kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৫ রবিউস সানি          

গলিবয় কারিগর

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গলিবয় কারিগর

মাহমুদ হাসান তবীব

মাহমুদ হাসান তবীব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ‘গলিবয়’খ্যাত তুমুল জনপ্রিয় হিপ-হপ গানের রচয়িতা, সুরকার ও ভিডিও নির্মাতা। ক্যাম্পাসে রানা নামের এক কিশোরকে পেয়ে, তাঁর কণ্ঠে গান শুনে, তাঁকে নিয়ে গানটি বেঁধেছিলেন। একে একে এই সিরিজের তিনটি গান তৈরি করেছেন তিনি। তিনটি গানই ভার্চুয়ালজগতে বেশ আলোড়ন তুলেছে। তাঁর গল্প শোনাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ। ছবি তুলেছেন শারাবান তহুরা আলী শারিন

‘এক মাস সেহরি খাইয়া রোজা রাখা সোজা

আমি রানা হারা বছর  সেহরি ছাড়াই রোজা...’

গত রমজানে ‘ঢাকাইয়া গলিবয়’ শিরোনামের হিপ-হপ গানটি বেশ সাড়া ফেলেছিল। গানে গানে উঠে আসা এক পথশিশুর এই গল্পটি নিয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়া এখনো তোলপাড়। মুম্বাইয়ের ‘গলিবয়’ সিনেমার গলির ছেলের মতোই ওই সময় এই গানের সহশিল্পী রানার উত্থান। এক গানেই বাজিমাত। এরপর একে একে প্রকাশ পায় ‘গলিবয় পার্ট-২’ ও ‘পার্ট-৩’। এই গানগুলোর কারিগর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান তবীব।

হিপ-হপ গান ছোটবেলা থেকেই তবীবের পছন্দ। একটি এমপি-থ্রি-প্লেয়ার ছিল তাঁর তখন। সুযোগ পেলেই ‘এমিনেম’, ‘ওয়াইজ খলিফা’, ‘টু-প্যাক’, ‘ফিফটি সেন্ট’—এদের গান শুনতেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় মানিকজগঞ্জে নিজ এলাকার সিনিয়রদের দেখলেন একটা গ্যাংস্টার হিপ-হপ গান অনলাইনে রিলিজ করতে। সেই গান শুনে তবীবের মনে হলো, এমন কিছু তাঁর পক্ষেও করা সম্ভব। আবৃত্তি ভালো করতেন ছোটবেলা থেকেই। তাই আত্মবিশ্বাস ছিল। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর বাবা তাঁকে কম্পিউটার কিনে দেন। সেই কম্পিউটারে সফটওয়্যার ইনস্টল করে মিউজিক কম্পোজিশন শেখা শুরু তবীরের। পাঠ্য বইয়ের কবিতাগুলোই তখন হিপ-হপ সুরে গাইতেন। এভাবে চলছিল তাঁর প্রশিক্ষণ। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর খেয়াল করলেন, এই কম্পোজিশন শেখায় একটু ঘাটতি রয়েছে। এ সময়ে তিনি অবশ্য লিরিকের দিকে বেশি মনোযোগী হলেন। ২০১৫ সালের বই মেলায় প্রকাশ পেল তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘আমি মানুষ বলেই’।

