kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

গবেষণার পোকা

মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ মামুন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালেই তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে স্প্রিঞ্জার জার্নাল। বিখ্যাত এই জার্নালের লেখকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সী বাংলাদেশি। গবেষণায় তরুণদের ভীতি দূর করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘আন্ডারগ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অর্গানাইজেশন’ নামের একটি সংগঠন। দেশে বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সের গবেষকদের মধ্যেও তিনিই সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর কথা জানাচ্ছেন মুতাসিম বিল্লাহ নাসির

১০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গবেষণার পোকা

বটতলায় বসেই গবেষণা করেন মামুন

হতাশার মেঘ পেরিয়ে

সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছিল মামুনের। ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাইকোলজি বিভাগে এক বছর পড়াশোনাও করেছেন। বললেন, ‘‘২০১৬-১৭ সাল খুব খারাপ কেটেছে আমার; এমনকি আত্মহত্যার ভাবনাও উঁকি দিত মাথায়। হাজারো মানুষের টিটকারি, অপমান তখন সইতে হয়েছে। কেননা তাদের মতে, ভালো কোনো বিষয়ে সুযোগ পাইনি আমি! এমনও হয়েছে, কলেজজীবনের এক বান্ধবী, যে মেডিক্যাল কলেজে পড়ছে, আমাকে খুব হেয় করে একবার বলল, ‘সাইকোলজি পড়ে ভাত নাই; নীলক্ষেত থেকে বই কিনে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দাও’!’’

সেই রাগ ও অপমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছিলেন মামুন। পরের বছর ভর্তি হয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও শুরুতে ভালো লাগেনি তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে গেরুয়া অঞ্চলের ভাড়া বাসায় তিনি ভাবতেন, কী করা যায়! এমন ভাবনা থেকেই পথের সন্ধান পেলেন। টানা দেড় বছর নিজেই নিজের মেন্টর হয়ে ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন বই নামিয়ে অধ্যয়ন করেছেন। গবেষণার বিষয়গুলো একা একা বোঝার চেষ্টা করেছেন। হালকা-পাতলা শরীরিক গড়নের মামুন বললেন, ‘একা একা পথের সন্ধান করা কতটা কষ্টকর, সে সময় তা আমি ভালোই বুঝেছিলাম। এখন আর কোনো আক্ষেপ নেই। গবেষণার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকি।’

গুরুর সন্ধান

বান্ধবীর খোঁচা দেওয়া সেই পরামর্শটি মামুন মনে রেখেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় ৪০তম বিসিএস পরীক্ষার্থীদের ওপর গবেষণা করেছেন। আর জেনেছেন, বিসিএস পরীক্ষার্থীদের বেশির ভাগই নানা মানসিক সমস্যায় ভোগেন। হতাশা, উত্কণ্ঠা ইত্যাদি তাঁদের নিত্যসঙ্গী। মামুনের সেই গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে স্প্রিঞ্জার জার্নালের ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড এডিকশন বিভাগে।

