kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

বিজ্ঞান

আটটি তারার তিমির

মহাকাশের কথা ভাবলেই অন্ধকার আকাশে মিটিমিটি তারার ছবি ভেসে ওঠে মনে। সব তারা কি এমন গোলগাল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আলো ছড়ায়? আছে অন্ধকার কালো তারাও। কোনোটা আবার ছুটে বেড়াচ্ছে লাখ লাখ মাইল বেগে। লিস্টভার্স ডটকম সাইট থেকে তারাদের নানা রকম মতিগতি নিয়ে জানাচ্ছেন আশিকুর রহমান

৩০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আটটি তারার তিমির

হাইপারজায়ান্ট

দৈত্য তারা 

কাজেকর্মে তেমন বিশেষত্ব নেই হাইপারজায়ান্ট তথা দৈত্যতারার। শুধু খেয়ে খেয়ে মোটাতাজা হওয়াই তার কাজ। এমনই এক দৈত্যতারার নাম এনএমএল সিগনি। আমাদের সূর্যের চেয়ে যার ব্যাসার্ধ ১৬৫০ গুণ বেশি। তুলনা করলে বলতে হয়, সূর্য থেকে বৃহস্পতি গ্রহের দূরত্ব যতখানি, তার চেয়েও বড় এ তারার ব্যাসার্ধ। তবে আকারে বড় হলেই যে বহুদিন দাপট দেখিয়ে বেড়াবে, তা নয়। বড় হওয়ার কারণেই হাইপারজায়ান্টরা বাঁচে কয়েক কোটি বছর মাত্র। আমাদের পরিচিত ওরিয়ন নক্ষত্রপুঞ্জে বেটেলগেজ নামের একটি দৈত্যতারা আছে। ওটা কয়েক লাখ বছরের মধ্যেই সুপারনোভা হয়ে বিস্ফোরিত হতে শুরু করবে। ওই সময় ওটার আলোয় আমাদের আকাশ এতটাই আলোকিত থাকবে যে টানা এক বছর দিনের বেলায়ও জ্বলজ্বলে চাঁদ দেখা যাবে।

 

গতিদানব

মহাকাশে সব কিছুই ছোটাছুটির মধ্যে আছে। তবে নক্ষত্রগুলো সাধারণত এ কাজে একটু আলসেপ্রকৃতির। ব্যতিক্রম হাইপারভেলোসিটি তারাগুলো। গ্যালাক্সির ঠিক মাঝ বরাবর চক্রাকারে ঘুরতে থাকা দুটি তারার মধ্যে একটা বিস্ফোরিত হলেই আরেকটা ছুটতে শুরু করে। তখন ছুটতে থাকা তারাটির গতি অস্বাভাবিক রকম বেশি হয়ে যায়। ঘণ্টায় ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ মাইলও হয়। এ গতিতে ছোটার ফলে তারাটি খুব সহজেই গ্যালাক্সির টান থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারে। আমাদের মিল্কিওয়েতে এমন ২০টি তারা বিজ্ঞানীরা দেখেছেন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, আমাদের গ্যালাক্সিতে এমন অন্তত ১০ হাজার তারা পাওয়া যাবে, যেগুলেঅ তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালাচ্ছে। তবে নতুন কোনো গ্যালাক্সির দিকে না ছুটে চোখ বন্ধ করে অন্ধকার মহাকাশে হারিয়ে যায় ওরা।

বেলুন নাকি?

মজার তারা সেফেইডস। বেলুনের মতো একবার ফোলে আরেকবার চুপসে যায়। তবে প্রক্রিয়াটা চলতেই থাকে। সেফেইডসের কেন্দ্রে মাধ্যাকর্ষণ চাপ থাকে ভীষণ। যে চাপ সামলাতে না পেরে এ ধরনের তারা প্রথমে বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে যায়। কিন্তু ছড়িয়ে যাওয়ার পর যখন চাপ কমে যায়, তখন আবার ধীরে ধীরে চুপসে যেতে থাকে। যত দিন এ তারা টিকে থাকবে, তত দিন চলবে এ ফোলা ও চুপসে যাওয়ার প্রক্রিয়া।

 

কালো বামুন

নক্ষত্রটা যদি আকারে তুলনামূলক ছোট হয় কিংবা বড় হতে হতে বিস্ফোরিত হয়ে যায়, তখন ওটা ধীরে ধীরে সাদা বামুনে পরিণত হয়। এতটুকু জানা কথা। কিন্তু সিম্যুলেশনে দেখা গেছে, এই সাদা বামুনই আবার ইলেকট্রোম্যাগনেটিক র্যাডিয়েশন বিকিরণ করতে করতে একসময় কালো হয়ে যাবে। মানে ওটা থেকে আর কোনো ধরনের আলো বা তাপ বিকিরিত হবে না। এমনকি ওই কালো বামুন ধরা পড়বে না কোনো টেলিস্কোপেও। সাদা থেকে কালো হওয়ার প্রক্রিয়াটা বেশ দীর্ঘমেয়াদি। এতে এতই সময় লাগবে যে এখন পর্যন্ত কোনো তারা কালো বামুন হয়নি। আমাদের সূর্যও একসময় কালো বামুন হবে। তত দিনে কেটে যাবে প্রায় দেড় হাজার কোটি বছর।

 

