kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

অন্য কোনোখানে

গোলাপি পাহাড়ের হাতছানি

রুবাইয়াত রবিন   

১০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গোলাপি পাহাড়ের হাতছানি

এবারের গন্তব্য নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের গোলাপি চীনামাটির পাহাড়। ভোর ৬টায় ঘুম থেকে উঠে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সাড়ে ৬টার মধ্যে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের মূল গেটে এসে দেখি সবে দলের দু-তিনজন আসতে শুরু করেছে। সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ একটা আরামদায়ক টয়োটা টুরিস্ট বাসে চেপে আমরা রওনা হলাম।

হৈহুল্লোড় আর গান-বাজনার তালে তালে বাস গাজীপুর চৌরাস্তা পার হয়ে ময়মনসিংহ রাস্তায় উঠে পড়ল। ১১টা নাগাদ ত্রিশাল পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে খানিক বিরতি। তারপর ত্রিশাল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত আশ্রয়কুটিরটা দেখলাম। তারপর আবার যাত্রা।

ময়মনসিংহ শহরে দুপুরের খাবার খেয়ে নেত্রকোনা পৌঁছতে পৌঁছতে সূর্য পাটে বসল। সন্ধ্যার পর সেই অন্ধকারের মধ্যেই সামনে ওপারে মেঘালয়ের দিগন্ত প্রসারিত মোহনীয় শৈলমালা আমাদের সাদর আমন্ত্রণ জানাল। রাস্তার দুই পাশের ধানভরা মাঠ, ক্ষেত, ঘাসবন আর বিল-ঝিলের বিশুদ্ধ বাতাস বুক ভরে নিলাম। আমাদের রাত্রিনিবাস ‘বিরিশিরি আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্রের’ পাশে ওয়াইএমসিএ রেস্ট হাউসে। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে সাধারণ বাঙালিদের পাশাপাশি বেশির ভাগই হাজং, গারো আর কোচ সম্প্রদায়ের। রাতের খাওয়াদাওয়া শেষে স্থানীয় আদিবাসী শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অডিটরিয়ামে মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান উপভোগ করলাম। পরদিন ভোরে আবার যাত্রা শুরু। টিলাময় উঁচু-নিচু রাস্তা আর হরেক রঙের শাপলা-শালুক ফোটা খাল-ঝিল পেরিয়ে দুধসাদা রং মিহিগুঁড়া মাটির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম সোমেশ্বরীর পারে। অপূর্ব সুন্দর ছিপছিপে সোমেশ্বরী। ওপারের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে কুলকুল রবে বয়ে চলেছে। ভেতরে সোনা-লাল রঙা বালুর ফরাসের ওপর টলটলে স্বচ্ছ হাঁটুজল। দলের বাচ্চা থেকে বুড়ো—সবাই সেই পানিতে পা ভিজিয়ে, পানি ছোড়াছুড়ি করে ক্লান্তি জুড়িয়ে ফুরফুরে হয়ে গেল। তারপর বড় একটা ইঞ্জিন নৌকা এপারে ভিড়তেই মহা-উল্লাসে উঠে পড়লাম সবাই। ওপারে নেমে সুন্দর পিচঢালা রাস্তা। দুই পাশে ছোপ ছোপ পাহাড়ি উপত্যকার ফসলের মাঠ আর উঁচু উঁচু ঘাসের বুনো ঝোপ। কিছু দূর যেতেই মেঘালয়ের নয়নাভিরাম পাহাড়শ্রেণি আমাদের খুব কাছে চলে এলো। একটু পরে বড় পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলা রাস্তা আমাদের নিয়ে আচমকা চলতে শুরু করল সবুজ ঘাসে ছাওয়া ছোট-বড় নানা আকৃতির টিলার ভেতর দিয়ে। একটা ছোটখাটো বাজার মতো জায়গায় এসে দাঁড়াল আমাদের রিকশা। তারপর পায়েহাঁটা সরু পাহাড়ি পথ। পায়ের তলায় মখমলের মতো নরম মিহি সাদা মাটির ওপর দিয়ে হাঁটতে খুব মজা লাগছিল। অদ্ভুত মিষ্টি সুগন্ধও পাচ্ছিলাম মাটি থেকে। কৌতূহলে সবার অজান্তে এক মুঠো মাটি তুলে জামার পকেটে ভরে নিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দৃষ্টিসীমায় উঁকি দিল বাহারি রঙের অপূর্ব সুন্দর একটি টিলা। দুপুরের ঠা ঠা রোদের মধ্যে টিলার গা থেকে গোলাপি, মৃদু হলুদ, মরচে সবুজ আর তামাটে রঙের আভা ছিটকে বেরোচ্ছিল যেন। এতসব রঙের জেল্লার মধ্যে গোলাপি রঙের মাস্তানিটাই বেশি। সামনে আরেকটু এগোতেই আরো কয়েকটি রংবাহারি টিলা পাহাড়। প্রখর খরতাপের ভেতর গরমে তৃষ্ণার্ত হয়ে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এই গোলাপি পাহাড়কে স্ট্রবেরি আইসক্রিম মনে করে জিভে জল আনছিল! টিলার নিচে লেক। স্বচ্ছ পানিতে প্রতিবিম্ব পড়ে দারুণ আবহ তৈরি করেছে। আমরা এক টিলা থেকে আরেক টিলায় যেন লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছি। বেশি উঁচু না হওয়ায় দ্রুত ওঠা-নামা সহজ ছিল। একটা টিলার নিচে টলটলে নীল পানির আধার দেখে থমকে গেলাম। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে একই লেকের পানি এখানে রং বদলে হয়ে গেছে নীল।