মামুন প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করেই গবেষণার যাত্রা শুরু করেছিলেন। পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকসের শিক্ষার্থী হলেও নিজ বিভাগের গণ্ডি পেরিয়ে, বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করতে তাঁর ভালো লাগে। প্রথম গবেষণার বিষয় ছিল পর্নোগ্রাফি। এই কাজটি করতে গিয়ে দুজন প্রথিতযশা গবেষকের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। একজন ড. এস এম ইয়াসির আরাফাত, অন্যজন প্রফেসর মার্ক ড. গ্রিফিথস। অবশ্য ড. আরাফাতের সঙ্গে গবেষণার শুরু থেকে কাজ করেছেন মামুন। তবে প্রফেসর গ্রিফিথসের সঙ্গে তাঁর পরিচয়টা কাকতালীয়। এরপর গ্রিফিথসের সঙ্গে কোলাবরেশনে চলছে মামুনের গবেষণা। তিনিই মামুনের প্রথম পেপারটি ঘষেমেজে, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড এডিকশনে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। মামুনের কাছে প্রফেসর গ্রিফিথস হলেন আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো। আইনস্টাইন যেমন সত্যেন্দ্র নাথ বসুকে বানিয়েছিলেন গবেষক। কোথাও নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে না পেরে আইনস্টাইনকে চিঠি লিখেছিলেন বসু। আইনস্টাইনই তাঁর পেপার ঘষেমেজে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন; ঠিক যেমনটা মামুনের বেলায় করেছেন গ্রিফিথস। প্রফেসর গ্রিফিথস আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য গবেষক। বিহেভিয়ার এডিকশন ফিল্ডে অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী তিনি। তাঁর গুগল সাইটেশন ৫৭ হাজার। এমন একজন মানুষের সঙ্গে কাজ করা মামুন আসলে রিসার্চ মেথোডলজির ওপর কোনো কোর্সই করেননি! মজার ব্যাপার হলো, প্রফেসর গ্রিফিথসের কারণে কপাল খুলে গেছে মামুনের; তিনি এখন বহুজাতিক গবেষণায় কাজ করার প্রস্তাব পাচ্ছেন।

চলতি পথে

এর পরে মামুন গবেষণা করেছেন প্রফেসর ডেভিড গোজালের সঙ্গে। তিনি আবার এপিডিমিওলজি নিয়ে কাজ করেন না, বরং চাইল্ড হেলথ নিয়ে ল্যাব-বেজড স্টাডিগুলো করেন। কিন্তু মামুনের সঙ্গে সব ধরনের পেপারের আমন্ত্রণে সারা দেন তিনি। তিনিও অনেক বড় মাপের বিজ্ঞানী, যার গুগল সাইটেশন প্রায় ৫০ হাজারের মতো। তিনি ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরি স্কুল অব মেডিসিনের চাইল্ড হেলথ বিভাগের প্রধান এবং মিসৌরি স্কুল অব মেডিসিন ওমেন্স অ্যান্ড চিল্ড্রেন হাসপাতালের প্রধান চিকিত্সক। তাঁর সঙ্গে মামুন কাজ করছেন স্লিপ এপ্নিয়া অসুখটি নিয়ে। দুর্ভাগ্যক্রমে মামুন নিজেও এ রোগে আক্রান্ত।

মূলত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েই গবেষণা মামুনের। হতাশা, আত্মহননপ্রবণতা, বিহেভিওরাল এডিকশন—এসব নিয়ে তাঁর আগ্রহ। কম টাকা খরচ করে এ গবেষণাগুলো করা যায়। কেননা যদি তিনি ল্যাবনির্ভর গবেষণা করতে চান, তাহলে বর্তমান বাস্তবতায় তাঁর পক্ষে সেটি খুব কঠিন; অন্যদিকে পাবলিক হেলথ সেক্টরেও কাজ করছেন তিনি। সৌদি ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নালে সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র তিনি পাঠিয়েছেন, সেলফ-মেডিকেশনের ওপর। অবশ্য এলসেভিয়ের, স্প্রিঞ্জার জার্নালে লেখা প্রকাশ করতেই বেশি ভালো লাগে তাঁর।

