kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

স্বপ্ন দেখা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে পড়েন মাশরুর ইশরাক। তাঁর নেতৃত্বে সহপাঠী ও বন্ধুরা মিলে গড়ে তুলেছেন ‘পাইওনিয়ার বাংলাদেশ’। এই সংগঠনকে ঘিরে তাঁরা বুনছেন অন্য রকম এক লড়াইয়ের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা জানিয়েছেন ও ছবি তুলেছেন মুনতাসির সিয়াম

১০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বপ্ন দেখা

মাশরুর ইশরাক

খুলনা বিএল কলেজে পড়ার সময় পাশের রেলওয়ে স্টেশনে আড্ডা দিতেন মাশরুর ইশরাক ও তাঁর বন্ধুরা। পাশের বস্তির মানুষগুলোর মানবেতর জীবনযাপন দেখে মন খারাপ হতো তাঁদের। ইশরাক ভাবতেন, ‘ওদের জন্য কি আমরা কিছু করতে পারি না?’ বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এসে সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ খুঁজে নেন তিনি।

অগ্রগামীতে শুরু : ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাস। শীতের সময়। হুট করেই ইশরাকের মাথায় একটা আইডিয়া এলো। এত দিন ধরে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে সুযোগ খুঁজছিলেন, সে জন্য ভালো সময় তো এখনই! শীতে কাতর মানুষগুলোকে নতুন কাপড় কিনে দেওয়ার সামর্থ্য না হলেও পুরনো কাপড় দিয়েও তো সাহায্য করা যায়? তবে তিনি চাইছিলেন, যেন সত্যিকারের ভুক্তভোগীদের কাছেই পৌঁছতে পারে এই সাহায্য। সেটি নিশ্চিত করতে রাতে ব্যাগভর্তি পুরনো কাপড় কাঁধে নিয়ে, সাইকেলে চেপে বেরিয়ে পড়েছিলেন ওঁরা চার বন্ধু। খুঁজে খুঁজে এমন সব মানুষের হাতেই তুলে দিয়েছিলেন, যাঁদের সত্যিকারেই সেগুলো দরকার। এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁরা একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। নাম রাখেন ‘অগ্রগামী’।

যেতে যেতে পথে : বিভিন্ন কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে চলছিল ‘অগ্রগামী’র পথ চলা। ধীরে ধীরে ১৩টা কলেজ মিলিয়ে ৫০ জনেরও বেশি দাঁড়িয়েছিল এর সদস্যসংখ্যা। এর মধ্যে রোজার মাসে ইফতারি হিসেবে শুকনো খাবারগুলোই তাঁরা বেশি দিতেন, যেন বেশ কিছুদিন জমিয়ে রেখে সেগুলো খাওয়া যায়। এ ছাড়া রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চল মিলিয়ে ২০০ পথশিশুকে ঈদের উপহার হিসেবে কিনে দিয়েছেন নতুন জামা। আরো নানা কাজ বেশ ভালোভাবে চললেও এইচএসসি পরীক্ষা এবং তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিকালীন ব্যস্ততা মিলিয়ে ‘অগ্রগামী’র পথ চলায় তাঁরা বিরতি টানতে বাধ্য হন। ভেবেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আবারও পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করবেন; কিন্তু বিভিন্ন সদস্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ায় আগের মতো গুছিয়ে কাজ করা গেল না। এভাবে একসময় থমকে গেল ‘অগ্রগামী’!

