kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

ফোকাস

স্মৃতির ঝাঁপিতে তুরস্ক

এ বছরের এপ্রিলে ‘টার্কিশ রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন ৪১তম ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস ফেস্টিভাল ২০১৯’-এ অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশের ১৬ কিশোর-কিশোরী। দলে ছিল ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের অষ্টম শ্রেণির জাওয়াদ মুহাম্মদ নাহিন। আফরা নাওমীর কাছে তুরস্ক ভ্রমণের স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরেছে ও

২৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



স্মৃতির ঝাঁপিতে তুরস্ক

১৬ কিশোর-কিশোরী। সঙ্গে আনজীর লিটন, নারগিস সুলতানা ও তুরস্কে বসবাসরত এক বাংলাদেশি উপস্থাপক (একেবারে ডানে, পেছনে)

‘১২ এপ্রিল ২০১৯। সন্ধ্যা ৭টায় আমার মা, নানাভাই, নানুপা আমার জন্য দোয়া পড়ছেন, বুকে ফুঁ দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিচ্ছেন। মা-বাবাও ঘোলা চোখে দাঁড়িয়ে। কপালে চুমু খেলেন দুজন। ছোট ভাই সাফিনের চোখেও পানি। একদিকে আমার স্বপ্নযাত্রা, অন্যদিকে আমার অনুপস্থিতি। মিশ্র অনুভূতি সবার। আর সেই অনুভূতিটাকে সঙ্গী করে শুরু হলো আমার তুরস্ক যাত্রা।’

নাহিনের গল্পের বাকিটা শোনার আগে জানিয়ে রাখি, টার্কিশ রেডিও এবং টেলিভিশন করপোরেশন প্রতিবছরের ২৩ এপ্রিল তুরস্কে এ উত্সবের আয়োজন করে। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছেলে-মেয়েদের এক মঞ্চে একত্র করে ‘ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এবং শান্তি’ রক্ষার বাণী ছড়িয়ে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। এ বছর শিশু উত্সবের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে নাহিনের অভিভাবকদের। প্রথমে নিবন্ধন করে তারপর আবেদন করলেন। তিন হাজার আবেদনকারী থেকে প্রাথমিকভাবে ৭০ জনকে বাছাই করা হয়। পরে বাংলা একাডেমিতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সামনে তারা তাদের প্রতিভা প্রদর্শন করে। চূড়ান্তভাবে বাছাই করা হয় ১৬ জনকে। বাংলা একাডেমিতে রিহার্সাল চলে অনেক দিন। এরপর ১২ এপ্রিল শুরু হয় তুরস্কযাত্রা। বাছাইকৃত ১৬ জনের মধ্যে নাহিন হয়েছিল দ্বিতীয়। প্রথম হয়েছিল কুষ্টিয়ার অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া সেঁজুতি। বাকিরা হলো—নুহা (ঢাকা), ফারমিনা (পাবনা), পিউ (হবিগঞ্জ), স্বস্তিকা (সিরাজগঞ্জ), মেধা (লালমনিরহাট), আফরিন (নারায়ণগঞ্জ), রুপন্তি (রাজশাহী), রবিন (সিলেট), সাফা (ঢাকা), আরমান (রংপুর), অরুণিমা (লালমনিরহাট), শানিন (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ও বিভা (শরীয়তপুর)।

“এয়ারপোর্টের প্রক্রিয়া শেষ করে ভোর ৪টায় আমরা রওনা হই। আমরা ১৬ জন, সঙ্গে ছিলেন বাংলা একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটন স্যার, জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা নারগিস সুলতানা ম্যাডাম এবং শিশু একাডেমির নাচের প্রশিক্ষক লিমন স্যারও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন।

