kalerkantho

সোমবার । ২২ আষাঢ় ১৪২৭। ৬ জুলাই ২০২০। ১৪ জিলকদ  ১৪৪১

সজীবের ‘আভা ফাউন্ডেশন’

৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সজীবের ‘আভা ফাউন্ডেশন’

ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শেখ সজীব নামে এক তরুণ গড়ে তুলেছেন ‘ড্রিম স্কুল’। শুধু তা-ই নয়, তাঁর ‘আভা ফাউন্ডেশন’ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঁচ বছর ধরে বিনা মূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। বয়স্ক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য প্রতি সপ্তাহে সরবরাহ করে নিজেদের তৈরি সুস্বাদু খাবার। গ্রামীণ মানুষদের পাঁচ টাকায় দেওয়া হয় ডিজিটাল সেবা। ড্রিম স্কুলসহ আভা ফাউন্ডেশনের নানা কাজের গল্প শোনাচ্ছেন সজীব আহমেদ

 

রেলস্টেশনের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ‘ড্রিম স্কুল’

ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে কমিউটার ট্রেন আসবে এখনই। চাপকলের পানি ব্যবহূত বোতলে ভরে অপেক্ষা করছে ড্রিম স্কুলের শিক্ষার্থী ১০ বছরের শ্রাবণ। ট্রেন এলেই চিত্কার জুড়ে দেব ‘প্রতি বোতল পাঁচ টাকা’। মা-বাবাহীন শ্রাবণের ঠাঁই হয়েছে পাতানো এক বৃদ্ধা নানির কাছে। পরিত্যক্ত রেললাইনের ওপর পলিথিনের ঘরে থাকে। দুজনই পানি বিক্রেতা, তা দিয়ে কখনো দুমুঠো খেতে পায়, কখনো পায় না। সেদিন বিকেলে তার তাড়াহুড়া একটু বেশিই। একদিকে ট্রেনটি স্টেশনে আসতে দেরি করেছে, অন্যদিকে তার জন্য অপেক্ষায় আছেন শিক্ষকরা। শেষ পর্যন্ত ট্রেন এলো। পানিভর্তি বোতল বিক্রি শেষে দৌড়ে নানির হাতে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে বই নিয়ে সোজা স্কুলে চলে এলো। আগে দৃশ্যগুলো এমন ছিল না। শ্রাবণ চাইত স্কুলে যেতে। নানিকে অনেক বলে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তিও হয়েছিল। কিন্তু বেশিদিন সেখানে পড়ালেখা করতে পারেনি, কারণ সে বেড়ে উঠেছে রেলস্টেশনের পলিথিনের ঘরে। শুধু যে সহপাঠীদের কাছে থেকে তা নয়, শিক্ষকদের কাছ থেকেও পেয়েছে অনাদর। শ্রাবণের মতো এমন অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাই পড়াশোনা করছে ‘ড্রিম স্কুলে’। ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের ছিন্নমূল ও দুস্থ শিশুদের নিয়েও কাজ করছে শেখ সজীবের ‘আভা ফাউন্ডেশন’। এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সচেতন করতে গত বছর রেলস্টেশনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকে স্বাস্থ্যসম্মত করে তাদের জন্য শুরু করা হয় ড্রিম স্কুলের কার্যক্রম। ৪ থেকে ১০ বছরের শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিয়ে কাজ করে তারা। বর্তমানে ড্রিম স্কুলটিতে মোট ৩৯ জন শিশুকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আভা ফাউন্ডেশনের সদস্য। তাঁরা বিনা বেতনে এ কাজ করছেন। শুরুতে শিশুরা স্কুলে পড়তে আসতে চাইলে অভিভাবকরা বাধা দিয়ে বলতেন, ‘পড়লে কি তাঁহারা (স্কুল শিক্ষকরা) টাহা দিব, ইস্কুলে যাওনের দরহার নাই, যা, রেলের থাইকা বুতল টুহায়া আনগা, মাইনসের কাছ থাইকা চাইয়া চাইয়া টাহা তুইল্লা আনগা, পড়তে ওইব না, পড়লে কী ওইব, খাইবার চাইলে এহনি যা।’ রেলস্টেশনের প্রায় প্রত্যেক সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জীবনচিত্র এমনই ছিল। ড্রিম স্কুলের তরুণ শিক্ষকরা অসচেতন অভিভাবকদের বুঝিয়ে শিশুদের স্কুলে নিয়ে এসেছেন। শিক্ষকদের আন্তরিকতায় ও ভালোবাসায় তারা এখন পড়তেও পারে, লিখতেও পারে। নিয়মিত স্কুলেও আসে। ক্লাসের সময় হালকা নাশতার পাশাপাশি বিশেষ দিনগুলোতে তাদের নিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয়, ব্যবস্থা করা হয় নতুন জামা-কাপড়ের। 