চ্যাপ্টা তারা

ভেতরের টানের কারণে আমাদের পৃথিবীর মতো তারারাও খানিকটা চ্যাপ্টা গড়নের হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চ্যাপ্টা হওয়ার বিষয়টা ধরা পড়ে না বললেই চলে। কিন্তু কিছু নক্ষত্র এমন দুর্দান্ত গতিতে নিজের অক্ষে ঘুরতে থাকে যে সেটার দুই মেরু চ্যাপ্টা হতে হতে একেবারে ঝিনুকের মতো হয়ে যায়। এ জন্য একে বলা হয় শেল তথা খোলস তারা।

 

নিউট্রন তারা

তারকারাজির মধ্যে পরিচিত নাম এটি। সুপারনোভার পর বড় আকারের তারাগুলো নিউট্রন তারা হয়ে যায়। এটি একটি ঘন গোলাকার পিণ্ড। প্রচণ্ড ভরসম্পন্ন নিউট্রন তারার ব্যাস মাত্র কয়েক কিলোমিটার হয়। তবে এর ভেতর যে শক্তি জমা থাকে, সেটা অতিকায় অনেক তারাকেও ছাড়িয়ে যাবে বহুগুণে। এ তারার আশপাশে একটা পরমাণু এলেও সেটা চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে নিউট্রনের দলায় পরিণত হবে। আর যদি এমন একটি নিউট্রন তারায় কোনোভাবে একটা ছোটখাটো গ্রহাণু আছড়ে পড়ে, তবে সেখানে গামা রশ্মির যে বিস্ফোরণটা ঘটবে, সেটার শক্তি আমাদের সূর্যের জীবদ্দশায় মোট উত্পন্ন শক্তির চেয়েও বেশি হবে। সুতরাং সৌরজগতের আশপাশে যদি কোনো নিউট্রন তারা তৈরি হয়, আর সেখানে গ্রহাণু আছড়ে পড়ে, তবে মুহূর্তের মধ্যে বাষ্প হয়ে যাবে আমাদের পৃথিবীটা।

যেমন হতে পারে কালো বামুন

উল্টো তারা

ইংরেজিতে বলে ডার্ক এনার্জি স্টার। সরাসরি দেখা না গেলেও তাত্ত্বিকভাবে অনেক বিজ্ঞানীই মেনে নিয়েছেন এ তারার অস্তিত্ব। প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী অনেক তারা বিস্ফোরিত হওয়ার পর সংকুচিত হতে হতে ব্ল্যাকহোল হয়ে যায়। বিকল্প তত্ত্বটা হলো, ব্ল্যাকহোল না হয়ে ওই তারা ডার্ক এনার্জি স্টারে পরিণত হয়। যেখানে স্থান-কালের যাবতীয় নিয়ম উল্টে যায়। সেখানে কাজ করতে শুরু করে নেগেটিভ গ্র্যাভিটি। তখন কোনো বস্তুকে আকর্ষণ না করে বিকর্ষণ করতে শুরু করে ওই তারকাটি। আশপাশে কোনো ইলেকট্রন এলে সেটাকে পজিট্রন বানিয়ে দেয় ওটা। পরে ওই পজিট্রন অন্য কোনো ইলেকট্রনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে শক্তির বিকিরণ ঘটায়। বিজ্ঞানীদের মতে, এমন বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনের সঙ্গে পজিট্রনের সংঘর্ষের কারণেই গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে র্যাডিয়েশন ছুটে আসতে দেখা যায়।

 

ভূতুড়ে বোসন তারা

আগে জেনে নাও বোসন আর ফার্মিয়ন সম্পর্কে। মূলত যা কিছু আছে, সব কিছুকে এই দুই কণায় ভাগ করা যায়। এর মধ্যে আমাদের চেনা কণাজগত্ তৈরি ফার্মিয়ন দিয়ে। ইলেকট্রন, নিউট্রন, কোয়ার্ক—এরা হলো ফার্মিয়ন। বোসনকে সহজে বোঝার জন্য শক্তির কণা বলা যেতে পারে। দুটি দৃশ্যমান বস্তু একই সময়ে একই স্থান দখল করতে না পারলেও শক্তির কণা সেটা পারবে। শুধু দুটি নয়, রীতিমতো কোটি কোটি বোসন কণা একই সময়ে একই স্থানে থাকতে পারবে। ফার্মিয়ন যদি একটা বাড়ি হয়, তবে বোসনকে কল্পনা করা যেতে পারে ওই বাড়িতে থাকা ভূত হিসেবে। দুটি বাড়ি একই সময়ে একই স্থানে থাকতে না পারলেও একটা জায়গায় হাজারটা ভূত থাকতে পারে। এভাবে এক জায়গায় যত ভূত জমা হবে, তত ওই ভূতের ক্ষমতা বাড়বে। তো বোসনের যদি অস্তিত্ব থেকেই থাকে, তবে বোসনের তৈরি তারাও থাকতে পারে। যে তারার ভেতর থাকতে পারে বিপুল পরিমাণে বোসন। তাত্ত্বিক এ তারা থাকতে পারবে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে। যার প্রবল ক্ষমতার কারণে একটা গ্যালাক্সির সব কিছু চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। অর্থাত্ ডার্ক এনার্জির মতো এটিও ব্ল্যাকহোলের বিকল্প একটি তত্ত্ব।

নিউট্রন তারা

 

 

মন্তব্য