kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

স্বাধীনতা প্রশ্নে কাতালোনিয়া

তামান্না মিনহাজ

১১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঙ্গরাজ্য কাতালোনিয়া। এর স্বাধীনতার প্রশ্নে স্পেন রাজতন্ত্রে তৈরি হয়েছে সাংবিধানিক সংকট। অঞ্চলটির ৯০ শতাংশ মানুষই স্পেন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে এক গণভোটে। এ গণভোটকে অবৈধ ঘোষণা করে এর ফলাফল নাকচ করে দিয়েছে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার। দেশটির রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ অভিহিত করে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিচ্ছিন্নতার পক্ষে নয়। এর মধ্যেই আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে ৯ অক্টোবর কাতালান পার্লামেন্টে অধিবেশন বসে। অঞ্চলটির প্রেসিডেন্ট কার্লেস পুজদেমন কী সিদ্ধান্ত নেন, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।

ইতিহাস-ঐতিহ্য

স্পেনের পূর্ব প্রান্তে ভূমধ্যসাগর ঘিরে কাতালোনিয়ার অবস্থান। অঞ্চলটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি চারটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত—বার্সেলোনা, গিরোনা, লেইদা ও তারাগোনা। এর রাজধানী ও সর্ববৃহত্ শহর বার্সেলোনা, যা মাদ্রিদের পর স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। ইউরোপে এর স্থান সপ্তম। ফুটবল ও পর্যটনের কারণে বার্সেলোনা বিশ্বের জনপ্রিয় শহরগুলোর একটি। কাতালোনিয়ার আয়তন ৩২ হাজার ১১৪ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৭৫ লাখ। স্পেনের ১৬ শতাংশ মানুষের বাস এখানে। সরকারি ভাষা কাতালান ও স্প্যানিশ। স্পেনের জিডিপির ১৯ শতাংশ আর রপ্তানি আয়ের এক-চতুর্থাংশ আসে কাতালোনিয়া থেকে।

স্পেনের সমৃদ্ধ অঞ্চল কাতালোনিয়া। এর লিখিত ইতিহাস এক হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। স্পেনের গৃহযুদ্ধের আগে এই অঞ্চলে অনেক বেশি স্বায়ত্তশাসন ছিল। কিন্তু ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনের সময় কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসনকে নানাভাবে খর্ব করা হয়। ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর সেখানকার জাতীয়তাবাদ আবার শক্তিশালী হতে শুরু করে। আন্দোলন ও দাবির মুখে ১৯৭৮ সালের সংবিধানের আওতায় স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কাতালোনিয়াকে আরো কিছু ক্ষমতা দিয়ে স্পেনের পার্লামেন্টে ২০০৬ সালে একটি আইন প্রণয়ন করে। কাতালোনিয়াকে উল্লেখ করা হয় একটি ‘জাতি’ হিসেবে।

স্বাধীনতা দাবির কারণ

কাতালোনিয়াকে দেওয়া অনেক ক্ষমতা ২০০৯ সালে বাতিল করে দেন স্পেনের সাংবিধানিক আদালত, যা তাদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা। কাতালানরা মনে করে, তাদের উপার্জিত অর্থ কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ে যাচ্ছে। তাদের ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। ২০১৪ সালে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গণভোটের আয়োজন করে কাতালোনিয়া। তখন ভোটার ছিল ৫৪ লাখ। ভোট পড়ে ২০ লাখের বেশি। স্পেন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দেয় ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোটার। ওই সময়ই তারা একটি গণভোট আয়োজনের কথা বলে, যার আইনি বৈধতা থাকবে। স্পেনের সংবিধানকে লঙ্ঘন করেই তারা এই ঘোষণা দেয়। সংবিধানে বলা আছে, স্পেনকে ভাগ করা যাবে না।

গণভোট প্রশ্নে আইন

২০ সেপ্টেম্বর গণভোট প্রসঙ্গে একটি আইন করা হয় কাতালান পার্লামেন্টে। সেখানে প্রশ্ন রাখা হয় —‘আপনারা কি চান কাতালোনিয়া প্রজাতন্ত্রের কাঠামোয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে উঠুক?’ ভোটে দুটি অপশন রাখা হয়—‘হ্যাঁ’ ও ‘না’। ভোটের ফলাফল মানা বাধ্যতামূলক করা হয়। ফল ইতিবাচক হলে কাতালোনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করার কথাও বলা হয়। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়ে গণভোটকে অবৈধ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত নরম সুরে কিন্তু কঠোর করে বলতে চাই কোনো গণভোট হবে না।’ প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে কাতালোনিয়ার আইনটিকে বাতিল করে দেন স্পেনের সাংবিধানিক আদালত। এতে কাতালানরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার কাতালোনিয়ার অর্থনীতি ও পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে।

