kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

পড়া আর খেলা দুটিতেই আছি

যশোরের ঝিকরগাছায় সুবিধাবঞ্চিত, ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমি ও আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয়। বিদ্যালয় আর ক্রিকেট একাডেমির হালচাল জানাচ্ছেন এম আর মাসুদ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পড়া আর খেলা দুটিতেই আছি

যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছা বি এম হাই স্কুল মাঠে বিকেলে হাজির হতেই চোখে পড়বে, এক-দেড় শ বিভিন্ন বয়সের ছেলে ক্রিকেট খেলার অনুশীলন করছে। কেউ নেটে বল করছে, কেউ ব্যাটিং-কৌশল শিখছে, কেউ আবার বল ধরার জন্য হাত ও আঙুলের ভঙ্গি রপ্ত করছে। সেখান থেকে মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দৃষ্টি গেলেই দেখা যাবে টিনের ছাউনির একটি স্থাপনা। রাত হলেই মাঠটি যখন নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, তখন সরব হয়ে উঠবে এটি। সুবিধাবঞ্চিত, ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের লেখাপড়া করানো হয় যে এখানে।

 

একাডেমির শুরু

২০১২ সালের অক্টোবর মাস। এক পড়ন্ত বিকেলে ঝিকরগাছা বি এম হাই স্কুলের সামনে আসতেই শাহানুর কবীর হ্যাপির নজরে পড়ল মাঠটি ফাঁকা। কোনো খেলাধুলা নেই। যেন ঝিমাচ্ছে। ওই দিন রাতে এসে দেখলেন, জায়গাটার অবস্থা আরো ভয়াবহ। মাঠের পশ্চিম কোণে হাজির হতে না হতেই বাতাসে ভেসে এলো মাদকের গন্ধ। মনটা খারাপ হয়ে গেল তাঁর। শাহানুর কবীর হ্যাপি ওই দিন রাতে ঘুমাতে পারলেন না।  তাঁর বাড়ি বেনাপোলের দিকে হলেও খালার বাড়ির সূত্রে এখানে আসা, তারপর এখানেই থিতু হওয়া। শুরু করেন ব্যবসা-বাণিজ্য। এই এলাকার প্রতি তাঁর প্রচণ্ড টান। তা ছাড়া ছোটবেলা থেকেই খেলা পাগল। তাঁর মনে হলো আবার মাঠটাতে খেলা শুরু করা গেলে মাদকের বিস্তৃতিও কমবে। অনেক দিন হলো খেলাধুলা ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। ঠিক করলেন আবার ক্রিকেট খেলবেন। পরদিন এ বিষয়ে কথা বলেন অনেকের সঙ্গে। মাঠে শুরু হয় ব্যাট-বলের অনুশীলন। এক সপ্তাহের মধ্যে ৩০-৪০ জন সঙ্গীও জুটে গেল। কিন্তু সেই অনুশীলনের সময়টা ছিল সকালবেলা। তাই নাম দেওয়া হয় মর্নিং স্টার। তিন মাসে সকালের অনুশীলনে যোগ হয় ছোট-বড় শতাধিক খেলোয়াড়। একপর্যায়ে ২০১৩ সালের প্রথম দিকে শাহানুর কবীর হ্যাপি এলাকার রবিউল ইসলাম, তৌফিকুর রহমান আলো, মোস্তাফিজুর রহমান বাশার,  শেখ শাহরিয়ার হাবিব কৌশিক, আবদুল করিমসহ বেশ কিছু যুবকের সঙ্গে আলাপ করেন বিকেলে অনুশীলন ও ক্রিকেট একাডেমি প্রতিষ্ঠার বিষয় নিয়ে। প্রথমে মূল লক্ষ্য ছিল ক্রিকেটের জন্য বয়সভিত্তিক খেলোয়াড় তৈরি। তাঁরা কথা বলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল, পেস বোলার সৈয়দ রাসেল, ক্রীড়া সংগঠক আকসাদ সিদ্দিকী শৈবালসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে। ক্রীড়া, শিক্ষা, সততা, ঐক্য ও শৃঙ্খলার ব্রত নিয়ে শুরু হয় ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমির যাত্রা। সেই সময় একাডেমিতে প্রথম ভর্তি হন মোহাম্মদ রনি হোসেন, আরিফ খান জয়, অভিসহ বেশ কিছু শিশু-কিশোর। একপর্যায়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়পড়ুয়াদের সমন্বয়ে বয়সভিত্তিক আটটি গ্রুপ করে অনুশীলন শুরু করে একাডেমি।

