kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

হ্যান্ডবল কন্যা

বাংলাদেশ জাতীয় হ্যান্ডবল দলের খেলোয়াড় ছন্দা রানী সরকার। কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপে গণ বিশ্ববিদ্যালয় দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। সেখানকার সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগের এই ছাত্রীকে নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ রনি খাঁ

১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হ্যান্ডবল কন্যা

বঙ্গবন্ধু স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপে বেস্ট প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্টের পুরস্কার নিচ্ছেন ছন্দা। ছবি : সংগ্রহ

তেঁতুলিয়ার মেয়ে ছন্দা। ছোটবেলা থেকেই খেলাপাগল ছিলেন। প্রাইমারি স্কুলে দৌড়, বালিশ নিক্ষেপ, বিস্কুট দৌড়, উচ্চলম্পসহ বিভিন্ন খেলায় অংশ নিতেন। হাই স্কুলেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। ওইটুকুন বয়সে জিতেছিলেন প্রায় ত্রিশটির মতো পুরস্কার! একসময় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে খেলেছেন। সেখানে সাফল্যের সুবাদে ঢাকায় পাড়ি জমান। থাকতেন গাজীপুরে অবস্থিত আনসার একাডেমিতে।

হ্যান্ডবলে হাতেখড়ি স্কুলবেলায়ই। স্কুলের শিক্ষক আবুল হোসেনের কাছ থেকেই হ্যান্ডবলে খুঁটিনাটি শিখেছেন। ক্লাস শেষে প্রায় প্রতিদিনই হ্যান্ডবল অনুশীলন করাতেন তিনি। ছন্দাও মনোযোগ দিয়ে কলাকৌশলগুলো আয়ত্তের চেষ্টা করতেন। ফলাফল স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা তো বটেই, আন্ত স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও হ্যান্ডবলে সেরা হতো ছন্দার দল। কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের বিদ্যালয় পর্যায়ে সেরা খেলোয়াড় হতেন তিনি। বর্ষা নিক্ষেপ, চাকতি নিক্ষেপ, দীর্ঘ লাফ, ব্যাডমিন্টনে ছন্দা ছিলেন সেরাদের সেরা। ভলিবল খেলায়ও পারদর্শী ছিলেন। সব মিলিয়ে আন্ত বিদ্যালয় পর্যায়ে পঞ্চাশের অধিক পদক রয়েছে তাঁর।

খেলাধুলার জন্য পরিবারের সমর্থন পেয়েছেন শুরু থেকেই। ছন্দার বাবা শচীন্দ্র নাথ সরকার পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। মা অনিমা রানী সরকার গৃহিণী। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।

২০০৯ সাল থেকে পঞ্চগড় জেলার হয়ে জেলা পর্যায়ে, পরে বিভাগীয় পর্যায়ে খেলেছেন তিনি। এ নিয়ে প্রতিবেশীদের কটু কথাও কম শুনতে হয়নি। তবে সেসবে থোড়াই কেয়ার করতেন ছন্দা।

২০১১ সালে সুযোগ পান বাংলাদেশ আনসার দলে। সেখানে ছন্দার খেলা নজর কাড়ে জাতীয় মহিলা হ্যান্ডবল কর্তৃপক্ষের। সে বছরই জাতীয় মহিলা হ্যান্ডবল দলের হয়ে খেলার সুযোগ পান।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা হ্যান্ডবল দলের হয়ে ২০১২ সালে নেপালের আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টে অংশ নেন। সেইবার আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবল ফেডারেশন (আইএইচএফ) আয়োজিত টুর্নামেন্টে রানার্স আপ হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয় হ্যান্ডবল দল। সে দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন ছন্দা। এটাকেই এখন পর্যন্ত নিজের সেরা অর্জন বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ মহিলা হ্যান্ডবল দলের কোচ আমজাদ হোসেনকে আইডল মানেন ছন্দা। ‘অসম্ভব ভালো মানুষ তিনি। আদরমাখা শাসন ছিল তাঁর।’ বলছিলেন ছন্দা।

নেপালে অনুষ্ঠিত আইএইচএফ টুর্নামেন্টের স্মৃতি এখনো কড়া নাড়ে ছন্দার মনে। সেখানে ভারতীয় হ্যান্ডবল দলের মেয়েদের সঙ্গে হিন্দি-বাংলার মিশ্রণে কথা বলেছেন। বললেন, ‘দারুণ ব্যস্ততায় কেটেছিল দিনগুলো। আমরা আর ভারতীয়রা একই হোটেলে ছিলাম। ওদের সঙ্গে আড্ডা জমে উঠত। আমি টুকটাক হিন্দি জানতাম। বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে তাদের সঙ্গে আড্ডা চালিয়ে গেছি।’

২০১৩ সালে বিজেএমসির ঢাকা জোনে ক্রীড়া প্রশিক্ষক হিসেবে চাকরি জোটে ছন্দার। তখনো তিনি উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হননি। চাকরি ছেড়ে কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের এইচএসসিতে ভর্তি হলেন। পরে বিজেএমসি দলের হয়ে আন্ত বিভাগ হ্যান্ডবলে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন করেন নিজ দলকে। ২০১৬ সালে থাইল্যান্ড সফরের জন্য ডাক পেয়েছিলেন; কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় যেতে পারেননি।

এইচএসসি পাসের পর ২০১৮ সালে ভর্তি হলেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগে। একই বছর আন্ত বিভাগ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ছন্দার নৈপুণ্যে হ্যান্ডবলে চ্যাম্পিয়ন হয় সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগ। এখন তিনি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। থাকেন গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পিএইচএর ছাত্রী হোস্টেলে। ক্যাম্পাসে শুরুর দিকে শিক্ষকদের সঙ্গেও অনুশীলন করতেন তিনি। এই ফাঁকে শিক্ষকদের সঙ্গে আড্ডা জমে উঠত তাঁর। বললেন, ‘স্যারদের সঙ্গে অনুশীলনে দারুণ মজা হতো।’

২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত আন্ত বিভাগ মহিলা ক্রিকেটে ছন্দার দারুণ পারফরম্যান্সের সুবাদে চ্যাম্পিয়ন হয় সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগ। কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্ডবল দলের নেতৃত্বে ছিলেন ছন্দা। প্রতিযোগিতায় সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন তিনি। শুধু হ্যান্ডবল নয়, ক্রিকেটেও দারুণ স্বাচ্ছন্দ্য ছন্দা। ফাইনালে তাঁর অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের কারণে স্বর্ণপদক অর্জন করে গণ বিশ্ববিদ্যালয়। সেইবার বল হাতে ৩ উইকেট এবং ব্যাট হাতে অর্ধশতক হাঁকিয়েছিলেন ছন্দা। সেরা খেলোয়াড় হিসেবে পদক নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে।

জাতীয় দলের ক্যাম্প কিংবা খেলা থাকলে ক্লাস করা হয় না। বাকি সময় নিয়মিতই ক্লাস করেন। ছন্দা বললেন, ‘এখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ভীষণ আন্তরিক। মন চাইলেও সব সময় ক্লাসে থাকতে পারি না। তবে শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হয়ে থাকে। পরীক্ষার আগে সহপাঠীরাও দারুণ সহযোগিতা করে।’ কিছুদিন আগে হাতের ইনজুরির কারণে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়েন ছন্দা। এখন স্বপ্ন দেখছেন আবারও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর। ফলে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন। বললেন, ‘আমার এখন লক্ষ্য আবার জাতীয় দলের হয়ে খেলা। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারা গর্বের ব্যাপার। আশা করি সফল হব।’

মন্তব্য