 তবীব ও রানা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর হিপ-হপ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন তবীব। টুকটাক মিউজিক কম্পোজিশন করেন নিজের মতো। আর দেশীয় হিপ-হপ সংস্কৃতি নিয়ে চলতে থাকে বোঝাপড়া। তবীব জানালেন, ‘দেশের হিপ-হপ কালচার খুবই বাজে! এগুলোতে গ্যাংস্টার র্যাপের (রিদম অ্যান্ড পোয়েট্রি) নামে চলছে অশ্লীলতার জোয়ার। আমি তাই হিপ-হপ নিয়ে নিজের ভাবনা প্রকাশের সুযোগ খুঁজছিলাম।’ এভাবে ২০১৭ সালে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস, বিভিন্ন দেশের মুদ্রার নাম আর কিছু ইংরেজি ভোকাবুলারি নিয়ে র্যাপ গান বাঁধেন। সেটি ছিল ভর্তি পরীক্ষা মাথায় রেখে। একটা বইও প্রকাশ করেছিলেন তখন, ‘সাধারণ জ্ঞানের গল্প’ নামে। ওই বইয়ের সঙ্গে ডিভিডিতে গানগুলো ফ্রি দিতেন। ভালো সাড়া ফেলেছিল তাঁর সেই উদ্যোগ। এরই মধ্যে একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনেছিলেন। সেটি দিয়ে বিভিন্ন শুটিং শুরু করলেন বন্ধু রায়হানের সঙ্গে।

তারপরই এলো গালিবয়ের ঘটনা। তবীব বলেন, ‘‘আমরা তখন কোনো একটা কাজ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলাম। বলিউডের ‘গলিবয়’ সিনেমাটা দেখার পর মনে হয়েছিল, আমাদের দেশেও অলিগলিতে এমন অনেক ‘হিরো’ আছেন। আমি তাঁদের গল্প বলব। পরিকল্পনা করলাম, কোনো পথশিশুকে দিয়ে তার জীবনের গল্প, তার না পাওয়ার গল্প, সামাজিক বৈষম্য নিয়ে কথা বলাব। তখন থেকেই এমন কোনো পথশিশু খুঁজছিলাম, যে একটু গান গাইতে পারে, মোটামুটি ভালো উচ্চারণে আবৃত্তি করতে পারে। ১৫ কী ১৬ রোজায় আমি এসএম হলে, রায়হানের রুমে যাই। ফেরার পথে এই রানা হুট করে আমার কাছে বাইকে চড়ার বায়না ধরল। আমি ওকে বাইকে তুলে নিই। কথায় কথায় জানাল, সে গাইতে পারে। শুনতে চাইলাম। শুরুতেই আমাকে একটা র্যাপ গান শোনাল। তখনই বুঝে গেলাম, আমি মনে মনে ওকেই খুঁজছি!”

এরপর রানাকে নিয়ে আজিমপুরে এক বন্ধুর বাসায় যান তবীব। সেখানে ওর জীবনের গল্প শুনেন, সেই রাতেই গান বেঁধে, সুরও করে ফেলেন। পরদিন রেকর্ড করে নেন। কিছুদিন পর রায়হানকে সঙ্গে নিয়ে করে ফেলেন ভিডিও রেকর্ডও। প্রথমে ‘গলিবয়’ গানটি ফেসবুকে দিয়েছিলেন তবীব। সেখানে বেশ হিট করলে, একটা ইউটিউব চ্যানেল পোস্ট করেন। সেখানে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৫৮ হাজারেরও বেশি ভিউ হয়েছে গানটির। সম্প্রতি নিজের ইউটিউব চ্যানেলেও (ঞধনরন গধযসঁফ) গানটি আপলোড করেছেন তিনি। এখানে ভিউয়ের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। রানার ‘গলিবয়’ হিট হওয়ার পর তবীব ভাবতে থাকেন, বাকি রানাদের কী হবে? এক মাসের মধ্যেই প্রকাশ করেন ‘গলিবয় পার্ট-২’। সেই গানে রানা গাইতে থাকে : ‘এক গান গেয়ে আমি আজ ভাইরাল/ বাকি রানাদের বলো, কী হবে কাল?’ তবীবের ইউটিউব চ্যানেলে এ গানের ভিউ হয়েছে প্রায় ৮৫ লাখ ৪৩ হাজার।

