kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৫ রবিউস সানি          

অন্য কোনোখানে

লাখো শাপলার বিলে

শাহীন আহমেদ   

২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লাখো শাপলার বিলে

লাখ লাখ লাল শাপলার বিল বিকি। স্থানীয়রা ডাকেন বেকি বিল বলে। অনেক দিন ধরেই বিলটা দেখার পরিকল্পনা ছিল। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে মিলল অবসর। সেদিন ভোর ৬টা। টাঙ্গুয়া হাওরের সুলতান বাবরুল ফোন করে জানালেন, সব প্রস্তুত। এবার যাওয়ার পালা। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ব্রিজ থেকে মোটরসাইকেলে রওনা দিলাম। আমাদের বাঁ পাশে মাটিয়ান হাওর। এই হাওর পশ্চিমে গিয়ে মিলেছে টাঙ্গুয়া হাওরের সঙ্গে। হাওর ধোয়া ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশ। যেতে যেতেই দেখা মিলল পাথার, গাঁও-গ্রাম। ইঞ্জিন নৌকায় পাড়ি দিলাম নীল জলের সুন্দর একটি খাল। তারপর বাদাঘাট বাজার। অনেক বড় বাজার। এখানকারই এক রেস্তোরাঁয় নাশতা সেরে এগোতে থাকি বিকি বিলের দিকে।

আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক রফিকুল ইসলাম ভাই। বিকি বিলের কাছেই তাঁর বাড়ি। অতঃপর নিজেরাই দুটি নৌকা নিয়ে বিলে নেমে পড়লাম। প্রায় এক হাজার একরজুড়ে শুধু শাপলা আর শাপলা। খুলনার তেরোখাদা, বরিশালের সাতলা ও সিলেটের ডিবির হাওরের চেয়ে এখানে শাপলা অনেক বেশি। বিলের দক্ষিণে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড়।

বিলে যাত্রার শুরুতেই একদল হাঁসের সঙ্গে সাক্ষাৎ। হাওরে সাঁতরে চলা হাঁস দেখতেও দারুণ লাগে। তারপর দেখি নানা জাতের তাজা মাছ। এরপর শুধুই লাল শাপলার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার পালা। বিলে নামার আগে ছোটখাটো একটি যুদ্ধ করেছি সবাই। কারণ এটা কোনো পর্যটন স্পট নয়। ধারেকাছে কোনো নৌকা নেই, মাঝি নেই। উপায় বের করলেন বাবলু ভাই। কিছু দূরে একটি ডুবানো নৌকা ছিল। সেটাই পানি থেকে তুলে চলাচলের উপযোগী করলেন। নৌকা তো পাওয়া গেল কিন্তু বৈঠা নেই। কোথা থেকে একটি বড় বাঁশ নিয়ে এলেন। সেটাকেই লগি হিসেবে ব্যবহার করলাম। একই ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম খুলনার তেরোখাদা আর বরিশালের উজিরপুরের সাতলার বিলে। ফলে এই অভিজ্ঞতা আমার জন্য নতুন নয়। এরই মধ্যে সোহাগও একটি বড় নৌকা সংগ্রহ করে ফেলেছে। ‘হেইয়া ও হেইয়া ও মাঝি ভাই’ বলে বাবলু ভাই লগিতে ধাক্কা দিলেন। ধাক্কার তোড়ে তরতর করে এগিয়ে চলল ছোট্ট নাওখানা। পানিতে তাকালাম। এত স্বচ্ছ যে নিজের মুখ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আর শাপলাপাতার ফাঁক দিয়ে যে পানি দেখা যাচ্ছে তা যেন ঘন সবুজ শরবত।

বিকি বিলের উত্তর, দক্ষিণ আর পশ্চিমে নাও চলার রাস্তা আছে। আমরা পশ্চিমের পথ ধরে এগোতে থাকি। দুই পাশে রক্তলাল শাপলা, নিচে সবুজ পানি, ওপরে নীল আসমান আর দক্ষিণে আকাশছোঁয়া খাসিয়া পাহাড়। সকালের স্নিগ্ধ হাওয়া, বিলে মাছের হুটোপুটি, হাঁসদের দলবেঁধে সাতরে চলা, পাখিদের মুক্ত ওড়াউড়ি—সব মিলে এ যেন অন্য এক পরিবেশ। বিলের সদর রাস্তা ছেড়ে ঘন শাপলার দঙ্গলে ঢুকে পড়ি। এখানে পরিবেশ এত শান্ত যে নৌকার কিচকিচ শব্দ এসে দাঁতে লাগে। লাখ লাখ শাপলা হাতের নাগালে। শাপলায় হাত বুলাই। বড় মায়া লাগে ওদের জন্য। ছবি তুলি। বসে, শুয়ে নানা এঙ্গেলে। ছবি তোলা শেষে আরো এগিয়ে যাই। অনেকক্ষণ বিল বেড়ানোর পর মনে হলো কিছু শাপলা গুনি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। এক, দুই, তিন, এক শ আর গুনতে পারি না। এত অজস্র শাপলা গুনে শেষ করতে পারি না। তালগোল পাকিয়ে যায়।

বিল ভ্রমণ শেষে ঘাটে ফিরলাম। আলাপ হলো কয়েকজন জেলের সঙ্গে। বললেন, আগে জানালে নৌকা প্রস্তুত করে রাখতেন। আবার বিল ভ্রমণের নিমন্ত্রণ করলেন তাঁরা। এমনিতেও তাহিরপুরের মানুষজন ভালো, সজ্জন। একই পথে বাদাঘাট বাজারে ফিরি। বাজার পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন রফিকুল ইসলাম ভাই। ভরপেট নাশতা করালেন। বাজারের সেরা মিষ্টির দোকানে রসগোল্লা খাইয়ে তবেই বিদায় দিলেন তিনি।

 

কিভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো জায়গা থেকে সুনামগঞ্জ। এখান থেকে মোটরসাইকেল নিন বাদাঘাট হয়ে বিকি বিল পর্যন্ত। ভাড়া ২০০ টাকা। আর তাহিরপুর থেকে ১০০ টাকা।

মন্তব্য