kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

অন্য কোনোখানে

ছত্রপতি শিবাজির দেশে

লতিফুল হক   

১৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ছত্রপতি শিবাজির দেশে

রাস্তার বাঁদিকে সাইনবোর্ডে ‘শালিমার হোটেল’ দেখে অজান্তেই মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো ‘রুখো’। ট্যাক্সি ড্রাইভার ব্রেক কষে আমার মুখের দিকে তাকাল। কী ঘটনা? আসল ঘটনা তাকে বলতে পারলাম না, জানাতে পারলাম না ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’-তে ফেলুদা, তোপসে আর জটায়ু এসে শালিমার হোটেলেই উঠেছিলেন। এই শালিমার সেই শালিমার কি না সেটা অবশ্য বলা মুশকিল। তবে একই নাম দেখে নস্টালজিক হতে দোষ কী!

চিকিত্সাসূত্রে মুম্বাই এসে মোটে এক দিন সময় বাঁচল। তা-ই সই। পারেল থেকে ১৫০০ রুপি চুক্তিতে একটা ট্যাক্সি নিলাম। ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা, ঠিক হলো ট্যাক্সিওয়ালা রাত ৮টা পর্যন্ত শহরের অবশ্য দ্রষ্টব্য ঘুরিয়ে দেখাবে। প্রথম গন্তব্য গেট অব ইন্ডিয়া। যেখানে যেতে যেতেই শালিমার হোটেল দেখেছিলাম। আগে মুম্বাই শহরের যে অংশে ছিলাম, ঢাকার সঙ্গে পার্থক্য বিশেষ ছিল না। বস্তি, নোংরা, যানজট, ঘিঞ্জি গলি-রাস্তা। কিন্তু কোলাবার দিকে এগোতেই দৃশ্যপট বদলে যেতে লাগল। সুউচ্চ ভবন তো আছেই, অসংখ্য পুরনো দিনের স্থাপত্য চোখে পড়তে লাগল। সবই ব্রিটিশদের কীর্তি সন্দেহ নেই। গেট অব ইন্ডিয়ায় নেমে মন ভালো হয়ে গেল। প্রথম কারণ হঠাত্ই দুই এক ফোঁটা বৃষ্টি! মুহূর্তেই কড়া রোদ আর বিচ্ছিরি গরমটা গায়েব। মাসটা জানুয়ারি হলেও মুম্বাইতে ভালো গরম। হাফ স্লিভ টি-শার্টেও সবাই দরদর করে ঘামছে। আকস্মিক বৃষ্টি ঠাণ্ডার পরশ বইয়ে দিল। গেট অব ইন্ডিয়া আরব সাগরের পার ঘেঁষে স্বমহিমায় দাঁড়ানো এক স্মৃতি কেতন। ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ এবং রানী মেরির মুম্বাই সফরের স্মৃতি ধরে রাখতে এই গেট তৈরি হয়েছিল। গেট অব ইন্ডিয়ার পারে আছড়ে পড়ছে আরব সাগরের ঢেউ, ছবি তোলায় বিরাম নেই কারো। পাশেই বিখ্যাত তাজ হোটেল। ২০০৮ সালে যেখানে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল। গেট অব ইন্ডিয়া থেকে স্পিডবোটে আরব সাগরে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা আছে। আরো একটু দূরে এলিফ্যান্টা দ্বীপে যাওয়ার জাহাজও ছাড়ে এখান থেকেই। গেট অব ইন্ডিয়া পেরিয়ে ফের এগোতে থাকি মেরিন ড্রাইভ ধরে। সমুদ্রের পাশ ঘেঁষা সাড়ে তিন কিলোমিটারের দারুণ এই ড্রাইভওয়েটি বসে বসে সমুদ্র দেখার জন্যও ভালো। গেট অব ইন্ডিয়ায় ভিড়ের মধ্যে ভালোমতো সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারিনি, মেরিন ড্রাইভে এসে একটা পাথরের ওপর বসে পড়লাম। দূরে বান্দ্রা-উরলি সি লিংক দেখা যাচ্ছে। অফিশিয়ালি যার নাম রাজীব গান্ধী সমুদ্র সেতু। ওরলি থেকে সমুদ্র পথে বান্দ্রা পর্যন্ত গিয়েছে সেতুটি। ২০০৯ সালে এটি খুলে দেওয়ার পর দুই স্থানের মধ্যে যাতায়াতের সময় ৪৫ মিনিট থেকে কমে সাত মিনিটে আসে। মেরিন ড্রাইভ আর বান্দ্রা-উরলি সি লিংক বলিউড ছবিতে বহুবার এসেছে। সেতুর ওপর দিয়ে চলতে চলতে একটু ভয়-ভয়ই অবশ্য করছিল। মনে হচ্ছিল নিচেই সমুদ্র! একটু পর লাঞ্চ সেরে নিলাম। এবার যাব হাজি আলি দরগা। ১৪৩১ সালে সমুদ্র ঘেঁষে দরগাটি তৈরি হয়। এখানেই পীর হাজি আলি শাহ বুখারির সমাধি। তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের কিংবদন্তি শোনা যায়। তবে দরগাটি সব ধর্মের পর্যটকের অবশ্য গন্তব্য। কারণ এটির