kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নোবেল পুরস্কার ২০১৯

তামান্না মিনহাজ

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নোবেল পুরস্কার ২০১৯

বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয় নোবেলকে। ১৮৯৫ সালে নিজের নামে এ পুরস্কার প্রচলনের ঘোষণা দেন সুইডিশ উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল। ডিনামাইট আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত এ বিজ্ঞানী ওই বছর তাঁর সম্পত্তির ইচ্ছাপত্রে নোবেল পুরস্কারের জন্য তহবিল তৈরির কথা উল্লেখ করে যান। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তি থেকে ৩১.৫ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (বর্তমান হিসাবে ২২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার) নিয়ে নোবেল ফাউন্ডেশন কাজ শুরু করে। ১৯০১ সালে এ ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে প্রথম নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এর পর থেকে মাঝের কয়েক বছর বাদ দিয়ে প্রতিবছরই নোবেল ফাউন্ডেশন সম্মানজনক এ পুরস্কার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা গুণীজনদের দিয়ে আসছে। আলফ্রেড নোবেলের উইলে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য ও শান্তি—এই পাঁচটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু তাঁর উইলের বাইরেও ১৯৬৯ সালে নতুন আরেকটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বছর সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয় অর্থনীতিতে।

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে সম্মানের বিষয়টি জড়িত হলেও এর আর্থিক মূল্যও নেহাত কম নয়। এ বছর নোবেল লরেটরা পুরস্কারের সঙ্গে ৯০ লাখ ক্রোনা করে পাবেন।

যদি এক বিষয়ে একাধিক ব্যক্তি পুরস্কার পেয়ে থাকেন, তবে তাঁদের মধ্যে পুরস্কারের অর্থ ভাগ করে দেওয়া হয়। এ বছর এরই মধ্যে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য, অর্থনীতি ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাহিত্যে নোবেলপ্রাপ্ত অস্ট্রিয়ার কবি-লেখককে নিয়ে বিতর্কও শুরু হয়ে গেছে।

 

‘ঝগড়া’ মিটিয়ে শান্তির নোবেল                               

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দশকের যুদ্ধ মিটিয়ে ২০১৯ সালের  নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলি। শুধু তাঁর নিজের দেশ ইথিওপিয়ায়ই নয়, গোটা উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় শান্তি ফেরাতে আবির যে পদক্ষেপ, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গত বছর ২ এপ্রিল ক্ষমতায় আসেন আহমেদ। এসেই একগুচ্ছ ‘সাহসী এবং বৈপ্লবিক’ সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেন, বন্দি সাংবাদিকদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়। দেশের নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েছেন তিনি। দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদে বহু নারীকে নিয়ে এসে এক ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’ও করে ফেলেছেন তিনি। তবে এ দেড় বছরে আহমেদের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ২০ বছরেরও বেশি পুরনো যুদ্ধে ইতি টানা। এখন দুটি দেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে দূতাবাস খুলেছে। কূটনৈতিক সংযোগ স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগও বেড়েছে। এত কম সময়ে এভাবে যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি ফেরানোর ঘটনা আধুনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।

 

প্রান্তবাসীদের গল্পকেই কুর্নিশ সাহিত্যে

পোলিশ ঔপন্যাসিক ওলগা তোকারচুক এবং অস্ট্রীয় লেখক পিটার হান্ডকে যথাক্রমে ২০১৮ ও ২০১৯ সালের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন। মানুষের জীবন যে নানা ধরনের সীমানা অতিক্রমের কাহিনি, সেটাই ওলগা তাঁর লেখার মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর পিটার হান্ডকে আমাদের মানব অস্তিত্বের একেবারে খাদে নিয়ে যান। তাঁর ভাষা ব্যবহার অনন্য, স্বতন্ত্র। দুজনকেই ‘প্রান্তবাসীদের কাহিনিকার’ বলে উল্লেখ করেছে নোবেল কমিটি। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের তালিকায় ওলগা ১৫তম নারী প্রাপক।

যৌন কেলেঙ্কারি ও আর্থিক দুর্নীতিতে নোবেল সাহিত্য একাডেমির সাবেক সদস্য ক্যাটরিনা ফ্রস্টেনসনের স্বামী, ফরাসি চিত্রগ্রাহক জঁ ক্লদ আর্নোর নাম জড়ানোর পরে ২০১৭ সালে কমিটির অনেক সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। অর্নোর বিরুদ্ধে দুটি ধর্ষণ মামলার অভিযোগও আছে। অর্থের বিনিময়ে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপকের নাম ফাঁস করে দিয়েছিলেন তিনি। সেই বিতর্কের পর গত বছর মে মাসে একাডেমি সাহিত্যে নোবেল ঘোষণা করা হবে না বলে জানানো হয়। ১৯০১ সালে শুরু হওয়া নোবেল পুরস্কার ঘোষণায় ছেদ পড়েছিল সাতবার, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য। কোনো কেলেঙ্কারির জন্য নোবেল ঘোষণা বন্ধ থাকার ঘটনা সেটাই প্রথম। বলে রাখা ভালো, বিজ্ঞান বা শান্তি পুরস্কারে একাধিকবার যৌথ প্রাপক থাকলেও এখনো পর্যন্ত সাহিত্যে কোনো যুগ্ম প্রাপক হননি।

