kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

বিসিএস প্রিলিমিনারি

যেভাবে টানা ছয়-ছয়বার প্রিলিতে টিকেছি

৪১তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি হলো। বিসিএসের আসল লড়াই প্রিলিতে। কারণ সবচেয়ে বেশিসংখ্যক আবেদন পড়ে প্রিলিতে, আর বেশির ভাগ প্রার্থী এই ধাপেই ছিটকে পড়ে। নিজের ছয়-ছয়বার প্রিলি টপকানোর অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ ও প্রস্তুতি নিয়ে লিখেছেন ৩৫তম বিসিএসে ক্যাডার (সাধারণ শিক্ষা) হওয়া গাজী মিজানুর রহমান

৩০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যেভাবে টানা ছয়-ছয়বার  প্রিলিতে টিকেছি

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

অনার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই ৩৪তম বিসিএসের আবেদন করি। জীবনের প্রথম বিসিএস; প্রিলি, রিটেন, ভাইভা—সব কটিতেই পাস করি। কিন্তু কোনো ক্যাডার পাইনি। দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হই, কিন্তু জয়েন করিনি। ওই সময় পূবালী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার পদে চাকরি হয়ে যায়। এরপর ৩৫তম বিসিএসে অংশ নিই। ওই বিসিএস থেকেই প্রিলিতে নতুন সিলেবাসে ২০০ নম্বরের পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হয়। রিটেনের প্যাটার্নেও পরিবর্তন আসে। এত কিছুর পরও জীবনের দ্বিতীয় এই বিসিএসে ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন বাস্তব হয়। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার হিসেবে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ পাই। পরে ৩৬তম বিসিএসও দিই, টিকি; কিন্তু কোনো ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত হইনি। ৩৭তম বিসিএস দিয়ে আবারও টিকি, কিন্তু নন-ক্যাডার। ৩৮তম বিসিএস প্রিলি দিয়ে পাস করি, ট্রেনিংয়ে থাকায় রিটেন দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ৪০তম বিসিএসের প্রিলিও টপকিয়েছি, সামনে রিটেন। এভাবে ৩৪তম-৪০তম বিসিএস পর্যন্ত (৩৯তম স্পেশাল বিসিএস ছাড়া) টানা ছয়টি বিসিএস প্রিলিতে টিকেছি।

২০০৬ সালে যখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হই, ‘বিসিএস’ শব্দটা তখনই প্রথম শুনি। পরে প্রথম চান্সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যাই। অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় বিসিএস নিয়ে আশপাশের বন্ধু ও বড় ভাইদের দৌড়ঝাঁপ-প্রস্তুতি দেখে নিজেও আগ্রহী হই। এর পর থেকেই পরিচিত বা জানাশোনাদের মধ্যে কোনো ভাই বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন শুনলে পরামর্শের জন্য ছুটে গেছি। আমার বিসিএস প্রস্তুতির শুরুটা এভাবেই। ওনারা একটা কথাই বারবার বলেছেন—ক্যাডার হতে হলে অনেক পড়তে হবে। কিন্তু কী পড়ব? কিভাবে পড়া শুরু করব? বুঝতে পারছিলাম না। একদিন এক বড় ভাই বললেন, ‘আজকাল যে (প্রার্থী) ইংরেজি আর গণিতে ভালো, তার জন্য চাকরি রেডি! তোমার হাতে এখনো অনেক সময়, এক কাজ করো—শুধু গণিত আর ইংরেজি নিয়েই লেগে থাকো। আপাতত অন্য কিছু পড়তে যেয়ো না। বাকি বিষয়গুলো ছয় মাস পড়লে এমনিতেই পারবা। কিন্তু গণিত-ইংরেজি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির বিষয়। তাই এখন থেকেই লেগে থাকো, সময়টা কাজে লাগাও।’

এসএসসি পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়েছি। ইংরেজি-গণিতে শিক্ষকদের কাছ থেকে খুব বেশি ট্রিটমেন্ট পাইনি। এ দুই বিষয়ে নিজের দুর্বলতার কথা ভেবে চিন্তায় পড়ে যাই।