কেউ ছোট কেউ বড়। কিন্তু এখন আমরা সবাই বন্ধু। সবারই মনে ভয়, উত্তেজনা আর পরিবারকে ফেলে আসার কষ্ট। তবু গল্প করতে করতে হাসিমুখেই ভোর ৬টায় আমরা পৌঁছে গেলাম ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে। সেখান থেকে বের হয়েই বাসে উঠে পড়ি। শুরু হলো ইস্তাম্বুল দর্শন।

দেশে যতই গরম পড়ুক, এখানে প্রচুর শীত। জ্যাকেট পরে নিলাম। উপভোগ করতে লাগলাম পাহাড়ঘেরা প্রকৃতি। দুই পাশে সবুজ পাহাড়, মাঝে আমাদের গাড়ি। দ্রুত একটার পর একটা পাহাড় পেছনে ফেলে এগোতে থাকলাম। পাহাড়ের ওপর ছোট ছোট টালি দিয়ে মোড়ানো চমত্কার সব দোতলা বাড়ি। মনোযোগী হলাম ইস্তাম্বুলকে হূদয়ে অবগাহন করিয়ে নিতে। একসময় পৌঁছে গেলাম প্রাথমিক গন্তব্যে। প্রথমে যে হোটেলে থামলাম, সেখানে মেয়েরা থাকবে। আমরা জনাকয়েক ছেলে পরিচালক স্যারের সঙ্গে রওনা হলাম পাশের আরেকটি হোটেলের দিকে।

হোটেলে পৌঁছেই হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসলাম। ক্ষুধায় কাহিল। হাজির হলো ভাত, মাংস আর ডাল। আর কী লাগে বাঙালির? পেট পুরে খেয়ে নিজের রুমে গেলাম জিরিয়ে নিতে। জানালার পাশে বিছানা। তুরস্কের শান্ত প্রকৃতি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

এর মধ্যে একটা মজার ঘটনা ঘটল, আমার বন্ধু সাফা নামাজ পড়বে, কিন্তু কাবা কোন দিকে বুঝতে পারছিল না। একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই সে আরেকজনকে ডাক দিল। পরেরজন আবার ম্যাপ বের করে একবার এদিক দেখায়, আরেকবার ওদিক। এরপর বলে কিনা একটু কোনাকুনি করে পড়ে নিতে হবে।

১৪ এপ্রিল। আমাদের প্রাণের উত্সব পহেলা বৈশাখ। তুরস্কেও বাংলাদেশ কনস্যুলেটের উদ্যোগে স্থানীয় মিমার সিনাল ফাইন আর্টস বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশাখ পালনের আয়োজন করা হয়। সেখানে আমাদের দলটা এসো হে বৈশাখ এসো এসো গেয়েছে, আমরা নেচেছিও।

পরদিন অপেক্ষা করছিল সারপ্রাইজ। স্যামসান শহরে স্যামসান কলেজে আমাদের একেকজনের নাম হাতে একেকটি হোস্ট ফ্যামিলি দাঁড়িয়ে ছিল। আগামী এক সপ্তাহ, আমরা ১৬ জন ১৬টি তুরস্ক পরিবারের সঙ্গে কাটাব। তুরস্কের একটি পরিবারের সঙ্গে মিশে সংস্কৃতির বিনিময় করব, এটাই উদ্দেশ্য।

আমার জন্য যে হোস্ট ফ্যামিলি নিযুক্ত ছিল, সেই পরিবার যথাসময়ে হাজির হোটেলে। বাবা, মা, বড় ছেলে ইফে এবং ছোট্ট এলাকে নিয়ে এ পরিবার। তাদের সঙ্গে পরিচিত হতে হতেই পৌঁছে গেলাম তাদের বাসায়। পাহাড়ের একেবারে চূড়ায়।

