kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

স্কুলের চেয়েও বেশি

বরিশালের বাকেরগঞ্জের বহু পুরনো এক স্কুল কলসকাঠী বি. এম. একাডেমি। ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটি অনেক দিক থেকেই অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। ছাদের সবজির বাগান, মূল্যবোধের দোকান, বিভিন্ন উত্সব ও জাতীয় দিবসে আলপনা আঁকা—এসব করে স্কুলের ছাত্ররাই। বিস্তারিত জানাচ্ছেন রফিকুল ইসলাম

১৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্কুলের চেয়েও বেশি

মাঠ, পুকুরসহ প্রায় পাঁচ একর জায়গা নিয়ে বি. এম. একাডেমি স্কুল। ছবিতে স্কুলের মূল প্রাঙ্গণ আর ভবনের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে

বিদ্যালয়ে ঢোকার মুহূর্তেই দেখা হয়ে গেল দীপায়ন আর মামুনের সঙ্গে। ওদের সঙ্গে গল্প করতে করতে ঢুকে পড়লাম স্কুলের ভেতরে। ওদের দুজনের গল্প বলার আগে বরং অন্য রকম এই বিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক

ছাদের সবজি বাগানে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা

ঐতিহ্যবাহী এক বিদ্যালয়

কলসকাঠীর জমিদার বড়দাকান্ত রায় চৌধুরী ১৮৮২ সালে নিজের ও স্ত্রী মুক্তাকেশীর নামে কলসকাঠী বি. এম. একাডেমি (বড়দাকান্ত মুক্তাকেশী একাডেমি) প্রতিষ্ঠা করেন। একসময় বি. এম. একাডেমিতে পরিচালিত হতো কলকাতা ইউনিভার্সিটির আওতায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। তখন অনেক ব্রিটিশ শিক্ষক কলকাতা থেকে এখানে এসে পড়াতেন। ১৯৩৭ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এই স্কুল পরিদর্শন করেন।

 

সবখানেই শিক্ষার্থীরা

স্কুলটিতে গেলে চোখে পড়বে প্রায় চতুর্ভুজ আকৃতির বারান্দার তিন দিকেই আলপনা করা হয়েছে। প্রবেশদ্বারও সাজানো হয়েছে সুদীর্ঘ আলপনায়। স্কুলের শিক্ষার্থীরা দিন-রাত কাজ করে আলপনা এঁকেছে একুশে ফেব্রুয়ারি, সরস্বতীপূজা আর স্কুলের ১৩৭তম বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা উপলক্ষে।

বিদ্যার দেবী সরস্বতীর প্রতিমা তৈরি থেকে প্রসাদ বিতরণ—সবই করেছে শিক্ষার্থীরা। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি শেষে কলসকাঠী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে ফুলের মালা দিয়েছে এবং সাজসজ্জা করেছে শিক্ষার্থীরা। কোনো শিক্ষার্থী পরপর তিন দিন অনুপস্থিত থাকলে তাদের বাড়িতে গিয়ে সহপাঠীরা হাজির হয়। কারণ অনুসন্ধান করে। পাশাপাশি সমাধানের পথ খুঁজে তাদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। এভাবেই ঝরে পড়া রোধে শিক্ষার্থীরা কাজ করছে। আর এসব বিষয়ে সব সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থেকে যিনি উত্সাহ দেন, তিনি বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক সৈয়দ লোকমান হোসেন।

চলছে আলপনা আঁকার কাজ

পণ্য আছে, বিক্রেতা নেই

কলসকাঠী বি. এম. একাডেমির একটি কক্ষে সাবেক শিক্ষার্থীদের অর্থে স্থাপন করা হয়েছে ‘মূল্যবোধের দোকান’। দোকানের পণ্যের তালিকায় আছে কলম, পেনসিল, খাতা, জ্যামিতি বক্স, রাবারসহ বিভিন্ন রকমের শিক্ষাসামগ্রী। কিন্তু কোনো বিক্রয়কর্মী নেই, নজরদারির জন্য নেই কোনো সিসি ক্যামেরা। পণ্যের গায়ে দাম লেখা আছে। পণ্য নিয়ে নির্ধারিত বাক্সে টাকা রেখে দিতে হয় নিজ দায়িত্বে। প্রতিদিন স্কুল চলাকালে ওই দোকান খোলা থাকে। শুধু স্কুলের শিক্ষার্থী-শিক্ষকরাই এখান থেকে কোনো জিনিস ক্রয় করেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা ও ন্যায়নীতির অনুশীলনের সুযোগ করে দিতেই এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি। বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস ‘মূল্যবোধের দোকান’ উদ্বোধন করেন। মূল্যবোধের দোকানে গিয়ে দেখলাম, ছাত্ররা খুব উল্লসিত এই দোকান নিয়ে। কেউ কিনছে, কেউ সাজিয়ে রাখছে। এদের একজন দশম শ্রেণি পড়ুয়া নাইমুর রহমান বলল, ‘আমরা সবাই মূল্যবোধ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। এখন এই দোকানের মাধ্যমে এর চর্চা করছি।’

 

