kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

কভিডজনিত নিউমোনিয়া

ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক

৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কভিডজনিত নিউমোনিয়া

নিউমোনিয়া প্রায়ই একটি স্বল্পমেয়াদি অসুস্থতা হলেও কখনো কখনো তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বর্তমানে কভিডজনিত নিউমোনিয়ার ব্যাপক প্রকোপ চলছে পৃথিবীব্যাপী। এসংক্রান্ত নিউমোনিয়ায় ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে এবং অনেকে সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছেন। তবে সঠিক চিকিৎসা নিলে বেশির ভাগ রোগীই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়।

 

 লক্ষণ

►   ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে জ্বর।

►   সবুজ, হলুদ বা রক্তযুক্ত কফ।

►   শ্বাস-প্রশ্বাস দুর্বল হওয়া।

►   ক্লান্তিবোধ।

►   ক্ষুধামান্দ্য।

►   বুকে তীব্র ব্যথা।

►   দ্রুত শ্বাস ও হৃত্স্পন্দনের কারণে ঠোঁট নীল হওয়া।

►   প্রচুর ঘেমে যাওয়া।

 

বুকের এক্স-রে

কারো নিউমোনিয়া হয়েছে কি না, তা বুঝতে বুকের এক্স-রে করানো হয়। বিশেষ করে লক্ষণগুলোর উন্নতি না হলে, লক্ষণগুলো বারবার ফিরে এলে, ধূমপায়ী হলে, বয়স ৪০-এর বেশি হলে অবশ্যই এক্স-রে করানো উচিত। ইদানীং এইচআরসিটি বা সিটিস্ক্যান করানো হচ্ছে বেশি, যাতে সংক্রমণের মাত্রা বোঝা যায় ভালোভাবে।

 

চিকিৎসা

কারো নিউমোনিয়া শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত। নিউমোনিয়ার ধরন, অসুস্থতাবোধ, বয়স ও অন্যান্য স্বাস্থ্য অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা করা হয়।

►   নিউমোনিয়া হলে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ণ কোর্স গ্রহণ করুন। ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণজনিত নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক দারুণ কাজ করে। হঠাৎ অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করে দিলে ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। কোর্স শেষ করার দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত কাশি থাকতে পারে এবং ক্লান্ত বোধ করতে পারেন। এখানে বলে রাখা ভালো, কভিড-১৯ হলো ভাইরাসজনিত রোগ। ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। ভাইরাল নিউমোনিয়া হলে চিকিৎসক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দেন।

►   অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো ডোজ শেষে ডাক্তার আবার বুকের এক্স-রে করে দেখবেন সংক্রমণ কমেছে কি না।

►   কাশির মাধ্যমে এবং নাক দিয়ে শ্লেষ্মা বের করার চেষ্টা করুন। নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি ভালো উপায়।

 

সহায়ক খাবার

►   মাল্টা, কমলা, বেরি, কিউইর মতো ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ সাইট্রাস ফল খান। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে এই ফলগুলো বেশ কাজ করে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদেরও এই ফলগুলো খেতে দিন।

►   গবেষণায় দেখা গেছে, মাছ, আঙুর, কলা ও পনির ফুসফুসের কার্যকারিতা রক্ষায় ভালো কাজ করে।

►   নিউমোনিয়া রোগীদের জন্য সুষম খাদ্য নির্ধারিত হলেও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারগুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ডিম, টোফু, পনির, ফলমূল এবং বাদামজাতীয় খাবারগুলোতে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি।

►   এ সময় লেবু-পানি খান প্রচুর। সর্দি প্রতিরোধের এক দুর্দান্ত উপায় লেবু। লেবু-পানি কিডনি, শ্বাসযন্ত্রের সিস্টেম এবং কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকেও উন্নত করে। এটি নিউমোনিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে বেশ সহায়তা করে।