এ যেন আরেক স্বপ্নপুরী। ইফের মা-বাবাকে আমি মা-বাবা বলেই সম্বোধন করলাম। এতে তারা দারুণ খুশি। ইফে আমার চেয়ে এক ক্লাস জুনিয়র হলেও আমাদের বন্ধুত্ব হতে সময় লাগল না। দিন-রাত গল্প করেছি ওর সঙ্গে। ওর স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গেও আমার বন্ধুত্ব হলো। ইফের দাদু-নানুর বাড়িতেও যাই। তারাও যেন আমার নানু-দাদুর মতোই আদর করলেন। ভাষার ব্যবধান ছাড়া আর কোনো পার্থক্যই ছিল না আমাদের। আর পুরো পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগে ইফেই ছিল আমার একমাত্র অবলম্বন, কারণ একমাত্র ও-ই ইংরেজি ভালো জানত।

আমার আবার ভুলে যাওয়ার বাতিক। যেদিন টেড স্যামসন কলেজের শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার কথা, সেই শোভাযাত্রায় পোশাকটি মনের ভুলে হোস্ট পরিবারের বাসায় ফেলে আসি। খুব নার্ভাস লাগছিল। আমার টার্কিশ বাবা আমার জন্য ফের বাসায় গিয়ে নিয়ে এলেন পোশাকটি। বিন্দুমাত্র বিরক্ত হননি তিনি। বাবারা এমনই হয়? পরে অনুষ্ঠানে পোশাকটা তো পরেছিই, সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকাও গায়ে জড়িয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিলাম।

ইফের পরিবারের সঙ্গে একদিন সাগরপারের একটি রেস্টুরেন্টে খেতে যাই। ওদের সৈকত আর সমুদ্র ঘিরে যে যোগাযোগব্যবস্থা, সেটা এককথায় চোখ ধাঁধানো। বিশেষ করে একটা সেতু ছিল, ওটা আবার এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের যোগাযোগ ঘটিয়েছে। বিশাল সব পিলার পিলে চমকে দেওয়ার মতো। এ ছাড়া সমুদ্রের চারপাশে ছোটখাটো জাহাজে করে পর্যটক আনা-নেওয়ার ব্যবস্থাও দেখলাম। দেখলাম একরাশ সামুদ্রিক পাখি। পাখিগুলো মানুষকে একটুও ভয় পায় না। সবাই ওদের খাবার দিচ্ছিল।

তুরস্কের শুদ্ধ বাতাস নিতে আসি এখানকার একটি রেইন ফরেস্টে। ঘন এ জঙ্গলে বেশির ভাগ সময়ই বৃষ্টি হয়। জঙ্গলের মধ্যেই এক অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে একটা ভিডিও দেখিয়ে আমাদের কাছে এর অর্থ জানতে চাওয়া হয়। ভিডিওটি এমন ছিল—একটি দাঁড়িপাল্লায় একপাশে একটি মানুষ তীর হাতে দাঁড়িয়ে, অন্য পাল্লায় একটি নেকড়ে। মানুষটি নেকড়েটিকে তীর ছুড়ে মেরে ফেলে নিজেও পড়ে গেল। আমাদের প্রশ্ন করলে আমি উত্তর দেওয়ার জন্য হাত তুলি। বলি, ভিডিওটির মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য বোঝানো হচ্ছে। অর্থাত্ প্রকৃতির ক্ষতি করলে সমান ক্ষতি মানুষেরও হবে। উত্তরটি সঠিক ছিল। সবাই তালি দিয়ে আমাকে সাধুবাদ জানাল। আমার মনে হলো, যেন আমি তুরস্ক জয় করলাম।

হোস্ট ফ্যামিলির কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটা বেশ কষ্টের ছিল। স্যামসন শহর ছেড়ে যাব। ব্যাগ গোছানোর কাজে মায়ের মতোই সাহায্য করলেন টার্কিশ মা অ্যানি। ছোট বোন এলা আমাকে তার আঁকা একটি ছবিও উপহার দিল। আমি যে একটি হোস্ট পরিবারের সঙ্গে থাকব, এটা আগেই জানানো হয়েছিল। তাই আমার মা-ও একটি নকশিকাঁথা আর তার হাতে আঁকা একটি জলরং ছবি আমাকে দিয়েছিলেন উপহার হিসেকে দেওয়ার জন্য। এটা পেয়ে ইফের পরিবার বেশ খুশি।

