kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

গল্প

মামার কালো ব্যাগ

মোস্তফা মামুুন

২৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মামার কালো ব্যাগ

অঙ্কন : মাসুম

মামা জানতে চাইলেন, ‘বল তোর জীবনের স্বপ্ন কী?’

বলতে লজ্জা করে। স্বপ্নের কথা শুনলে সবাই হাসাহাসি করবে।

মামা বললেন, ‘বুঝতে পারছি। খুবই খারাপ স্বপ্ন।’

তাড়াতাড়ি বললাম, ‘না। না। খারাপ কিছু না।’

‘তাহলে বলছিস না কেন?’

চুপ করে গেলাম। স্বপ্নটা খারাপ নয়, আবার সুবিধারও নয়। আমাদের বাসা খুব ভালো জায়গায় না। বিশেষ করে বড় আপু খুব ঝামেলাবাজ। শুনলে খেপাতে শুরু করবে। ওর সুবাদে পাড়ার সবাই জেনে যাবে যে আমি তলে তলে ভাবছি...। থাক।

রাজীব বিজ্ঞের মতো বলল, ‘আচ্ছা মামা, শুধু কি স্বপ্ন, নাকি সমস্যার কথাও বলা যাবে?’

মামা একটুও না ভেবে বললেন, ‘বলা যাবে। সমস্যা সব দূর হয়ে যাবে এক তুড়িতে।’ বলে মামা একটা তুড়িও মারেন।

মামা এসেছেন কাল রাতে। মায়ের কাছে গল্প শুনতে শুনতে তাঁর একটা ছবি দাঁড় করিয়েছিলাম। মায়ের সব গল্পেই মামা হচ্ছেন কীর্তিমান ছোট ভাই। স্কুলে ফার্স্ট সব সময়, কারো বিপদ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ভার্সিটিতে স্যাররা সব অয়ন বলতে অজ্ঞান। এমন সর্বগুণী মামার কাপড়চোপড় হবে কেতাদুরস্ত। রাজীব-শান্তকে সে রকমই বলে রেখেছিলাম। এমন লজ্জা পেলাম। মামার পরনে ফতুয়া। সঙ্গে স্যান্ডেল। তা-ও একটু কালি করে নিলে ভালো হতো। ধুলায় এত বিশ্রী দেখাচ্ছিল যে রাজীবরা তার পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। আমি তাকিয়ে থাকলাম আকাশের দিকে।

কথায়ও সমস্যা। শুধু প্রশ্ন করেন। প্রথমেই জানতে চাইলেন, ‘কার রোল নাম্বার কত?’

আমারটা ৮ শুনে বললেন, ‘পরীক্ষার আগের রাতে ডায়রিয়া ছিল নাকি?’

‘না। জ্বর।’

‘এ জন্যই ৮, না!’

‘হ্যাঁ।’

‘বেশ তো মিথ্যা কথা শিখেছিস।’

কথাটা মিথ্যা না। রাজীবরা সাক্ষী। আশা করেছিলাম, ওরা সেটা বলবে। বলল না। বরং নিজেদের রোল নম্বর বলাতে খুব উত্সাহী। হওয়ারই কথা। কিভাবে যেন দুজনই গত পরীক্ষায় আমার চেয়ে ভালো করেছে। রাজীব তৃতীয়। শান্তর রোল ৭।

মামা কী যেন ভেবে বললেন, ‘নাম্বারগুলো মনে রাখবি। কাজে লাগবে।’

এটা কী ধরনের কথা। নিজেদের নাম্বার মনে থাকবে না কেন? ভুলতে চাইলেও কি পারা যাবে? প্রতিদিন রোল কলের সময়ই শোনা যায়, রোল নাম্বার ৮, টোকন চৌধুরী। ৭, সাদমান শান্ত।

রোল নাম্বারের পর পরের পরীক্ষা কবে, পরীক্ষায় ভালো না করলে যে ভবিষ্যত্ অন্ধকার, সেসব জ্ঞানের কথা বলবেন বলে মনে হচ্ছিল। তা না। চলে গেলেন স্বপ্নের পথে। আমাদের স্বপ্নের কথা সাধারণত কেউ জানতে চায় না। সবাই বরং স্বপ্নের পথে বাধা তৈরিতে ব্যস্ত।

শান্ত বলল, ‘আমার স্বপ্ন নামকরা কবি হওয়া।’

মামা জানতে চাইলেন, ‘তাতে সমস্যা কী? কবি হবি। কবিতা লিখবি। সারাক্ষণ কবিতা লিখবি।’

‘লিখি তো।’

‘এখানে তো সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না।’

‘সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। এই টোকন-শান্তরাও।’

কথা ঠিক। ওর কবিতা নিয়ে আমরা হাসি। হাসির প্রথম কারণ কবিতা জিনিসটা আমাদের খুব পছন্দ না। পরীক্ষায় নম্বর পেতে কবিতা মুখস্থ করতে হয়। দ্বিতীয় ব্যাপার, আমাদের বিশ্বাস, ও আসলে কবিতা লিখছে চুপি চুপি কোনো মেয়েকে খুশি করতে। ওসব কর্মে আমরা থাকব কেন?