গবেষণা নিরন্তর

দক্ষিণ কোরিয়ার কাওয়ানগুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যৌথভাবে আরেকটি গবেষণা করছেন মামুন। গবেষণার টপিক মেন্টাল ডিস-অর্ডার প্রযুক্তির মাধ্যমে কম ভুল হওয়ার আশঙ্কা রেখে রোগ নির্ণয় করা। এ ক্ষেত্রে ডিপ্রেশন ডায়াগনসিসকে ফোকাস করে স্মার্টফোনের সেন্সর ব্যবহার করা হয়। এ জন্য একটা অ্যানড্রয়েড মোবাইলের অ্যাপ্লিকেশন সাজেস্ট করা হয়। মামুনদের গবেষণাকৃত মডেলের মাধ্যমে হতাশার ফল ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুল হয়। সব প্রক্রিয়া শেষ করে ডিভাইসটি বাজারে আনার চেষ্টা চলছে এখন। সায়েন্টিফিক কমিউনিটির ভ্যালিডেশন শেষে ডিপ্রেশন ডিটেকশন ডিভাইস যদি বাজারে আসে, তাহলে মানসিক চিকিত্সাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী সাফল্য আসবে বলে মামুনের বিশ্বাস। তখন ডাক্তার খুব সহজেই মানসিক রোগ নির্ণয় করতে পারবেন, এমনকি রোগী নিজেই নিজের ফোন বা এই ডিভাইস দিয়ে বুঝতে পারবেন তিনি কতটুকু আক্রান্ত। এই গবেষণার প্রধান গবেষক বাংলাদেশি তানভির মাসুদ। এ গবেষণা প্রবন্ধটি জার্নাল অব বায়োমেডিক্যাল ইনফরমেটিকসের রিভিউতে রয়েছে। শিগগিরই সেটি প্রকাশ পাওয়ার আশা করছেন মামুন।

গবেষণা প্রসঙ্গে মামুন বলেন, ‘আমি প্রতি মাসে তিন থেকে চারটি গবেষণাপত্র প্রস্তুত করি। দিন-রাত খেটে হলেও আমার এ লক্ষ্য ঠিক রাখি। গত এক বছরে ২০টির মতো গবেষণাপত্র তৈরি করেছি। এর মধ্যে অর্ধেক প্রকাশ পেয়েছে আর বাকিগুলো রয়েছে রিভিউতে। গত ৬ মে পাবজি (পিইউবিজি) গেমের কুপ্রভাববিষয়ক গবেষণাপত্রটি গৃহীত হয়েছে। এ নিয়ে গবেষণা বিশ্বে আমরাই প্রথম করেছি।’

বটতলায় অফিস

মামুন শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবতে নারাজ। দেশের গবেষণার গতিধারার পরিবর্তন নিয়েও তিনি ভাবেন। সম্প্রতি তিনি ‘পেপার-বেজড রিসার্চ লার্নিং’ চালু করেছেন। এটি ট্র্যাডিশনাল রিসার্চ মেথোডলজি থেকে অনেক আলাদা। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে তিনিই প্রথম এ বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসছেন। তিনি বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রিসার্চ মেথোডলজির কোর্স করানো হচ্ছে, কিন্তু তাতে গবেষক তৈরি হচ্ছে না। কেননা এই প্রক্রিয়াটি জটিল। আমি বরং গেরুয়াতে বসেই বিশ্বমানের গবেষকদের সঙ্গে রিসার্চ করছি।’ তবে তাঁর আক্ষেপ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুনিয়র গবেষকদের বসার কোনো জায়গা নেই। টিম মেম্বারদের সঙ্গে আলোচনা কিংবা পেপার-বেজড রিসার্চ লার্নিংয়ের সেশনগুলো করার জন্য একটি অফিসরুমের অভাব তিনি অনুভব করেন। আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার কোনো হোটেলে বসেই কাজটি করতে হয় তাঁকে।

মামুনের অভিযোগ, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক নামমাত্র সংগঠনের জন্যও রুম বরাদ্দ রয়েছে। সরকার অনেক সংগঠনকে ফান্ড দিচ্ছে কাজ করার জন্য। কিন্তু আমরা পাচ্ছি না। অথচ আমরা গেরুয়া অঞ্চলে বসে ডিপ্রেশন ডিটেকশন ডিভাইস মডেল তৈরি করতে কাজ করছি। আমাদের প্রত্যেকটি গবেষণাপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের  র‍্যাংকিং তো বটেই, দেশের  র‍্যাংকিং বাড়ায়।’

মন্তব্য