kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

কোলন ও রেকটাল ক্যান্সার

এ বছর বিশ্বব্যাপী এপ্রিল মাসকে কোলোরেকটাল ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। কোলোরেকটাল ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসা বিষয়ে জানাচ্ছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সাজ্জাদ মো. ইউসুফ

৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কোলন ও রেকটাল ক্যান্সার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ক্যান্সারের স্থান দ্বিতীয়। ২০১৮ সালের সর্বশেষ তথ্য মতে, পৃথিবীতে ৯৬ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এখনই প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা হবে দ্বিগুণ। আশার কথা হচ্ছে, পৃথিবীতে যত মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে তার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্যান্সারই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

 

ক্যান্সারের প্রকারভেদ

প্রতিবছর বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। সাধারণত ফুসফুস, কোলন, রেকটাল, স্তন, জরায়ু ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হয়।

 

কোলন ও রেকটাল ক্যান্সার

পরিবেশ অথবা বংশগত প্রভাবের কারণে মলাশয়ের মিউকোসাল এপিথেলিয়ামের টিউমারটি ম্যালিগন্যান্ট টিউমারে পরিণত হলে তাকে কোলন বা মলাশয়ের ক্যান্সার বলে। এটি সাধারণত মলাশয় ও মলদ্বারের সংযোগস্থানে বেশি হয়।

 

লক্ষণ

►   প্রাথমিকভাবে কোলন ক্যান্সার নির্ণয় অত্যন্ত কঠিন। এর কারণ প্রথম দিকে রোগটির তেমন কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না।

►   কোলন বা মলাশয়ের কোন জায়গায় ক্যান্সার রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে উপসর্গে বিভিন্নতা দেখা যায়।

►   পায়খানার সঙ্গে রক্ত কিংবা পেটে ব্যথা নিয়ে বেশির ভাগ রোগী প্রথম চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়।

►   মলত্যাগের অভ্যাস পরিবর্তন (কখনো ডায়রিয়া, কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য),  রক্তশূন্যতা (দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট)।

►   অবস্থা গুরুতর হলে ওজন কমে যাওয়া, পেটে চাকা, পেটে পানি, রক্ত মিশ্রিত পায়খানা বা তাজা রক্ত ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়।

►   দুর্ভাগ্যবশত চিকিৎসকরা রোগীদের রোগটির অতিমাত্রায় অগ্রসর অবস্থায় পান। কারণ বেশির ভাগ রোগীই আগে অপচিকিৎসার শিকার হয়ে চিকিৎসকের কাছে আসে।

 

ক্যান্সারের কারণ

বয়স : কোলন ক্যান্সারে ভোগা প্রতি ১০ জনের ৯ জনের বয়স ৬০ বা তার বেশি।

খাদ্যাভ্যাস : খাদ্যতালিকায় ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত রেড মিট, ডিডিটি মিশ্রিত শুঁটকির আধিক্য এবং আঁশযুক্ত খাবারের অনুপস্থিতি।

ওজন : অতিরিক্ত ওজন যাদের তাদের কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

পারিবারিক ইতিহাস : বংশগত কারণে জিনের পরিবর্তন হতে পারে। পরে তা কোলন ক্যান্সার ত্বরান্বিত করে। এ ছাড়া রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়-পরিজন কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকলে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ধূমপান ও মদ্যপান : ধূমপান ও মদ্যপান কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

 

বাংলাদেশে কোলন ও রেকটাল ক্যান্সারের চিত্র

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এই ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ১৪-১৫ লাখ। এই সংখ্যার সঙ্গে প্রতিবছর যোগ হচ্ছে দুই লাখ নতুন ক্যান্সার রোগী। বাংলাদেশে কোলন ক্যান্সার শনাক্ত রোগীর কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে বাংলাদেশ জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ২০১৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ১৯.২ শতাংশ পরিপাকতন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে ক্যান্সার পরিস্থিতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ বা কোন শ্রেণির মানুষ ভোগে এ বিষয়ে সাম্প্রতিক কোনো তথ্য না থাকলেও বর্তমানে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার কিছুটা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার ৫৬ শতাংশ, যেখানে ৫০ থেকে ৮৯ বছর বয়সীদের আক্রান্তের হার ৪৪ শতাংশ। ইদানীং চট্টগ্রামে তরুণদের মাঝেও কোলন ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বয়সভিত্তিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর বেশির ভাগই ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী। আমাদের এর কারণ দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে।

 

করণীয়

প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে এটি অনেকাংশে নিরাময়যোগ্য। এমনকি ক্যান্সার যদি কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতেও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সার্জারি-পরবর্তী কেমোথেরাপির মাধ্যমে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পঞ্চাশোর্ধ্ব সব জাতি-বর্ণের নারী-পুরুষ কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়।

মনে রাখতে হবে, স্ক্রিনিং (কোলোনোস্কপি, Stool for OBT, Fecal immunochemical test)-এর মাধ্যমে ক্যান্সার-পূর্ববর্তী পলিপস শনাক্ত করে অপসারণের মাধ্যমে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব। পাশাপাশি  স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকৃত এসব পলিপস, যা বিস্তৃতি লাভ করেনি বা ছড়িয়ে পড়েনি সেগুলো অপসারণের মাধ্যমে পুনরায় সুস্থ জীবন যাপন করার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়।

 

চিকিৎসা

সম্পূর্ণ নিরাময় বা নিয়ন্ত্রণই হলো কোলন ক্যান্সার চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য। সাধারণত রোগীর শারীরিক অবস্থা, টিউমারের অবস্থান ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে

►   সার্জারি।

►   রেডিওথেরাপি।

►   কেমোথেরাপি।

►   ইমিউনোথেরাপি।

 

যেকোনো ক্যান্সার চিকিৎসায় একটি শব্দ বিশ্বে বহুল প্রচলিত—Multidisciplinary approach; যার মানে হচ্ছে সার্জন, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, সাইকোথেরাপিস্ট, প্যাথলজিস্ট, ক্যান্সার কেয়ার নার্সসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যা ক্যান্সার জয়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

 

অপচিকিৎসা নয়

ক্যান্সার কঠিন রোগ হলেও এর উপযুক্ত চিকিৎসা রয়েছে। রোগীদের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক চিকিৎসার যুগে এসেও বাংলাদেশের মানুষ এখনো হাকিম, কবিরাজ, ঝাড়ফুঁকের ওপর বিশ্বাস করে। এসব কুসংস্কার থেকে পরিত্রাণ পেতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যয় সরকারি হাসপাতালগুলোতে অত্যন্ত কম। রোগীদের প্রতি অনুরোধ, কোনো রোগ সম্পর্কে পরিচিতজনের পরামর্শ না নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এ ক্ষেত্রে রোগীর সচেতনতাই ক্যান্সারকে প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করতে সাহায্য করবে। কাজেই সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।

 

প্রতিরোধের উপায়

►   স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান।

►   লাল মাংস কম খান বা পরিহার করুন।

►   ৫০ বছর বয়সের পর স্ক্রিনিং করান।

►   ধূমপান বর্জন করুন।

►   নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।

►   ফরমালিনমুক্ত খাবার খাওয়া বন্ধ করুন।