kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

ধারাবাহিক গল্প

বিপর্যয়ের কালো ছায়া

ডিউক জন

৩০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিপর্যয়ের কালো ছায়া

অঙ্কন : মাসুম

(গত সংখ্যার পর)

ধীরে ধীরে মাথাটা ওর দিকে ঘুরে গেলে দেখতে পেল চেহারাটা।

গলায় ক্রস ঝুলছে মেয়েটার। ভয়ার্ত চাহনি। দেখেই বোঝা যায়, অনেক কষ্ট সয়েছে জীবনে।

‘ভুল বলেছিলেন, মিস্টার জনসন।’ ফিসফিসাল লিন্ডা। ‘মোটেই দেবদূত মনে হচ্ছে না তোমাকে দেখে...’

আরেকটু আগে বাড়ল ব্যাটম্যান। যারা ওর সঙ্গে পরিচিত নয়, স্বাভাবিকভাবেই ওকে দেখলে কাঁপ ধরে যায় বুকে।

‘তা আমি নইও।’ বলল মুখোশধারী ব্রুস। ‘আমি আসলে জানার চেষ্টা করছি, কী ঘটেছে ফিল কোহেনের ভাগ্যে।’

প্রবল অস্বস্তি নিয়ে বাইবেলের মলাটে আঙুল ঘষছে লিন্ডা কোহেন।

‘ফিল?’ উচ্চারণ করল অস্ফুটে। ‘ও তো হারিয়ে গেছে! ঠিক আমার মেয়ের মতো। কোনো দিনই আর ফিরে আসবে না ওরা!’

‘শেষ কখন জীবিত দেখেছ তোমার স্বামীকে?’

ক্ষোভ ফুটে উঠল মেয়েটার চেহারায়। কিন্তু বেদনার ছায়া চোখ জোড়ায়।

‘কেন আমাকে বিরক্ত করছ তুমি?’ অভিযোগ করল। ‘দেখতে পাচ্ছ না, অসুস্থ আমি?’

‘দুঃখিত।’ নিখাদ আন্তরিকতা প্রকাশ পেল ছদ্মবেশী ব্রুসের গলার স্বরে। ‘সত্যিই দুঃখিত আমি। কিন্তু রহস্যময় খুনি ঘুরে বেড়াচ্ছে গথাম শহরে। আমার বিশ্বাস, সাহায্য করতে পারো তুমি বদমাশটাকে ধরতে। প্লিজ, লিন্ডা! ঠিক কী হয়েছিল ফিল কোহেনের?’

দুই হাতে মুখ ঢাকল কোহেনের স্ত্রী। খামচে ধরল চুলগুলো। নিদারুণ যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরটা।

‘ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল, যখন হারালাম আমার সোনামানিককে।’ দীর্ঘ এক শ্বাস ছেড়ে শেষমেশ বলতে আরম্ভ করল হতভাগিনী। ‘সোনার টুকরো বাচ্চাটা...।’ ডুকরে উঠল। ‘চার্চে কাজ করত ফিল, সুবিধাবঞ্চিত গৃহহীনদের জন্য। একদিন কাজে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল মেয়েটাকে। তারপর...তারপর...ওহ্, গড! ওহ্, গড!’

সান্ত্বনার হাত রাখল ব্রুস মেয়েটার কম্পিত কাঁধে। মমতা দিয়ে শুষে নিতে চাইছে, যেন অভাগী মায়ের সমস্ত দুঃখকষ্ট।

শক্ত করে ক্রুশটা চেপে ধরল লিন্ডা। জলভরা চোখে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল পবিত্র যোগচিহ্নটার দিকে।

‘ঠিক আছে, মিস কোহেন।’ বলল ব্যাটম্যান কোমল গলায়। ‘কী হলো এরপর, বলো আমাকে।’

‘মেয়ের অপহরণের জন্য নিজেকে দুষতে লাগল ফিল। মদ ধরল এর পর থেকে। মদের ঘোরে ভাবতে আরম্ভ করল, সে-ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে মেয়েটার মতো...শুধু আমার কাছ থেকে নয়, ঈশ্বরের কাছ থেকেও। একপর্যায়ে বলা শুরু করল, খোঁজ পেয়েছে নতুন ধর্মের। প্রায়ই বলত, আমাদের মতো আরো অনেক মানুষ রয়েছে দুনিয়ায়, ঘৃণাভরে যাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন স্রষ্টা। এক লোকের কথা বলতে শুনেছিলাম ওকে, সব পাপ ধুয়ে-মুছে দিয়ে খাঁটি মানুষে পরিণত করবে যে আমাদের।’ চোখে চোখ রাখল লিন্ডা। আতঙ্ক ওর চোখের তারায়। ‘কিন্তু জেনে গিয়েছিলাম আমি আসল সত্যটা...।’

