kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

হরর ক্লাব

ঈশা খাঁর ভূত!

তন্ময় আলমগীর

৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঈশা খাঁর ভূত!

ঈশা খাঁর পরিত্যক্ত বসতবাড়ির একটি অংশ

সুদূর ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ আসতাম আমার এক দাদুভাইয়ের মুখে গল্প শোনার জন্য। যেনতেন গল্প নয়, সত্যি ভূতের গল্প! দাদুভাই ভূতের গল্প বলেন খুব চমত্কার। একই গল্প বারবার শুনতে ইচ্ছা করত। প্রতিবারই নতুন মনে হতো। শুধু তা-ই নয়, দাদু বলতেন, তাঁর গল্পগুলো পুরোপুরি সত্য ঘটনা। গালগপ্পো মোটেও নয়।

বাংলার বারোভুঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ঈশা খাঁ। তিনি মানসিংহকে পরাজিত করেছিলেন। সেই বীর ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানীখ্যাত জঙ্গলবাড়িতেই দাদুর গ্রাম। ৪০০ বছর আগে ঈশা খাঁ এখানে একটি কারুকার্য করা বাড়ি ও একটি দর্শনীয় রাজপ্রাসাদ বানিয়েছিলেন। সেই পরিত্যক্ত প্রাসাদ এখন নাকি ভূতের আস্তানা! এ প্রাসাদের আশপাশেই আমার দাদুর বেড়ে ওঠা। প্রাসাদটি ঘিরে এমন সব ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটত, যা শুনলে যে কেউ শিউরে উঠবে নিশ্চিত।

জঙ্গলবাড়ির ওই প্রাসাদে গভীর রাতে নাকি ভূতদের সভা বসত। একজন নয়, একাধিক মানুষ নিজ চোখে দেখেছে এ ঘটনা। ভূতদের পরনে থাকত সাদা রাজকীয় পোশাক। শরীরের কাঠামো ধোঁয়াটে। গলার স্বর মোটা। ঢোলের আওয়াজের মতো নাকি। আর তাদের মধ্যে রাজার আকৃতি নাকি আলাদা।

অনেক আগের কথা। তখন দাদির গর্ভে ছিলেন আমার এক চাচা। একদিন রাতে দাদির হঠাত্ প্রসব ব্যথা উঠলে অন্ধকার মাড়িয়ে দাদুভাই ছুটে যান ডাক্তারবাড়ি। ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে রাজপ্রাসাদের কাছের রাস্তা দিয়েই আসছিলেন। প্রাসাদ পেরোনোর সময় শুনতে পেলেন, ভেতর থেকে আওয়াজ আসছে। দাদুভাই ভূত ভূত বলে  চিত্কার করে উঠলেন। ডাক্তার বললেন, আরে ভূতটুথ কিছু না। সবই মনের ভুল। এ কথা শুনে দাদু কিছুটা সাহস পেলেন। চুপিচুপি দুজনে গিয়ে দাঁড়ালেন প্রাসাদের দেয়াল ঘেঁষে। উঁকি দিয়ে দেখেন, রাজারা যেভাবে তার উজির-নাজির নিয়ে রাজসভা করেন, ঠিক সেভাবেই অনেকে বসে আছে প্রাসাদের ভেতর। আর সেটি দেখে এবার চিত্কার করে উঠলেন ডাক্তার স্বয়ং। দাদুভাইও তার হাতের হারিকেন ফেলে দিলেন দৌড়। পরের দিন শুনতে পান, ডাক্তার নিজেই হাসপাতালে ভর্তি।

প্রাসাদটির পাশেই নরসুন্দা নদী। কথিত আছে, অনেক দিন আগে নাকি গভীর রাতে নদীর ঘাটে সাজানো পরিপাটি একটি ডিঙি এসে থামত। হাতে তরবারিসহ নেমে আসত একজন লম্বাটে মানুষ। দেখতে নাকি হুবহু ঈশা খাঁর মতো। সেই ছায়ামানব বীরদর্পে প্রবেশ করত প্রাসাদে। নদীপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার আসাও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু না, পরে দেখা গেল, সেই মানুষটি ঘোড়ায় চড়ে আসতে লাগল। অনেকেই শুনেছে ঘোড়ার খুরের খটখট শব্দ। দাদুভাই নিজেও নাকি দেখেছেন তাকে।

দাদুভাইয়ের শখ মাছ শিকার করা। দিনের বেলায় বড়শি আর রাতে আলোর ফাঁদ দিয়ে মাছ ধরেন। একবার বর্ষার একরাতে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিল। দাদুভাই বর্শা হাতে বেরিয়ে পড়লেন। নদীর পাড় দিয়ে হাঁটছেন আর আলো ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করছেন। কাছেই একটা মাছ নড়ে উঠল। দাদু পানিতে নামতে লাগলেন। প্রথমে হাঁটুপানি, তারপর কোমরপানি, তারপর বুক সমান। দাদু ভাই নামছেন তো নামছেন। হঠাত্ কানে ঘোড়ার খুরের খটখট আওয়াজ! পানির কলকল শব্দের সঙ্গে সেই শব্দ মিলেমিশে যেতে লাগল। সংবিত্ ফিরে এলো দাদু ভাইয়ের। চেয়ে দেখেন, ঘোড়ায় চড়ে ঈশাখাঁই যাচ্ছেন! তার মাথার ওপর শূন্যে ঝুলে আছে লম্বা এক শামিয়ানা। পানি থেকে উঠেই বাড়ির দিকে ছুট লাগালেন দাদু। এরপর নাকি প্রায় তিন-চার দিন জ্বরে ভুগেছিলেন তিনি।