বইয়ের জাদু : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তির পর থেকেই নানা ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধা চোখে পড়ে ইশরাকের। যেমন—লাইব্রেরিতে পড়ার জন্য সব ধরনের বই খুঁজে পাওয়া যায় না অথবা বইটি খুঁজে পেলেও প্রয়োজনমতো বাসায় নিয়ে পড়ার সুযোগ সব সময় থাকে না। অনেকের পক্ষেই নির্দিষ্ট সময়ে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পাঠের চাহিদা মেটানোও সম্ভব হয় না। এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বন্ধুদের নিয়ে একটা প্রকল্প চালু করেন ইশরাক। নাম দেন ‘বুক শেয়ারিং’। এই প্রকল্পের স্লোগান হলো, ‘রিড বুকস, শেয়ার বুকস; বি আ লিভিং লাইব্রেরি।’ মূল উদ্দেশ্য, সবাইকে বই পড়তে উত্সাহিত করা। ক্যাম্পাসজুড়ে গ্রাহককে তাঁদের সুবিধামতো স্থানে বই পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটি পালন করেন প্রকল্পটির ১০ সদস্য। ইশরাকের সংগ্রহে থাকা ৫০টি বই দিয়ে এর যাত্রা শুরু হলেও অন্য সদস্যদের বই মিলিয়ে ওদের ভাণ্ডারে এখন বইয়ের সংখ্যা ২৫০। একেকটি বই এক মাস পর্যন্ত নিজের কাছে রাখার সুযোগ রয়েছে গ্রাহকের। তবে বই নেওয়ার সময় ৩০ টাকা করে ফি দিতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রাপ্ত টাকা জমিয়ে বইয়ের সংগ্রহ বাড়ানো হয়। গ্রাহকের আগ্রহ বাড়াতে কেউ মোট পাঁচটি বই অর্ডার করলে তাঁকে বাড়তি একটি বই বিনা মূল্যে পড়তে দেওয়া হয়। আর ১০টি বই অর্ডার করলে একটি বই সেই গ্রাহককে দেওয়া হয় উপহার হিসেবে।

তৃতীয় চোখে দেখা : ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার সময় আরো একটি সমস্যা চোখে পড়ে ইশরাকের। অনেক দৃষ্টিহীন বন্ধু পরীক্ষার সময় শ্রুতলেখক খুঁজতে গিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন। শ্রুতলেখক জোগাড় হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। পরীক্ষার্থী ও লেখকের মধ্যে ঠিকমতো বোঝাপড়া না হলে পরীক্ষা ভালো হয় না। আবার সব বই ব্রেইল প্রিন্টিংয়ে না পাওয়া যাওয়ায় বা সেগুলোর দাম অনেক বেশি হওয়ায় পড়ালেখার ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। ফলে বন্ধুদের নিয়ে এ বছর ইশরাক শুরু করেছেন ‘থার্ড আই’ প্রকল্প। এর ১৫০ জন সদস্য মিলে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁরা প্রয়োজনীয় বইগুলোর পাঠ রেকর্ড করছেন, যেন পড়তে না পারলেও শুনে শুনে আত্মস্থ করতে পারেন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত এ রকম ৯ জন শিক্ষার্থী নিয়মিতই পাচ্ছেন ‘থার্ড আই’য়ের বিভিন্ন সেবা।

পাইওনিয়ার বাংলাদেশ : ‘বুক শেয়ারিং’ ও ‘থার্ড আই’ প্রকল্প দুটি একসঙ্গে সচল রাখতে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সেই ভাবনা থেকেই ইশরাকের ‘পাইওনিয়ার বাংলাদেশে’র সূচনা। এর আওতায় থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে একই সঙ্গে দুটি প্রকল্পেরই কার্যক্রম চালানো হয়। সংগঠনটির ওয়েবসাইট তৈরির কাজ চলছে এখন। এর খরচ টি-শার্ট বিক্রির মাধ্যমে জোগাড় করা হচ্ছে। অন্যদিকে ‘বুক শেয়ারিং’ ও ‘থার্ড আই’ ছাড়াও ‘পাইওনিয়ার বাংলাদেশে’র অধীনে আরো তিনটি নতুন প্রকল্প শুরুর পরিকল্পনা চলছে। এর মধ্যে ‘বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ রক্ষা অভিযানমূলক কার্যক্রমে’র মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে সবাইকে অনুরোধ জানানো হবে, যেন টিফিনের কিছু টাকা বাঁচিয়ে হলেও তাঁরা একটি করে বৃক্ষরোপণ করেন এবং পরিবেশ রক্ষায় সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ‘স্বাস্থ্যবিষয়ক’ প্রকল্পটি পরিচালিত হবে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের নিয়ে। তাঁদের কাজ হবে, যতটুকু সম্ভব অসহায় মানুষের প্রাথমিক চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ‘দরিদ্রতা নির্মূল’ প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মক্ষম ভিক্ষুকদের কাজের সুবিধা করে দেওয়ার চেষ্টা থাকবে। এ ক্ষেত্রে কর্মহীন নারীদের শেলাই মেশিন কিনে দিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করানো, এর পর প্রয়োজনে তাঁদের শেলাই করা জামা-কাপড় বিক্রির দায়িত্ব নেওয়ারও স্বপ্ন দেখে ইশরাক ও তাঁর বন্ধুদের ‘পাইওনিয়ার বাংলাদেশ’।

মন্তব্য