►   বুক ও পেটের উন্নত পেশি শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য বেশ প্রয়োজনীয়। এ জন্য মাংস, মাছ, ডিম এবং দুগ্ধজাত প্রোটিন খাওয়া উচিত।

►   আদা-পানি খেলে সংক্রমণের কারণে ঘটে যাওয়া শ্বাসকষ্ট হ্রাস করে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, আদা শ্বাসকষ্টের সিনসিটিয়াল ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেশ কার্যকর। এই ভাইরাস শ্বাসকষ্টের সংক্রমণের একটি সাধারণ কারণ।

►   ওষুধের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খান। এতে কফ তরল হবে। কুসুম গরম পানি, লাল চা পান করুন।

 

আরো যা করবেন

►   নিউমোনিয়া চিকিৎসাকালে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কম মেলামেশা করুন। না হলে অন্যদের মধ্যে জীবাণু ছড়াতে পারে।

►   হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় মুখ ও নাক ডিসপোজেবল টিস্যু দিয়ে ঢেকে রাখুন। দ্রুত টিস্যুগুলো বক্সে রেখে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন।

►   গরম ভাপ নিতে পারেন।

►   শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক রাখতে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন।

►   যেকোনো ধোঁয়া, যেমন—ধূমপান, কাঠ বা ইটভাটার ধোঁয়া, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ইত্যাদি থেকে দূরে থাকুন। 

 

যাদের ঝুঁকি বেশি

বৃদ্ধ এবং অল্প বয়স্ক শিশুরা নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। যাদের ইমিউন সিস্টেম ভালো কাজ না করে কিংবা অন্যান্য গুরুতর সমস্যা, যেমন—ডায়াবেটিস বা যকৃতের সিরোসিসে ভোগা রোগীদের নিউমোনিয়ার জটিলতা বেশি দেখা দেয়। ধূমপায়ী ব্যক্তি, ক্যান্সারের চিকিৎসা নিলে বা স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবনকারী ব্যক্তির নিউমোনিয়া হলে তা জটিল রূপ নিতে পারে।

 

নিউমোনিয়ায় জটিলতা

►   শ্বাসনালি বা ফুসফুসে রক্তক্ষরণ হলো জটিলতার লক্ষণ। ভারী কাশি ফুসফুসে রক্তনালিগুলো ভেঙে রক্তক্ষরণ করতে পারে। ফলে লাল কফ হতে পারে। তবে আরো মারাত্মক অবস্থার কারণেও লাল বা গোলাপি কফ হতে পারে।

►   দেহে অনিয়ন্ত্রিত প্রদাহ হতে পারে। এ কারণে কোনো অর্গান ফেইলিওর হয়েও যেতে পারে।

►   অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (এআরডিএস) হতে পারে, যা শ্বাসযন্ত্র ফেইলিওরের একটি রূপ।

►   ফুসফুসে ফোড়া হতে পারে। ফুসফুসের আশপাশে তরল বা পুঁজ হতে পারে। এ কারণে অনেক সময় শল্যচিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

►      রক্তপ্রবাহে জীবাণুর সংক্রমণ নিউমোনিয়ার জটিলতা।

 

প্রতিরোধে করণীয়

►      করোনা মহামারির এই সময় ঘরের বাইরে সবাই মাস্ক পরিধান করুন। বাড়িতে সর্দি-কাশির রোগী থাকলে তাকেও মাস্ক পরিয়ে রাখুন।

►      শারীরিক নিরাপদ দূরত্বে থাকুন।

►   নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখুন। টয়লেট থেকে ফিরে এবং খাওয়ার আগে অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন। স্যানিটাইজ করুন।

►   ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। শিশুদের ধূমপানের ধোঁয়া, রান্নার চুলার ধোঁয়া কিংবা কয়েলের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখুন।

►   নিয়মিত ব্যায়াম করুন। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানোর চেষ্টা করুন।

►   ঠাণ্ডাজাতীয় সমস্যা বা সর্দি-জ্বর দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কভিড টেস্ট করুন।

     অনুলিখন : জুবায়ের আহম্মেদ