 

এবার নৈশ বিদ্যালয়

২০১৩ সালের জুলাই মাসের দিকে ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমির সঙ্গে যোগ হয় আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয়। প্রথম প্রথম শাহানুর কবীর হ্যাপি রেললাইনের বস্তি ও হরিজন পল্লীতে গিয়ে সন্ধ্যায় শিশু-কিশোরদের ডেকে এনে পড়ানো শুরু করেন। রাতে তাদের আবার বাড়ি পৌঁছে দিতেন। একপর্যায়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঝরে পড়া আরো অনেক শিশু-কিশোরকে ডেকে এনে পাঠদান শুরু করেন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন এলাকার অনেকেই। ভিক্ষুকের সন্তান, গ্যারেজের শিশুশ্রমিক, হরিজন সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েসহ সুবিধাবঞ্চিত, ছিন্নমূল ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে এখানে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ২৫০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে ১৩ জন শিক্ষক পাঠদান করেন। এখানকার সব ছাত্র-ছাত্রীকে চিকিত্সা, বস্ত্র, শিক্ষা-উপকরণ থেকে শুরু করে বিশেষ দিবসে খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়। এমন অনেকে আছে, যারা এখানে এসে স্কুলের পড়া তৈরি করে নেয়। সপ্তাহে ছয় দিন সন্ধ্যা থেকে তিন ঘণ্টা করে পাঠদান করা হয়। বিকেলে একাডেমিতে কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়।

 

শিক্ষকরা আছেন, তাই...

আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষকের মধ্যে তিনজন কোনো অর্থ নেন না, বাকি ১০ জন নামমাত্র কিছু বেতন-ভাতা নেন।

প্রধান শিক্ষক কামরুজ্জামান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরির পাশাপাশি এখানে সময় দেন। কামরুজ্জামান জানান, তিনি চার বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন বিনা বেতনে। শুধু তা-ই নয়, কখনো কখনো অর্থ দিয়েও সাহায্য করেন ছাত্র-ছাত্রীদের। কেয়া দাস ঝিকরগাছা সরকারি শহীদ মশিয়ুর রহমান কলেজের স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। থাকেন রেললাইনের সরকারি জায়গায়। বাবা জুতা মেরামত করেন। চার বছর ধরে কেয়া আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে পড়াচ্ছেন। তাঁর অনটনের কথা ভেবে বেশ কয়েক মাস ধরে কিছু ভাতা দেওয়া হচ্ছে। কেয়া জানান, ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমি ও আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয়ই তাঁর প্রিয় ক্যাম্পাস। আজহারুল ইসলাম মুকুট চার বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে পড়াচ্ছেন। মাত্রই নিজের লেখাপড়া শেষ করেছেন। মুকুট জেলার প্রথম বিভাগ ক্রিকেটও খেলে থাকেন নিয়মিত। এখানে যাঁরা শিক্ষক হিসেবে আছেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই এখনো পড়ালেখা শেষ হয়নি । এঁরা নিজেদের কলেজ ক্যাম্পাসে সময় দিতে পারেন আর না পারেন, ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমি ও আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাজিরা দিতে ভুল করেন না।

 

