kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

ধারাবাহিক গল্প

বিপর্যয়ের কালো ছায়া

গায়ে জামা নেই লোকটার, চামড়া ফ্যাকাসে। সবচেয়ে পীড়াদায়ক যেটা—একটা নকশা আঁকা ডেডবডির চামড়া কেটে—বৃত্তের মধ্যে একটা তারকাচিহ্ন

ডিউক জন   

১৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বিপর্যয়ের কালো ছায়া

এক

হিম ঠাণ্ডা, বৃষ্টিমুখর রাত নেমেছে গথাম নগরীতে। অনেক পরিচিত একটা নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে শহরটার অবহেলিত, পুরনো এক অংশে।

‘এই যে ভাই’—ভেসে এলো সাদামাটা এক পানশালার ভেতর থেকে। ‘কথা কানে যায় না? বললাম তো, আজকের মতো বন্ধ করে দিচ্ছি দোকান!’

খুলে গেল বারটার পেছনের সুইং ডোর। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বের করে দেওয়া হলো অসময়ের খদ্দেরকে। ভবঘুরে লোকটা। জীর্ণ, মলিন, অপরিচ্ছন্ন জামাকাপড়। টলছে অল্প অল্প।

‘যত্তসব!’ শোনা গেল বারটেন্ডারের গলা। ‘কোত্থেকে যে আসে এগুলো!’ ভেতরের দিকে পা বাড়াল লোকটা।

বৃষ্টি থেকে বাঁচতে হুডছাড়া জ্যাকেটের কলার মাথার ওপর তুলে দিল ভবঘুরে। কী যেন আওড়াচ্ছে বিড়বিড় করে। ঠাঁই দরকার মাথা গোঁজার।

দীর্ঘকায় এক লোক লক্ষ করছে, ওকে ফাঁকা রাস্তার ওপারে ছায়ার আড়াল থেকে।

দীর্ঘদেহির কাছাকাছি এসে হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল যেন আধমাতাল ভবঘুরে। একটা কণ্ঠস্বর ডাক দিয়েছে ওকে আঁধার থেকে। কে ডেকেছে, ভালো করে দেখার জন্য জ্যাকেটের নিচ থেকে গলা বাড়াল পানশালা থেকে বিতাড়িত লোকটি।

‘বেচারি!’ এখনো কথা বলছে কণ্ঠটা। ‘বাতিল বলে ঘোষণা করেছে তোমাকে দুনিয়া...’

‘কে! কে ওখানে?’

আংশিক দৃশ্যমান হলো লোকটি ছায়ার ভেতর থেকে। আপাদমস্তক কালো পোশাক পরনে। হুডের ছায়া আড়াল করে রেখেছে চেহারা। তসবির মতো, পাথরের একখানা মালা কবজি আর আঙুলে জড়ানো।

‘আশ্রয় খুঁজছ?’ বলল সে দয়ালু কণ্ঠে। ‘একটা জায়গার হদিস দিতে পারি তোমাকে...’

‘সত্যি?’ বিশ্বাস করতে পারছে না যেন ভবঘুরে। ‘কিন্তু...কেন আমাকে সাহায্য করছ তুমি?’

‘তার কারণ, এত নিষ্ঠুরতা প্রাপ্য নয় তোমার। সভ্যতা যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁপতে বাধ্য করে ঠাণ্ডায়, কী রকম অনুভূতি হয় তখন, জানা আছে আমার।’

কাঁধ জোড়া ঝুলে পড়ল ভবঘুরের। কী যেন দলা পাকিয়ে উঠেছে গলার কাছে।

‘হ্যাঁ, স্যার...ঠাণ্ডা খুব!’ কাঁটা দিয়ে উঠল গায়ে।

‘এসো তবে, অনুসরণ করো আমাকে।’ বলে হাঁটা ধরল আগন্তুক। ‘আজ রাতে, সমস্ত দুর্দশার অবসান ঘটবে তোমার।’

 