একদিন নীলক্ষেত গিয়ে চৌধুরী অ্যান্ড হোসাইনের Advanced Learners Functional English আর সাইফুরসের Student Vocabulary বই দুটি কিনে এনে পড়া শুরু করে দিই। প্রথম প্রথম যতই পড়ি, গ্রামারের নিয়মে হালকা দখল নিতে পারলেও ভোকাব্যুলারির কিছুই মনে রাখতে পারিনি। হলের বড় ভাইদের সঙ্গে ব্যাপারটা শেয়ার করলাম। ওনারা বললেন, ‘প্রথম যখন ভোকাব্যুলারি পড়ো, ধরে নেবে এটা এমনিতেই পড়ছ (যেভাবে আমরা পত্রিকা পড়ি। পত্রিকা পড়ার সময় কিন্তু সাবলীলভাবেই পড়ি, সেটা তখন মুখস্থ করা উদ্দেশ্য থাকে না)। এভাবে প্রথমবার পড়লে হয়তো মনে থাকবে না। কিন্তু দ্বিতীয়বার পড়লে কিছু কিছু মনে থাকবে। তৃতীয়বার পড়লে আরো অনেক কিছু মনে থাকবে। এভাবে মনে রাখার মতো অবস্থা আস্তে আস্তে বাড়বে। আর পড়ার সময় অবশ্যই খাতায় শব্দগুলো লিখে রাখবে। পরে আবার দেখবে।’ এ পরামর্শটা বাস্তবে কাজ করতে শুরু করল। একটু একটু করে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। তবে এতটুকুতেই সন্তুষ্ট ছিলাম না। ঠিক করলাম—ঘুম থেকে উঠে নাশতার আগ পর্যন্ত শুধু ভোকাব্যুলারি পড়ব। এভাবে টানা চার মাস চর্চা করে ভোকাব্যুলারি বইটা শেষ করেছি। দেখলাম—আগের চেয়ে অনেক বেশি ভোকাব্যুলারি পারি। তখন ভোকাব্যুলারির আরেকটি বড় বই কিনি, আগের প্রস্তুতির কারণে সেটা শেষ করতে বেগ পেতে হয়নি। এরপর পিসি দাশের Applied English Grammar & Composition বইটি নিয়ে বেছে বেছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টারগুলো শেষ করি।

এবার আসি ইংরেজি গ্রামারে। প্রথমে ভালো করে Parts of Speech শেষ করি। তারপর Tense, Subject Verb Agreement, Right Forms of Verb, Preposition। এগুলো শুধু বিসিএসই না, যেকোনো চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য একেবারে কমন। তারপর Group Verb এবং Phrase & Idioms শেষ করার পর মনে হলো, ‘প্রস্তুতি পাকাপোক্ত’।

ইংরেজি গ্রামারের জন্য চৌধুরী অ্যান্ড হোসাইন এবং পিসি দাশের বই দুটি বেশ কাজে এসেছে। পাশাপাশি English For Competitive Exam বইটিও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। ইংরেজি পত্রপত্রিকার সম্পাদকীয় নিয়মিত পড়েছি।

গণিত প্রস্তুতির জন্য প্রথমে গণিতের সূত্রের চার্ট কিনে বেসিক সূত্রগুলো মুখস্থ করে ফেলি। দিনে দু-তিনটি করে দেখেছি। একসঙ্গে বেশি সূত্র পড়লে অনেক সময় মনে থাকে না। আর গণিতের ক্ষেত্রে সূত্রেই যদি ভুল হয়, তাহলে গোটা অঙ্কটাই ভুল হবে; সমাধান পর্যন্ত যাওয়া যাবে না। দেখলাম, মাস দুয়েকের মধ্যে সব সূত্র শেখা শেষ। পাশাপাশি রুটিন করে করে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির গণিত বইয়ের অঙ্কগুলো করেছি। এগুলো শুধু বিসিএস প্রিলি না, পরে রিটেন ও ব্যাংকের পরীক্ষাগুলোয়ও আমাকে দারুণভাবে হেল্প করেছে। এরপর বিসিএস প্রিলিতে আসা আগের বছরগুলোর গণিত প্রশ্নগুলোর সমাধান করেছি। যখন কোথাও খটকা লেগেছে, তখনই ক্লিয়ার হয়েছি।

বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় আসা গণিত প্রশ্নের বই বাজারে পাওয়া যায়, সেগুলোও দেখেছি।

আমার মতে, গণিতের সূত্র মুখস্থ করার পর ব্যাপকভাবে চর্চা করলে দুর্বল প্রার্থীও গণিতের ‘মাস্টার’ হয়ে উঠবে!  আর এর জন্য শর্টকাট চিন্তা না করে বিস্তরভাবে আগাগোড়া চর্চা করতে হবে। তখন নিজেই শর্টকাট মেথড বের করতে পারবেন; কিন্তু শেখা বা চর্চার সময়ই যদি শর্টকাট অ্যাপ্লাই করেন, তাহলে গোড়ায়ই গড়বড় থেকে যাবে। তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে শর্টকাটে মনে রাখা যায়, তবে সব কিছুতে নয়।

 

মন্তব্য