kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

মগজে ঝড় ও অন্যান্য...

বিজ্ঞানের দস্যিপনার শেষ নেই। গবেষণাগারে তৈরি হচ্ছে স্বচ্ছ অঙ্গ, বশ মানছে স্থূলতা, এমনকি মৃত প্রাণীর মগজ কিছুটা সময় বাঁচিয়ে রাখার মতো ডানপিটে কাজও করে দেখালেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানের জগতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া চমত্কার কিছু আবিষ্কারের কথা জানাচ্ছেন কাজী ফারহান পূর্ব

২৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মগজে ঝড় ও অন্যান্য...

গবেষণাগারে স্বচ্ছ করা অঙ্গ

স্বচ্ছ অঙ্গ

গত এপ্রিলের ঘটনা। জার্মানির মিউনিখের লুডউইগ ম্যাক্সিমিলান্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রোক অ্যান্ড ডিমেনশিয়া রিসার্চের দলনেতা ড. আলী আরতুর্ক ও তাঁর দল যুগান্তকারী এক গবেষণা করেছেন। প্রাণীর শরীরের একটি অঙ্গের ওপরের স্তরে এক ধরনের জৈব দ্রাবক বসাতেই ঘটেছে অদ্ভুত ঘটনা। স্বচ্ছ হয়ে আসতে থাকে অঙ্গটি টিস্যুর কোনো ক্ষতি না করেই। চর্বি ও রঞ্জক পদার্থগুলো বেমালুন গায়েব হতেই অঙ্গটি হয়ে যায় স্বচ্ছ! ভেতরের সব পরিষ্কার ফুটে ওঠে। কোন অংশে কী আছে, কিভাবে রক্তনালি দিয়ে রক্ত যাচ্ছে—সব পরিষ্কার।

রয়টার্সের খবরে আরো জানা গেল, স্বচ্ছ অঙ্গটির রক্তনালির নেটওয়ার্কসহ কোষগুলোও ঠিকঠাক দেখা সম্ভব।

এরপর লেজার স্ক্যানার ব্যবহার করে অঙ্গটির আরো নিখুঁত চিত্র তৈরি করা যাবে। যেটাকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করে থ্রিডি প্রিন্টারে চাইলে হুবহু কৃত্রিম অঙ্গও বানানো যাবে।

ড. আলী আরতুর্ক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ‘এত দিন থ্রিডি প্রিন্টারে তৈরি অঙ্গগুলো পুরোপুরি নিখুঁত হতো না। কারণ সেগুলো কম্পিউটার টোমোগ্রাফি বা এমআরআই মেশিনে পাওয়া ছবির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হতো। এখন আমরা চাইলে প্রতিটি কোষ দেখে অবিকল অঙ্গ তৈরি করতে পারব। আমি বিশ্বাস করি, আমরা এখন নিখুঁত কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির দ্বারপ্রান্তে।’

অন্যদিকে ব্রিটিশ গণমাধ্যম টেলিগ্রাফ থেকে জানা যায়, ড. আরতুর্কের দলটি দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে বায়োপ্রিন্টেড কৃত্রিম অগ্ন্যাশয় এবং পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে কৃত্রিম কিডনি তৈরি করতে চায়। আরেকটা কথা, এ বিজ্ঞানীরাই কিন্তু বিশেষ দ্রাবক ব্যবহার করে একটা ইঁদুরকে আগাগোড়া স্বচ্ছ করে ফেলেছেন! মানে তোমার অদৃশ্য হওয়ার স্বপ্নটাও বুঝি পূরণ হতে চলল!