পোলিশ সাহিত্যের দুনিয়ায় ৫৭ বছর বয়সী ওলগা তোকারচুক অতি পরিচিত নাম। ‘বিগুনি’ উপন্যাসটির জন্য গত বছর ম্যানবুকার পুরস্কার পান তিনি।

অনুবাদের কল্যাণে বাঙালি পাঠকের কাছে পরিচিত নাম পিটার হান্ডকে। সোভিয়েত অধিকৃত বার্লিনে শৈশব কাটানোর পরে ছয় বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে অস্ট্রিয়া চলে এসেছিলেন পিটার হান্ডকে। পিটারের যখন ৯ বছর বয়স, তখন আত্মহত্যা করেন তাঁর মা। মাতাল সত্বাবার বাড়িতেই কৈশোর কেটেছে পিটারের। পরে চলে যান বোর্ডিং স্কুলে। ছেলেবেলার সেই নানা ধরনের না পাওয়াকে তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসের বিষয়বস্তু করেছেন পিটার। তবে সার্বীয় জাতীয়তাবাদ বা যুগোস্লাভ যুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর দক্ষিণপন্থী কথাবার্তার জন্য বহু সমালোচিতও হয়েছেন। বিতর্কের জন্য বহু পুরস্কারে তাঁর নাম ঘোষণা করা হলেও পরে তা বাতিল করে দেওয়া হয়। এবারও বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে, যাতে অংশ নিতে দেখা যায় নানা দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকেও।

 

চিকিৎসা, পদার্থ ও রসায়ন

মানবদেহে কোষ কী করে অক্সিজেনের উপস্থিতি টের পায় এবং এর সঙ্গে মানিয়ে নেয় তা আবিষ্কারের জন্য এবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম কায়েলিন জুনিয়র, স্যার পিটার জে র‌্যাটক্লিফ ও গ্রেগ এল সোমেনজাকে। ভৌত বিশ্বতত্ত্ব নামক জ্ঞানের শাখায় একাধিক তাত্ত্বিক আবিষ্কার ও সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণমান একটি গ্রহ আবিষ্কারের জন্য যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জিম বিপলস এবং সুইজারল্যান্ডের মিশেল মাইওর ও দিদিয়ে কোলজকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। লিথিয়াম আয়োন ব্যাটারি উদ্ভাবনের জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জন গুডেনো, স্টানলি হুইটিংহ্যাম ও জাপানের আকিরা ইওশিনো। জন গুডেনোর বয়স ৯৭, তিনি সবচেয়ে বর্ষীয়ান নোবেল বিজয়ী। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি আমাদের আধুনিক সভ্যতার ধারক। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক গাড়ি—সব জায়গায়ই এই ব্যাটারি তার ছোট আকার, শক্তি ও ক্ষমতার জন্য ব্যবহার করা হয়।

 

দারিদ্র্য বিমোচনের পথ দেখিয়ে অর্থনীতিতে নোবেল

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ অভিজিত ব্যানার্জি, ফরাসি-আমেরিকান এসতার ডুফলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাইকেল ক্রেমের এ বছর (২০১৯) অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। দারিদ্র্য নিয়ে কাজ করার জন্য সুইডিশ রয়াল একাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁদের এ পুরস্কারে ভূষিত করে। জুরি বোর্ড এক বিবৃতিতে জানায়, বৈশ্বিক দারিদ্র্য নির্মূলে উন্নয়ন অর্থনীতির গবেষণার ধরন পাল্টে দেওয়ায় তাঁদের নির্বাচিত করা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসার ব্যাপারেও নতুন করে ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছে তাঁদের গবেষণা। ডুফলো গত ৫০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় নারী হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল জিতলেন। তিনি ও তাঁর স্বামী অভিজিত ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। অমর্ত্য সেনের পর অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া দ্বিতীয় বাঙালি অভিজিতের জন্ম কলকাতায়।

ক্রেমের অধ্যাপনা করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে নোবেল বিজয়ীদের হাতে সনদ, মেডেল ও নোবেলের অর্থমূল্য তুলে দেওয়া হবে।

মন্তব্য