দুই

দেশলাই জ্বেলে চুরুট ধরাল ডিটেকটিভ হেনরি মর্গান। একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘পথ দেখাও, ডেপুটি।’

‘এদিকে, স্যার।’ নির্দেশ করল গোয়েন্দা সহকারী।

বর্ষণমুখর সে রাতের তিন হপ্তা পরের ঘটনা।

স্প্র্যাং নদীর পার ঘেঁষে রয়েছে ওরা। পুরনো গথামের দূরের দক্ষিণে অবস্থিত স্রোতস্বিনীটা।

ঝোপঝাড় আর ছোট গাছের সারি গ্রামীণ এলাকাটা আলাদা করে রেখেছে কাছের ব্যস্ত নগরী থেকে। গগনচুম্বী অট্টালিকাসহ বিশাল এক সেতু পরিচয় বহন করছে গথামের শহুরে অংশটার।

সূর্য ডুবছে। আঁধার এই নামল বলে!

নদীর ধারে বিছানো নীল একটা তেরপলের উদ্দেশে এগিয়ে চলেছে মর্গান ও তার ডেপুটি। একটা মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। লাশ বহন করার কালো গাড়িসমেত অকুস্থলে পৌঁছে গেছে ফরেনসিক এক্সপার্টরা।

চুরুটে টান দিয়ে গোড়ালিতে ভর দিয়ে বসল ডিটেকটিভ। আস্তে করে তুলল তেরপলের কোনা ধরে। তীক্ষ চোখে জরিপ করতে লাগল নিথর দেহটা। কাছাকাছি হয়ে গেছে দুই ভুরু।

অবশেষে যা আশা করছিল, পেয়ে গেল ওটা।

ভারী হয়ে এলো মর্গানের অভিব্যক্তি। যা দেখেছে, খুশি হতে পারেনি মোটেই।

‘হায়, যিশু...’ আপনা-আপনি বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে।

‘জি, স্যার।’ বলল ডেপুটি। ‘হাইকারদের যে দলটা খবর দিয়েছে আমাদের, আতঙ্কে মারা যাওয়ার অবস্থা ওদের।’

‘যাওয়ারই কথা।’ মন্তব্য করল পুলিশের ডিটেকটিভ। খাড়া হলো পায়ের ওপর। এখনো বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে লোকটাকে। ‘তো, কী কী জেনেছি আমরা?’ জিজ্ঞেস করল সহকারীকে।

‘তত্ত্ব-তালাশ চলছে, স্যার, এলাকায়।’ জানাল মর্গানের ডেপুটি। ‘তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি কোনো প্রত্যক্ষদর্শী।’

‘আর কী আশা করছিলে, অ্যাঁ?’ কিঞ্চিত্ বিরক্ত গোয়েন্দাপ্রবর। ‘পরিত্যক্ত একটা চার্চ আর পাঁড় মাতাল কটা ভবঘুরে ছাড়া আর কী রয়েছে আশপাশে?’

সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল সহকারী গোয়েন্দা। না, ওপরওয়ালার কথায় নয়, দেখতে পেয়েছে অন্য কিছু।

‘ফরেনসিক ক্রুদের কাজ শেষ হোক।’ বলল হেনরি মর্গান। ‘তারপর প্যাথলজিস্টদের কাছে নিয়ে ফেলতে হবে মড়াটাকে। হতভাগার পরিচয় জানে, এমন কাউকে না পেলে তো...’

‘স্যার...।’ বসের কথায় মনোযোগ নেই অধস্তনের।

‘হ্যাঁ...বলো...।’ অধীনস্থের দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনে তাকাল অফিসার কাঁধের ওপর দিয়ে। কাছেই দাঁড়ানো অতি পরিচিত একটা অবয়ব, ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হয়ে অপেক্ষা করছে ব্রাশউডগাছের ছায়ার নিচে।

‘আপনার সঙ্গেই কথা বলতে চাইছে বোধ হয়...’

‘উঁ?’ ডেপুটির মন্তব্যে সচকিত গোয়েন্দা অফিসার। হাততালি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করল কুশলী লোকগুলোর। ‘কাজ কত দূর আপনাদের?’

