kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

অদম্য

পানছড়ির ব্যতিক্রম দিপা

খাগড়াছড়ির পানছড়িতে একজনই জিপিএ ৫ পেয়েছে। সে দিপা নন্দী। প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে নিয়ে লিখেছেন শাহজাহান কবির সাজু

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পানছড়ির ব্যতিক্রম দিপা

রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার। সেখানেই সুভাষ নন্দী আর পপি দাশের ঘরে জন্ম দিপা নন্দীর। জন্ম থেকেই তার ঘাড়টা ছিল বাঁকা। এ কারণে বাবা সুভাষ নন্দী তাঁদের পরিবারে নতুন অতিথির আগমনে খুশি হতে পারেননি। তা ছাড়া দিপার মা-ও ছিলেন কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী। তাই সংসারে নিত্য ছিল অশান্তি। অবশেষে বাবা সুভাষ নন্দী মা-মেয়েকে পাঠিয়ে দেন বাপের বাড়ি। নানার বাড়িতে বছর চারেক থাকার পর মামা সঞ্জয় দাশ ও মামি চুমকি বিশ্বাসের সঙ্গে তার মাসহ পাড়ি জমায় খাগড়াছড়ির পানছড়ি। মামার করাতকলে ম্যানেজারের চাকরির সুবাদেই পানছড়িতে আসা। তারা তখন তালুকদারপাড়ায় ভাড়াটে বাসায় থাকত। সেখানে শুরু হয় দিপার নতুন জীবন। মামি এইচএসসি পাস। দিপার অসামান্য মেধা নজর কাড়ে তাঁর। ছোটবেলা থেকেই তাই আদর-যত্নের পাশাপাশি লেখাপড়ায় মনোযোগী করার ব্যাপারে নিজের মেয়ের মতো করেই তাকে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। নিজে পানছড়ি আদর্শ শিশু বিদ্যানিকেতনে অল্প বেতনে চাকরি করেন। দিপাকেও ভর্তি করান সেখানে। মামা-মামির আগ্রহ, পাশে মমতাময়ী মা—সব মিলিয়ে দিপা প্রতিজ্ঞা করে নিজেকে আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। মামির সঙ্গে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া, নিয়ম মেনে বিদ্যালয়ের পড়া শেষ করা ছিল তার নিত্য রুটিন। কম কথা বলা, নিয়মিত শ্রেণিতে পড়া পারা ইত্যাদি শিক্ষকদেরও চোখে পড়ে। ফলে পঞ্চম শ্রেণিতে লাভ করে জিপিএ ৫। মামা-মামির অভাবের সংসার। কিন্তু তাঁরা দিপাকে বুঝতে দেননি কোনো কিছুর অভাব। একপর্যায়ে পানছড়ি বাজারের হাজারী টিলায় বাসা বদল করে আসার পর দিপাকে ভর্তি করানো হয় পানছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে ভর্তির পর শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও সহযোগিতা দেখে দীপার পড়ালেখার উত্সাহ যায় বেড়ে। স্কুলের বেতন থেকে শুরু করে প্রাইভেটসহ সব কিছু ছিল ফ্রি। লেখাপড়া ছাড়াও সাধারণ জ্ঞানেও ভারি আগ্রহ তার। প্রিয় বিষয় বাংলার পাশাপাশি কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, কারেন্ট ওয়ার্ল্ড ও গল্পের বই পড়া তার শখ। ‘কালের কণ্ঠ পত্রিকার একজন নিয়মিত পাঠক আমি। টুনটুন-টিনটিন, ঘোড়ার ডিম, দলছুট—এসব পড়ে মজা পাই।’ বলল দিপা। মাতৃভাষা দিবস, বিজয় দিবসের রচনা প্রতিযোগিতায় সে বরাবরই প্রথম স্থানের অধিকারী। কথা প্রসঙ্গে বলল, ‘বিদ্যালয়ের হয়ে বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে একবার বিদ্যুত্ ক্যাম্পিংয়ে যোগ দিতে গিয়েছি। প্রতিবন্ধী দেখে অনেকেই শুরুতে অবহেলার চোখে দেখে। কিন্তু পরে ক্যাম্পিংয়ের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন, পিটি, ব্যায়ামসহ সব কিছুতে আমি অন্য দশজনের চেয়ে ভালো করি।’ তা ছাড়া অষ্টম শ্রেণিতে জিপিএ ৫ পাওয়ার পর খাগড়াছড়ি কাঠ ব্যবসায়ী সমিতি তাকে সংবর্ধনা ও ক্রেস্ট প্রদান করার অনুষ্ঠানটিও স্মরণীয় হয়ে আছে বলে জানায় দিপা। পানছড়ি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, তার হাতের লেখাও খুব সুন্দর। পরীক্ষার খাতায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো কাটাছেঁড়া থাকত না। তাঁদের আশা ছিল, ভালো ফল করবে এবং তা হয়েছেও। দিপার ঘাড়টি বাঁকা হওয়ায় অনেকক্ষণ একদিকে তাকিয়ে থাকলে ব্যথা করে। তা ছাড়া কিছুদিন পর পর এমনিতেই ব্যথা ওঠে। মামা-মামি একবার চট্টগ্রামে ডাক্তারের কাছে নিলে অনেক পরীক্ষা করার পর জানা যায়, তার ঘাড়ের একটি রগ চিকন হয়ে গেছে এবং সেই রগ দিয়ে ঠিকভাবে রক্ত চলাচল করছে না। অপারেশন করতে অনেক টাকা লাগবে; তা ছাড়া অপারেশন করলে ঝুঁকিও আছে। তবে ডাক্তার বলেছে, এর চিকিত্সা আছে, তাকে ভালো করে তোলা সম্ভব।

দিপার মামি চুমকি বিশ্বাস বলেন, ‘বালিকা বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা অবস্থায় তেমন খরচ ছিল না। এখন কলেজে পড়লে অনেক খরচ আছে তার। আমাদের অভাবের সংসারে তার সব কিছুর চাহিদা মেটাতে পারব কি না চিন্তায় আছি।’

অবশ্য পানছড়ির সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বর্তমান খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (ডিডিএলজি) মুহাম্মদ আবুল হাশেম দিপার লেখাপড়ার যাবতীয় খরচের ভার বহন করবেন বলে এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন।

মেধাবী দিপাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে সেনাবাহিনীর খাগড়াছড়ি রিজিয়ন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২০৩ পদাতিক ব্রিগেড ও খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক তার হাতে এটি তুলে দেন। এদিকে খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিবন্ধী অফিসার মো. শাহজাহান দিপার সাফল্যের খবর পেয়ে ছুটে আসেন পানছড়ির বাসায়। জেলা প্রতিবন্ধী অফিস সব সময় দিপার পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

দিপা জানায়, আত্মবিশ্বাস ছিল সে জিপিএ ৫ পাবে। সে যে মামা-মামির আশ্রয়ে লেখাপড়া করছে, এই চিন্তা কখনো মনে আসেনি। নিজ বাড়ির মতো সব সময় স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে লেখাপড়া চালিয়ে গিয়েছে। তার ইচ্ছা খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে পড়ার। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের এই ছাত্রী ভবিষ্যতে ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ার পরও খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় দীর্ঘ তিন বছর পর এবারের এসএসসিতে জিপিএ ৫ নিয়ে আসা দিপা প্রমাণ করল মানুষের ইচ্ছাশক্তি থাকলে শারীরিক বাধা বড় কোনো বাধা নয়।

 

মন্তব্য