 

ছয়

সরাইখানার গলি।

কমলারঙা হিট ক্যাপসুলটা মুঠোয় নিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে রয়েছে চেস্টার।

কাছেই অসন্তোষ নিয়ে তাকিয়ে দেখছে রহস্যময় সে ‘ত্রাণকর্তা’, যে লোক উধাও হয়েছিল অর্ধচন্দ্র পাওয়া ভবঘুরেকে নিয়ে। টাল খাওয়া একটা ধাতব পাইপ পড়ে আছে লোকটার পায়ের কাছে, রাস্তার ওপর।

‘বেজন্মা লোকটা...।’ ফিসফিস করল লিন্ডা। ‘নরকের প্রতিনিধি...।’

‘মিস কোহেন...’, তাগিদের সুর ব্যাটম্যানের কণ্ঠে। ‘সলিড তথ্য প্রয়োজন আমার। লোকটার তালাশ পাওয়া সম্ভব, এমন কিছু বলতে পারো আমাকে?’

মাথা ঝাঁকাল মেয়েটা। ‘একমাত্র যে তথ্যটা জানি আমি, তা হলো...।’ থেমে গেল লিন্ডা।

‘হ্যাঁ মিস, থামলে কেন?’

‘লোকটার নাম। যে রাতে অদৃশ্য হলো ফিল, সে রাতেই জেনেছিলাম নামটা ওর মুখ থেকে।’

‘কী নাম লোকটার?’

সামনে দাঁড়ানো মূর্তিটির দিকে চোখ তুলে চাইল চেস্টার। ‘জি?’

‘এত কিছু করলাম তোমার জন্য, আর এভাবে তার প্রতিদান দিলে!’ জপমালাটা কবজিতে জড়িয়ে নিয়েছে আগন্তুক। অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভবঘুরের দিকে। এক হাতে শক্ত করে ধরা ধাতব পাইপটা।

‘না!’ সভয়ে চেঁচিয়ে উঠল চেস্টার। ‘স্রেফ সাহায্য করার চেষ্টা করছিলাম আমি! জানতাম না যে—’

হাতের পাইপটা সর্বশক্তি দিয়ে চেস্টারের মাথায় নামিয়ে আনল অনাহূত। রক্তের ছিটায় আরো নোংরা হয়ে গেল ফুটপাতের দেয়াল।

ঠং করে রক্তমাখা পাইপটা পড়ল রাস্তায়।

নিথর দেহটা নিজের কাঁধে ফেলল আগন্তুক। হারিয়ে যাচ্ছে কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারে।

‘বেঞ্জামিন চুডনোফস্কি!’ ঘৃণার সঙ্গে উচ্চারণ করল লিন্ডা। ‘বন্ধুর বেশে অনুপ্রবেশ করেছে শয়তানটা আমাদের সুখের জীবনে!’

‘বলছি তোমাকে, লিন্ডা।’ বলল ব্যাটম্যান কঠিন স্বরে। ‘শয়তান তো নয়ই, শয়তানের চেলাও নয় ব্যাটা! স্রেফ একটা কাপুরুষ...সময় ফুরিয়ে এসেছে ওর।’

ফিরে এসেছে ডেনভার। গথাম মানসিক হাসপাতালের হলওয়েতে অপেক্ষা করছে ধৈর্য ধরে।

কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে থামল ব্যাটম্যান দরজার কাছে এসে। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ মিস কোহেন। ভালো হয়ে উঠবে তুমি।’

‘না, ধন্যবাদ দিয়ো না আমাকে।’ জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে মেয়েটা। ‘একটা অপয়া ছাড়া কিছুই নই আমি।’

 

সাত

নিজের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের উদ্দেশে হেঁটে চলেছে বেঞ্জামিন চুডনোফস্কি। জানেও না, বাদুড় আকৃতির ছোট্ট এক ইলেকট্রনিক ডিভাইস সেঁটে রয়েছে ওর গাড়ির পেছনের বাম্পারে।

অ্যাপার্টমেন্ট হাউসের দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার কামরায় বাতির সুইচ টিপে দিল চুডনোফস্কি। আলোকিত ঘরটা দেখে কেউই বলবে না যে প্রেতচর্চা করে বার মালিক। অস্বস্তি জাগানো কোনো ছবি কিংবা মূর্তি-টুর্তি, ধর্মগ্রন্থ বা নকশা-টকশা—এমন কিছুই নেই, যা দেখে মনে হতে পারে, সম্পর্ক রয়েছে শয়তানের সঙ্গে। একেবারেই সাধারণ কামরা।

গায়ের কালো কোটটা খুলে কিচেন কাউন্টারে ছুড়ে দিল চুডনোফস্কি। ফ্রিজ খুলল ঝুঁকে। পরনের ট্যাংক টপটার নিচ থেকে উঁকি দিল এবার লোকটার বিশ্বাসের চিহ্ন—বিশাল এক শয়তানি উল্কি!

