kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

বিজ্ঞান

ভিলেনরা কেন তিনকোনা হয়?

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কখনো চারকোনা ফুটবল, গোলগাল টেলিভিশন, চারকোনা বাতি কিংবা ত্রিভুজাকৃতির পয়সা দেখেছ? কিছু কিছু বস্তু আছে, যাদের নিজস্ব একটা আকার থাকবেই। পেছনে আছে বৈজ্ঞানিক যুক্তি। জানাচ্ছেন কাজী ফারহান পূর্ব

আমেরিকান ফুটবল ডিমের মতো

আমেরিকান ফুটবল খেলার নাম শুনেছ? নামে ফুটবল কথাটা থাকলেও মেসি-রোনালডো যে ধরনের ফুটবল খেলে, তার সঙ্গে চমত্কার এ খেলাটির বেশ পার্থক্য আছে! পার্থক্য আছে বলের আকৃতিতেও! এখানে বলটা কিন্তু ঠিক ফুটবলের মতো গোল না। বরং এর আকৃতি অনেকটা চ্যাপ্টা ডিমের মতো। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে পারো—বলটির আকৃতি এমন অদ্ভুত কেন? এর কারণ, এসব বল শুরুর দিকে শূকরের ব্লাডারের সাহায্যে তৈরি হতো! প্রাণীটির ব্লাডার ফোলানো অবস্থায় এক রকম ডিম্বাকার আকৃতিই ধারণ করত! কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিল! সেটা হলো, এ ধরনের ব্লাডার খুব দ্রুত ফেটে যেত। বল বারবার ফেটে গেলে খেলতে ভালো লাগে? একটা সুন্দর সমাধানও বের হয়ে গেল! বলের আয়ু বাড়াতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্লাডারের চারপাশে ডিম্বাকার চামড়ার আবরণের ব্যবহার শুরু হয়ে গেল। রাগবিরেলিক্স.কম থেকে জানা যায়, উইলিয়াম গিলবার্ট এবং রিচার্ড লিন্ডন নামের দুজন মুচি এসব বল সরবরাহ করা শুরু করেন। তবে এখন কিন্তু আর শূকরের ব্লাডার ব্যবহূত হয় না। ১৮৫০ সালের দিকে প্রাণীর ব্লাডারের পরিবর্তে ভল্কানাইজড রাবারের ব্যবহার শুরু হয়। কারণ এগুলো রাবারের তৈরি হলে ছুড়ে মারতে বেশ সুবিধা হয়। কিন্তু রাবার বলের একটি ঝামেলা আছে। সেটা হলো বলগুলো খুবই পিচ্ছিল আর এ কারণে ধরতে বেশ কষ্ট। আর একটা সমস্যা হচ্ছে, বল বাউন্স খেয়ে কোথায় পড়বে তার কোনো আন্দাজ করা যেত না। তাই রাবারের বলের ওপর চামড়ার বলের মতো সেলাই করে দেওয়া হলো, যাতে ধরতে সুবিধা হয়। তবে আমেরিকান ফুটবল নিয়ে কিন্তু বেশ ঝামেলা হয়। যেখানে একটা সাধারণ গোল ফুটবল বাউন্স খেয়ে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট দিকে যায়, সেখানে একটা আমেরিকান ফুটবল কোথায় যাবে, তার ঠিক থাকে না।

এ সম্পর্কে বাংলাদেশ রাগবি অনূর্ধ্ব ১৬ জাতীয় দলের কোচ নাজমুস সাকিব শোভন বলেন, ‘বলটা চ্যাপ্টা ডিমের মতো হওয়ায় ধরতে সুবিধা। সেটা ছুড়ে মারলে চরকির মতো ঘুরতে ঘুরতে যায়। বলটা মাটিতে পড়লে বাউন্স খেয়ে কোথায় যে যাবে তা বলা মুশকিল! সে জন্য সেটা মাটিতে পড়ার পর খেলোয়াড়রা বলের পেছনে এমনভাবে দৌড়ায় যেন তারা মুরগি কিংবা পুকুরে মাছ ধরতে যাচ্ছে! জিনিসটা দর্শকদের জন্য মজার। খেলোয়াড়দের জন্য চ্যালেঞ্জিং। এটাই এ খেলার সৌন্দর্য।’

উড়োজাহাজের গোল জানালা

উড়োজাহাজে চড়েছ? তাহলে নিশ্চয়ই সেখানকার জানালাগুলো চোখে পড়েছে? আমাদের বাসাবাড়ির জানালা চারকোনা হলেও