টিলা আর পাহাড়গুলোর মধ্যেই ছোপ ছোপ সবুজ ঘাসের মাঠ আর ফসলের ক্ষেত। কোথাও কোথাও দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর। সুসং দুর্গাপুরের আকাশে-বাতাসে অন্য রকম এক সতেজতা, উজ্জ্বল শুভ্রতা, যা বাংলাদেশের আর কোথাও তেমন দেখা যায় না। প্রকৃতির মতোই এখানকার মানুষগুলোও উদার, অতিথিপরায়ণ। আশপাশের গৃহস্থ বাড়িতে দেখলাম পায়ে দলে ধান এলানোর দৃশ্য। মায়াবি গোলাপি পাহাড়ের রঙে প্রাণ রাঙিয়ে দুপুর গড়াতে ফেরার পথ ধরলাম। বিকেলের রোদে অন্য এক রূপ ফুটে উঠছিল গোলাপি টিলাগুলোয়। পথে টিলার ওপর এক হাজং পরিবারের আতিথেয়তায় দুপুরের ভোজন সারলাম। সেই পরিবারের প্রধান কর্তা যে বৃদ্ধা, তিনি এ বছর ১১০-এ পা দিলেন! এখনো চোখে পরিষ্কার দেখতে পান এবং কথা বলেন মোটামুটি স্পষ্টভাবে। আমরা সবাই তাঁর ফেলে আসা জীবনের গল্প শুনছিলাম বুঁদ হয়ে। আপ্যায়ন পর্ব শেষে তার শুভাশিস নিয়ে ঢাকার পথ ধরলাম।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সুসং দুর্গাপুর যাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় বলাকা কমিউটার ট্রেন অথবা রাতের বাস। কমলাপুর থেকে ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে ছাড়ে বলাকা কমিউটার। জারিয়া পৌঁছে সকাল ১০টায়। সেখান থেকে বাসে, টমটমে ও সিএনজিকে সুসং দুর্গাপুর যাওয়া যায়। আর মহাখালী থেকে সরাসরি রাতের বাস পাওয়া যায়।

 

মন্তব্য