তারপর ‘গলিবয় পার্ট-৩’-এর মাধ্যমে পথশিশুদের জন্য একটা সমাধান দিতে চেয়েছেন তবীব। এ গানের ভিউ ৬৮ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি। তবীব বললেন, ‘আগস্ট মাসের দিকে বাজেট নিয়ে বেশ আলাপ চলছিল। নানা রকমের বৈষম্যের কথা বলছিল অনেকে। আমি ভাবলাম, আমরা একটা প্রস্তাবনা দিলে কেমন হয়? তাতে পথশিশুদের উন্নয়নে আমরা বাজেট চাইব। সেটা দিয়ে তাদের জন্য কাজ হবে। প্রস্তাবনাটা ছিল—৫০০ কোটি টাকা একবারই পথশিশুদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ করা হবে। এর ৩০০ কোটি টাকা দিয়ে ওদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল করা হবে। বাকি ২০০ কোটি টাকা দিয়ে করা হবে শপিংমল। সেই শপিংমলের টাকা দিয়ে চলবে ওই স্কুল। আমরা তাই গানে গানে বললাম—‘কিছুদিন পর পর অতীতকে ভুলে যাই/ তবু রানাদের হয়ে কিছু কথা বলে যাই/ পাঁচ লাখ কোটি যদি দেশের বাজেট হয়/ পাঁচ শত কোটি টাকা অ্যামাউন্ট বেশি নয়...।’ এই গানের পর আমরা অপেক্ষা করছি, সরকার কোনো সাড়া দেয় কি না। অবশ্য আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলক আমাকে বলেছেন, গানগুলো তিনি প্রধানমন্ত্রীকে শোনাবেন। তারপরও কোনো সমাধান না হলে হয়তো বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে আমরা ‘গলিবয় পার্ট-৪’ তৈরি করব।’

বাংলাদেশে অনেক কিছুই বেশ আলোচনায় এসে পরে ঝিমিয়ে যায়। কেউ আর খোঁজ রাখে না। এই বিষয়টি নিয়ে তবীব নতুন গান করেছেন ‘হিপ-হপ পুলিশ’ শিরোনামে। দুর্নীতির কথাও তুলে ধরেছেন এই গানে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণদের মানসিকতা গড়ে তোলার জন্য তিনি গেয়েছেন—‘যদি তোরা এক চাকরি পেয়েই মাতিস বিজয় উল্লাসে/ তবে তো তোদের গিলেই খাবে মানবের মতো রাক্ষসে/ নয় মাথা নত, যত আছে ক্ষত, ঝেড়ে ফেলে দিয়ে উঠ জেগে/ খাবো না ঘুষ, দেবো না ঘুষ, স্লোগানে স্লোগানে বল রেগে/ টাকা ছাড়া কেউ সাইন না দিলে কলমগুলোকে হত্যা কর/ শিক্ষার আলো মুখে ছুড়ে মার, অন্ধকারেই থাকুক ঘর/ আপন বাবাও যদি ঘুষ খায়, বাপকে করে দে ত্যাজ্য বাপ/ লাঞ্ছিত হোক ঘুষখোর বাপ, বাড়ুক তাহার রক্তচাপ...।’ ‘হিপ-হপ পুলিশ’ও ভার্চুয়ালজগতে বেশ সাড়া ফেলেছে। এক সপ্তাহ আগে আপলোড করা এই গানটির এখন পর্যন্ত ২২ লাখ ২৮ হাজারের বেশি ভিউ হয়েছে। জনসচেতনতার বার্তা নিয়ে এটির সিকুয়েল বাঁধার কাজে এখন মগ্ন তবীর।

সম্প্রতি ‘গলিবয়’ রানাকে নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ক্যারিয়ার ক্লাবের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০১৯’-এও করেছেন পারফর্ম। ইতিমধ্যেই আরো বেশ কিছু ঘরোয়া ও ক্যাম্পাসভিত্তিক অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। এমন অনুষ্ঠানে নিয়মিত ডাক পেয়ে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত।

মন্তব্য