kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

হরর ক্লাব

অভিশপ্ত সোনার কলস

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অভিশপ্ত সোনার কলস

ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মান্নান। পঁচিশ বছর আগে হারিয়েছেন দুই ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে—মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে! প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ভূতুড়ে কিছু ঘটনা! আবদুল মান্নান তাঁর গল্পটা শুনিয়েছেন মো. মাঈন উদ্দিনকে

 

পঁচিশ বছর আগে আমার বয়স কতই হবে, আটচল্লিশ-পঞ্চাশ। বড় ছেলেটাকে মাত্র বিয়ে করিয়েছি। পুরনো ভিটায় সংকুলান হয় না। পুরনো বাড়ির দুই ক্ষেত উত্তরে বাবার দুই কাঠা জমি ছিল। সেখানে বাড়ি করব ঠিক করলাম। বাড়ি করেও ফেললাম। হাতে নগদ টাকা ছিল। দু-তিনটি ঘর উঠাতে বেশি সময় লাগল না। উত্তর দিকে একটি পুকুর খনন করলাম। মোটামুটি বড়ই। বাড়ির পশ্চিমে আগে থেকেই জঙ্গল ছিল। বিরাট জঙ্গল। প্রথম ছয় মাস একটু ভয় ভয় লাগত। পরে সব ঠিকঠাক চলছিল। এর পরই শুরু হয় একের পর এক ভৌতিক কাজ-কারবার।

খানিকটা থামলেন মান্নান। হারিয়ে গেলেন স্মৃতির ঝাঁপিতে। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, বড় ছেলে রফিকুল হঠাত্ জ্বরে পড়ল। খুব জ্বর। শোয়া থেকে উঠতে পারে না। ওর কাছে গিয়ে বসলাম। সে বলল, ‘আব্বা, আমি খুব ভয় পেয়েছি। গতকাল সন্ধ্যায় হাত-পা ধুতে পুকুরে নেমেছিলাম। ওঠার সময় পড়ে যাই। মনে হলো, পায়ে কী যেন পেঁচিয়ে ধরেছে। পেছনে তাকিয়ে দেখি, একটা সোনার কলসি। চিকচিক করছে। শিকলে বাঁধা। বুঝতে পারলাম—এটা স্বাভাবিক কলসি না। ভয়ে শিউরে উঠি। দেখলাম, কলসির ঢাকনা পড়ে গেল আর কলসি থেকে চিকন ডোরাকাটা একটা সাপ বের হয়ে আমাকে তাড়া করল। চিত্কার দিলাম। কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ হলো না।’ এরপর রফিকুলের জ্বর বেড়েই চলল। ভেবে পাচ্ছিলাম না কী করব। এই-সেই করতে করতে ছেলেটা মারা গেল।

চার দিন পর। ঠিক দুপুরবেলা। বড় ছেলের শোকে আমি নির্বাক। তখন ওই জঙ্গলে আমার মেজো ছেলেটার চিত্কার শুনি। দৌড়ে গিয়ে দেখি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।

জ্ঞান ফিরলে জিজ্ঞেস করলাম, কী দেখেছিস? সে বলল, ‘আব্বা, দেখলাম, ভাইয়া সাদা শার্ট পরে জঙ্গলে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের ইশারায় আমাকে ডাকলেন। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম তিনি মারা গেছেন। আমি হেঁটে তাঁর কাছে চলে গেলাম।’ তিনি বললেন, ‘আমার সঙ্গে যাবি?’ আমি বললাম, ‘কোথায়?’ ঠিক তখন লক্ষ করলাম তাঁর চোখ আগুনের মতো লাল। দাঁত বড় বড়। আমি বিড়বিড় করে বললাম, ‘ভাই তো মারা গেছেন। তাহলে কার সামনে দাঁড়িয়ে আছি? এরপর হঠাত্ দেখি তিনি এগিয়ে আসছেন। আমার গলা টিপে ধরলেন। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। তারপর আর কিছু মনে নেই।’

সেই থেকে মেজো ছেলেটাও অসুস্থ হয়ে গেল। জ্বর আর শ্বাসকষ্ট। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। কিন্তু বাঁচানো গেল না। একদিন পরই মারা গেল। এর কয়েক দিন পর আমার মেয়েটাও পানিতে ডুবে মারা গেল। আমি জানতাম। মেয়ের মৃত্যুর পেছনেও আছে ওই অশুভ শক্তি।

এক মাসের ব্যবধানে তিন সন্তানকে হারিয়ে আমি পাগলপ্রায়। মানুষ বলাবলি করতে লাগল, এ বাড়িতে অভিশাপ আছে। কোনো প্রেতাত্মা আছে। এরপর নতুন বাড়িতে দিনে থাকি। আর রাতে পুরনো বাড়িতে ঘুমাই। একদিন ছেলের মা-ও বড় ভুল করে বসল। তিন সন্তানকে হারিয়ে তার মানসিক অবস্থা তো ভালো ছিল না। আমাকে ডেকে বলল, ‘শোনো, নতুন পুকুরে রফিকুল যে সোনার কলসি দেখেছিল, ওই কলসি আমি নিয়ে এসেছি। সাপ-টাপ কিছু নেই। ঢাকনা শক্ত করে বন্ধ করা ছিল। ঢাকনাসহ কলসিটা ট্রাংকে ভরে রেখেছি। তুমি দেখবে?’ ভয়ে আমার মুখে কথা আসছিল না। সে আমাকে টেনে ঘরে নিয়ে গেল। চৌকির নিচে রাখা ট্রাংক খুলল। ট্রাংক খুলতেই ইয়া বড় এক সাপ তরতর করে বেরিয়ে এলো। কোনো কলসি নেই। আমি ভয়ে জমে যাচ্ছিলাম। ছেলের মা আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিত্কার দিল। দুজন দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। এই-ই প্রথম ভৌতিক ঘটনাটা নিজ চোখে দেখলাম। আমার কিছু হয়নি; কিন্তু ছেলের মা ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকে। দু-তিন মাস পর সে-ও মারা গেল। এখন আমি আমার ছোট ছেলেটাকে নিয়ে আছি। এখন আর কিছু দেখি না। ভালোই আছি। ছোট ছেলেটাকে বিয়ে করিয়েছি। একটা নাতিও আছে। তবে সেই লোমহর্ষক দিনগুলোর কথা মনে হলে গায়ে কাঁটা দেয়। মনটাও কেঁদে ওঠে।

মন্তব্য