ফ্রিজে রাখা বিয়ারের বোতলের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে আঁতকে উঠল লোকটা। বাদুড়সদৃশ ছায়া পড়েছে বোতলে! ঠিক যেন ওর পেছনেই রয়েছে ওটা!

‘না, না!’ পাগলাটে অভিব্যক্তি ফুটল চুডনোফস্কির চোখ দুটিতে। নিজেকে এক পাশে ছুড়ে দিয়েই বোতল ছুড়ল ব্যাটম্যানের উদ্দেশে।

ঝট করে নিচু হয়ে আঘাত এড়াল বাদুড়মানব। কিচেন কাউন্টারে আছড়ে চুরমার হলো বোতল।

‘চামচিকার ছাও!’ গালি দিয়ে উঠল চুডনোফস্কি। ‘কিভাবে আমার খোঁজ পেলে তুমি!’ ছিটকে আসা ধারালো একটা ভাঙা বোতলের টুকরা কুড়িয়ে নিয়ে ফের হামলা চালাতে উদ্যত হলো শয়তানের পূজারি।

খপ করে লোকটার কবজি ধরে ফেলল অন্ধকারের অবতার। শাণিত কণ্ঠে খোলাসা করল, ‘ট্র্যাকার বসিয়ে দিয়েছিলাম গাড়িতে...।’

ঘুষি মেরে চুডনোফস্কির নাকটা সমান করে দিল ব্যাটম্যান। খোলা রেফ্রিজারেটরের ওপর ছুড়ে ফেলল বদমাশটাকে।

‘...জানতাম, কিছু একটা লুকাচ্ছ তুমি।’ বলল সে আগের কথার সূত্র ধরে।

প্রত্যুত্তরে শুধু কাতরে উঠল শয়তানের উপাসক।

ফ্রিজের সঙ্গে ঠেস দিয়ে পড়ে রয়েছে লোকটা। ভেতরের খাবারদাবার সব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একাকার ওর গায়ে, মাথায়। ভাঙা নাক থেকে দরদর করে গড়াচ্ছে রক্ত।

বিদ্যুত্গতিতে কাছে এসে হারামিটার গলা টিপে ধরল ব্যাটম্যান এক হাতে। চোয়ালে কাঠিন্য ভাব। ‘তোমার কলুষিত জীবন শেষ হচ্ছে, চুডনোফস্কি। যেখানে যাচ্ছ, কেউ ফিরে আসে না সেখান থেকে...।’

‘না, না! দাঁড়াও!’ তরাসে চেঁচিয়ে উঠল বার মালিক। ‘ভালো করে তাকিয়ে দেখো চারপাশ। কই, কোনো লাশটাশ রয়েছে এখানে?’

প্রতিক্রিয়ায় ব্যাটম্যানের চোখের মণিতে রাগ দেখতে পেল লোকটা। রক্তভরা ভাঙা দাঁতের ফাঁকে হিসহিসিয়ে বলল, ‘ভূতের পেছনে ছুটছ তুমি, চামচিকা!’

‘আর একটাও মিথ্যা কথা নয়!’ শাসাল যমদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া ব্রুস ওয়েইন। ‘ফিল কোহেনের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি আমি। খুন করেছ তুমি মেয়েটার স্বামীকে। সম্ভবত অন্যদেরও।’

‘না, না...আমি নই! ওই লোকই করেছে সব কিছু...নিজ হাতে!’

পাকড়ে ধরল ব্যাটম্যান চুডনোফস্কিকে। গ্রিলবিহীন সবচেয়ে কাছের জানালাটার থাইগ্লাস ভেঙে ছুড়ে দিল বাইরে রক্তাক্ত দেহটা। আধখানা শরীর বেরিয়ে রয়েছে লোকটার, জীবনটা ঝুলছে ব্যাটম্যানের হাতের মুঠোয়, ছেড়ে দিলেই সোজা গিয়ে পড়বে বহু নিচের রাজপথে।

►(চলবে)

 

মন্তব্য