মামা বললেন, ‘ঠিক আছে। তোর সমস্যার সমাধান করছি।’

‘সমাধান আছে আপনার কাছে?’ শান্তর এমন আনন্দ হয়।

‘আমার কাছে নেই, তবে আমার এই ব্যাগে আছে।’

ও, হ্যাঁ। মামার সঙ্গে একটা কালো চামড়ার ব্যাগ আছে। সত্যি বললে, মামাকে অনাকর্ষণীয় দেখানোর পেছনে সেটাও একটা কারণ। পুরনো আমলের একটা ব্যাগ বুকে চেপে ধরে থাকা এই যুগের কোনো তরুণকে মানায় না। মামা বাসায় ঢোকার সময় এমনভাবে ব্যাগটা ধরেছিলেন, যেন কেউ কেড়ে নিয়ে যাবে। আর সেই ব্যাগে নাকি আমাদের সব সমস্যার সমাধান আছে। যত্তসব।

কিন্তু সম্ভাবনা দেখে মামার পক্ষে চলে যাচ্ছে শান্ত। কবি হওয়ার জন্য সে যেকোনো কিছু করতে রাজি। রাজীব এখনো ঠিক ভরসা পাচ্ছে না। তবু যদি শান্তর কবি হওয়ার স্বপ্নপূরণ হয়ে যায় ওই কালো ব্যাগ দিয়ে, তাহলে সে-ই বা বসে থাকে কেন?

সে তার স্বপ্ন পেশ করে, ‘আমার ইচ্ছা গায়ক হওয়া। এন্ড্রুু কিশোরের মতো বড় গায়ক—আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান—এ রকম গান গেয়ে ফাটিয়ে দিতে চাই।’

‘হবে। আমার ম্যাজিক ব্যাগে সফল গায়ক হওয়ারও উপায় আছে।’

‘তাহলে তো দারুণ ব্যাপার!’ গদগদ হয়ে রাজীবও ব্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে শুরু করে।

দুজন একদিকে চলে যাচ্ছে। আমাদের নিয়ম হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠকে অনুসরণ করা।

আমি লজ্জা ভুলে বললাম, ‘মামা, আমার স্বপ্নটা একটু অন্য রকম।’

‘কী রকম?’

‘আমার খুব ইচ্ছা, আমাদের উল্টাদিকে যে বস্তি, ওখানকার ছেলেদের একদিন হোটেলে নিয়ে গিয়ে পোলাও-মাংস খাওয়াই।’

‘খাওয়াবি।’

আমি হতাশ। তাঁর উচিত ছিল বলা, তুই তো মারাত্মক মানবিক, তোকে ভাগ্নে ভাবতেই আনন্দ হচ্ছে, অথচ মামার নীরস বক্তব্য, ‘খাওয়াবি’। যেন বিড়ালকে এঁটো-কাঁটা খাওয়ানোর কথা বলছি।

মামা তাঁর তথাকথিত ম্যাজিক ব্যাগের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এখানে এই স্বপ্নপূরণের বটিকাও আছে।’

বিগলিত হলাম না। একটু হাসলাম।

পরদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি, মামা নেই। মা বললেন, ‘অনেক কষ্টে এক দিনের সময় বের করে এসেছিল। বোনের জন্য টান বলে কথা। ওর পড়াশোনার যা চাপ, বাথরুমে যাওয়ারও সময় নেই।’

কিছু একটা বলতে গিয়েও আটকালাম। মায়ের অতি আদরের ভাই। বড় ভালোবাসেন। কী দরকার তাঁর মন খারাপ করার।

যা-ই হোক, অল্পতেই বিদায় হয়েছেন জেনে ভালো লাগল। দু-একদিন থাকলে যে আরো কত গুল মারতেন।

স্কুলব্যাগটা রাখতে গিয়ে খেয়াল করি, পড়ার টেবিলে কালো কী যেন। আরে মামার ব্যাগই তো!

মা দেখে বললেন, ‘মাথায় পড়াশোনা, মানুষের জন্য কাজ করা। এসব ভাবতে ভাবতে নিজের জিনিসের কথাই ভুলে যায়। থাক, পরেরবার যখন আমরা ঢাকায় যাব, তখন নিয়ে যাব।’

রাতের বেলা পড়া শেষে হঠাত্ মনে হলো—আচ্ছা, মামা তো বলেছিল এই ব্যাগের ভেতরে আমাদের স্বপ্নপূরণের উপায় আছে। ব্যাগটাও ফেলে গেছেন! কোনো ব্যাপার নেই তো এর মধ্যে।

আচ্ছা, ব্যাগটা খুলেই দেখি না।

খুলতে গিয়ে দেখলাম, কাজটা সহজ নয়। লক করা। নাম্বার সিস্টেমে। নাম্বারগুলো মিলিয়ে লক করতে হয়, আবার সেগুলো মেলালে লক খোলে। চেষ্টা-চরিত করলাম নানাভাবে। হয় না।

পরদিন সকালে রাজীব আর শান্তও হাজির। আমার চেয়ে ওদের বিশ্বাস আরো বেশি। ওরা নিশ্চিত, একটা ম্যাজিক আছে। মামা ইচ্ছা করেই ব্যাগটা ফেলে গেছেন। এখন ওটা খুলতে পারলেই কবি আর গায়ক হওয়া নিশ্চিত।

অনেক চেষ্টা করল ওরাও। রাজীব তো শেষে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, ছুরি দিয়ে ব্যাগটা কেটে...। হয়তো তা-ই করতাম। কিন্তু ব্যাগ কাটার মতো ধারালো ছুরি ওই মুহূর্তে হাতের কাছে না থাকায় হলো না।

আমি বললাম, ‘বাদ দিই। খুলছে না যখন...’