১ অক্টোবরের গণভোট

ভোটের আগে ও পরে বার্সেলোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় স্বাধীনতার পক্ষে সমাবেশ হয়। এতে লাখ লাখ লোক অংশ নেয়। কার্লেস পুজদেমন বলেন, স্পেন থেকে স্বাধীনতা পেতে গণভোটের আয়োজন করায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এতে তিনি ভয় পান না। ভোট ঠেকানোর জন্য কাতালোনিয়ায় হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন করে কেন্দ্রীয় সরকার। ২০ হাজার ৩১৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৩ হাজার ৯৯টিই বন্ধ করে দেয় পুলিশ। ভোটের সরঞ্জাম তছনছ করে। গণভোট চলাকালে কেন্দ্রীয় পুলিশের বাধায় আহত হয় প্রায় ৯০০ লোক। ৩৩ জন পুলিশ সদস্যও আহত হয়। ভোটের ফল ঘোষণা করতে কয়েক দিন সময় নেয় কাতালোনিয়ার নির্বাচন কমিশন। ৬ অক্টোবর প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, ৯০ শতাংশই পড়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বলছে, ভোটে অনিয়ম ও জালিয়াতি হয়েছে। কাতালান সরকার জানায়, ৯ অক্টোবর পার্লামেন্ট অধিবেশনের দিন বা এই সপ্তাহের মধ্যেই স্বাধীনতার ঘোষণা আসবে। স্পেন সরকারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় তারা। ধর্মঘটের ডাক দিয়ে বার্সেলোনা বন্দরও বন্ধ রাখা হয়।

কোনোভাবেই স্বাধীনতা নয়

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার দাবি কখনোই মেনে নেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। সংলাপেও রাজি না তারা। তবে কাতালোনিয়ার কর কমানো ও সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় তারা। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়ে তাঁর সর্বশেষ ভাষণেও স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইনের বাইরে তিনি যাবেন না। সংলাপে বসবেন না। প্রয়োজনে কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসন স্থগিত করা হবে। যদিও কাতালোনিয়ার সঙ্গে সংলাপ শুরুর দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে মাদ্রিদসহ পুরো স্পেনে। খোদ বার্সেলোনায়ও রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে এ সংকট সমাধানের দাবিতে বিক্ষোভ করেন ঐক্যবদ্ধ স্পেনের সমর্থকরা।

প্রতিক্রিয়া

ইউরোপীয় কমিশনের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কাতালোনিয়ায় যা হচ্ছে তা স্পেনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।’ এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন কাতালান নেতা পুজদেমন। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান মন্তব্য করেছে, সম্প্রতি কাতালোনিয়ার গণভোট ঠেকাতে স্পেন কর্তৃপক্ষের শক্তি প্রদর্শন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি দেশটির প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দেশটির স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এগোচ্ছিল স্পেন। সেটির ওপর আঘাত এলো এ ঘটনায়। পত্রিকাটি সতর্ক করে, এই গণভোটের প্রভাব স্পেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে স্পেনের বাইরেও।

প্রভাব পড়বে পুরো ইউরোপে

বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা বিশ্বের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। যুগোস্লাভিয়া খণ্ডবিখণ্ড হয়ে সাতটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। অপেক্ষাকৃত ছোট চেকোস্লোভাকিয়াও এক থাকতে পারেনি। চেক ও স্লোভাকিয়া নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে। ধারণা করা হয়েছিল, এই ভাঙন সাবেক সমাজতান্ত্রিক বলয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু তা হয়নি। স্কটল্যান্ড ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে যেতে চায়, কানাডা থেকে আলাদা হতে চায় কুইবেক। দীর্ঘকাল ধরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইতালির উত্তরাঞ্চলে নর্দান লিগ বিচ্ছিন্নতার দাবিতে উচ্চকিত। জার্মানির দক্ষিণাঞ্চলের বাভারিয়ান জাতীয়তাবাদীদের মধ্যেও বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা রয়েছে। কাতালোনিয়া উদাহরণ তৈরি করতে পারলে ইউরোপের ওই সব অঞ্চলে স্বাধীনতার দাবি ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের প্রস্থানও এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা। সংগতভাবেই কাতালোনিয়াকে সমর্থন দিচ্ছে না জোটটি। এ প্রবণতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্যের চেতনাকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মন্তব্য