উড়োজাহাজের জানালা ডিম্বাকার। এর পেছনে আছে মর্মান্তিক দুটি দুর্ঘটনা। ওই দুর্ঘটনার পরই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, চারকোনা জানালা ব্যবহারের ভয়াবহতা। বিবিসি থেকে জানা যায়, দুর্ঘটনা দুটি ঘটে ১৯৫৩-৫৪ সালের দিকে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক এয়ারলাইনার ব্রিটিশ ডি হ্যাভিল্যান্ড কমেটের দুটি যাত্রীবাহী এয়ারক্রাফটে। উড়োজাহাজ দুটি যাত্রার মাঝপথেই ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাণ হারায় ৫৬ জন। উড়োজাহাজগুলো যখন উঁচুতে ওড়া শুরু করে, তখন সেখানে বায়ুর ঘনত্ব কমতে থাকে। এতে জ্বালানি কম লাগে। তা ছাড়া বায়ুমণ্ডলের উত্তাল পরিবেশও এড়িয়ে চলা যায়। ভ্রমণ হয় আরামদায়ক। কিন্তু এর জন্য উড়োজাহাজের নকশায় কিছুটা পরিবর্তনও আনতে হয়। যেমন উড়োজাহাজের ভেতরের বায়ুচাপ কিছুটা বাড়াতে হয়। আর কেবিনটাকে হতে হয় সিলিন্ডার আকৃতির। এতে ভেতরের অতিরিক্ত চাপে উড়োজাহাজের কোনো ক্ষতি হয় না। ডি হ্যাভিল্যান্ড কমেটের নকশায় সব ঠিকঠাক থাকলেও জানালা ছিল চারকোনা। যখন উড়োজাহাজটি ওপরে উঠতে থাকে, তখন বাইরের চাপ কমতে থাকে। ভেতরের চাপ বাড়তে থাকে বলে উড়োজাহাজটি বেলুনের মতো কিছুটা ফুলে ওঠে। ওই ফুলে যাওয়ার কারণে চারকোনা জানালায় পড়ে দারুণ চাপ। ফলে উড়োজাহাজটিতে রীতিমতো ডিমের খোসার মতো ফাটল ধরে। এতেই ঘটে দুর্ঘটনা। গোল জানালায় চাপ সব দিকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে বলে এমনটা ঘটে না।

ভিলেনের ত্রিভুজ

বেশ কয়েক দিন ধরেই ওয়াকিন ফিনিক্সের জোকার মুভির কথা সবার মুখে মুখে। খেয়াল করেছ কি না যে কমিকসে জোকারের মতো যত ভিলেন চরিত্র আছে, তাদের প্রায় সবার থুতনি ত্রিভুজাকৃতির? বেশির ভাগ সময়ই দেখবে যে এদের শিং, চোখা কান, ইংরেজি ভি আকৃতির চিবুক, তীক্ষ চোখ, ভি আকৃতির ভ্রু থাকে। এগুলো কিন্তু কাকতালীয় নয়। খলনায়কদের ইচ্ছা করেই ত্রিভুজের সঙ্গে মিল রেখে আঁকা হয়। এর কারণ, আমাদের মস্তিষ্কটা ত্রিভুজাকৃতির রাগী রাগী চেহারা দ্রুত চিহ্নিত করতে পারে। মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই ত্রিভুজটাকে হুমকি হিসেবে ধরে নেয়। বিজনেস ইনসাইডার থেকে জানা যায়, ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় স্বেচ্ছাসেবীদের কয়েকটি ছবি দেখানো হয়। হাসি মুখ, রাগী মুখ এবং সাধারণ চেহারা দেখানোর সময় সবাই প্রথমে রাগী মুখটাকেই শনাক্ত করে। গবেষকদের মতে, ত্রিভুজ আমাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। এটাই খলনায়কদের চিবুকের আকৃতির রহস্য।

 

অষ্টভুজের স্টপ সাইন

রাস্তায় তো বিভিন্ন চিহ্ন দেখতে পাও। খেয়াল করে দেখবে যে ‘স্টপ’ সাইনটি একটি অষ্টভুজের মধ্যে লেখা থাকে। কারণ এ ধরনের চিহ্ন অনেক দূর থেকেই আলাদা করে চেনা যায়। আর সামনে-পেছনে যেখান থেকেই দেখা হোক না কেন, স্টপ সাইনটি ধরা পড়বেই। দি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব স্টেট হাইওয়ে অফিশিয়ালস এই অষ্টভুজের আইডিয়া প্রথম বাস্তবায়ন করে। আগে অষ্টভুজে হলুদের ওপর কালো লেখা থাকলেও ১৯৫৪ সাল থেকে সেখানে লালের ওপরে সাদা হরফে লেখা হয়। লাল রং বেছে নেওয়ার কারণ হলো এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। দূর থেকে সহজে দেখা যায়।

 

গোলগাল ফিলামেন্ট বাতি

লাইট বাল্বের কথা ভাবলেই গোলাকার বস্তু মাথায় আসবে। ঘনক কিংবা চতুর্ভুজ আসবে না। যুক্তরাষ্ট্রের একজন বাতির নকশাকার ডেরেক পোর্টারের মতে, একটি রুম সবচেয়ে কম আলোতে সবচেয়ে বেশি আলোকিত করতেই বাল্ব গোলাকার করে বানানো হয়। বৃত্তের কেন্দ্র থেকে তার পরিধির ওপরের প্রতিটি বিন্দুর দূরত্ব সমান। এ কারণে গোল বাল্বের চারদিকে সমপরিমাণ আলো সুন্দরভাবে ছড়িয়ে দিতেই টাংস্টেন ফিলামেন্টকে গোলাকার বাল্বের কেন্দ্রে রাখা হয়। ১৮৭৯ সালের দিকে যখন প্রথম ফিলামেন্ট বাতি বানানো হতো, তখন কিন্তু লাইট প্রস্তুতকারকরা এ কথাটা মাথায় রাখতেন। এখনকার বাতিগুলো এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করলেও গোল বাতি আলো বেশি ছড়াবেই।

গ্রাফিকস : সমরেন্দ্র সুর বাপী

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

মন্তব্য