kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা

চলছে প্রস্তুতি

পহেলা বৈশাখ মানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বর্ণিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবারের শোভাযাত্রার প্রস্তুতির কথা জানাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ

১০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চলছে প্রস্তুতি

বর্ষবরণের শিল্পকর্মে মশগুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা

আয়োজনের শুরুটা ছিল ১৯৮৭ সালে, যশোরে। চারুপিঠের উদ্যোগে একদল শিক্ষার্থী হাতি-ঘোড়া ও পাখপাখালির আদলে পুতুল তৈরি করে প্রথম শোভাযাত্রার আয়োজন করেছিলেন। উদ্যোক্তা ছিলেন শিল্পী মাহবুব জামাল শামীম ও হিরন্ময় চন্দ। 

১৯৮৭ কি ১৯৮৮ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মদিনে ঢাকার চারুকলায় মাটির পুতুল, টেপা পুতুলের ফর্মকে বড় আকারে তৈরি করে সেগুলো দিয়ে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে ছিল চারটি ঘোড়া, ২০-২৫টি মুখোশ।

তারপর ১৯৮৯ সালে (বাংলা ১৩৯৪) সাড়ম্বরে এই আয়োজনের সূচনা হয়। আয়োজন করেন চারুকলার নবীন শিক্ষার্থীরা। প্রথমে চারুকলা থেকে প্রায় দেড় শ শিক্ষার্থী শোভাযাত্রা নিয়ে বের হন। শাহবাগ অতিক্রম করতেই দেখা গেল, ১০ হাজারের মতো লোক শামিল হয়ে গেছেন সেই শোভাযাত্রায়। শুরুতে ঢাক ছিল ৪০টি। তৈরি করার সময় মনে হচ্ছিল সংখ্যায় যথেষ্টই। কিন্তু মিছিলের সাড়ম্বর দেখে সেদিনের সেই শিক্ষার্থীরা বুঝে গিয়েছিলেন, না, পর্যাপ্ত নয়। সেদিনের আয়োজনে আরো ছিল মুখোশ, শোলার তৈরি পাখিসহ আরো কিছু লোকজ অনুষঙ্গ। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল বড় আকারে বানানো হাতি, ঘোড়া। ঢাকে বাড়ি দিয়ে সেই শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেছিলেন কবি-সাংবাদিক ফয়েজ আহ্মদ।

প্রথমবারের সেই চমত্কার অভিজ্ঞতার পর প্রতিবছর নিয়মিত শোভাযাত্রাটি আয়োজনের কথা ভাবা হয়। প্রথম দিকে চারুকলা কর্তৃপক্ষ অবশ্য জায়গা দেওয়া ছাড়া সরাসরি অন্য কোনো সহায়তা করেননি। বরং কয়েকজন প্রগতিশীল শিক্ষার্থী আর শিক্ষকের ব্যক্তি-উদ্যোগেই এটি আয়োজিত হতো। পরে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আর এই আয়োজনের সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের করে নেয়।

বিশাল এই আয়োজনের জন্য অনেক খরচ, তাই বহুজাতিক কম্পানিগুলো নানা সময়ে এগিয়ে এসেছিল। তবে আয়োজকদের মতে, এতে চেতনার রক্ষা হবে না। ফলে সিদ্ধান্ত হলো, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য না নিয়ে বরং এখানকার শিক্ষার্থীরাই ছবি আঁকবেন, মুখোশ বানাবেন, আর সেগুলো বিক্রি করে আয়োজনটির অর্থের সংস্থান হবে। এখন পর্যন্ত এটিই এই আয়োজনের সংস্কৃতি হয়ে আসছে। প্রতিবছর চারুকলার প্রবীণতর ব্যাচ এই আয়োজন সামলানোর দায়িত্ব পায়। তাঁদের সহায়তা করেন বাকি সবাই। এবারের আয়োজনের দায়িত্বে আছেন ২১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।  

শুরুর ৩০ বছর পরও আয়োজনটা ঠিক কেমন আছে, দেখতে ঢু মেরেছিলাম চারুকলায়। দেখা গেল, জলরঙে ছবি আঁকছেন একদল শিক্ষার্থী। সেই দলে নবীনতর শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পড়াশোনা শেষ করে কাজে লেগে যাওয়া তরুণ শিল্পীরাও মিলেমিশে ছবি আঁকছেন। মাটির সানকিতে রং করা সরা আছে থরে থরে সাজানো, আছে ছোট পাখি। চারুকলায় এটাকে তুহিন পাখি বলে ডাকা হয়। বেশ অনেক বছর আগে কোনো এক তুহিন ভাই এই পাখি বানানো শুরু করেছিলেন বলেই এমন নাম।