স্থূলতা আটকানোর জিন

স্থূলতা নিয়ে সবারই মাথাব্যথা। এটি যেমন আমাদের মোটকু বানিয়ে ছাড়ে, অন্যদিকে বয়ে আনে একগাদা স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেক ক্ষেত্রে এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যায়। বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন,  একটি জিন আছে, যা আমাদের স্থূলতা থেকে সুপারহিরোর মতো রক্ষা করে। কিন্তু এর আসল পরিচয় জানা যাচ্ছিল না। নাছোড়বান্দা বিজ্ঞানীরা গত মাসেই সুপারহিরো জিনটির মুখোশ খুলেছেন। টেলিগ্রাফের খবরে জানা গেল, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ইউকে বায়োব্যাংকের প্রায় পাঁচ লাখ স্বেচ্ছাসেবীর জিনেটিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা দেখেন যে প্রায় ছয় শতাংশ ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকের জিনের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তাঁদেরকে কোনোভাবেই মুটিয়ে যেতে দেয়নি। এমসি৪আর নামের জিনটি মস্তিষ্কের মেলানোকরটিন-৪ নামের একটি উপাদানকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে। যাদের এই এমসি৪আর জিনে গোলমাল দেখা দেয়, তাদের ওজন বেড়ে যায় সহজেই। জিনটি ঠিকঠাক থাকলে মানুষ খুব বেশি খায় না, মোটাও হয় না। গবেষকরা আরো দেখলেন, জিনটি ঠিক থাকলে স্থূলতাসহ টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হূদরোগের আশঙ্কাও কম থাকে। তবে সব দোষ কিন্তু একেবারে জিনের ওপর চাপিয়ে দিলেই হবে না! গবেষক দলের সদস্য অধ্যাপক সাদাফ ফারুকি জানালেন, ‘এর মানে এই নয় যে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করে আমরা ওজন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারব না! তবে গবেষণা থেকে এটা পরিষ্কার যে কিছু মানুষের মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এমনিতেই বেশি থাকে।’ আপাতত গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন ওষুধ তৈরির কথা ভাবছেন। হয়তো অচিরেই শুনবে, ইচ্ছামতো কাচ্চি খেতে চাইলে আগে এই ওষুধটা খেয়ে নিন!

রুয়ুগু গ্রহাণুতে অভিযান

পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশে গ্রহাণুর কোনো ভূমিকা আছে কি না সেটা জানতে অনেক খাটছেন বিজ্ঞানীরা। এবার সেই পরীক্ষায় এগিয়ে গেল জাপান। দেশটির বিজ্ঞানীরা এবার নজর দিয়েছেন পৃথিবী থেকে প্রায় ১৯ কোটি মাইল দূরের গ্রহাণু রুয়ুগুর দিকে। একটা দুঃসাহসিক কাজও করে ফেলেছেন তাঁরা। দ্য গার্ডিয়ান থেকে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে একটি জাপানিজ স্পেস ক্রাফটের মাধ্যমে রুয়ুগুর পৃষ্ঠে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। সেখান থেকে বিভিন্ন ধাতু ও রাসায়নিক দ্রব্য সংগ্রহ করা হবে। জাপান এয়াসোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জাক্সা) থেকে জানা যায়, হায়াবুসা-২ নামের স্পেসক্রাফট থেকে ‘স্মল ক্যারি অন ইম্প্যাক্ট’ নামের একটি কোনাকৃতির যন্ত্র গ্রহাণুতে পাঠিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিস্ফোরণের পর ধুলার ওড়াউড়ি কমলে হায়াবুসা-২ সেখানে আবার পর্যবেক্ষণের জন্য যাবে এবং বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করবে। গার্ডিয়ান আরো জানাল, গ্রহাণুটিতে ৪৬০ কোটি বছরের পুরনো জৈব পদার্থ এবং পানি পাওয়া যেতে পারে। যা কিনা আমাদের সৌরজগতের জন্মেরও আগের! মিশন শুরু হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। ২০২০ সালের নভেম্বরে গ্রহাণুর নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে আসার কথা রয়েছে হায়াবুসা-২-এর। এর আগে ২০০৫ সালে নাসা একটি ধূমকেতুতে বিস্ফোরণ ঘটালেও সেখান থেকে কোনো নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি।

 

