kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৫ রবিউস সানি          

গোয়েন্দা গল্প

গুবলু গোয়েন্দার গণেশরহস্য

অরুণ কুমার বিশ্বাস

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



 গুবলু গোয়েন্দার গণেশরহস্য

অঙ্কন : জামিল

এক.

গুবলু গোয়েন্দার মামাতোভাই টুবলু। কিন্তু টুবলুরও একটা মামা আছে। উনি চাকরি করেন ঢাকা এয়ারপোর্টে। গুবলুর অনেক দিনের শখ, ঢাকা ঘুরে দেখবে।

এবার ঘটনাচক্রে গুবলু ঢাকায় এলো। তার আবার মামাতো বোন আছে—লিজা। কলেজে পড়ে, তবে ভাবসাব দেখে মনে হয়, এখনো প্রাইমারির বেণিদুলুনি মেয়েটিই রয়ে গেছে।

তো হলো কি, টুবলুর মামা কবিরুল বললেন, চল যাই, তোদের এয়ারপোর্ট ঘুরিয়ে আনি। আজ আমার ডে-নাইট ডিউটি। মেলা সময় হাতে। আরামসে আড্ডা দেওয়া যাবে।

প্রস্তাব শুনে টুবলু পারলে খুশিতে আড়াই পাক নাচে। মামা কবিরুল হক কবির চৌকস কাস্টমস ইন্সপেক্টর। তাঁর নাম শুনলে স্মাগলারদের গায়ে নাকি জ্বর ওঠে। ইন্সপেক্টর কবির ডিউটিতে থাকলে ভুলেও চোরাই মাল নামায় না ওরা, বিমানবন্দরের কোথাও লুকিয়ে রাখে।

এয়ারপোর্টের দিকে গাড়ি ছুটছে। গুবলু অবাক হয়ে শহর দেখে। কী দেখবে! রাস্তায় জ্যাম আর জ্যাম! লিজা বলল, পিক টাইম কিনা, জ্যাম একটু বেশি। কাকভোরে বা গভীর রাতে থাকে না। রাস্তাকে তখন বাড়ির উঠোন মনে হয়।

গুবলু এসব নিয়ে ভাবছে না। সে ভীষণ উত্তেজিত। আজ প্রথম সামনাসামনি উড়োজাহাজ দেখবে। গ্রামে ফিরে সুমন আর বাপ্পিকে গল্প শোনাতে পারবে। 

আড়াই ঘণ্টা পর ওরা এয়ারপোর্টে ঢুকতে পারল। লিজার বাবা আগে থেকেই ওদের জন্য তিনখানা স্পেশাল পাস কিনে রেখেছিলেন। টাকা দিয়ে টিকিট কিনলে এয়ারপোর্টের একটা নির্দিষ্ট জায়গা অবধি যাওয়া যায়।

কিন্তু বিধিবাম। ইন্সপেক্টর কবির অফিসে ঢুকতেই বড় কর্তা (ছদ্মনাম চার্লি) উত্তেজিত স্বরে বললেন, ‘দেখুন মিস্টার কবির, আজ একটা চোরাচালান ঢোকার কথা রয়েছে। এইমাত্র খবর পেলাম ওরা আসবে, ছদ্মবেশে। সতর্ক থাকবেন। টিমকে বলে দিন, ওরা যেন ঠিকঠাক ডিউটি দেয়। স্টেশন ফাঁকা রেখে নো ওয়াশরুম, নো চা-পান। অ্যাম আই ক্লিয়ার, মিস্টার কবির?’

ইয়েস স্যার! অলরাইট স্যার! এ কথা বলে ঠক্ করে একটা শক্ত স্যালুট ঠুকলেন ইন্সপেক্টর কবির। যে কাজের যেমন কেতা!

