kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

আলোর পথে

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘আলোকিত স্নানঘাটা’। শিক্ষার আলো ছড়ানো ও সমাজসচেতনতায় এখনো কাজ করছে সংগঠনটি। এর পথচলার গল্প শোনাচ্ছেন নাদিম মজিদ

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আলোর পথে

‘আলোকিত স্নানঘাটা’র কয়েক সদস্য

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ক্যামিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আহাদুজ্জামান নাহিদ এসএসসি পাস করেছিলেন মাদারীপুরের কালকিনী উপজেলার স্নানঘাটা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। তখন বুয়েট, মেডিক্যাল কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে খুব একটা ধারণা ছিল না তাঁর। উচ্চশিক্ষার এসব প্রতিষ্ঠানের কথা বিস্তারিত জেনেছেন উচ্চমাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষে উঠে। ২০১৪ সালে তিনি যখন বুয়েটে তৃতীয় বর্ষে পড়েন, একদিন গ্রামের বাজারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে আলাপ হয়। এলাকার স্কুল শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য তৈরি করার বুদ্ধি বের করেন তাঁরা। কেননা নিজেদের সময়ে এ নিয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়ার মতো তেমন কাউকে তাঁরা পাননি। তাই যোগাযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়া সেই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। একে একে জড়ো হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের নুসরাত জাহান সুরভী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানের রাশেদ রানা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের সাজ্জাদ আহমেদ সালাহউদ্দিন, খুলনা সরকারি বিএল কলেজের বাংলা সাহিত্যের রাশেদুল ইসলাম, মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের দর্শনের আরিফুল ইসলাম ও ইংরেজি সাহিত্যের সাইফুল ইসলাম, ঢাকা কলেজের সমাজবিজ্ঞানের আহসানুর রহমান এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের জাহিদ হাসানসহ আরো কয়েকজন। এভাবেই গড়ে ওঠে ‘আলোকিত স্নানঘাটা’।

নাহিদ জানান, ‘শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে ধারণা দিতে ও ক্যারিয়ারসচেতন করতে প্রথমেই আমরা স্নানঘাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা আমাদের ক্লাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। সেই সুযোগে আমরা স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পেরেছি।’ ‘আলোকিত স্নানঘাটা’র সদস্যরা জানতেন, স্কুলে ক্লাস রুটিন সব সময়ই একই থাকে। কোনো ক্লাসের পাঠ যদি শুরু হয় গণিত দিয়ে, আর শেষ হয় বাংলা দিয়ে, সারা বছর এভাবেই চলতে থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ কোনো বিশেষ কারণে কখনো স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি দেওয়া হলে, শেষ দিকের ক্লাসগুলো আর হয় না। তাই প্রথম দিকের বিষয়গুলোর সিলেবাস ক্লাসে শেষ হলেও রুটিনের শেষের দিকের বিষয়গুলোর শেষ হয় না। এ কারণে বছর শেষ হয়ে গেলেও সেই বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান থাকে কম। এ অপূর্ণতার সমাধান হিসেবে সংগঠনটির সদস্যরা শিক্ষকদের জানান, ক্লাস রুটিনে বৈচিত্র্য আনলে এ সমস্যা আর থাকবে না। সপ্তাহের একেক দিনের রুটিন যদি একেক রকম হয়, তাহলে সব বিষয়ের সিলেবাসই শেষ করা যাবে।

অন্যদিকে গ্রামের স্কুলে শিক্ষার্থী তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ বিদ্যালয়ে সরাসরি ভর্তি হওয়া যায়। এ কারণে ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতা সম্পর্কে এই শিক্ষার্থীদের তেমন ধারণা থাকে না। কিন্তু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। তাই সেই ধারণা দিতে ২০১৫ সাল থেকে স্নানঘাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা চালুর ব্যবস্থা করে ‘আলোকিত স্নানঘাটা’।

এর পাশাপাশি শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতেও সংগঠনটি কাজ করছে। প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রিয় শিক্ষক নির্বাচন করা হয় ছাত্র-ছাত্রীদের ভোটে। সেই শিক্ষকদের দেওয়া হয় সম্মাননা। এ ছাড়া ক্লাস পরীক্ষার মেধা তালিকায় প্রথম থেকে তৃতীয় স্থান অধিকারীদেরও দেওয়া হয় পুরস্কার। এ কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি উত্সাহ বাড়ছে। অন্যদিকে মাদকসহ বিভিন্ন নেতিবাচক বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজকে সচেতন করার পাশাপাশি বৃক্ষরোপনসহ নানা কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে এই সংগঠন। এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণায় ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘আমাদের সূর্যমুখী’, ‘আলোর পথে রায়পুর’, ‘আলোকিত চরসিঙ্গাইরা’, ‘আলোকিত ভাতখালী’সহ বেশ কিছু সমমনা সংগঠন। এসব সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরাও ‘আলোকিত স্নানঘাটা’র নির্বাহী কমিটিতে কাজ করছেন।

ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপে এ সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ৪ হাজার। সদস্যদের মাসিক ও এককালীন চাঁদা দিয়েই চলে এর কার্যক্রম।

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নাহিদ জানান, ‘এখানে সবাই দায়িত্ববোধ থেকে স্বেচ্ছায় কাজ করেন।’

মন্তব্য