kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রহস্যজট

হরিপদের ছোরা

ধ্রুব নীল

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হরিপদের ছোরা

মুরুকপুরের মাছঘাটার পাশেই পাহাড়ঘেঁষা জঙ্গল। সেখানে তিন দিন হলো ঘাপটি মেরে পড়ে আছে ষাটোর্ধ্ব হরিপদ। এর মধ্যে আবার গতরাতে টানা অনেকক্ষণ বৃষ্টিও হয়েছে। গাছের আড়াল নিয়েও সারা রাত ভিজতে হয়েছিল হরিপদকে। ঠাণ্ডাটা যেন জমে গেছে বুকে।

পাহাড়ের পশ্চিমে সমুদ্র। পুবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গুটিকয়েক গ্রাম। তারপর সাগর। হরিপদের কুঁড়েঘরসহ পাশের দুটি গ্রাম বলতে গেলে পুরোটাই জ্বলে গেছে। রাজাকারদের দু-একটা বাড়ি রক্ষা পেয়েছে শুধু। বাকিরা কেউ বাঁচেনি। হরিপদ শুনেছে, সবাইকে ধরে ধরে মোরকপুর মাছঘাটার কাছে নিয়ে গুলি করে দিচ্ছে পাকি সেনারা।

হরিপদের সাতকুলে কেউ ছিল না। কুঁড়েঘরটার জন্য তাই মায়া লাগছে খুব। শুকনো চিঁড়া, একটা বাকশো আর কয়েক টুকরা গুড় নিয়ে সময়মতো পালাতে পেরেছিল মুরুকপুরের ছোটখাটো একটা স্কুলের অঙ্ক-বিজ্ঞানের শিক্ষক হরিপদ। অবশ্য শুকনো পাতা বিছানো চাদর আর মশার কামড়ে জঙ্গলে কদিন টিকবে কে জানে।

‘রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ার চাইতে এটাই ভালো।’ গতরাত থেকে এমনটাই আওড়ে যাচ্ছে হরিপদ।

বাকশোটার গায়ে হাত বুলাল। পুরনো কিছু খুঁটিনাটি জিনিসপত্রে ভর্তি। একটা নবাবি আমলের ছোরাও আছে। নিয়মিত ওটায় ধার দিয়ে রাখে হরিপদ। বাকশোটা আগলে রেখেছে অনেক দিন ধরে। তাই পালানোর সময় ওটার মায়া কাটাতে পারেনি।

‘হ্যাঁচ্ছো..।’ গতরাতে ভেজার মূল্য দিতে হচ্ছে। হাঁচি দিতেই কান সজাগ। কেউ একজন আছে আশপাশে।

‘এই সাঁঝবেলায় আবার কে এলো জঙ্গলে!’

বিড়বিড় করে কথাটা একটু জোরেই বলে ফেলেছে হরিপদ। অথবা তার হাঁচির শব্দটাই হয়তো শুনেছে আগন্তুক।

‘কে কথা কয়! জঙ্গলে কে রে?’

ঝিম মেরে বসে আছে হরিপদ। পরিচিত নয় গলাটা। তবে লোকটা বৃদ্ধ। পায়ের শব্দ আসছে বাঁ দিক থেকেই।

‘আরে মাস্টারসাব দেখি! কী আজব! পুরা গেরাম খুঁইজা আপনার দেখা পাইলাম না।’

ধরা পড়ে গেছে হরিপদ। তবে লাঠিতে ভর করে হাঁটা বয়স্ক লোকটা হরিপদকে দেখে হাসল। তাতে মন বিশেষ গলল না হরিপদের।

‘জঙ্গলে কী করেন। ভূতপ্রেতে ধরবে। আপনে গেরামে চলেন আমার লগে।’

‘গেরামে তো আসল ভূতপ্রেত আস্তানা গাড়ছে। আমি বরং জঙ্গলেই থাকি।’

‘আরে পাকিস্তানি মিলিটারি তো ভাগছে। মুক্তিবাহিনী আইসা সবাইরে ভাগাইছে। গেরাম এখন পরিষ্কার। নতুন কইরা আবার ঘর তুলবেন। চলেন আমার লগে।’

‘আপনি নিশ্চিত, পাকিস্তানি মিলিটারি নাই?’

‘এই বয়সে আবার মিথ্যা বলব ক্যান। আমারে দেখতাছেন না? নিশ্চিন্তে ঘুরতাছি। সবাই বলাবলি করতেছিল, মাস্টার হরিপদ কোথায় গেল, তাই ভাবলাম একটু এদিকে খুঁইজা দেখি।’

‘পাকিস্তানিরা গেল কী করে? ঘটনা খুইলা বলেন আগে।’

‘গতকাল রাতে হইলো অপারেশন। পাকি সেনারা জঙ্গলরে ডরায়। রাজাকাররা গিয়া কইল, মুক্তিবাহিনী জঙ্গলে আস্তানা গাড়ছে। সেইটা শুইনা অনেকগুলা পাকি মিলিটারি গেল জঙ্গলে। ঘাপটি মাইরা থাকা মুক্তিবাহিনীর কানে পাতা মাড়ানির শব্দ আইতেই শুরু হইলো গুলি। এক রাউন্ডে সব খতম। বাকি যে কয়টা ছিল, গানবোটে পলাইছে।’

বাকশো হাতে উঠে দাঁড়াল হরিপদ। তবে বাকশোর ভেতর থেকে ছোরাটা হাতে উঠে এসেছে আগেই। এক ছুটে লোকটার পেছনে গিয়ে গলায় পেঁচিয়ে ধরল বাঁকানো ছোরার ধারালো ডগা।

‘রাজাকারের বাচ্চা! এইবার সত্য কথা কও দেখি, নইলে দিমু এক পোঁচ!’

এবার বলো, হরিপদ কী করে বুঝল লোকটা মিথ্যা বলেছে?

 

গত রহস্যজটের উত্তর

উত্তর : পলাশ যদি গ্লাস ভাঙার পর দরজাটা খুলে আবার বন্ধ করে চলে যেতেন, তবে ভাঙা গ্লাসের টুকরো দরজার মাঝ বরাবর থাকত না। দরজা খোলার সময় ধাক্কা খেয়ে সেটি সরে যেত একপাশে। এতে বোঝা যায়, দরজা বন্ধ থাকা অবস্থায়ই মিথি নিজে গ্লাস ভেঙে ছড়িয়ে রেখেছিলেন দরজার নিচে।

মন্তব্য