ব্যস, হয়ে গেল। রাগে-ক্ষোভে নিজের ঠোঁট কামড়ান কবির। লিজা, টুবলু আর তার বন্ধু এখন কী করবে! এ যেন বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে ডেকে এনে অতিথিকে তাড়িয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার।

টুবলু ওর মামার এমন খোলা মুড়ির মতো নেতিয়ে যাওয়া দেখে বলল, ‘প্রবলেম মামা? কী হয়েছে আমাকে বলো।’

সংক্ষেপে কেসটা খুলে বললেন। কবিরের কথা শুনে টুবলু পারলে খুশিতে আড়াই লাফ দেয়। তারপর গুবলুকে ডেকে বলে, তোর তো ভাই খুশির ওপর খুশি রে গুবলু! উড়োজাহাজ তো দেখবিই, আরেকখানা জিনিস আসছে। তা-ও দেখতে পাবি।

কী জিনিস! চোখ নাচায় গুবলু।  

স্মাগলার! মানে চোরাচালান আসছে! তুই না গোয়েন্দা! এটাই মোক্ষম সুযোগ, বুঝলি। নিজের মগজটা একটু ভালো করে ঝালিয়ে নে। শহুরে বাবুরা জানুক, গাঁয়েও শিয়াল, থুক্কু বাঘ আছে!

মামাতো ভাইয়ের কথায় গুবলুর খুব আনন্দ হয়। পপকর্নের মতো ফুটতে থাকে। স্মাগলার! স্বচক্ষে মাফিয়া দেখবে! কী ভাগ্য!

ইন্সপেক্টর কবির অবশ্য বুঝতে পারেন না, স্মাগলিংয়ের কথা শুনে পুঁচকেগুলোর এত আনন্দ কিসের! গুবলু কী জিনিস তা কি তিনি জানেন! সে যে একজন সাহসী গোয়েন্দা—এ খবর তাঁকে কে দেবে!

ওয়াকিটকি হাতে চরকির মতো ঘুরতে থাকেন ইন্সপেক্টর কবির। এয়ারপোর্টে কাস্টমস ছাড়া আরো কতগুলো বাহিনী কাজ করে। যেমন ইমিগ্রেশন পুলিশ, এনএসআই, ডিজিএফআই, র্যাব, সিভিল অ্যাভিয়েশন। প্রত্যেকে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত।

রাত সাড়ে ১০টা। তখনো অফিসারদের ঝিমুনি শুরু হয়নি। কবির সব্বাইকে সজাগ করে দেন—টয়লেট অফ, কেউ কোত্থাও যাবে না। আসছে ফ্লাইটে ওদের আসার কথা আছে। প্রয়োজনে গ্যালন গ্যালন কফি খাও, ঝিমানো চলবে না।

ওরা মানে কারা! বোকার মতো প্রশ্ন করে অতি চালাক লিজা। ফিক করে হেসে ফেলল গুবলু।

‘তুমি হাসলে যে!’ রেগে যায় লিজা। ‘জানো তো, বোকারাই বুঝে না-বুঝে হাসে। অকারণ হাসবে না! এতে নিজের ওজন কমে যায়।’

গুবলু কিছু মনে করে না। ও যাত্রীদের আনাগোনা দেখছে। কবির মামার কথামতো এদের মধ্যেই আছে স্মাগলার। মানুষের মতোই। আলাদা কিছু নয়। তাই খুঁজে বের করা কঠিন বৈকি।

কবির মামা ওয়াকিটকিতে বারবার বলছেন, ‘থাই এয়ারওয়েজ জাস্ট ল্যান্ডেড। টোটাল প্যাসেঞ্জারস টু নাইনটি-ফাইভ। টেক কশন্স। হি অর শি মে বি দেয়ার। ওভার অ্যান্ড আউট!’

গুবলু বুঝল, স্মাগলার একা অথবা একের অধিক হতে পারে। সে নারী বা পুরুষ হতে পারে। সে আরো শুনেছে, ইতালির সিসিলি দ্বীপের যে মাফিয়া গ্রুপ, তার নেতৃত্ব দেয় নাকি একজন নারী। সে নাকি হাসতে হাসতে বলে, ‘মৃত্যুকে আমি পরোয়া করি না; বরং উপভোগ করতে চাই, আই ওয়ান্ট টু হাগ ডেথ!’ কী সাংঘাতিক!

