kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

চাকরি পেতে সহায়ক

সিজিপিএ নাকি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ?

চাকরি পাওয়ার দৌড়ে সিজিপিএ আগে, নাকি এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ? চাকরিক্ষেত্রের বাস্তব অবস্থা বা কেস স্টাডিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজকেই বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে করপোরেট হাউসগুলো। বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন ওয়ালটন গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগ) এস এম জাহিদ হাসান

১৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সিজিপিএ নাকি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ?

সন্তোষজনক একাডেমিক ফলের সঙ্গে এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ হচ্ছে সফল যুগলবন্দি। এই দুটির মিশ্রণেই সফল একটা ক্যারিয়ার গঠন সম্ভব। যদি ন্যূনতম সিজিপিএ অর্জনে প্রার্থী বা শিক্ষার্থী ব্যর্থ হন তাহলে এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ দিয়ে সেই ঘাটতি কখনোই পূরণ হবে না

ধরুন, দুজন প্রার্থী যোগ্যতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ বা নিয়োগপ্রক্রিয়ার শেষ ধাপে এসে পৌঁছেছেন। এর মধ্যে প্রথমজনের ফল খুব ভালো; কিন্তু তাঁর বাড়তি যোগ্যতা বা এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ (সহশিক্ষা কার্যক্রম) নেই; আরেকজনের ফল খুব ভালো না হলেও সন্তোষজনক, এর সঙ্গে এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ বা বাড়তি যোগ্যতা আছে। তাঁদের মধ্যে যদি একজনকে নিয়োগ দিতে হয়, প্রতিষ্ঠান কাকে নেবে? এমন প্রশ্ন অনেকেরই।

আসলে এমন পরিস্থিতিতে চাকরিক্ষেত্রে দ্বিতীয়জনকেই নেওয়া হবে। কারণ তাঁর সন্তোষজনক বা ন্যূনতম একাডেমিক যোগ্যতা আছে, পাশাপাশি এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজও আছে, চাকরির ক্ষেত্রে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে দেখা গেছে, ভালো ফল করা শিক্ষার্থী, যাঁর বইয়ের বাইরে আর কোনো জগৎ নেই তাঁর চেয়ে কর্মক্ষেত্রে তিনিই এগিয়ে থাকেন, যাঁর ফল ‘সেরা’ পর্যায়ে না হলেও মোটামুটি; কিন্তু বইয়ের বাইরে বিতর্ক, সংগঠন, স্কাউটিং, ক্লাবিং, মুটকোর্ট, পাঠচক্র, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজসহ বিভিন্ন কিছুতে সম্পৃক্ততা ছিল বা আছে।

 

চাকরির বাজারে শুধু সিজিপিএকেই শতভাগ নম্বর বা রেটিং দিতে চাই না, আবার একাডেমিক পড়াশোনাকে মূল্যায়ন না করে শুধু পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কাজ যেমন—বিতর্ক, সংগঠন, ক্লাবিং ইত্যাদিকেও অগ্রাধিকার দিতে চাই না। ন্যূনতম একাডেমিক অবস্থা বা ফল দরকার, যার মাধ্যমে আবেদনের সব শর্ত পূরণ হবে। তবে সন্তোষজনক একাডেমিক ফলের সঙ্গে এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ হচ্ছে সফল যুগলবন্দি। এই দুটির মিশ্রণেই সফল একটা ক্যারিয়ার গঠন সম্ভব। যদি ন্যূনতম সিজিপিএ অর্জনে প্রার্থী বা শিক্ষার্থী ব্যর্থ হন তাহলে এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ দিয়ে সেই ঘাটতি কখনোই পূরণ হবে না।

 

একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে যদি কেউ কমপক্ষে দুটি সংগঠনে সময় দেন কিংবা দুটি ক্লাবের সক্রিয় সদস্য থাকেন তাহলে তিনি করপোরেট চাকরির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এবং প্রতিযোগিতায় অনেকাংশেই এগিয়ে থাকবেন। তাই প্রার্থীদের উচিত কাঙ্ক্ষিত চাকরিতে আবেদনের ন্যূনতম ‘সিজিপিএটা ঠিক রেখে সংগঠন, ক্লাবিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মতো এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজে যুক্ত থাকা। পুথিগত জ্ঞান ও বৃত্তের বাইরের জগৎ—দুটিই একজন প্রার্থীকে উপযুক্ত হিসেবে তৈরি করে।

 

অনেকেই আছেন, যাঁরা ঢাকার বাইরের অফিসে বদলি হতে চান না। তাঁরা অনুরোধ করেন, যেন তাঁদের বদলি ঢাকা কিংবা ঢাকার আশপাশে হয়। কিন্তু যাঁরা ক্লাবিং করেছেন, ক্লাবের কাজের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে, স্কাউটিং ক্যাম্প করেছেন, তাঁরা বরং ঢাকার বাইরে বদলিতে খুশিই হন। একটি করপোরেট সেক্টরে এ রকম মানসিকতার কর্মী খুবই প্রয়োজন। যেকোনো জায়গায় চাকরি করার জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকার জন্য একজন ক্লাব অ্যাক্টিভিস্ট শিক্ষার্থীকে যেকোনো অফিসের জন্য আশীর্বাদ বলা যায়। এ ছাড়া এ ধরনের প্রার্থী প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা বা সহজ ব্যবস্থাপনা করতে পারেন।

 

