাবান। পাশাপাশি করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সবাইকে সচেতন হতেও বলছে ওরা। প্রতিদিন প্রায় ১২-১৫ হাজার টাকার খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে দলটি। আট দিন ধরে চলছে তাদের কার্যক্রম। পরিস্থিতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলতে থাকবে বলে জানাল ওদের কয়েকজন। কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থী আদনান যাইদী বললেন, ‘খাদ্যসামগ্রীর অধিকাংশই বিতরণ করা হয়েছে দিনমজুর মানুষদের মধ্যে। যারা দিন আনে দিনে খায়। আমাদের এই কার্যক্রম চলবে প্রতিদিন।’ অন্যদিকে চাঁদপুরের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সংগঠন ফ্রেন্ডস ক্লাব। ওঁরা সবাই দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁরা প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬০টি পরিবারকে ৫ কেজি চাল, ১ লিটার তেল, ১ কেজি পেঁয়াজ, ১ কেজি ডাল, ২ কেজি আলু, ১ কেজি লবণ ও ১টি করে সাবান বিতরণ করেছে। এ ছাড়া চাঁদপুরের পশ্চিম পিংড়া গ্রামের শিক্ষার্থী ও তরুণরা মিলে জীবাণুনাশক ছিটিয়েছে। তারা এলাকার অধিকাংশ বাড়িতে জীবাণুনাশক ছিটানো ও সচেতনতামূলক অভিযান চালায়।

 

কুড়িগ্রামে শিকড়

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সংগঠন শিকড়। করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগকালে তারা নিল এক দারুণ উদ্যোগ। তহবিল সংগ্রহ করে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে প্রায় ৩০০ কর্মহীন পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে ওরা। ৩১ মার্চ মঙ্গলবার সংগঠনটির পক্ষ থেকে রাজারহাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব বিতরণ করা হয়। ৫ কেজি চাল, ২ কেজি আলু, আধা কেজি ডাল, আধা কেজি লবণ ও ১টি করে সাবান দেওয়া হয় প্রতিটি পরিবারকে। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারের মধ্যেই করোনা সচেতনতাবিষয়ক লিফলেট বিতরণ করে এবং ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সচেতনতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। এলাকার বিভিন্ন জায়গায় সচেতনতামূলক পোস্টারও লাগিয়েছে তারা। বাজার কিংবা রাস্তার মোড়ে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাও করেছে।

মন্তব্য