 

যাত্রী চেকিং চলছে। দু-চারজন খুব অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। বলছেন, ‘এসব কী! সবাইকে যদি চেক করবে তাহলে গ্রিন চ্যানেলের কী দরকার! ও বস্তু তুলে দাও।’ ‘খাঁটি কথা।’ আহ্লাদি হেসে বললেন ইন্সপেক্টর কবির। সেই সঙ্গে ওই দু-চারজনের ওপর নজরদারিও বাড়িয়ে দিলেন। ‘উহারাই’ হয়তো সোনার তাল নিয়ে সোনার বাংলায় ঢুকতে চলেছেন

দুই.

একটু পরে আরেকটা ফ্লাইট নামল। এয়ার অ্যারাবিয়া। সৌদি আরব থেকে এসেছে। যাত্রীদের বেশির ভাগই শ্রমিক। সঙ্গে পোঁটলা-পুঁটলি অনেক।

গুবলু দেখে সত্যি অবাক হয়, এই ভুখানাঙ্গা লোকদের ওপর খুব নজর। কী এনেছ, কেন এনেছ, ট্যাক্স দিচ্ছ না কেন—প্রশ্নের পর প্রশ্ন। ব্যাপারটা তার মোটেও পছন্দ হয়নি। ইন্সপেক্টর কবির তার নিজের মামা হলে কথাটা শেয়ার করত।

ইন্সপেক্টর কবির আজ অন্তত সেসব নিয়ে ভাবছেন না। তাঁর নজর চোরাচালানের দিকে। কে আসবে, কী আনবে, জানা নেই। বড় কর্তা বলেছেন, আসছে। একা কিংবা সদলবলে। ‘ক্যাচ হিম অন দ্য নেক।’ ঘাড় ধরে আটকাতে হবে। লোকটা যদি বেশি লম্বা-চওড়া হয়, কবির তাহলে ঘাড় ধরবে কী করে! নাকি কলার কাঁদির মতো ঘাড় ধরে ঝুলে পড়বে! যত্তসব অবাস্তব কথা।

কবির ও তার টিম আজ আর শ্রমিকদের পিছে সময় নষ্ট করেনি। তারা থাই এয়ারওয়েজের দিকে নজর রাখছে।

ওদিকে গুবলু খরচোখে যাত্রীদের লক্ষ করে যাচ্ছে। টুবলুও। লিজা নিজের মনে ইংরেজি গানের কলি আওড়াচ্ছে। যেন ইংরেজি মাধ্যমে পড়লে বাংলা গান গাওয়া বারণ।

একটু পর কবিরের বড় কর্তা মোরগের মতো গলার স্বর মোটা করে জানালেন, ‘স্বর্ণ নিয়ে এসেছে স্মাগলাররা। বি কেয়ারফুল। ওভার অ্যান্ড আউট!’

গুবলু এতক্ষণে বুঝল, সব কথার শেষ কথা ‘ওভার অ্যান্ড আউট।’ কী মজা!

সোনা আনছে চোররা। কেমন করে? গয়না, নাকি সোনার বিস্কুট। ইশ্! একটা সোনার বিস্কুট যদি দেখতে পেত!

থাইল্যান্ড থেকে আগত যাত্রীদের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিল কবির ও তার টিম। প্রতিটি যাত্রীকে চেক করতে থাকে। মালপত্র নয় শুধু। শরীরের প্রতিটি অংশও খুঁজতে থাকে। নারী প্যাসেঞ্জারদের জন্য কাস্টমস লাউঞ্জে লেডি ইন্সপেক্টর মজুদ আছে। পর্দাঘেরা ছোট্ট ঘরে চেক করা হবে। সোনার চালান আটকাতেই হবে। অ্যাট অ্যানি কস্ট।