আরেক দিন সকালের ঘটনা। দাদুভাই বন্ধুদের নিয়ে প্রাসাদের সামনে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক আগাগোড়া কাপড়ে ঢাকা এক নারী এলেন। জানালেন, তাঁর ছেলের তিন দিন ধরে জ্বর। কোনো ওষুধে সারছে না। তিনি জানতে পেরেছেন, এই প্রাসাদের দেয়াল ভেদ করে গজানো বটগাছের পাতার রস খেলে নাকি অসুখ ভালো হয়। তাঁর পরিচিত আরো অনেকেই নাকি এ পাতার রস খেয়ে সুস্থ হয়েছে।

প্রাসাদের অরক্ষিত বারান্দায় দীর্ঘদিন ধরে এক মানসিক ভারসাম্যহীন লোক থাকত। দাদুভাই ওই নারীকে ওই লোকটার কাছে নিয়ে গেলেন। তাকে বলে কিছু গাছের পাতা সংগ্রহ করে দিলেন ওই নারীকে। কিন্তু দুুদিন পর জানতে পারলেন, প্রাসাদের গাছের রস খাওয়ানোর পরপরই নাকি কাঁপুনি দিয়ে জ্বরের মাত্রা বেড়ে গেল ওই নারীর ছেলের। এমনকি শেষে ছেলেটা মারাও যায়। তার পরও থামেনি গুজব। তিন মাসের ভেতর ওই সব পাতার রস খেয়ে আরো দুজন মারা যায়।

এতেও রটে গেল ভূতুড়ে কাজ-কারবারের ঘটনা। প্রাসাদের বারান্দায় থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন লোকটা জানাল, সে নাকি স্বপ্নে দেখেছে—পাঁচটি ভূতের একটি পরিবার থাকে ওই বটগাছে। পাতার ঝোপঝাড় আর শিকড়ের আনাচকানাচে তাদের নিত্য আসা-যাওয়া। পাতা সংগ্রহের কারণে তাদের শান্তি বিঘ্নিত হওয়ায় তারা রস পানকারীদের ওপর যম হয়ে চেপে বসেছিল। এমনটা শোনার পর আর কাউকে প্রাসাদের কোনো পাতা ছিঁড়তে দেখা যায়নি।

প্রাসাদটির পাশে এখন একটি মাঠ। গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। বিকেল হলে ছোটরা ফুটবল খেলে। একদিন ফুটবল খেলার সময় বলটা প্রাসাদের কাছের একটি ঝোপে আছড়ে পড়ে। বল আনতে গিয়ে বিপদে পড়ল ছেলেরা। একটি গাছের নিচে দুটি সাপ মারামারি করছে। দেখে তাদের মনে হলো, যেন সাপ দুটির মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা! আশপাশে ছড়িয়ে আছে রক্ত। সাপ সাপ বলে ছেলেরা চিত্কার করলে আশপাশ থেকে বড়রাও আসে। লাঠিসোঁটা নিয়ে সাপ মারতে যাবে তারা, অমনি সাপ দুটি ঢুকে গেল ঝাড়ের ভেতর। সবাই পিছু নিল। গিয়ে দেখে, প্রাসাদের ভেতরেই ঢুকেছে সাপ দুটি।

তখন সন্ধ্যা। মাগরিবের আজান ভেসে আসছে ৪০০ বছরের পুরনো মসজিদ থেকে। আজান শুরু হতেই সাপ দুটি চুপ! মারামারি একেবারে বন্ধ। আজান শেষ হতেই ফের মারামারি! লাঠি দিয়ে লোকজন আঘাত করতে গেলেই ফণা তুলে ফোঁস করে তেড়ে আসছে। অর্ধশত মানুষের জমায়েত থেকে এগিয়ে এলেন বাবরিওয়ালা এক লোক। তিনি এলাকায় টুকটাক কবিরাজি করেন। একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে গেলেন সাপগুলোর দিকে। কাছে গিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বললেন, ‘তোমরা যদি জিন হয়ে থাকো তাহলে চলে যাও। অন্যথায় তোমাদের নিস্তার নেই।’ এ কথা বলতেই চোখের পলকে একটি সাপ অদৃশ্য হয়ে গেল। অন্য সাপটি প্রাসাদের দেয়াল ভেদ করে গজানো বটগাছের ভেতর ঢুকে গেল। এ ঘটনার পর থেকে প্রাসাদের প্রতি মানুষের ভীতি আরো বেড়ে গেল। সবাই বলাবলি করল যে সাপ দুটি জিনই হবে। কেউ কেউ বলল, ঈশা খাঁ ও মানসিংহও হতে পারে!

মন্তব্য