kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

সুদানে সেনাদের সঙ্গে সমঝোতা

শান্তি ফিরবে কি?

তামান্না মিনহাজ   

১০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শান্তি ফিরবে কি?

উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার দেশ সুদান রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতিসংকটে জর্জরিত। সংঘাত আর দারিদ্র্য কখনোই একসময়ের তেলসমৃদ্ধ এই দেশটির পিছু ছাড়েনি। স্বৈরশাসক ওমর আল বশিরের দীর্ঘকালের অপশাসন, গৃহযুদ্ধ, দুর্নীতি দেশটিকে নিকষ কালো অন্ধকারে আবৃত করে রেখেছিল। যে আঁধার বশিরের পতনের পরও দূর হয়নি। বশিরের পর দেশটির ঘাড়ে চেপে বসে সামরিক শাসন। তীব্র আন্দোলন আর বহু হতাহতের ঘটনার পর সম্প্রতি সেই সামরিক শাসকদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছতে পেরেছে জনতা। যৌথ শাসনের সম্মতি আদায় করে নিয়েছে তারা। তবে এর ফল আদতে সুখকর হবে কি না নিশ্চিত হতে অপেক্ষা করতে হবে। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলে, আপাতদৃষ্টে যা সমাধান, চূড়ান্ত অর্থে তা দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগেরই নামান্তর।

এমন সমাধান হিসেবেই সুদানের ওপর নাজিল হয়েছিলেন ওমর আল বশির। বশিরের রাজনৈতিক জীবনকে যুদ্ধ দিয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করা যায়। ১৯৮৯ সালে ক্ষমতা নিয়ে শক্ত হাতে তিনি  দেশ পরিচালনা শুরু করেন। ২০১১ সালে বিভক্ত হয়ে দক্ষিণ সুদানের জন্ম না হওয়া পর্যন্ত এই দেশটিই ছিল আফ্রিকার সবচেয়ে বড় দেশ। যখন তিনি ক্ষমতা দখল করেন, তখন উত্তর আর দক্ষিণ সুদানের মধ্যে ২১ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলছিল। শক্ত হাতে জবাব দিতে শুরু করেন বশির। তাঁর বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।

আইসিসির যেসব অভিযোগ রয়েছে তার মধ্যে আছে—গণহত্যা, হত্যা, জোর করে বাস্তুচ্যুত করা, ধর্ষণ, নির্যাতন, দারফুরে বেসামরিক লোকজনের ওপর হামলা, গ্রাম ও শহরে লুটতরাজ।

২০০৯ ও ২০১০ সালে তাঁর নামে দুইটি আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারের পরোয়ানা জারি করা হয়।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে তাঁর ওপর আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়। তার পরও বশির মিসর, সৌদি আরব আর দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণ করেন। ২০১৫ সালের জুনে তিনি অনেকটা বিব্রতকরভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন, কারণ দেশটির একটি আদালত বিবেচনা করছিলেন যে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি কার্যকর করা হবে কি না।

আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি ২০১০ ও ২০১৫ সালের দুইটি নির্বাচনে বিজয়ী হন। তাঁর সর্বশেষ নির্বাচনটি অবশ্য বিরোধীরা বর্জন করে।

ক্ষমতা গ্রহণের আগে সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন বশির। তিনি বিদ্রোহী নেতা জন গ্যারাঙ্গের (দক্ষিণ সুদান স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা) বিরুদ্ধে বেশির ভাগ অভিযান পরিচালনা করেন। যখন তিনি সুদানিজ পিপলস লিবারেশন মুভমেন্টের পক্ষে গ্যারাঙ্গের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন, তখন বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যাতে চুক্তিটি পরাজয় বলে মনে না হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা অসহায় হয়ে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করিনি; বরং আমরা বিজয়ের শীর্ষে থেকে তাতে স্বাক্ষর করেছি।’

সব সময়ই তাঁর লক্ষ্য ছিল একীভূত সুদান; কিন্তু শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ সুদানের বিষয়ে একটি গণভোট আয়োজন করতে তিনি বাধ্য হন। ২০১১ সালের জানুয়ারির গণভোটে ৯৯ শতাংশ দক্ষিণ সুদানিজ আলাদা হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। ছয় মাস পরে দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। যখন তিনি দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতার পক্ষে সম্মত হন, তখনো দারফুরের প্রতি তাঁর মনোভাব ছিল আগ্রাসী।

সম্প্রতি দেশটিতে রাজনৈতিক বিক্ষোভ জোরালো হয়ে ওঠে। সরকার তেল ও রুটির দাম বাড়ানোর পর বশিরের ৩০ বছর ব্যাপী শাসনামলের মধ্যে গত ডিসেম্বরে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ শুরু হয়। কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিকভাবে সংকটে ভুগছে সুদান, বিশেষ করে দক্ষিণ সুদান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর। কারণ বেশিরভাগ তেল উত্তোলন ক্ষেত্র দক্ষিণ সুদানে। মুদ্রামান কমে যাওয়া ও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংকটে পড়ে দেশের মানুষ। বশিরের শাসনামলে দেশটি ২০১৮ সালের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির তালিকায় ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭২ নম্বরে স্থান পায়।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক বছর মেয়াদি জরুরি অবস্থা জারি করেন বশির। মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনেন এবং দেশের সব স্টেট সরকারের গভর্নরদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বসিয়ে দেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবিও নাকচ করে দেন। তাঁর দাবি, বিক্ষোভকারীরা ২০২০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁকে সরিয়ে দিতে পারবে। বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে সরকারের বিরুদ্ধে।

কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে গত ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ৩৮ জন নিহত হয়েছে। যদিও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি। জাতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, তারা সব রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিতে যাচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে গত ১১ এপ্রিল বশির পদত্যাগ করেন। সুদানে যেভাবে তাঁর শাসনামল শুরু হয়েছিল, সেভাবেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। বশিরের পর একটি অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক কাউন্সিল দুই বছরের জন্য দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। একটি নির্বাচন আয়োজন করাই হবে তাদের দায়িত্ব। তিন মাসের জন্য দেশটিতে জরুরি অবস্থা এবং এক মাসের জন্য কারফিউ জারি করা হয়। ওমর আল বশিরকে গ্রেপ্তার করে একটি নিরাপদ স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।

তবে এতেও স্বৈরশাসনের ছায়া দেখতে পায় জনতা। আবারও আন্দোলন শুরু করে তারা। লাখো মানুষ পথে নেমে আসে। পুলিশ শক্তি প্রয়োগ করলে নিহত হয় সাতজন। আহত হয় প্রায় ২০০।

পরিস্থিতি চরমে উঠলে নমনীয় হয় সেনাবাহিনী।

পরবর্তী সময়ে সাধারণ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আগামী তিন বছর ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছে সুদানের সেনাবাহিনী ও বিরোধী জোট। রাজধানী খার্তুমে দুই দিনের আলোচনা শেষে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। চুক্তি অনুসারে ১৮ মাস সেনাবাহিনীর কাছে সার্বভৌম পরিষদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং বেসামরিক প্রশাসনের হাতে থাকবে ১৮ মাস। অন্তর্বর্তীকালীন পর্ব শেষ হলে সুদানে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করা হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় এটি হচ্ছে প্রথম পদক্ষেপ। তবে মূল চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন এবং একটি বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া। সেটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সুদানে শান্তি ফিরছে কি না তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

মন্তব্য