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ দুটি। একটা গ্রিন চ্যানেল, অন্যটা রেড। কোনো কোনো দেশে ইয়েলো চ্যানেলও থাকে। গ্রিন চ্যানেল মানে সুবজসংকেত। তোমার কাছে অবৈধ বা শুল্কযোগ্য কোনো পণ্য না থাকলে সবুজ পথ দিয়ে মহারাজার মতো গটগট করে হেঁটে যাবে, কেউ আটকাবে না। ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে এমন পণ্য থাকলে কাস্টমস ব্যাগেজ কাউন্টারে গিয়ে তা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। তা না করলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ধরা খেলে জেল-জরিমানা হবে।

আজ কিন্তু কবির মামার টিম লাল-সবুজ দুটি চ্যানেলেই চোখ রাখছে। ওরা বেশ অভিনয় জানে। চট করে সন্দেহ করার উপায় নেই।

কাস্টমস গোয়েন্দারা প্রতিটি যাত্রীর কানের কাছে গিয়ে পাখিপড়ার মতো করে বলছে, ‘অ্যানি ট্যাক্সেবল আইটেমস? ডিক্লেয়ার, প্লিজ!’

কেসটা কী ধরতে না পেরে গুবলু কবির মামার কাছে গেল। জানতে চাইল, ওরা এমন কেন করছে? যার মাল সে নিজের থেকে ঘোষণা দেবে। জানতে চাওয়ার কী আছে!

আছে রে ভাগ্নে, আছে। ওদের তুমি চেনো না বাছাধন। অতিশয় চালাক প্রাণী। স্বেচ্ছায় ঘোষণা দেবে না। ধরা খেলে তখন বলবে, ‘স্যরি! সত্যি মনে ছিল না। নানা ঝামেলায় ঘোষণার কথা ভুলে গিয়েছিলাম।’

মুচকি হাসল গুবলু। একেই বলে যেমন বুনো ওল, তেমনি বাঘা তেঁতুল! শঠে শাঠ্যং।

সারিবদ্ধভাবে যাত্রী চেকিং চলছে। দু-চারজন খুব অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। বলছেন, ‘এসব কী! সবাইকে যদি চেক করবে, তাহলে গ্রিন চ্যানেলের কী দরকার! ও বস্তু তুলে দাও।’

‘খাঁটি কথা।’ আহ্লাদি হেসে বললেন ইন্সপেক্টর কবির। সেই সঙ্গে ওই দু-চারজনের ওপর নজরদারিও বাড়িয়ে দিলেন। ‘উহারাই’ হয়তো সোনার তাল নিয়ে সোনার বাংলায় ঢুকতে চলেছেন।

বেজায় খুশি গোয়েন্দা গুবলু। টুবলুর কারণে ব্যাপক অভিজ্ঞতা হচ্ছে।

অর্ধেক যাত্রী বেরিয়ে গেল, কিন্তু সোনাচোরের সন্ধান পাওয়া গেল না। হতাশ গোয়েন্দা গুবলু। টুবলু বলে, ‘ওয়েট ওয়েট, এখনো অনেকে বাকি। চোর হয়তো জাল কেটে বেরোনোর রাস্তা খুঁজছে। মামা যেমন ঘোড়েল, চাঁদু পালাতে পারবে বলে মনে হয় না।’

ওদিকে এক ভদ্রমহিলা ট্যাক্স নিয়ে ঝগড়া শুরু করেছেন। ডজনখানেক টি-শার্ট এনেছেন ব্যাংকক থেকে, কিন্তু ট্যাক্স দেবেন না। তার এককথা, এসব ব্যবহারের জিনিস, ট্যাক্স দেব কেন?

কিন্তু ভাই, তুমি নিজের দেশ থেকে কিনলে ট্যাক্সসমেত দাম চুকাতে হতো। তা ছাড়া একটা-দুইটা হলে কথা ছিল, এক ডজন শার্ট বিবেচনার সুযোগ নেই। এ নিয়ে বিশাল ঝকমারি। কবির মামার সেদিকে নজর নেই, তিনি স্মাগলার খুঁজছেন।   

(বাকি অংশ পরের সংখ্যায়)

মন্তব্য