kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

সাফল্য

মা-মেয়ে একসঙ্গে

নাটোরের বাগাতিপাড়ার মাছুমা খাতুন আর তাঁর মেয়ে একসঙ্গে এবার এইচএসসি পাস করেছে। অদম্য এই নারী আর তাঁর মেয়ের গল্পটা জেনে এসেছেন রেজাউল করিম রেজা

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মা-মেয়ে একসঙ্গে

পরীক্ষাকেন্দ্রে মা ও মেয়ে

দুই সন্তানের জননী মাছুমা খাতুনের বয়স ৪০ ছুঁই ছুঁই। নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার বাগাতিপাড়া গ্রামের এই নারীর স্বামী-সন্তান আর সংসার নিয়ে সময় কাটে কঠিন ব্যস্ততায়। কিন্তু এত সব ঝামেলা তাঁর পড়ালেখার প্রতি অদম্য আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। অবশ্য আগ্রহটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াটা মোটেই সহজ ছিল না। ১৯৯৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার আগেই বিয়ে হয়ে গেল তাঁর। এরপর আর পরীক্ষা দিতে পারেননি। 

লেখাপড়ার ইচ্ছা থাকলেও স্বামীর গ্রামের বাড়ি বাঁশবাড়িয়ায় থাকাকালে সে সুযোগ ছিল না। অন্তরের যন্ত্রণাটাও স্বামী-সংসার আর পরবর্তী সময়ে বাচ্চাদের কথা ভেবে চাপা দিয়ে রাখেন। তবে বেশ একটা বিরতি দিয়ে শেষ পর্যন্ত ঠিকই আবার পড়ালেখা শুরু করেন। সুযোগটা হয় ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার স্বার্থে স্বামী বাগাতিপাড়ায় বাড়ি করলে। প্রথমে লুকিয়ে লুকিয়ে অবসর সময়ে পড়ালেখা করতেন। মনে ভয় ছিল স্বামী-সন্তানরা জেনে গেলে বিষয়টি খারাপভাবে নিতে পারে। কিন্তু আস্তে আস্তে সবাই বিষয়টি জানে, আর সহজভাবেই নেয়।

২০১৫ সালে বাগাতিপাড়া পৌর মহিলা কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। তখন তাঁর মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মনি পড়ত একই উপজেলার কাদিরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে নবম শ্রেণিতে। প্রথম দিকে মায়ের বেশি বয়সে স্কুলে, তা-ও আবার মেয়ের সঙ্গে একই ক্লাসে ভর্তি হওয়া নিয়ে একটু অস্বস্থিতে ছিল জান্নাতুল। তবু মায়ের জিদের কাছে হার মানে। একপর্যায়ে মাকে পড়িয়েছে মেয়ে। লোকলজ্জার ভয়ে তিনি প্রাইভেট পড়তে পারছিলেন না। কোথাও বুঝতে না পরলে মেয়ে মনি তাঁকে সহায়তা করে; বিশেষ করে গণিত, পদার্থ, রসায়ন ও ইংরেজির মতো কঠিন বিষয়গুলো মাকে জান্নাতুলই বুঝিয়ে দিত। সংসারের হাড়ভাঙা খাটুনির মধ্যে নিজের পড়ার সময় বের করা কঠিন ছিল। তবু সময় বের করে ক্লাস করেছেন মাছুমা। আসলে দিনে সেভাবে পড়ালেখার সুযোগ পেতেন না। রাতেই সব কাজ শেষ করে পড়ালেখা করেছেন। অবশ্য তাঁর আগ্রহ জানার পর স্বামীও উত্সাহ দিয়েছেন। এভাবেই নিজের চেষ্টায় ২০১৭ সালে মেয়ের সঙ্গে এসএসসি পাস করেন। তখন মা পেয়েছিলেন জিপিএ ৪ দশমিক ৬১ এবং মেয়ে জিপিএ ৫। এরপর আগ্রহ বেড়ে যায় মাছুমার। শুরু করেন এইচএসসি পাসের এক অদম্য লড়াই। ফলাফল, এবার আবারও সেই মেয়ের সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হলেন মাছুমা। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পেয়েছেন জিপিএ ৪ দশমিক ১৩। আর তাঁর মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মনি রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পেয়েছে জিপিএ ৫। মাছুমা খাতুন বাগাতিপাড়া পৌর মহিলা কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সেক্রেটারিয়েল সায়েন্স ট্রেডের ছাত্রী ছিলেন। মা-মেয়ে একসঙ্গে পাস করায় গোটা পরিবারই অনেক খুশি। ভালো ফল করায় খুশি সহপাঠী আর কলেজের শিক্ষকরাও।

প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক, নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বকুল মা-মেয়েকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। আর বাড়িতে গিয়ে উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান খাদিজা বেগম শাপলা তাঁদের শুভেচ্ছা জানান ফুল দিয়ে। এখন মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মনি আর লজ্জা পায় না; বরং মায়ের জন্য গর্ববোধ করে।

মাছুমা খাতুনের ছেলে বনি আমিন কনক পুলিশ সদস্য হিসেবে চাকরি পেয়ে বর্তমানে প্রশিক্ষণে রয়েছেন। এদিকে স্বামী আব্দুল মজিদ আনসার ব্যাটালিয়নে সিপাহি (প্রশিক্ষক) পদে চাকরি করেন। তাঁর কর্মস্থল গাজীপুরের শফিপুরের আনসার একাডেমিতে।

মাছুমা খাতুন বলেন, ‘বিয়ের ১৯ বছর পেরিয়ে গেছে। পিঠাপিঠি দুই ছেলে-মেয়েকে মানুষ করতে গিয়ে নিজের পড়ার কথা ভাবারই সময় পাইনি। অবশেষে ছোট মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নতুন করে পড়ালেখা শুরু করেছি। সমাজে আর ১০টি মানুষের মতো একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে যাতে নিজের পরিচয় দিতে পারি, সে কারণেই এই বয়সে কষ্ট করে লেখাপড়া করছি।’ আরো বলেন, ‘সংসারের চাপে আটকে থাকা মায়েরাও চেষ্টা করলেই লেখাপড়া করতে পারেন। এর জন্য থাকতে হবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি। আর মনের ভেতরে সঞ্চয় করতে হবে সাহস।’

মাছুমা খাতুন আরো লেখাপড়া করতে চান। তাঁর মতো বেশি বয়সে লেখাপড়া করা মায়েদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টির জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

কথা হলো মাছুমার মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মনির সঙ্গে। বর্তমানে রাজশাহীতে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য কোচিং করছে। তার ইচ্ছা একজন চিকিত্সক হয়ে মানুষের সেবা করা। যদি কোনো কারণে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে না পারে, তবে ঢাকা, রাজশাহী  অথবা ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের কোনো বিষয়ে ভর্তি হতে চায়। সে চায় তার মা আরো পড়ালেখা করুক। মাছুমা খাতুনের স্বামী আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমার জন্য একটু কষ্টকর হলেও আমি আমার স্ত্রীর ইচ্ছাটার মর্যাদা দিয়েছি। সে যত দূর পড়াশোনা করতে চায়, আমি চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।’

 

মন্তব্য