kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

অন্য কোনোখানে

চেরাপুঞ্জির পাদদেশে...

আবু আফজাল সালেহ   

৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চেরাপুঞ্জির পাদদেশে...

সিলেটের সারি নদী হয়ে লালাখাল জিরো পয়েন্ট মানেই ভারতের চেরাপুঞ্জির পাদদেশ। ইঞ্জিন চালিত নৌকায় নীল জল দেখতে দেখতে এক ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় সারিঘাট থেকে। সিলেট-জাফলং রোড ধরে ৩৫ কিলোমিটার গেলেই সারিঘাট। পাশেই জৈন্তা উপজেলা শহর, আছে জৈন্তা রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। একটু দূরেই জাফলং বা তামাবিল স্থলবন্দর।

সারিঘাট থেকে অটোতে কিছুটা এগিয়ে ওয়াপদা মোড়ে গিয়ে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে রিজার্ভ নৌকা নিতে পারেন। ওপারে ছোট্ট বাজার বা চা বাগানে যাওয়া যায় সহজেই। বাগানটি নয়নাভিরাম। এখানে হাতির পিঠেও চড়তে পারবেন। নীল জল বেয়ে দস্যিপনা করতে করতে পৌঁছা যাবেন লালাখাল জিরো পয়েন্টে। পাহাড়ের সারির ভেতর দিয়ে ছুটবে নৌকা। সে এক অপরূপ দৃশ্য!

যাত্রার শুরুতেই পাড়ি দিতে হবে ছোট টিলা আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে এঁকেবেঁকে চলা এক নদী। নাম সারি গাঙ। এ নদীর উত্পত্তি ভারতের চেরাপুঞ্জির পাহাড়ে। লোকমুখে শোনা যায়, এ নদী দিয়েই নাকি পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলাদেশে এসেছিলেন। সারি গাঙের বুকে ভেসে বেড়ায় শত শত বারকি নৌকা। স্বচ্ছ নীল পানির নদী চলে গেছে লালাখাল। তারপর মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়বেষ্টিত বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক সীমানা।

পাহাড়ের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা সারি নদী দিয়ে যেতে যেতে দুকূলে মানুষের প্রাত্যহিক কাজকর্মের দৃশ্য চোখে পড়বে। বিশেষ করে সারি বেয়ে রমণীদের পানি বয়ে নিয়ে যাওয়া আর অতিথি পাখির ওড়াউড়ি। নভেম্বর থেকে মার্চজুড়ে ঘন ও স্বচ্ছ থাকে এ নদীর পানি। মেঘ জলের গলাগলি, পাহাড়-সবুজ-বৃষ্টির মিতালি! দুই পাশে পাহাড় আর মাঝ দিয়ে নীল ধারায় নৌকা ভ্রমণ স্বপ্নময় ভুবনে নিয়ে যাবে। সারি গাঙের টলমলে স্বচ্ছ জল আর নানা দৃশ্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছে যাবেন লালাখালে। সারি গাঙের তুলনায় লালাখালের পানি বেশি স্বচ্ছ। নীলরঙা লালাখালের পানি এতটাই স্বচ্ছ যে পানির নিচের পাথর, সাঁতরে বেড়ানো মাছসহ অন্যান্য জিনিস স্পষ্ট দেখা যায়। অন্যদিকে ওপরে পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে আছে সাদা মেঘের অবয়ব। সবুজ, জল আর মেঘে একাকার পরিবেশ। মেঘ উড়ছে তুলার মতো।

জিরো পয়েন্টে এলেই দারুণ রোমাঞ্চ হবে। ওই দেখা যায় পাহাড়! ঐতিহাসিক মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জির পাহাড়! চেরাপুঞ্জি বিশ্বের বৃষ্টিবহুল এলাকা। পাহাড়ের সবুজ বৃক্ষের আড়ালেই বিএসএফের ফাঁড়ি। কর্মচঞ্চল পুরুষ-নারী দল পাথর সংগ্রহের করছে। সামনেই জিরো পয়েন্ট বা নো ম্যানস ল্যান্ডে লাল পতাকা জানিয়ে দেয় দুই দেশের সীমানার এখানেই শেষ।