মগজে ঝড়

বৃদ্ধ বয়সের বড় সমস্যা স্মৃতিলোপ। লক্ষ করবে, তোমার নানু-দাদুদের অনেকেই কিন্তু টুকটাক তথ্য মনে রাখতে পারছেন না। মস্তিষ্কের স্নায়ু ঠিকমতো কাজ না করলেই দেখা দেয় স্মৃতিভ্রংশ। অন্যান্য কোষের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মারা যায় অনেক স্মৃতিকোষও। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পঁয়ষট্টি বা এর ওপরের প্রায় চল্লিশ শতাংশ মানুষের বয়সজনিত স্মৃতিলোপের সমস্যা রয়েছে। এখানেও বিজ্ঞানীরা তাঁদের ভেলকি নিয়ে হাজির! ২০১৯ সালের এপ্রিলের নেচার নিউরোসায়েন্সে প্রকাশ হয় যুগান্তকারী এক গবেষণা। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজিক্যাল অ্যান্ড ব্রেন সায়েন্সেসের রব রেইনহার্ট এবং ডক্টরাল রিসার্চার জন এনগুয়েন দাবি করছেন, ইলেকট্রোস্টিমুলেশনের মাধ্যমে তাঁরা নাকি সত্তর বছর বয়সীর মস্তিষ্ককে বিশ বছর বয়সী মস্তিষ্কের মতো কার্যকরী করে তুলতে পারবেন! তাঁরা ব্যাপারটা পরীক্ষার মাধ্যমেও দেখিয়েছেন। মৃদু বিদ্যুত্ প্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কের যেসব জায়গায় সমস্যা দেখা যাচ্ছে, আবারও সেগুলোর কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন তাঁরা। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, গবেষণার সময় তাঁরা ২০ বছর বয়সী এবং ৬০-৭০ বছর বয়সীদের কিছু কাজ দেন। তাঁদেরকে প্রথমে একটা ছবি দেখিয়ে কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আরেকটা ছবি দেখানো হয় এবং বলা হয়, দ্বিতীয় ছবিটি প্রথমটা থেকে আলাদা কি না। এ ক্ষেত্রে তরুণরা অনেক বেশি পারদর্শিতা দেখিয়েছে। এরপর বয়স্কদের মাথায় তড়িত্দ্বারের (ইলেকট্রোড) মাধ্যমে পঁচিশ মিনিট মৃদু বিদ্যুত্প্রবাহ চালানো হয়। এরপর আবার একই কাজ করতে দেওয়া হয়। দেখা গেল, এবার দুপক্ষই সমান পারদর্শিতা দেখাল! এ চিকিত্সা শুধু যে স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্তদের জন্য প্রযোজ্য তা নয়। রেইনহার্ট বলেন, এর মাধ্যমে যারা চিন্তা করার দক্ষতায় পিছিয়ে আছে, তারাও সাহায্য পেতে পারে।

 

দেহ মৃত, মগজ সচল

ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য শোনাতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের একদল নিউরোসায়েন্টিস্ট কিন্তু এমনটাই করে দেখিয়েছেন। নেচার জার্নাল থেকে জানা যায়, কয়েক ঘণ্টা ধরে মৃত অবস্থায় থাকা শূকরের মস্তিষ্কের কয়েকটি অংশকে ব্রেনএক্স নামের একটি কৃত্রিম রক্তসঞ্চালন পদ্ধতির মাধ্যমে সজীব করা সম্ভব হয়েছে। সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীরা মারা যাওয়ার ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে অক্সিজেনের অভাবে তাদের মস্তিষ্কও ‘মারা যায়’। এ ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ হারায় ও এর ঝিল্লিগুলোও নষ্ট হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এমনটা ঘটবেই, কিছুতেই ঠেকানো যাবে না। কিন্তু এপ্রিলের শেষের দিকে করা ওই গবেষণার মাধ্যমে নিউরোসায়েন্টিস্ট নেনাদ সেস্টানের নেতৃত্বাধীন দলটি তা মিথ্যা প্রমাণ করল। প্রথমে তাঁরা ৩২টি শূকরের মস্তিষ্ক সংগ্রহ করেন। শরীর থেকে মস্তিষ্ক আলাদা হওয়ার চার ঘণ্টা পর সেগুলোকে তাঁরা ব্রেনএক্সের সঙ্গে যুক্ত করে অক্সিজেন, পুষ্টিকর তরল এবং আরো কয়েকটি রাসায়নিক মিশ্রণ সঞ্চালন করেন। প্রায় দশ ঘণ্টা পর দেখা যায়, মৃত শূকরগুলোর মস্তিষ্কের টিস্যুগুলো সচল হয়েছে এবং কোষগুলোও ‘জীবিত’ হয়েছে—অর্থাত্ অক্সিজেন গ্রহণ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করতে পারছে। তবে এটা বলে রাখা ভালো যে মস্তিষ্কের মধ্যে কিন্তু কোনো চেতনা ছিল না। কারণ নিউরনগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল না। তার পরও এটা যুগান্তকারী আবিষ্কার। কারণ গবেষকরা মনে করছেন, এর ফলে মস্তিষ্ক কিভাবে কাজ করে ও এটাকে কী করে সংরক্ষণ করা যায়, সে-সংক্রান্ত গবেষণার দরজা খুলে গেল।

গ্রাফিকস : সমরেন্দ্র সুর বাপী ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

য়ুগু গ্রহাণু

মন্তব্য