সবাই আমাকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিল। শেষ মুহূর্তে কেউই চোখে পানি ধরে রাখতে পারিনি। বেশ খানিকটা দূরে আসার পরও দেখি, ইফে আবার দৌড়ে এলো বিদায় জানাতে। এই সাতটি দিন আমার জীবনে বিশেষ সাতটি দিন হয়েই থাকবে। যাদের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না, ভাষায়-চেহারায় নেই মিল, অথচ সাত দিনে আমি তাদের পরিবারের একজন হয়ে গেলাম।

এরপর বাসে করে কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছে যাই রাজধানী আংকারায়। পাঁচতারকা হোটেল আনাদুলুতে এসেও আমার একা একা লাগছিল। বাসার সবার কথা মনে পড়ছিল। আর হোস্ট ফ্যামিলির জন্যও মন খারাপ ছিল খুব।

অবশ্য, আমাদের মধ্যে সেঁজুতির একটু বেশিই মন খারাপ ছিল। তার সঙ্গে হোস্ট পরিবারের ওই মায়ের খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য ছোট্ট মেধাকে মনে হলো হাঁফ ছেড়েই বেঁচেছে। কারণ বেচারি প্রথম দিন থেকেই নিজের পরিবারের জন্য কান্নাকাটি করেছে খুব। তার ওপর আবার বয়স কম হওয়ায় হোস্ট পরিবারে গিয়ে ইংরেজিতে কথাই বলতে পারছিল না। মেধা কী খাবে সেটা বুঝতে ওই পরিবারকে ফোন দিতে হয়েছিল আনজীর লিটন স্যারকে।

আংকারায় প্রথমে ওয়ান্ডারল্যান্ড, তারপর তুরস্কের জাতির পিতা কামাল আতাতুর্কের সমাধি ও শেষে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বাসভবনও ঘুরে দেখেছি আমরা। এরপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রেসিডেন্ট ভবনের একটি অডিটরিয়ামে হবে গালা শো। প্রধান অতিথি স্বয়ং প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। তিনি আসার পরই শুরু হলো অনুষ্ঠান। প্রতি দেশের জন্য দুই মিনিট বরাদ্দ।

উপস্থাপক যখন ‘বাংলাদেশ’ বলল, তখন বাকিদের মতো আমার মধ্যেও বিশাল এক দায়িত্ববোধ ভর করল। বাংলাদেশে অডিশন রাউন্ডে বিচারক অপি করিমের কথা মনে পড়ল। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা যারা আজ সিলেক্ট হলে, তাদের ওপর এখন গুরুদায়িত্ব। তুরস্কের মঞ্চে কেউ তোমার নাম ধরে ডাকবে না, ডাকবে বাংলাদেশ। অর্থাত্ তোমাকে চিনবে বাংলাদেশ নামে। পতাকার সম্মান তোমাদেরই হাতে।’ আমরা সবাই দৌড়ে মঞ্চে উঠে প্রাণপণ চেষ্টা করলাম সেরাটা দিতে। তুমুল হাততালি পেয়ে মনে হলো, বিরাট একটা কাজ করেছি।

দেশে ফিরে বেশ কিছুদিন তুরস্কের স্মৃতিতেই ডুবে ছিলাম। একদিকে যেমন তুরস্কে বন্ধু বানিয়েছি, তেমনি অংশগ্রহণকারীরাও হয়ে গিয়েছিল একেবারে নিকটাত্মীয়ের মতো। সবার সঙ্গেই এখন নিয়মিত যোগাযোগ আছে আমার।”

তুরস্কের সৈকতে ইফে ও নাহিন

মন্তব্য