kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

অন্য কোনোখানে

২০১ গম্বুজ মসজিদে

মীম মিজান   

৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



২০১ গম্বুজ মসজিদে

টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনাল থেকে গোপালপুরের বাসে উঠলাম। পুরো বাসের পেছনের আসনটাই শুধু ফাঁকা। তাতেই গা এলিয়ে দিলাম। শরত্কালীন নীল আকাশের খাঁ খাঁ রোদ।

বিজ্ঞাপন

তার মধ্যেই গোপালপুর থানা সদরে নেমে ভ্যান ঠিক করে রওনা হলাম দক্ষিণ পাথালিয়া। শুক্রবার। ছুটির দিন। পথেই জুমার নামাজ পড়ে নিয়েছি। এসেছি টাঙ্গাইলের বিখ্যাত ২০১ গম্বুজ মসজিদ দেখতে। মসজিদের কাছাকাছি হতেই দেখি পর্যটকের ভিড়। মসজিদের পাশেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা গাড়ি রাখা। মসজিদের সামনে কয়েকটি দোকান। তার মধ্যে দুটি হোটেল। সব পর্যটক গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। খাবারের সে কী সংকট! আরো আছে শোপিস, আচার, খেলনাসহ বেশ কিছু জিনিসের দোকান। ছোটদের জন্য আছে ট্রেন, নাগরদোলা, নৌকা দোলনি ইত্যাদি খেলার ব্যবস্থা।

ব্যক্তিগত কাজে সকালে টাঙ্গাইল গিয়েছিলাম। ১১টার মধ্যে কাজ শেষ। টাঙ্গাইলের উদীয়মান কবি ইমরোজ আহসান টাঙ্গাইল ঘুরে দেখতে চাওয়ায় এখানে নিয়ে এসেছেন।

ভিড়ের মধ্যেই ঠেলেঠুলে দুই হোটেলের একটিতে জায়গা করে নিয়েছিলাম। খাওয়া শেষে মসজিদে ঢোকার আগে বাইরের দিকটা ঘুরে নিলাম। মসজিদের বাম পাশে তিন নেতার মাজারের মতো একটি স্থাপনা। সেখানে একজনের কবর দেওয়ার মতো জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। জানতে পারলাম, এখানে সমাহিত হবেন এই মসজিদের নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম।

মসজিদসংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ৪৫১ ফুট উচ্চতার একটি বিশাল বড় মিনার তৈরি হচ্ছে। প্রায় ৫৭ তলা উঁচু ভবনের সমান এই মিনারের ৫০তলা পর্যন্ত থাকবে লিফট সুবিধা। নাম হবে রফিকুল ইসলাম টাওয়ার। নির্মাণ শেষ হলে দিল্লির কুতুবমিনারকে পেছনে ফেলে দিবে রফিকুল টাওয়ার। কুতুব মিনার ২৪০ ফুট।

মসজিদটির পশ্চিমাংশে উত্তর-দক্ষিণে বয়ে গেছে যমুনার শাখা জিনাই নদী। এটি মসজিদের সৌন্দর্যকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। মসজিদের সামনে দিয়ে পৌঁছলাম উত্তর দিকে অবস্থিত অজুখানায়। বিশাল বড় অজুখানা। বসে অজু করার জন্য ছোট ছোট চেয়ারের মতো ১১৬টি আসন। অজুখানার ছাদ ছাইরঙা ক্ষুদ্রকায় পাথরের মতো মোজাইক করা। তাতে মধ্যম গভীর পানির আধার। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য অজুখানাটি সামান্য বাঁকা করে নির্মাণ করা হয়েছে।

মূল গেট দিয়ে দ্বিতীয়তলায় প্রবেশ করলাম। মসজিদের প্রধান দরজা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ৫০ মণ পিতল। একসঙ্গে ১৫ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারবেন। দ্বিতল এই মসজিদটি নির্মাণে ব্যবহূত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের উন্নতমানের টাইলস, যা মিসর থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। মসজিদের অভ্যন্তরের দেয়ালের চার দিকে একসারি টাইলস লাগানো হয়েছে, যাতে খণ্ড খণ্ড করে পুরো পবিত্র কোরআন লিপিবদ্ধ। মিহরাবের পাশে লাশ রাখার জন্য হিমাগার তৈরি করা হচ্ছে। এখানে থাকবে জানাজার ব্যবস্থা। প্রায় ১৫ বিঘা জমির ওপর নির্মাণাধীন এই মসজিদটি সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলেও এতে সহস্রাধিক বৈদ্যুতিক পাখা যুক্ত করা হবে।

মসজিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ একই, ১৪৪ ফুট। দৃষ্টিনন্দন মসজিদটির ছাদের মূল গম্বুজের উচ্চতা ৮১ ফুট। এই গম্বুজের চারপাশ ঘিরে ১৭ ফুট উচ্চতার আরো ২০০ গম্বুজ তৈরি করা হয়েছে। মসজিদের চার কোনায় রয়েছে ১০১ ফুট উঁচু চারটি মিনার। এ ছাড়া ৮১ ফুট উচ্চতার আরো চারটি মিনার পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে। গম্বুজ আর মিনারগুলোতে দৃষ্টিনন্দন উন্নতমানের টাইলস বসানো। ধর্মপ্রাণ মুসলমানসহ ভ্রমণ পিপাসু অসংখ্য মানুষ এটি দেখার জন্য ও সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রতিদিন ছুটে আসেন এখানে।

মসজিদটির উত্তর-পশ্চিম দিকে একটি ছয়তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে বিনা মূল্যে হাসপাতাল, এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে। এই বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠলে মসজিদ ও নদীর সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করা যায়।

২০১ গম্বুজ মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে। মসজিদটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের মা। নির্মাধীন মসজিদটিতে ২০১৮ সাল থেকে পবিত্র ঈদের নামায আদায় শুরু হয়েছে। শবে বরাত ও শবে কদর উপলক্ষে ওয়াজ ও দোয়া মাহফিলের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।  

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা নিমার্ণ শেষ হলে গিনেস রেকর্ড বুকে স্থান করে নেবে ২০১ গম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদ ঘিরে আশপাশে তৈরি হচ্ছে ফাইভস্টার হোটেল, আবাসিক হোটেল, মার্কেট, হেলিপ্যাডসহ অত্যাধুনিক সব বিল্ডিং। এই মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ হলে কাবা শরিফের ইমাম এসে নামাজের ইমামতি করে উদ্বোধন করবেন বলে জানালেন স্থানায় অধিবাসীরা।

 

কিভাবে যাবেন

বাস কিংবা ট্রেনে টাঙ্গাইল সদর। সদর থেকে গোপালপুর থানা সদর ৩০ কিলোমিটার। সেখান থেকে নগদা শিমলা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রাম আরো ১০ কিলোমিটার। গোপালপুর পর্যন্ত বাস যায়। এরপর সিএনজি বা অটোরিকশায়।