kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

কাজের মানুষ

যত দোষ নন্দ ঘোষ

সৈয়দ আখতারুজ্জামান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিয়ন্ড ইনস্টিটিউট অব ট্রেনিং অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক লেখক ও প্রশিক্ষক

২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যত দোষ নন্দ ঘোষ

অন্যের কারণে অফিসে আপনার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। কাজ করল একজন কিন্তু দোষ এসে পড়ল আপনার ঘাড়ে। যতক্ষণে ব্যাখ্যা করলেন ততক্ষণে আপনার নামে সারা অফিসে ফিস ফিস কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে। অফিসে অন্যের দোষ যাতে আপনার ঘাড়ে না আসতে পারে তার জন্য ১০ রক্ষাকবচ।

এক.

প্রতিযোগিতায় জিততে হলে নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর দরকার হয় না কিন্তু অন্য কেউ যাতে তার দোষ আপনার ঘাড়ে চাপাতে না পারে তার কৌশল জানা একান্ত দরকার। যাঁরা ‘মনে হয়’, ‘হয়তো’, ‘যদি’, ‘অথবা’ ইত্যাদি শব্দযোগে কথা বলেন তাঁদের সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। এসব শব্দযোগে বহুমুখী বাক্য তৈরি করা যায় বলে তা বহুবিধ অর্থ তৈরি করে। এরা সব কথা বলে কিন্তু কোনো কথায়ই বাধা পড়ে না। সুুযোগমতো পিছলে যায় অথবা আঁকড়ে ধরে। সুতরাং সতর্ক থাকুন।

 

দুই.

আপনার কাজের সীমানা নির্ধারণ করুন। আপনার কাজ কী কী তা যেমন স্পষ্ট হওয়া দরকার একইভাবে কোন কোন ক্ষেত্র আপনার কাজের জন্য নয় তাও উল্লেখ থাকা দরকার। অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ, পদোন্নতি বা বদলির সময় আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য (জব রেসপনসিবিলিটি) বিষয়ে উল্লেখ করে নথি বা চিঠি দিয়ে থাকে কিন্তু আমাদের দেশে অনেক অফিসে এখনো এ ধরনের পেশাদারির পরিচয় পাওয়া যায় না। তাই এসব ক্ষেত্রে নিজে উদ্যোগী হয়ে আপনার সুপারভাইজারের সঙ্গে বসে খোলামেলা আলাপ করে (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে নেওয়া দরকার।

 

তিন.

আপনার সুপারভাইজারের অনুমতি ছাড়া কখনো আপনার সীমানার বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করবেন না। যদি প্রয়োজনে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে তা করতেও হয়, আপনার বসের অনুমতি নিয়ে নিন। ভালো করতে গিয়ে খারাপ হলে আপনার এই মহান প্রচেষ্টার ফলাফল খুব বেদনাদায়ক হতে পারে।

 

চার.

প্রতিদিন আপনার কাজের প্রতিবেদন (ডেইলি অ্যাক্টিভিটি রিপোর্ট) লিখুন। এ কাজটি একটি অনন্যসাধারণ কাজ। কাজটি করতে প্রতিদিন ১০ মিনিটের বেশি সময় লাগে না কিন্তু প্রচুর ধৈর্য দরকার। কিছু দিন চালিয়ে যাওয়ার পরই খুব ক্লান্ত বোধ হয়। মনে হয় আজ থাক, কাল দুই দিনেরটা একসঙ্গে করব। এভাবে আলসেমি ভর করে। কিন্তু একবার অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে এই প্রতিবেদন আপনাকে মারাত্মক সব বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে এবং অনেক কাজে দারুণ সাহায্য করতে পারে।

 

পাঁচ.

বুদ্ধি করে আপনার কাজের ধরন বুঝে একটা ফরম্যাট বানিয়ে ফেলতে পারলে এই কাজের প্রতিবেদন লেখা আরো সহজ হয়ে যায়। বিষয়টি কিছুই নয়, আপনি সারা দিন যা যা করেছেন তার হিসাব রাখা শুধু। অন্য কেউ দোষ চাপাতে চাইলে এই প্রতিবেদন আপনাকে তথ্য দিয়ে দারুণ সাহায্য করবে। কারণ আপনি কী করেছেন আর কী করেননি তার নিখুঁত সাক্ষী এই প্রতিবদন। অনেকে প্রতিদিন এই প্রতিবেদন সুপারভাইজারকে দেখিয়ে তাঁর একটা স্বাক্ষরও রাখেন। সুপারভাইজারকেও এই সুযোগে জানানো হলো আপনি সারা দিনে কী কী কাজ করলেন।

 

ছয়.