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কথা

১৩ বছরের কিশোর রাকিবুর রহমান। রেললাইনের সরকারি জায়গায় থাকে মা-বাবার সঙ্গে। বাবা অসিম সরদার লেবারের কাজ করেন। তৃতীয় শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় তার। পরে ক্রিকেট একাডেমি ও নৈশ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাকিবুর রহমানকে পড়িয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা দেওয়ায়। সে এখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। জানাল, সন্ধ্যায় একাডেমিতে পড়ে অন্য কোথাও আর প্রাইভেট পড়তে হয় না। রাকিবুরের সমবয়সী প্রীতম বিশ্বাস। বাবা মারা গেছেন। থাকে  রেলপাড়ার বস্তিতে নানির কাছে। নৈশ বিদ্যালয়ের আন্তরিকতার কারণে সে এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। আলিফা খাতুন ঝিকরগাছা সরকারি এম এল মডেল হাই স্কুলের দশম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী। ক্লাসের রোল এক। ছোটবেলায় বাবা ফেলে রেখে চলে যান। মা নুরজাহান বেগম তাকে নিয়ে রেলওয়ের জমিতে থাকেন। বছর চারেক আগে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেলে আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফের বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেয়। আলিফা জানায়, ‘নৈশ বিদ্যালয়ের কারণেই আবার লেখাপড়ায় ফিরতে পারছি।’ এদিকে নুরউদ্দীন নুরু মোটর গ্যারেজে কাজ করে। মা-বাবার সঙ্গে থাকে রেল বস্তিতে। কখনো স্কুলে যায়নি। তবে চার বছর ধরে নৈশ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এখন লিখতে, পড়তে এবং হিসাব-নিকাশ করতে পারে। নুরুর মতে, এটা হলো একটি আনন্দ স্কুল। এদিকে নাজিরুল ইসলাম নাঈমের বাড়ি জেলার মণিরামপুর উপজেলার পাঁচপোতা গ্রামে। পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে তারও লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমি ও আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয় নাঈমকে এনে পড়াচ্ছে। সে এখন নবম শ্রেণিতে পড়ে। দুই বছর ধরে নাঈম এখানে থাকে। থাকা-খাওয়াসহ সব ব্যবস্থা হয়েছে তার। দারুণ ক্রিকেটও খেলে। অনুশীলন করে একাডেমিতে। যশোর প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ খেলে এই বয়সেই বেশ নাম হয়েছে। ‘এখানে না এলে ক্রিকেট ও লেখাপড়া কোনোটাই হতো না।’ বলল সে।

এদিতে পঞ্চাশোর্ধ্ব জাহানারা বেগমের স্বামী মারা গেছেন। ঝিকরগাছা রেললাইনের পাশে খুপরিতে থাকেন আর তরকারির বাজারে কাজ করেন। সন্ধ্যা হলেই দুই নাতি নিয়ে আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয়ে হাজির। বললেন, ‘নাতিরা আগে স্কুলে যাইত না, এখানে রাতে পড়ে আবার দিনের বেলা স্কুলে যায়। এইখান থেকে বই-খাতা, পোশাক, চিকিত্সা, কোনো দিন খাবারদাবারও দেয়।’

 

একাডেমি ও বিদ্যালয়ের কৃতিত্ব

ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমির মোহাম্মদ রনি হোসেন গত বছর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নিয়েছে। ২০১৬ সালে রবি ফাস্ট বোলার হান্ট প্রতিযোগিতায়ও ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমির ছাত্ররা কৃতিত্ব দেখিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দল ছাড়াও ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন, ফার্স্ব, সেকেন্ড ডিভিশনসহ সব জায়গায়ই রয়েছে ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে এই একাডেমির দল। আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষার্থী ২০১৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই পাস করেছে। এবারের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায়ও বেশ কয়েকজন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমি ও আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয়।

 

সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন অনেকে

যাঁরা একাডেমি থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রিমিয়ার লিগ, প্রথম বিভাগ ও দ্বিতীয় বিভাগে খেলেন, তাঁরা প্রতি মাসে নিয়মিত কিছু চাঁদা দিয়ে থাকেন একাডেমি ও বিদ্যালয়ের জন্য। সমাজের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিও প্রতি মাসে অর্থ দেন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও।

এদিকে একাডেমির ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষকদের মধ্যে জাতীয় দলের সাবেক পেসার সৈয়দ রাসেল ছাড়াও আছেন মোস্তাফিজুর রহমান বাশার, শেখ শাহরিয়ার হাবিব কৌশিক ও সৌরভ হাসান রনি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়ে থাকেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল।

 

শেষ কথা

ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমির আলোকিত পথ নৈশ বিদ্যালয়ের স্থাপনাটির ছাউনি টিনের, বেড়া কাঠের। নেই চেয়ার-টেবিল। মাদুরে বসে চলে পাঠক্রম। ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমির সাধারণ সম্পাদক শাহানুর কবীর হ্যাপি বলেন, ‘সরকার ও ধনী ব্যক্তিদের আরও আর্থিক সহযোগিতা পেলে একাডেমি ক্রিকেট, লেখাপড়া ছাড়াও মাদক নির্মূলসহ নানা কল্যাণমূলক কাজে অবদান রাখতে সক্ষম হবে।’

মন্তব্য