রাজীব বলে, ‘বাদ দেব মানে! আমি গায়ক হব না!’

শান্ত বলে, ‘আমাকে হতে হবে এ যুগের রবীন্দ্রনাথ।’

গালে হাত দিয়ে তিনজন তিন দিকে বসে ভাবছি। হঠাত্ মনে পড়ে, মামা বলেছিল আমাদের রোল নাম্বারগুলো মনে রাখতে। চমকের মতো মাথা কাজ করে, তাহলে কি তিনটি নম্বর মেলালে...৩-৭-৮।

তিনজন সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ৩৭৮-এ হলো না।

রাজীব বলল, ‘তোর মামা তো তোর নম্বরটাই আগে বসাবেন।’

আট দিয়ে শুরু হলো। তাতেও হলো না। কয়েকবারের চেষ্টায় হলো শেষ পর্যন্ত। ৭৮৩ কম্বিনেশনে ব্যাগটা খুলল।

কিন্তু ব্যাগ খালি। খাঁ খাঁ করছে।

রোল নাম্বারের বুদ্ধি বেরোনোয় যে তৃপ্তি হয়েছিল, সেটা চলে গিয়ে এখন আবার বিরক্তি।

রাজীব বলে, ‘একটা ব্যাপার আছে রে। আমাদের রোল নাম্বারকে পাসওয়ার্ড বানিয়ে গেছেন। আছে, কিছু আছে!’

ওরা দুজন খালি ব্যাগরহস্য খুঁজতে থাকে। আমি ওদের বোকামিতে বিস্মিত হই। কবি আর গায়ক হলে মানুষ আধপাগলা হয় জানতাম; কিন্তু এরা তো দেখছি পুরো পাগল।

হঠাত্ ‘ইউরেকা’ বলে শান্ত এমন চিত্কার করল, যেন সে সাক্ষাত্ আর্কিমিডিস। পাওয়া গেছে একটা পুরনো কাগজ। তাতেই এমন চিত্কার। 

রাজীব বলে, ‘এর মধ্যেই মন্ত্র লেখা আছে নিশ্চিত।’

মন্ত্রটা অবশ্য এমন কিছু হাতি-ঘোড়া নয়। ‘ব্যাগটা খুলতে পেরেছিস নিজেদের ঐক্য দিয়ে। তাই না! মিলেমিশে চললে সব স্বপ্ন পূরণ হয়।’

আমি একটু ব্যঙ্গ করে বললাম, ‘আমরা তো মিলেমিশে চলি, তাতে কি তুই কবি হয়ে গেছিস? তুই গায়ক!’ রাজীব বলে, ‘আমরা তো মিলেমিশে চলেছি; কিন্তু এর শক্তি বুঝতে পারিনি। শক্তিটাই মামা বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন।’

‘কী রকম?’

‘ধর, এখন থেকে শান্তর কবিতা নিয়ে হাসাহাসি করব না। শুনব। পরামর্শ দেব। উত্সাহ দেব।’

কৌতুকের স্বরে বললাম, ‘আর তোর গানে তাল দিতে হবে। বলতে হবে খুব ভালো হয়েছে!’

‘তোরা না বললেও আমার হবে। তবু যদি বলিস, তাহলে মন্দ হয় না। তোরা শ্রোতা হিসেবে সামনে থাকলি। আমাকে তো অনেক শ্রোতার সামনে গাইতে হবে। প্র্যাকটিস হবে।’

হাসতে হাসতে বললাম, ‘তোদেরটা না হয় হলো। কিন্তু আমারটা...ওটা তো আর নিজেরা বসে প্র্যাকটিস করলে হবে না।’

রাজীব আমার চেয়েও বেশি হাসে। ‘আরে বোকা, তোরটা তো আরো সহজ।’

‘কী রকম?’

‘সামনে ঈদ। আমরা তিনজন যে সালামি পাব, সেগুলো একত্র করি। বস্তিতে ১০টা ছেলে-মেয়ে, ওদের পোলাও-কোর্মা খাওয়ানো খুব সম্ভব।’

তাই তো! তাই তো!

নিমেষে মামার পোশাকগত, আচরণগত যাবতীয় দোষ ঢেকে গেল। স্বার্থপরের মতো একটু গর্বও হয়। এই মানুষটা রাজীব বা শান্তর নয়। আমার মামা!

মন্তব্য