ক্রুরা বিদায় নিলে ব্রাশউডের ছায়া থেকে বেরিয়ে এলো মানবমূর্তিটি। ও আর পুলিশ ডিটেকটিভ ছাড়া ক্রাইম সিনে আর কেউ নেই আপাতত।

‘ব্যাটম্যান! কী করছ এখানে?’ অসহিষ্ণু কণ্ঠে জবাব দাবি করল পুলিশ অফিসার। ‘হাতে আর কাজ নেই তোমার? বলতে চাইছি, একটু বেশিই মামুলি হয়ে যায় না কেসটা তোমার জন্য?’

‘মামুলি কি মামুলি নয়, সেটাই বুঝতে এসেছি।’ রাশভারি জবাব গথামের সুপারহিরোর।

লাশটা একনজর দেখবে বলে নিচু হলো বাদুড়মানব। হাত বাড়াল তেরপলের দিকে।

‘তো, বেশ, দেখো বুঝে।’ শ্রাগ করল মর্গান। ‘বাজি ধরে বলতে পারি, বাড়িতেই থাকতে চাইবে তুমি লাশ দেখার পর।’

তেরপলের এক কোণ উঁচু করল ব্যাটম্যান। ভয়াবহ বললে কম হবে। বীভত্স দৃশ্য!

গলাধাক্কা খাওয়া হতদরিদ্র সেই মাতালটা। মাথার ওপর ছাদ নেই বলে যেকোনো সুযোগ গ্রহণে যে মরিয়া। গায়ে জামা নেই লোকটার, চামড়া ফ্যাকাসে। সবচেয়ে পীড়াদায়ক যেটা—একটা নকশা আঁকা ডেডবডির চামড়া কেটে—বৃত্তের মধ্যে একটা তারকাচিহ্ন।

‘কী মনে হচ্ছে তোমার?’ জবাব আশা করছে ডিটেকটিভ। ‘চরমপন্থী কোনো গুপ্তসংঘের কাজ?’

‘তেমনটাই তো লাগছে ক্ষতটা দেখে।’ চিন্তিত ব্যাটম্যান।

‘ক্ষত...মানে?’

‘নকশাটার কথা বলছি...উল্টো পেন্টাগ্রাম। শয়তানের চিহ্ন এটা।’

দ্বিতীয়বার চাইতে গিয়ে ক্লান্তি অনুভব করল সাত ঘাটের পানি খাওয়া অফিসার। চুপচাপ ধোঁয়া টানতে লাগল নদীর দিকে মুখ ফিরিয়ে।

‘এ-ও বোঝা যাচ্ছে, এটাই প্রথম শিকার নয় ওদের।’ বলল ব্যাটম্যান শান্ত কণ্ঠে। ‘শেষও নয়।’

ফিরে চাইল ডিটেকটিভ। ‘কী থেকে আসছ এই সিদ্ধান্তে?’

হাই-টেক একখানা মেডিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট বেরিয়ে এলো কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত চওড়া ব্যাটম্যানের ব্রেসলেট থেকে। মৃতদেহের বুকের ক্ষতটায় সুঁই ঢোকাল বাদুড়মানবের ছদ্মবেশে থাকা ব্রুস ওয়েইন। ‘এক মাসে ডজনখানেক লোক নিখোঁজ হয়েছে এই এলাকার দশ মাইলের মধ্যে।’

‘তাতে কী হয়েছে? তোমার কী ধারণা, সম্পর্ক রয়েছে এ দুটির মধ্যে?’