ছাদবাগান

আছে ছাদবাগান। যেখানে চিচিঙ্গা, বেগুন, পুঁইশাকসহ আরো অনেক সবজির চাষ হয়েছে। আর এই বাগান পরিচর্যায় কাজ করছে স্কুলের শিক্ষার্থীরাই। এদেরই একজন নবম শ্রেণির ছাত্র জয় শিকদারের সঙ্গে কথা হলো। বলল, ‘আমাদের স্কুলে শিক্ষার্থীদের দুপুরে খাবার দেওয়া হবে। আর এতে সবজির চাহিদা পূরণে সাহায্য করবে ছাদকৃষি।’

 

স্কুল পালানোর দিন শেষ

২০১৯ সাল থেকে কলসকাঠী বি. এম. একাডেমির পুরো কার্যক্রম ডিজিটালাইজ করা হয়েছে। এখন শিক্ষার্থীরা বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে হাতের ছাপ দিয়ে স্কুলে প্রবেশ করে। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছে মুঠোফোনে ক্ষুদ্র বার্তার মাধ্যমে পৌঁছে যায় অনুপস্থিতির তথ্য। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের বেতন, পরীক্ষার প্রবেশপত্র, ক্লাস রুটিন, সিট প্ল্যান, ফলাফল—সব কিছুই ডিজিটাল পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা মুঠোফোনেই ফলাফল, বেতন জমার তথ্যাদি সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যান।

 

ফলাফল

স্কুলের ফলাফলও কিন্তু বেশ ভালো। ২০১৮ সালে এই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৯১ দশমিক ৭৬। এবারও ফলাফল ভালো হবে বলে আশা করছেন প্রধান শিক্ষক দীপক কুমার পাল। তিনি বলেন, ‘একসময় এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা যশোর বোর্ডের মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকত। কিন্তু যোগ্য শিক্ষক না থাকায় আগের মতো ফলাফল ভালো হচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে আরো ভালো ফলাফলের জন্য বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি কাজ করছে।’  

 

ছাত্র থেকে শিক্ষক

আবদুস সালাম তালুকদার, কলসকাঠী বি. এম. একাডেমির সবচেয়ে প্রবীণ ছাত্র। ছাত্রজীবনের পাট চুকিয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এই স্কুলেই। এক যুগের বেশি সময় আগে অবসরে গেছেন। তবে সময় পেলে এখনো স্কুলে এসে শিক্ষার্থীদের পড়ান। এই স্কুলের আরেক সাবেক কৃতী ছাত্র এ কে এম মজিবুর রহমান। তিনি এই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে যশোর বোর্ডে সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে ডিগ্রি নিয়ে ১৯৮১ সালে পিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেন। পরে ২০১৫ সালে সরকারি বরিশাল কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরে যান।

 

কাজ-শিক্ষা একসঙ্গে

এই স্কুলের একটা অন্য রকম ব্যাপার হচ্ছে, এর বেশ কয়েকজন ছাত্র পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করে আয়-রোজগার করে। কেউ কেউ তো সংসার চালায়। শুরুতে ঢোকার মুখে যে দুজন ছাত্রের সঙ্গে দেখা, তারাও এর বড় উদাহরণ। দীপায়ন পাল দশম শ্রেণিতে পড়ে। বাবা অকালে চলে গেলে তাঁর রেখে যাওয়া ছোট্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাল ধরে সে। এক বেলা দোকান তো অন্য বেলা স্কুল। এভাবেই ব্যবসার পাশাপাশি পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে দীপায়ন। দেবী সরস্বতীর প্রতিমা গড়তে যারা ভূমিকা রেখেছে, সে তাদের অন্যতম। ছাদবাগানে তার নেতৃত্বেই শিক্ষার্থীরা কাজ করছে। প্রবেশদ্বারের বাগান পরিচর্যার দায়িত্বও দীপায়নের কাঁধেই।

ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মামুন মৃধা। পিএসসি পরীক্ষার সময় বাবা মারা যান। বাবার অনুপস্থিতিতে বড় দুই ভাইয়ের সঙ্গে মামুনও পরিবারের হাল ধরেছে। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার হাটের দিন বাজার থেকে ধান কিনে আনে। সেই ধান শুকিয়ে চাল করে বাজারে বিক্রি করে। এই টাকায় পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচ মিটিয়ে এক বোন আর তিন ভাইয়ের পড়ালেখা চলে। সময় পেলেই মামুন স্কুলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজেও শ্রম দেয়।

 

দুপুরে খাবারের উদ্যোগ

দরিদ্র মেধাবী এবং দূরবর্তী অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলের সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের পাশেই আছে বিরাট এক পুকুর। সেখানে হবে মাছ চাষ। মাছ, ছাদবাগান আর পুকুরপারের সবজি যোগ হবে শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারে। স্বল্প আয়ের পরিবার থেকে উঠে আসা এবং দূরবর্তী অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ইতিবাচক ফল দেবে বলে কর্তৃপক্ষ আশা করছে। এ ক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবানদের যুক্ত করার কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি।

স্কুলটিতে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। যারা সচ্ছল, তাদের প্রতিটি ক্লাসঘরের সামনে একটি বড় পাত্র রাখা থাকবে। প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে তাদের ছোট্ট হাতে ভরে এক মুঠো করে চাল কিংবা ডাল এনে ওই পাত্রে জমা করবে। সেই সংগৃহীত চাল ও ডাল এবং ছাদবাগন থেকে উত্পাদিত সবজির মাধ্যমে খিচুড়ি তৈরি হবে। যা শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারে দেওয়া হবে।

 

মন্তব্য