kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

টিফিন আওয়ার

আঁকছে ওরা বিরাট ছবি!

শুক্রবারের সকাল। এবাড়ি-ওবাড়ি ছোটাছুটি করছে নড়াইল পৌর এলাকার দিঘিরপার আদিবাসীপাড়ার শিশুরা। আজ তাদের ছবি আঁকার দিন। যেনতেন ছবি নয়। এটা যে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শিশুছবি! লিখেছেন সাইফুল ইসলাম তুহিন

১০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আঁকছে ওরা বিরাট ছবি!

তড়িঘড়ি সকালের নাশতা সেরে নিচ্ছে আদিবাসী গোহাট খোলার বাসিন্দা ইমন সরদার। কারণ আজ বিমানেশ স্যারের স্কুলে ছবি আঁকা হবে। তার কাছে যেতেই বলল, ‘সময় নেই। ছবি আঁকতে যাব। বিমানেশ স্যারের ওখানে। আজ নতুন কিছু আঁকতে হবে। অনেক কাজ।’ ইমনকে আর না ঘাঁটিয়ে গেলাম পাশের বাড়িতে। সেখানে ১২ বছরের চন্দ্রিমা মালি ও শ্রীকান্ত সরকারকে দেখা গেল সেজেগুজে চলে এসেছে ইমনকে ডাকতে। খাওয়া সেরে দরজার পাশ থেকে চটি জোড়া বের করেই ছুট। ইমনের মা কাঞ্চন রানী জানালেন, ‘শুক্রবার এলেই ছেলেকে বাড়িতে রাখা যায় না। চলে যায় ছবি আঁকতে। আমিও কয়েক দিন গিয়েছি। ভালোই লাগে। ছেলেদের খুব যত্ন করে শেখায় বিমানেশ বাবু।’

আদিবাসীপাড়া ছাড়িয়ে বন বিভাগের পাশের রাস্তা দিয়ে দল বেঁধে চলছে খুদে চারুশিল্পীর দল। গন্তব্য ‘শিল্পাঞ্জলী’। বরেণ্য শিল্পী এস এম সুলতানের ঘনিষ্ঠ শিষ্য চিত্রশিল্পী বিমানেশ চন্দ্র বিশ্বাসের গড়ে তোলা অবৈতনিক চিত্রকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশুরা এখানে নিজেদের মতো করে আঁকে। ছবি আঁকা শিখতে দিতে হয় না কোনো ফি। আঁকার যাবতীয় সরঞ্জাম কিনে দেন বিমানেশ নিজেই। আর তাদের হাতেই তিলে তিলে গড়ে উঠছে ১৬০০ ফুট লম্বা ও ৩ ফুট চওড়া একটা ছবি। আড়াই বছর ধরে চলা এ কাজ পুরোপুরি শেষ হলে এটাই হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিশুচিত্র।

নিভৃতচারী শিল্পী বিমানেশ পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। এখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘদিন। ৩৪ বছর শিক্ষকতা করে এখন অবসরকালীন ছুটিতে। সুলতান, মাইকেল মধুসূদনের আবক্ষ মূর্তি ছাড়াও দেশের অনেক বড় স্থাপনায় তাঁর হাতের কাজ স্থান পেয়েছে। পাওয়া না-পাওয়ার অনেক গল্প থাকলেও নিজের সব কিছু এখন শিশুদের শিল্পচর্চায় নিবিষ্ট। ছবি বিক্রির টাকায় বাবার বাড়ির দোতলার একটি দেয়াল ঘেরা ঘরে চালু করেন ‘শিল্পাঞ্জলী’। এখন গোয়াখোলা, মুলিয়া, মালিয়াট, গোবরাসহ আরো কয়েকটি গ্রামে আছে এর শাখা। বিমানেশের গুণমুগ্ধ চারুকলার শিক্ষার্থীরাই মূলত এখানে ছবি আঁকা শেখান।