‘হুম, সম্ভাবনা আছে। নিশ্চিত হতে পারলে জানাব আপনাকে।’

সিধে হলো ওয়েইন। কোমরের ইউটিলিটি বেল্টে একটা কার্ট্রিজের মধ্যে রেখে দিল রক্তের নমুনাটুকু।

‘তা তো জানাতেই হবে।’ চালিয়াতির ভঙ্গিতে কথাটা বলে নদীর দিকে চাইল আবার অফিসার। ‘আমাদের সাহায্য ছাড়া এক পা-ও এগোতে পারবে তুমি?’ থতমত খেল ফিরে তাকাতেই।

বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে ব্যাটম্যান! নিঃশব্দে।

 

তিন

নিজের গোপন আস্তানায় কোয়ান্টাম সুপার-কম্পিউটারের সামনে বসে আছে ব্রুস ওয়েইন। পেছনে ফেলা পরনের রোবটটার মস্তকাবরণ। জায়গাটার নাম দিয়েছে ও বাদুড়ের গুহা।

জিসিপিডির (গথাম সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট) এভিডেন্স ফাইল দেখাচ্ছে মনিটর। কেস নম্বর সংযুক্ত প্রতিটি নথিই নিখোঁজ ব্যক্তিদের।

ট্রেতে করে পেয়ালা আর চায়ের কেটলি নিয়ে গুহায় প্রবেশ করল খানসামা আলফ্রেড।

‘সকাল সকাল ফিরলেন নাকি আজ?’ জিজ্ঞেস করল প্রৌঢ় বাটলার।

‘হ্যাঁ, মাত্রই।’ বলল ব্যাটম্যান। যদিও এখন ছদ্মবেশে নেই ও।

‘খুব ভালো লাগছে এ সময় আপনাকে বাড়িতে দেখে।’ তাকাল খানসামা কম্পিউটারের দিকে। ‘নতুন কিছু জেনেছেন নাকি ওল্ড গথামের অন্তর্ধান-রহস্যগুলোর ব্যাপারে?’

‘হুম।’ কি-বোর্ডে টাইপ করছে ব্যাটম্যান। ‘নিখোঁজ-রহস্যের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে নদীর ধারে পাওয়া লাশটার।’

‘কী রকম?’

‘রক্ত পরীক্ষা করেছি ডেডবডির। উচ্চ মাত্রায় ইথানল পাওয়া গেছে রক্তে।’

মনিবের জন্য কাপে চা ঢালছে আলফ্রেড। জিজ্ঞেস করল, ‘বলতে চাইছেন, দূষিত ছিল রক্তটা?’

‘হ্যাঁ...খুবই। তবে আমার ধারণা, বিষটা এসেছে অ্যালকোহল থেকে। পানাসক্তির ফলাফল।’

‘মার্জনা করবেন, জনাব। শহরের বেশির ভাগ পুরুষেরই তো প্রধান অসুখ এটা। ডাউনটাউনের হারানো লোকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলে ভাবছেন কেন?’

উঠে দাঁড়াল ওয়েইন, কম্পিউটারের সামনে থেকে। ভৃত্যকে পাশ কাটানোর সময় মাথায় তুলে দিল হুডটা। হাঁটা ধরেছে ব্যাটমোবাইলের উদ্দেশে।

‘নিজেই পড়ে দেখো।’ বলল সে জবাবে। ‘মিসিং পার্সনদের ওপর পুলিশের দেওয়া রিপোর্টগুলো জড়ো করেছি আমি। খোঁজ চালিয়েছি বারগুলোতে। উধাও হওয়ার আগে ওগুলোর কোনোটাতে শেষ দেখা গেছে কি না কাউকে। যতবারই গভীরে যেতে চেয়েছি কেসগুলোর, একটা নাম উঠে এসেছে বারবার।’

কম্পিউটার স্ক্রিনে মনোযোগ দিল বাটলার। ‘নরকের সরাইখানা...নামটাও সে রকম, স্যার।’

ব্যাটমোবাইল নামের গাড়িটিতে লাফিয়ে উঠল ওটার উদ্ভাবক।

‘বুঝতে পারছি, চা খাওয়ার সময় নেই আপনার।’ বলল বাটলার মৃদু হেসে। ‘আর কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাকে?’

‘অবশ্যই, আলফ্রেড। কো-অর্ডিনেটগুলো আপলোড করো, আর সামনে থেকো কম লিংকের।’

 (চলবে)

মন্তব্য