যেভাবে শুরু

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ সজীবের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার চরকুশলী গ্রামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই তাঁর ‘আভা ফাউন্ডেশন’ অবস্থিত। দেশকে ডিজিটালাইজড করার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৫ সালে সম্পূর্ণ নিজের অর্থায়নে ভাড়া করা একটি ভবনে ‘আভা ফাউন্ডেশন’-এর কার্যক্রম শুরু করেন। শুরুটা ছিল অনেক কঠিন, ছিল না তেমন কোনো সরঞ্জাম। এ পরিস্থিতিতে গ্রামের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৬ সালে আরো বড় পরিসরে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। সেই সঙ্গে আরম্ভ হয় আভা শেয়ার পয়েন্টের যাত্রা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তাঁদের মধ্য থেকে কিছু শিক্ষার্থী নির্বাচিত হন আবার বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য। তাঁরা পরবর্তী সময়ে শেয়ার পয়েন্টে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এভাবেই চলছে শেয়ার পয়েন্ট, যেখানে শিক্ষার্থীরা শেয়ার করছেন বাস্তব অভিজ্ঞতা, তাঁদের জ্ঞান। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত আড়াই হাজারেরও বেশি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যে কেউ ইচ্ছা করলেই এখান থেকে ছয় মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে পারছেন। এমএস ওয়ার্ড, এমএস এক্সেল, এমএস পাওয়ার পয়েন্ট, এডোব ফটোশপ, কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং, ইন্টারনেট এবং ই-মেইলের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আভা ফাউন্ডেশন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে এই এলাকার নতুন কুঁড়ি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু তোরাব। সে জানায়, ‘এখানে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কম্পিউটারে বাংলা-ইংরেজি টাইপিং, ছবির কাজ ও ইন্টারনেটে ই-মেইল করাসহ বিভিন্ন কাজ করতে পারি। আমার মতো এখন আমাদের এলাকার যারা পড়াশোনা করছে, সবাই এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কম্পিউটার চালাতে পারে।’

 

ডিজিটাল সেবা

আভা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষদের দেওয়া হয় পাঁচ টাকায় ডিজিটাল সেবা। এ ডিজিটাল সেবায় অনলাইনে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন, ই-মেইল, ছবি তোলা, কম্পোজ, পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল জানানো, স্কলারলিপ, চাকরি ও পাসপোর্টের আবেদন—সব কিছুই করা যায়। সম্প্রতি আভা ফাউন্ডেশনে গিয়ে দেখা যায়, এ ফাউন্ডেশনের ডিজিটাল সেবাকেন্দ্রে সেবা নিচ্ছেন কয়েকজন। ছলিমপুর গ্রামের মধ্যবয়সী আবদুল আজিজ এসেছেন ই-মেইল করতে। বলেন, ‘অন্য যেকোনো কম্পিউটারের দোকান থেকে বিদেশে একটি পাসপোর্ট স্ক্যান করে ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠাতে ৫০ টাকা খরচ হয়ে যেত। এ সেবাটি চালু করায় এখন পাঁচ টাকায় অতি সহজেই বিদেশে স্ক্যান করে ই-মেইল পাঠাতে পারছি।’ এদিকে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের দিন সকাল থেকেই আভা ফাউন্ডেশনে ভিড় জমায় রেজাল্ট প্রত্যাশী শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা। এমনকি রেজাল্ট প্রকাশ হলে অনেকেই মিষ্টি নিয়ে হাজির হন ফাউন্ডেশনের সদস্যদের খাওয়াতে।

 

বয়স্ক এবং সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য আভা কিচেন

সারা দিন কিছু খায়নি অনিক। খাবারের জন্য ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের পাশের বিভিন্ন হোটেলের সামনে ঘুরঘুর করছে। ক্ষুধায় পেট ব্যথা করছে। প্রতি সপ্তাহের মতো এই শনিবারও বিকেল ৩টার দিকে আভা ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার নিয়ে হাজির স্টেশনে। মুখে হাসি ফুটল অনিকের। তার হাতে খাবারের বক্স ধরিয়ে দেয় একজন। বক্স খুলতেই বিরিয়ানির মিষ্টি গন্ধ এসে নাকে লাগল অনিকের। তৃপ্তি নিয়ে খেতে শুরু করল। ওর মতো শতাধিক দুস্থ, বয়স্ক এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুর নিয়মিত মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই এই আয়োজন। আভা ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকরা চেষ্টা করেন দেশের নামিদামি রেস্টুরেন্টে তৈরি হয় এমন প্রায় সব ধরনের খাবার তৈরি করতে। এগুলোর বেশির ভাগই তাঁরা তৈরি করেন ইন্টারনেট ঘেঁটে। যাঁরা আগে কখনো চুলার কাছেই যাওয়ার সাহস করেননি, সেই তাঁরাই তৈরি করছেন বিরিয়ানি, পোলাও, ফ্রাইড রাইস, ফ্রাইড চিকেন, চিকেন টিক্কা, বিভিন্ন শীতকালীন পিঠাসহ নানা ধরনের খাবার। এ ছাড়া দুধ, ডিম, আপেল, কমলা, আঙুরসহ বিভিন্ন দেশি ফল সরবরাহ করা হয়। এদিকে রেলস্টেশনে থাকা প্রসূতি মায়েদের পুষ্টির জন্য দেওয়া হয় গরুর দুধ, ডিম, কলাসহ নানা পুষ্টিকর খাবার। অবশ্য এসব খাবারের খরচ অনেকটাই বহন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষরা।

 

শেখ সজীব বলেন

তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে সবার কাছে ইন্টারনেট সেবা সহজলভ্য; কিন্তু খুব কম শিক্ষার্থীই তথ্য-প্রযুক্তি যথাযথ ব্যবহার করছে। সাধারণত শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং অনলাইনভিত্তিক ভিডিও সাইটগুলোতে প্রচুর সময় অপচয় করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেও অনেকেই কম্পিউটারের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাবে চাকরি পাচ্ছেন না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও গুরুত্ব দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আমরা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি, যেখানে শিক্ষার্থীরাই কম্পিউটার শিখবে এবং অন্যদের শেখাতে পারবে।

আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা দুস্থ, বয়স্ক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য নিজেদের হাতে তৈরি করছে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার। রেলস্টেশনের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনার জন্য স্টেশনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকে স্বাস্থ্যসস্মত করে পরিচালনা করছে ড্রিম স্কুলের কার্যক্রম। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শেয়ার পয়েন্ট স্থাপনের জন্য পরিকল্পনা করেছি, এটা ব্যক্তিগত অর্থায়নে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সবার সহযোগিতা চাই।

মন্তব্য