একটু এগিয়ে গ্যালারিতে গেলে দেখা যাবে হাজারো রঙের প্যাঁচার মুখোশ। আছে ইয়া বড় রাজা-রানির মুখোশ। একটু এগোতেই মাঠে দেখা যাবে বড় বড় ডামি তৈরিতে ব্যস্ত সবাই। ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমি বললেন, ‘এবারের আয়োজন শুরু হয়েছে ১৮ মার্চ। আমরা বেশ ঘটা করে এটা শুরু করি। শুরুতে ফান্ড কালেকশনের জন্য জলরঙে আঁকা ছবি, মুখোশ, তুহিন পাখি, সরা—এসব বানাই ও বিক্রি করি। তারপর কিছু টাকা উঠে এলে শোভাযাত্রার মূল আসবাব তৈরিতে নামি। মূল শোভাযাত্রায় আমরা মুখোশ, পাখি, বিভিন্ন ফুল আর স্ট্রাকচার নেব।’

চারুকলার পাঠ চুকিয়ে এখন চাকরিজীবনে আছেন সুদীপ্ত। বেশ মন দিয়ে ছবি আঁকছিলেন তিনি। বললেন, ‘এটা আমার কাছে ঘোরের মতো। প্রতিদিন অফিস শেষ করেই এখানে চলে আসি, ছবি আঁকি। তারপর রাত করে বাসায় ফিরি।’

প্রিন্ট মেকিং বিভাগের অভিজিত্ কাজ করছিলেন স্ট্রাকচারে। বললেন, ‘প্যাঁচা, ছাগল, বাঘ ও বক, কলসিতে কবুতরসহ মোট আটটি স্ট্রাকচার তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি মোটিফেরই আলাদা অর্থ থাকে। আমরা রং দিয়ে সেই অর্থ ফুটিয়ে তুলি। স্ট্রাকচারগুলো দাঁড়িয়ে গেছে, রং দেওয়া বাকি। বৈশাখের প্রথম লগ্ন পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাক করা হবে।’

মুখোশ বানাচ্ছিলেন রাসেল রানা। বললেন, ‘কাগজ কেটে প্যাঁচার আদল দেওয়া হয়। তারপর একটা বোর্ডে সেসব আঠা দিয়ে লাগিয়ে রং করা হয়। নিজের খেয়াল-খুশির রঙে এসব মুখোশ রঙিন হয়ে ওঠে।’

পেপারম্যাশের বড় মুখোশ তৈরির কৌশল জানা গেল তাঁর কাছ থেকে। বললেন, ‘মাটিতে একটা আদল তৈরি করে শুকানো হয়। তার ওপর কাগজের প্রলেপ দিতে দিতে সেটিকে ভারী করে তুলতে হয়। ব্যস, হয়ে গেল মুখোশ! এবার রং লাগিয়ে নিলেই হলো।’

একদিকে পাখি বানাচ্ছিলেন নুসরাত। বললেন, ‘এই পাখিগুলো বিক্রির জন্য। কাগজ কেটে পেস্টিং করে তারপর রং করি।’ তিনি জানালেন, শোভাযাত্রার ফুল-পাখির কাজ এখনো ধরা হয়নি। আরো কয়েক দিন পর শুরু করবেন।

অন্যদিকে আরেক শিক্ষার্থী তানিয়া জানালেন, ‘আমাদের আরো একটা মজার আয়োজন হয়, যেটার খবর খুব কম মানুষই জানে! পহেলা বৈশাখের পরদিন আমরা একটা যাত্রাপালা করি। আমাদের এক সিনিয়র শিক্ষার্থী সেটির নির্দেশনা দেন। আর আমরা অভিনয় করি। সেটির রিহার্সালও চলছে। দেখতে চাইলে সন্ধ্যা ছয়টায় চলে আসতে হবে চারুকলা প্রাঙ্গণে।’

চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার মোটিফ তৈরির কাজ। ছবি : রাফিজ ইমতিয়াজ

মন্তব্য