দেশের উৎপাদনশীল কারখানাগুলোতে সাধারণত ফ্রেশার গ্র্যাজুয়েটের অধীনে বেশ কিছু কর্মী থাকেন। এসব কর্মীর কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেওয়ার দায়িত্ব থাকে সদ্য যোগ দেওয়া এই তরুণের। এ ক্ষেত্রে তাঁর অধীনে থাকা কর্মীদের কিভাবে কাজে লাগাতে হবে, কোন পদ্ধতিতে কাজে লাগালে তাঁরা সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করতে পারবেন—সেসব নিয়ে সঠিক উপায় খোঁজার ক্ষেত্রে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস্ট শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি পারদর্শী। কারণ এসব শিক্ষার্থী চাকরিজীবনে ঢোকার আগে ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দিয়েছেন কিংবা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করেছেন। তাই তাঁরা খুব সহজে যে কাউকে কাজ বুঝিয়ে দিতে পারেন এবং অগ্রজদের থেকে সহজে কাজ বুঝেও নিতে পারেন, যা শুধু বইয়ের পাতা মুখস্থ করে পাওয়া সম্ভব নয়।

 

যাঁরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ছাত্রাবস্থা থেকে যুক্ত থাকেন, তাঁরা তুলনামূলক কর্মঠ হন, টানা সময় নিয়ে কাজ করার মানসিকতা রাখেন এবং সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন। অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মাধ্যমে দলবদ্ধভাবে কাজ করার দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়। যেকোনো চাকরির ক্ষেত্রে টিম ওয়ার্ক বড় ভূমিকা রাখে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করেন, তাঁরা সহজেই যেকোনো টিমের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন, যা বিশ্বের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। একজন নিষ্ঠাবান কর্মঠ কর্মী একজন উচ্চ ফলধারীর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে নিষ্ঠা ও কর্মস্পৃহা গড়ে ওঠার হাতিয়ার হলো এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ।

 

এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের সঙ্গে যুক্ত থাকা শিক্ষার্থীরা সাধারণত ‘মাল্টিটাস্কিং’ বা একসঙ্গে একাধিক কাজ চালিয়ে নেওয়ায় পারদর্শী হন। কোনো প্রতিষ্ঠান বা কারখানায় যেকোনো মুহূর্তে একজনের ওপর একাধিক কাজের দায়িত্ব অর্পণ করার প্রয়োজন হতে পারে। সেই সময়ে একজন এক্সট্রা কালিকুলার অ্যাক্টিভিটিজে যুক্ত থাকা গ্র্যাজুয়েট সবচেয়ে এগিয়ে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—কোনো একটি বহুজাতিক কম্পানির মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের অর্ধেক কর্মী ঈদের ছুটিতে গেছেন। তার মানে, স্বাভাবিকভাবেই বাকি অর্ধেক কর্মীর ওপর পুরো কাজের দায়িত্ব পড়বে। সে ক্ষেত্রে যেসব প্রার্থী সংগঠন বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করতেন বা যাঁদের কাজ ও সময় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নেতৃত্বের গুণাবলি আছে, তাঁরা কর্মক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন। আপৎকালে এসব কর্মীই একটি প্রতিষ্ঠানকে স্থিতিশীল রাখতে পারেন। তাই প্রার্থীর এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজকে বাড়তি গুরুত্ব দেন নিয়োগকর্তা বা মানবসম্পদ কর্মকর্তারা।

 

একজন চাকরিপ্রার্থীর সামাজিকতা, দায়িত্বজ্ঞান, সহনশীলতা, কর্তব্যপরায়ণতা ইত্যাদি গুণকেও বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়। যেকোনো করপোরেট অফিস কিছু নিয়ম-শৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে পরিচালিত হয়। আবার যাঁরা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ক্লাবিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁরা নিয়মানুবর্তিতার ব্যাপারে আগে থেকেই সচেতন ও অভ্যস্ত থাকেন। এসব কারণে কর্মজীবনে নতুন করে নিয়ম মানার ক্ষেত্রে বেগ পেতে হয় না। ফলে যেকোনো পরিস্থিতিতে তাঁরা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। এই মানিয়ে নেওয়াটাও কর্মক্ষেত্রে একটা বড় গুণ, যা নিয়োগদাতাদের আগ্রহ ও অগ্রাধিকারের বিষয়।

যাঁরা বিতর্ক করেন, তাঁরা সাধারণত নিয়মিত পত্রিকা পড়েন। সাম্প্রতিক বিষয়গুলো তাঁদের নখদর্পণে থাকে, যা ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে অনেক কাজে দেয়। আবার যাঁরা আবৃত্তি কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন, তাঁরা খুব সহজেই বিদেশি বায়ার বা ক্লায়েন্টদের সামনে তাঁর কম্পানিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। খেলাধুলায় যাঁরা পারদর্শী, তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই খুব পরিশ্রমী হন। এসব দক্ষতা খুব সহজে অন্যদের তুলনায় একজন প্রার্থীকে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখে। লিডারশিপ, থিংকিং পাওয়ার, ওয়ার্কিং অ্যাবিলিটি—এগুলার সমন্বয়ে একজন দক্ষ কর্মী গড়ে ওঠে। এসব যোগ্যতা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ ছাড়া অন্য কোনোভাবে অর্জন করা খুব কঠিন। এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ শিক্ষাজীবনেই শিক্ষার্থীর ভেতর সফট স্কিলের সুপ্ত বীজ বপন করে দেয় আর চাকরিজীবনে এসে সেই বীজ থেকে গাছ হয়ে ছায়া, ফুল, ফল দিতে শুরু করে; যা তাঁকে শুধু ব্যক্তিগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করে না, সামগ্রিকভাবে পুরো প্রতিষ্ঠানকেই লাভবান করে।

 

শ্রুতলিখন : আল সানি

মন্তব্য