kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

ফোকাস

কেরানীগঞ্জ থেকে লর্ডসে

বিশ্বকাপের আগেই কিন্তু দারুণ এক বিশ্বকাপ হয়ে গেছে। পথশিশুদের বিশ্বকাপ! খেলা হয়েছিল ক্রিকেটের জন্মস্থান ইংল্যান্ডে। যেখানে ব্যাটে-বলে ভালোই মাতিয়েছে আমাদের সানিয়া, স্বপ্না, আরজু ও রাসেলরা। তাদের স্বপ্ন নিয়ে লিখেছেন গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

৩০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কেরানীগঞ্জ থেকে লর্ডসে

শিশুদের নিয়ে এবার বেশ সরব আইসিসি। বিশ্বকাপে শিশুদের জন্য এক দিন কার্যক্রমও ঘোষণা করা হয়েছে এবার। তবে বড়দের খেলা শুরুর আগেই ছোটদের একটা বিরাট আয়োজন হয়ে গেল। স্ট্রিট চিলড্রেন ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপে খেলেছে বাংলাদেশের আট পথশিশু। ৩০ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত ১০ দেশের ৮০ পথশিশু খেলেছে তাতে। আর দশ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ খেলেছে সেমিফাইনাল পর্যন্ত।

লন্ডনের স্ট্রিট চাইল্ড ইউনাইটেড নামের সংগঠনটি ছিল অন্য রকম এ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক। সঙ্গে ছিল আইসিসি। বাংলাদেশের লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (লিডো) তত্ত্বাবধানে থাকা চারজন ছেলে ও চারজন মেয়ে গিয়েছিল খেলতে। পথশিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়া ও তাদের সুযোগ করে দেওয়ার প্রতি সবার নজর কাড়াই ছিল এ বিশ্বকাপের মূল লক্ষ্য। তবে খেলায় কিন্তু ঠিকই ছিল টানটান উত্তেজনা।

খুদে আট

বাংলাদেশের খুদে আট টাইগার হলো—সানিয়া মির্জা, জেসমিন আক্তার, স্বপ্না আক্তার, আরজু রহমান, রাসেল ইসলাম রুমেল, আবুল কাশেম, রুবেল ও নিজাম হোসেন। এ আটজন মিলে দেশের হয়ে খেলেছে লর্ডসের মাঠে। অধিনায়ক ছিল আবুল কাশেম এবং সহ-অধিনায়ক রাসেল ইসলাম। প্রতি ম্যাচে ছয়জন করে খেলেছে। ঘুরেফিরে দুজনকে তাই বসতে হয়েছিল গ্যালারিতে।

বাংলাদেশ, ভারত (উত্তর ও দক্ষিণ), পাকিস্তান, ইংল্যান্ডসহ মোট দশ দেশের পথশিশু অংশগ্রহণ করে এই বিশ্বকাপে। ৩০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া প্রথম পথশিশু ক্রিকেট বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠেছে বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে ভারত উত্তর ও নেপালকে হারিয়ে শেষ চারে যাওয়া নিশ্চিত করে খুদে টাইগাররা। ভারত উত্তরের বিপক্ষে পাঁচ ও নেপালের বিপক্ষে সাত রানে জয় পায় আবুল কাশেম ও স্বপ্নাদের দল। স্বপ্নভঙ্গ হয় সেমিফাইনালে। হেরে যায় দক্ষিণ ভারতের কাছে। ৭ মে ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ৫ রানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো পথশিশু বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত দক্ষিণের শিশুরা।

  

স্বপ্নযাত্রা

স্বপ্না আক্তার জানাল, ‘লর্ডসের মতো জায়গায় ক্রিকেট খেলতে যাব—এটা কল্পনাও করতে পারিনি। তার ওপর আবার দেশের প্রতিনিধি হব, এটা তো আরো বিশাল ব্যাপার। ওই কয়দিন যা যা ঘটল, সবই আমার জীবনে প্রথম। প্রথম বিমানে চড়া, প্রথম হোটেলে থাকা, দেশের বাইরে ব্যাটিং-বোলিং করা—সবই যেন স্বপ্ন। যেখানে গিয়েছিলাম, সেখানে সবাই অনেক মিশুক ছিল। আমার অনুপ্রেরণা জাহানারা আলম আপা। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন তার মতো জাতীয় দলে খেলব।’

স্বপ্না আরো জানাল, ‘ভাবছিলাম, লন্ডন জায়গায়টা কেমন? মানুষজন কেমন? আবার শুনেছি, প্লেন যখন অনেক ওপরে ওঠে, তখন নাকি ভয় লাগে। আমারও লেগেছে অবশ্য। লন্ডনে আমরা হোটেলে উঠলাম। সেখানে অন্য দলগুলোও ছিল। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। আমরা থেকেছি ৩১ তলায়। সেখানে মরিশাস দল আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। সবাই একসঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। গান করেছি, ছবি তুলেছি। মনে হয়নি আমি অন্য একটা দেশে আছি। তবে ভাষা ভিন্ন হওয়ায় কথা বলতে একটু কষ্ট হয়েছে।’

রুমেল জানাল, ‘আমরা যেহেতু ছোট, তাই মাঠের বাউন্ডারি ছোট করে দেওয়া হয়। আবার নিয়ম ছিল, একজন পনেরো রান করলে তাকে বিশ্রাম করার জন্য বসে থাকতে হবে। তাই পনেরো রান হয়ে যাওয়ার পর আমরা একজন একজন করে বসে যেতাম। গ্রুপের খেলাগুলো ইংল্যান্ডের বিভিন্ন মাঠে খেলেছি। আর সেমিফাইনাল খেলেছি লর্ডসের মাঠে। ওখানেই ব্রিটিশ এমপিদের সঙ্গে খেলেছি। ওই ম্যাচে কিন্তু আমরাই জিতেছি।’

