kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৪ অক্টোবর ২০১৯। ৮ কাতির্ক ১৪২৬। ২৪ সফর ১৪৪১       

টিম প্রজাপতির অ্যাগ্রো ড্রোন

ডানা মেলে আকাশে

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের দল ‘টিম প্রজাপতি’। ৪ ফেব্রুয়ারি দলটির তৈরি ‘অ্যাগ্রো ড্রোন’ সফলভাবে ডানা মেলেছে আকাশে। লিখেছেন স্বপ্নীল রহমান

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডানা মেলে আকাশে

ড্রোন উড়াচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

দেশের জনসংখ্যা যত বাড়ছে, ততই কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উত্পাদন বাড়ানো জরুরি। কৃষিতে ড্রোনের ব্যবহার আনতে পারে যুগান্তকারী পরিবর্তন। এমন ভাবনা থেকেই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল শিক্ষার্থী তৈরি করেছেন ‘অ্যাগ্রো ড্রোন’। তাঁদের উদ্ভাবিত ড্রোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা ড্রোন তৈরি করলেন এবারই প্রথম।

ড্রোন উড়ল আকাশে

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের দল ‘টিম প্রজাপতি’। ৪ ফেব্রুয়ারি দলটির তৈরি ‘অ্যাগ্রো ড্রোন’ সফলভাবে উড়েছে আকাশে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ প্রাঙ্গণে উড্ডয়নের উদ্বোধন

করেন উপাচার্য অধ্যাপক

ড. এস এম ইমামুল হক। শিক্ষার্থীদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, শিক্ষার্থীরা তাদের বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে নিত্যনতুন উদ্ভাবন করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে।’ ড্রোনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।

্রেড্রানটি উড়িয়ে দেখান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আবদুল্লাহ। এটি আকাশে উড়েছিল প্রায় আধা ঘণ্টা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান এবং বঙ্গবন্ধু হলের প্রভোস্ট রাহাত হোসাইন ফয়সাল, প্রভাষক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান হাফিজ আশরাফুল হকসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

নেপথ্যের কারিগর

‘টিম প্রজাপতি’র তরুণরা হলেন—মো. সোহেল মাহামুদ, জুবায়ের আবদুল্লাহ জয়, আহম্মদ সাবির, আবু সাঈদ মো. আফ্রিদি ও মীর সামিউর রহিম। দলনেতা সোহেল শেষ বর্ষের ছাত্র, বাকি সবাই পড়ছেন দ্বিতীয় বর্ষে। প্রজেক্টটির সুপারভাইজার ছিলেন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান এবং বঙ্গবন্ধু হলের প্রভোস্ট রাহাত হোসাইন ফয়সাল। কো-সুপারভাইজার একই বিভাগের প্রভাষক ও ছাত্র উপদেষ্টা মো. মোস্তাফিজুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগ জানায়, এর মধ্য দিয়ে ‘অটোমেটেড ক্রপস কোয়ালিটি মনিটরিং ইউসিং ড্রোন সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড ইমেজ প্রসেসিং’ প্রজেক্টের প্রথম পর্বের সফল উড্ডয়ন হলো।

পেছনের গল্প

টিম প্রজাপতির দলনেতা মো. সোহেল মাহামুদ জানান, ড্রোন বানাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এত টাকা তাঁদের পক্ষে জোগার করা সম্ভব ছিল না। শরণাপন্ন হন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সাব্বির হোসেনের কাছে। তাঁর সঙ্গে ছিল না পূর্বপরিচয়। বিষয়টি শুনেই ৩৫ হাজার টাকার চেক দিয়ে দেন তিনি। এতে ভীষণ অবাক টিম প্রজাপতির সদস্যরা। তিনি টাকাটা না দিলে হয়তো তাঁদের ড্রোন বানানোর স্বপ্ন পূরণই হতো না। সোহেল মাহামুদ বলছিলেন, ‘ড্রোন বানাতে প্রায় সাত মাস সময় লেগেছে। বানাতে ও উড়াতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলাম। লক্ষ্যে অটুট ছিলাম। তাই হাল ছাড়িনি। বানানোর পর ভেবেছিলাম ড্রোন উড়ানো খুবই সহজ কাজ; কিন্তু যখন উড়াতে গেলাম, ভয়ে গা শীতল হয়ে গিয়েছিল।’

কাজের কাজি

যেখানে মানুষ যেতে পারবে না, সেখানে চলে যাবে ড্রোন। তুলে নিয়ে আসবে ছবি। প্রজেক্টটির সুপারভাইজার কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান রাহাত হোসাইন ফয়সাল জানান, এটি মূলত কৃষিভিত্তিক ড্রোন হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার করা যাবে। নিরাপত্তার কাজে এটি ব্যবহার করা যাবে। জরুরি ওষুধ আনা-নেওয়ার কাজেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট দূরত্বে বা প্রত্যন্ত এলাকায় অনাবাদি বা কম ফলনশীল জমির অবস্থা নিরূপণ করার জন্য ড্রোন ব্যবহার করা যাবে। অনেক সময় জমিতে সরাসরি গিয়ে দেখা সম্ভব হয় না, ড্রোন দিয়ে সহজেই জমির ছবি ধারণ করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে এসব ছবি অ্যানালিসিস করে বের করা যাবে এসব জমি কেন অনাবাদি, কী পরিমাণ চাষাবাদ হচ্ছে, সমস্যাটা কোথায়, কিভাবে আবাদযোগ্য করা যায়। ফসলে কোনো ধরনের পোকা বা জীবাণু আক্রমণ করেছে কি না তা-ও শনাক্ত করা যাবে। ড্রোনের মাধ্যমে বিশাল কোনো জমিতে নিখুঁতভাবে সার বা কীটনাশক দেওয়ার কাজটিও করা যাবে। কৃষিক্ষেত্রে এ রকম নানা সমস্যা চিহ্নিত করে গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের জন্য কাজ করা যাবে।

রাহাত হোসাইন ফয়সাল বলেন, ‘যন্ত্রাংশ কিনে প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজ করে তৈরি করা হয়েছে এটি। আরো উন্নত অ্যাগ্রোবেজড ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা করেছি আমরা। এটি ডেভেলপ করার জন্য গবেষণার কাজ চলছে।’

বাণিজ্যিক ব্যবহার সম্ভব

উন্নত অনেক দেশে ড্রোন তৈরি পাঠ্যক্রমেরই অংশ। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আমরা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তৈরি ড্রোন অনেকটাই আশার আলো। জুবায়ের আবদুল্লাহ জয় বলেন, ‘সারা বিশ্বে দিন দিন ড্রোনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এটি ব্যবহার করে দুঃসাধ্য জিনিসকে সহজতর করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে আমরা গবেষণা চালিয়ে যাব।’

‘টিম প্রজাপতি’র তরুণ সদস্যরা মনে করেন, উন্নত দেশগুলো ড্রোন সেক্টরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এ খাত শিল্পে রূপ নিতে পারে। এতে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। কর্মসংস্থান হবে অনেকের।

 

মন্তব্য