প্রতিদিন নিয়মিতভাবে আপনি যে কাজগুলো করেন বা করা দরকার বলে মনে করেন তার একটা চেকলিস্ট তৈরি করুন। প্রতিদিন অফিস থেকে বেরোনোর আগে যে কাজগুলো করেছেন তার পাশে টিক চিহ্ন দিন এবং যে কাজগুলো করা হয়নি তার পাশে ক্রস চিহ্ন দিন। এতে ভুলবশত কোনো কাজ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম। ফলে অন্য কেউ সহজে আপনার ওপর দোষ চাপাতে পারবে না।

 

সাত.

আপনার কাজের ধরন ও ক্ষেত্র বুঝে কে কে আপনার ওপর দোষ চাপাতে পারে তার একটি সম্ভাব্য তালিকা তৈরি করুন। তালিকাটি মনে মনে তৈরি করাই ভালো। এদের সঙ্গে কাজ করার সময় বা কথা বলার সময় সতর্কতা অবলম্বন করুন। পরিষ্কার করে কথা বলুন, স্পষ্ট যোগাযোগ রাখুন, প্রতিটি পদক্ষেপ লিখিত রাখার চেষ্টা করুন। কাজ শেষে বা আলাপ শেষে কী কাজ হলো বা কী আলাপ হলো তার সারসংক্ষেপ আবার উল্লেখ করুন, যাতে ভুল-বোঝাবুঝির কোনো রকম সুযোগ না থাকে। এর পরও যারা অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেকে নিষ্কণ্টক রাখতে চায়, তারা সে চেষ্টা করবেই। তবে আপনার এই পদক্ষেপ তার সাবলীল অভ্যাসে অনেক বড় অস্বস্তি তৈরি করবে। আপনাকে অত সহজে ফাঁদে ফেলা যাবে না।

 

আট.

কোনো নথি গ্রহণ করতে বা কোনো নথি প্রদান করতে রেজিস্টার মেনে চলুন। যে নথি গ্রহণ করলেন তার জন্য নথিতে স্বাক্ষর করবেন এবং যে নথি প্রদান করলেন তার জন্যও আপনার রেজিস্টারে স্বাক্ষর রাখবেন। কে নথি পাঠাল, কী নথি পাঠাল, কত তারিখে পাঠাল, কোন সময়ে আপনি তা গ্রহণ করলেন, কার বা কোন মাধ্যমে পাঠানো হলো এসব তথ্য যেন রেজিস্টারে উল্লেখ থাকে। অন্য কাউকে নথি পাঠানোর ক্ষেত্রেও একইভাবে তথ্য সংরক্ষণ করুন। তাহলে আর আপনাকে ফাঁদে ফেলা অত সহজ হবে না।

 

নয়.

কোনো সভায় অংশগ্রহণ করলে সভা প্রতিবেদন (বা মিটিং মিনিটস) লিখুন। সভায় কী কী বিষয়ে আলোচনা হলো, কাকে কী দায়িত্ব দেওয়া হলো, বিশেষ করে আপনাকে কী দায়িত্ব দেওয়া হলো বা আপনি কাকে কী দায়িত্ব দিলেন ইত্যাদি বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো টুকে রাখুন।

 

দশ.

একা কাজ করার চেয়ে দলগত কাজে একের দোষ অন্যকে চাপানোর প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তাই দলগত কাজেও নিজের দায়িত্বের অংশটুকু আলাদাভাবে বুঝে নিন। আপনার কাজের অগ্রগতি এবং অন্যের সঙ্গে আপনার কাজের অংশীদারিত্ব বিষয়ক খুঁটিনাটি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) আপনার সুপারভাইজারকে জানিয়ে রাখুন।

 

এগারো.

দুঃসময়ে ধৈর্যের পরিচয় দিন। কখনো অন্যায়ভাবে আপনার ওপর দোষ চাপানো হলে ঠাণ্ডা মাথায় শালীনভাবে তার প্রতিবাদ করুন। আবেগতাড়িত না হয়ে যুক্তি দিয়ে, এত দিন ধরে যেসব নথিপত্র নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করেছেন তার সাহায্য নিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করুন। এত কিছুর পরও অনেক সময় আসে যখন পরিস্থিতির চাপে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা যায় না। এ ক্ষেত্রেও ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে পুরো ব্যাপারটিকে একটা শিক্ষা মনে করে মেনে নিন। এগিয়ে চলার পথ যেন কখনো বাধাগ্রস্ত না হয়। ভাবুন, এ ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কী করে সামলাবেন।

মন্তব্য