অবস্থান। জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানিতে দরগায় যাওয়ার পথটি পুরো ডুবে যায়। তখন দরগা সমুদ্রের মধ্যে ভাসমান এক স্থাপত্য। দেখতে দারুণ লাগে। প্রচণ্ড রোদ উঠে যাওয়ায় বেশিক্ষণ এখানে থাকা হলো না। ফের রওনা হলাম। যেতে যেতে ট্যাক্সিওয়ালা একে একে শচীন টেন্ডুলকর, অমিতাভ বচ্চন, সালমান খানের বাড়ি দেখাল। এর মধ্যে সালমানের বাড়ি ‘গ্যালাক্সি’ বাইরে থেকে দেখতে একেবারেই সাদামাটা। আমরা যাব আরেক খান, শাহরুখের বাড়ি। আরব সাগরের পার দেখে ‘কিং খান’-এর ‘মান্নাত’-এর সামনে যথারীতি বেশ ভিড়। বাংলাদেশি এক দম্পতি ঝগড়া করছেন—শাহরুখ কখন দেখা দেবেন এই নিয়ে। তাঁদের জানালাম জন্মদিন, ঈদ বা বিশেষ কোনো ঘটনা ছাড়া তাঁর দেখা দেওয়ার ইতিহাস নেই। স্ত্রী ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তাইলে আইলাম ক্যান?’ শাহরুখ দেখা দেন না, তার পরও সকাল-সন্ধ্যা বাড়ির সামনে হাজারো ভক্ত ভিড় করে। মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই প্রিয় তারকার বাড়ির সামনে ছবি তোলা। সঙ্গে আরব সাগরের সৌন্দর্য বাড়তি পাওনা। পড়ন্ত বিকেলে এই জায়গায় এসে পড়লে ফেরার কথা মনে পড়ে না। এরপর আমাদের যেতে হবে বিখ্যাত জুহু বিচ। আজ পর্যন্ত কত ভারতীয় ছবিতে এই সমুদ্র সৈকত দেখা গেছে ইয়ত্তা নেই। জুহু সৈকত ততটা পরিচ্ছন্ন নয়, অনেক মানুষের ভিড়। তবে জুহু বলে কথা, ঘণ্টাখানেক না কাটালেই নয়। ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’র মতো হাতে ভেলপুরির ঠোঙা নিয়ে ভিড় আর হই-হুল্লোড় ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে সমুদ্রের ধারে বালির ওপর বসলাম। একটু পরেই টুপ করে সূর্যটা ডুবে গেল। ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে চুক্তি ছিল সে আমাকে সিএসটি রেলস্টেশনে নামিয়ে দিয়ে যাবে। সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে হোটেলে ফিরব। কারণ সন্ধ্যার পর মুম্বাইতে ভালোই যানজট হয়। তবে সিএসটি বা বিখ্যাত ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস দেখাও আরেকটা কারণ ছিল। মহারাষ্ট্র তাদের মহান বীর ছত্রপতি শিবাজির নামে বিমানবন্দর, প্রধান রেলস্টেশনসহ অনেক কিছুরই নামকরণ করেছে। বিশাল এই স্টেশন তৈরি করতে সময় লেগেছিল ১০ বছরের বেশি। অনন্য এই স্থাপত্য ঘুরে দেখতে দেখতে ২০০৮ সালের সন্ত্রাসী হামলার কথাও মনে পড়ল। এখানেও একে-৪৭ নিয়ে হামলা চালিয়েছিল সন্ত্রাসীদের একজন আজমল কাসাব। যে ঘটনায় ৫৮ জন মারা যায়। সিএসটির ১৮টি প্ল্যাটফর্ম থেকে ভারতের বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেন ছেড়ে যায় ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। মাত্র পাঁচ রুপি দিয়ে টিকিট করে তারই একটায় চড়ে বসলাম। যাব শিউরি, এখান থেকে আট স্টেশন পর। সারা দিনের ঘোরাঘুরির ধকলে ট্রেনে বসতেই গা ছেড়ে দিল।

 

থাকা ও অন্যান্য

ভালোভাবে মুম্বাই দেখতে দুই থেকে তিন দিনই যথেষ্ট। চাইলে মুম্বাইয়ের সঙ্গে গোয়াও ঘুরে দেখা যায়। মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর বাংলাদেশিদের থাকা নিয়ে সমস্যা হতো। সেটা এখন অনেকটাই মিটেছে। শহরে থাকতে গেলে প্রতি রাত আড়াই হাজার রুপির মতো খরচ পড়বে।

কিভাবে যাবেন

ফ্লাইটে গেলে যেতে হবে কলকাতা হয়ে। এ ছাড়া বাস বা ট্রেনে কলকাতা পৌঁছে সেখান থেকে ট্রেনে মুম্বাই যাওয়া যায়। মুম্বাইগামী সবচেয়ে ভালো ট্রেন দুরন্ত এক্সপ্রেস। খাবারসহ ভাড়া ন্যূনতম চার হাজারের মতো। সময় লাগে ২৭ ঘণ্টা।

 

মন্তব্য