‘শিল্পাঞ্জলী’তে যেতেই চোখে পড়ল রেকর্ড গড়ার ধুম। শিশুরা এঁকে চলেছে ম্যারাথন ছবি। বিশাল দুটি রোল থেকে আর্টপেপার বের করা হলো। এরপর কাগজের দুই পাশে বসে কেউ আঁকতে শুরু করল নতুন কিছু, কেউ আবার আগের অসমাপ্ত ছবিতে রং করা শুরু করল। মনোযোগ দিয়ে আঁকছে দিঘিরপারের রুম্পা মালি, শীলা মালি, সিপন মালি, শহরের কুড়িগ্রাম এলাকার অর্পণ, তাবাসসুম, দৃষ্টি, মোহনাসহ আরো ৩০ জন। মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামীণ জীবন, মসজিদ-মন্দির, নৌকাবাইচসহ নানা লোকজ উত্সব, বর-কনে, পালকি, রাখাল, কৃষক-শ্রমিক, কম্পিউটার, মোবাইল টাওয়ার, মাছ শিকার, ঈদের নামাজ—কী নেই!

এরই মধ্যে দুপুর হয়ে গেল। খাওয়া শেষে আর দেরি নেই। ফের শুরু ছবিযজ্ঞ। শিশুদের টুকটাক দেখিয়ে দিচ্ছেন নড়াইলের এস এম সুলতান বেঙ্গল চারুকলা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৌমিত্র মোস্তবী।

শিল্পাঞ্জলীতে ছবি আঁকার এ বর্ণিল হাট বসে সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার। রেকর্ড গড়তে এক জায়গায় এসে জড়ো হয়েছে দুই শতাধিক শিশু। কার্তিজ পেপারে মোম রং বসিয়ে তৈরি হচ্ছে ৪৮০০ বর্গফুটের ছবিটি।

শিবসংকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির তীর্থ সরদার জানাল, দুই বছর ধরে আঁকছি। বিমানেশ স্যার আমাদের রং, পেনসিল আর কাগজ দেন। বড় ছবিতে আমার ৮-৯টা ছবি আছে। চতুর্থ শ্রেণির চন্দ্রিমা মালি আপন মনে নকশা আঁকছে। কী আঁকছ জানতে চাইলে বলল, আমি আমার নকশায় রং বসাচ্ছি। এর আগে সাপখেলা, মন্দির, পুকুরপারসহ ১৫টি ছবি এঁকেছি। এখানে যা খুশি আঁকতে পারি।

শিশুদের যত্নের যেন ত্রুটি না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখছেন বিমানেশের স্ত্রী মমতা বিশ্বাস। শিশুরা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন নিজের ইচ্ছামতো হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকে। আবার দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে চলে যোগব্যায়াম। ফাঁকে ফাঁকে আবার গানও করে। ছবি এঁকে এঁকে ক্লান্ত হলে গোল হয়ে বসে। মাঝে থাকেন বিমানেশ ও সৌমিত্র। এরপর কেউ একজন গাইতে থাকে। তালি দিয়ে তাল মেলায় বাকিরা।

সৌমিত্র জানালেন, আমি ফাইন আর্ট নিয়ে পড়ছি; কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এই পড়াটা এখানে এসে সম্পন্ন হচ্ছে। শিল্পাঞ্জলীতে সারা দিন শিশুদের সঙ্গে কাটাই, ওদের প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হই।

বিমানেশ বিশ্বাস বললেন, শিশুদের মনোজগত্ বাড়াতে যে কাজ হচ্ছে, তা বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের মুখ উজ্জ্বল করবে। সারা বিশ্বের শিশুদের মধ্যে সাড়া ফেলবে। শিশুচিত্রটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে দেশের ভাবমূর্তি বাড়বে—এটাই প্রত্যাশা বিমানেশের। আগামী ডিসেম্বরে বৃহত্ এই ছবির প্রদর্শনী হবে বলে জানালেন তিনি।

মন্তব্য