বর্ষায় অপূর্ব দৃশ্য উপস্থাপিত হয় জিরো পয়েন্টে। নীল-সবুজ জল তো নয় যেন সাগর। অবশ্য বর্ষাকালে নীল পানি থাকে না। তখন পানিতে নীলের পরিমাণ কমে যায়।

লালাখাল, চোখ ধাঁধানো তার নীল জলে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির অপার রূপ-রহস্য। নির্জনতায় মোড়ানো এর স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর তার দুই ধারের অপরূপ সৌন্দর্য যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর কাছে এক দুর্লভ আকর্ষণ। চারদিকে সবুজের সমারোহ আর তার সঙ্গে পাহাড়, নদী, চা বাগানের মায়াবি সৌন্দর্য মুহূর্তেই মোহাচ্ছন্ন করবে। ছুটি-ছাঁটায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য প্রায় অনেকেই ছোটেন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি লালাখাল দর্শনে। চলছে বর্ষা মৌসুম, এ সময়টায় ঘুরে আসতে পারেন সেখান থেকে।

 

থাকা-খাওয়া 

সারিঘাটে থাকার মতো ভালো ব্যবস্থা নেই। সিলেট শহরে ভালোমানের থাকা-খাওয়ার আবাসিক হোটেল রয়েছে। পাহাড়ের গা ঘেষা হোটেল বা রিসোর্টে থাকলে দারুণ হবে। শাহপরাণ সংলগ্ন খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের কাছে ‘সুকতারা’, ‘জাকারিয়া সিটি’ বা ‘নাজিমগড়ে’ থাকতে পারেন। সিলেটের বিখ্যাত ‘সাতকরা’ আচারের স্বাদ নিতে পারেন সিলেটের যেকোনো স্থান থেকে। যাওয়ার পথে শাহপরাণ বা শাহজালালের মাজার দেখতে পারেন। শাহজালাল (রহ.) মাজারসংলগ্ন অনেক আবাসিক ও খাওয়ার হোটেল পাবেন। পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্টে নানা পদের ভর্তার স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

 

পার্শ্ববর্তী দর্শনীয় স্থান

সারিঘাট থেকে জাফলং (১৬ কিলোমিটার), তামাবিল (১২ কিলোমিটার), সারিঘাট থেকে গোয়াইনঘাট হয়ে ২৬ কিলোমিটার দূরের বিছানাকান্দি। আর ‘মিনি সুন্দরবন’ খ্যাত রাতারগুল বর্ষায় হয় মোহনীয়। রাতারগুলকে বাংলাদেশের মিনি অ্যামাজনও বলে থাকেন কেউ কেউ। হাতে সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন।

 

সতর্কতা

সিলেটি বৃষ্টির ভাবগতি বুঝে ওঠা কঠিন। তাই সিলেট ভ্রমণে সব সময় ছাতা সঙ্গে রাখবেন। নৌকা বিহারের আগে দরদাম ঠিক করে নেবেন। সিলেটের প্রায় সব স্পটে নৌকা ভাড়া ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে। একা গেলে শেয়ার করতে পারেন।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বিমান, রেল বা সড়ক পথে সিলেট। শহরের ওসমানী উদ্যান, শাহপরাণ কিংবা টিলাগড় থেকে সিএনজি চালিত অটোরিক্সা বা লেগুনায় সরিঘাট। জাফলং রোড ধরে গাড়ি চলবে ৩৫ কি.মি.। সারিঘাটে কিংবা একটু এগিয়ে লালাখাল ওয়াপদা ঘাট থেকে রিজার্ভ নৌকা পাবেন, এক ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে।

মন্তব্য