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পাশেই ভিক্টোরিয়া টাওয়ার গার্ডেনসে ব্রিটিশ এমপিদের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ হয়। ২০ ওভারের ওই ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহিরয়ার আলম। ২০ ওভারের প্রীতি ম্যাচ শেষে সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে সান্ধ্যভোজনেও অংশ নেয় ওরা।

জেসমিন বলল, ‘খেলতে যাওয়ার আগেও কিন্তু মজার মজার ঘটনা ঘটেছে। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে আনন্দপূর্ণ একটি দিন কাটিয়েছিলাম। দেশের জার্সি গায়ে দল বেঁধে ঘুরেছি। বিসিবিতে গিয়েছিলাম। সেখানে তামিম ভাইয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তামিম ভাইয়া আমাদের সবাইকে কেডস ও কিপিং গ্ল্যাভস উপহার দিয়েছিলেন। দেখা হয়েছিল মুশফিক ভাইয়ার সঙ্গেও। তিনি আমাদের অনেক টিপস দিয়েছিলেন। এটাও আমাদের জন্য স্মরণীয় ঘটনা।’

আবুল কাশেম বলল, ‘বাংলাদেশের হয়ে খেলার অনুভূতি মুখে বলা সম্ভব না। আমি বল করে একবার স্টাম্প ভেঙে ফেলেছি। ছয়-চারও মেরেছি অনেকগুলো। দলকে বলতে গেলে একবার আমিই জিতিয়েছি। এখন চিন্তা একটাই—বড় হয়ে মুশফিকুর রহিমের মতো ক্রিকেটার হতে হবে। দেশের জন্য খেলতে হবে। রুবেল বলল, তার নাম রুবেল। এ জন্য তার পছন্দের খেলোয়াড়ও রুবেল। লর্ডসে বল করার সময় তার ধ্যানজ্ঞান ছিল, যে করেই হোক রুবেলের মতো পেস বল ছুড়তে হবে। এদিকে স্বপ্না জানাল চলমান বিশ্বকাপ নিয়ে তার স্বপ্নের কথা, ‘আমি চাই বাংলাদেশ যেন সেমিফাইনালে উঠতে পারে।’ সানিয়া বলল, ‘আমরা বিশ্বকাপ জিততে পারিনি। তবে জাতীয় দল যেন বিশ্বকাপ জিতে যায়।’

 

লিডো পিস হোম

২০১০ সালে পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা হয় লিডো পিস হোম। ঢাকার কেরানীগঞ্জের ওয়াশপুরে এর অবস্থান। হোমটি পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন মানুষের আর্থিক সহায়তায়। ৫২টি শিশু নিজেদের দুঃখ ভুলে আপন করে নিয়েছে পিস হোমটিকে। ১৮ বছরের নিচে বিভিন্ন বয়সী ছেলে-মেয়েরা এখানে বড় একটা পরিবারের মতো থাকে।

সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন এখন এ ৫২ শিশুর অভিভাবক। সানিয়া, রাসেল, নিজাম, আরজু, জেসমিনরা এখানেই থাকে, পড়াশোনা করে এবং এখানেই ক্রিকেট প্র্যাকটিস করছে। নিজেদের কোনো মাঠ না থাকায় পিস হোমের পাশেই স্থানীয় এক ব্যক্তির দেওয়া জায়গায় এরা খেলে। এ ছাড়া আশপাশের মাঠে গিয়েও চালায় প্র্যাকটিস।

পিস হোমের গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়বে গাছপালা, ছড়ানো রঙিন পাথরের সারি। মূল বাড়ির সামনে বাঁশের তৈরি দারুণ একটি দ্বিতল স্থাপনা। ওপরের তলায় শিশুরা গল্প করে, গান গায়, কখনো বা নাচে। নিচতলায় একটা মঞ্চের মতো জায়গায় আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠান। নিচতলায়ই সবার থাকা ও খাওয়ার জায়গা রয়েছে। ওপরতলায় আছে পাঠাগার ও ক্লাসরুম। পুরো ভবনটি যেন শিশুদের মনের কথা ভেবেই বানানো হয়েছে।

ফরহাদ হোসেন জানালেন, ‘যে আটজন শিশু খেলছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে অনূর্ধ্ব-১৬ দলে স্থান পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা এই শিশুদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করব, যাতে তারা সমাজের পথশিশুদের নিয়ে ভবিষ্যতে নিজেদের জায়গা থেকে কিছু একটা করতে পারে।’

লিডো পিস হোমের স্বেচ্ছাসেবক জাবের জানান, ‘আমাদের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া আপাতত সাধ্যের বাইরে। তবে বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে বিসিবি থেকে দুজন কোচকে দুই সপ্তাহের জন্য এখানে নিয়োগ করা হয়েছিল। তাঁরাই প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। আর আটজনকে বাছাই করা হয়েছিল নানা পরীক্ষার মাধ্যমে। বিশ্বকাপ শেষে বিসিবির কর্মকর্তারা দেশে এলে তাঁদের সঙ্গে এ শিশুদের নিয়ে আলাপ করা হবে।’

মন্তব্য